Category: গল্প-কবিতা

দেশের মান

দেশের মান


মোঃ কামারুজ্জামান সানিল
একাত্তরে দিলাম রক্ত
স্বাধীনতার জন্য,
রেখেছি মোরা দেশের মান
জীবন হলো ধন্য।

রক্ত দিয়ে লিখে দিলাম
বাংলাদেশের নাম,
রাখবো ধরে দেশের মান
করবো না বদনাম।

সংস্কৃতিচর্চাই আমৃত্যু মনোবলে বলিয়ান বর্ষিয়ান নাট্যপুরুষ নান্নু


নজরুল ইসলাম তোফাঃ খেলাধুলো, ছবি আঁকা, গান গাওয়া, সাহিত্য রচনা, নাটক নির্মান, নাটকে অভিনয় এইসব করতে আলাদা মন লাগে। এসব ক্ষেত্রে ঘটা করে প্রতিযোগিতার আয়োজন না থাকলেও যারা যেটা ভালবাসে, সেটার চর্চা চালিয়ে যায় নিজ তাগিদে, আর সেই চর্চায় শিল্পীর সঙ্গে আত্মিক ও বৌদ্ধিক উন্নতি ঘটে। শিল্পী নিজের ভেতরেই নিজেকে উন্নত করার চেষ্টায় সর্বদা প্রস্তুত থাকেন, এ যুগের সমকালীন শিল্পী, সাহিত্যিক, নাট্য নির্মাতা, অভিনেতা, অভিনেত্রীরা সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে আরো ভালো হবার তাগিদ অনুভব করেন, আর সেই তাগিদেই তাঁদের নাম ছড়ায় দেশে বিদেশে। তার জন্য প্রতিযোগিতার কোন দরকার পড়ে না একেবারেই প্রথম হবার। এই সব মৌলিক বিনোদনের ক্ষেত্রে ভীমসেন যোশীকে বব ডিলান হয়ে উঠতে হয় না, এমনকি আলি আকবর খানও হতে হয় না, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকেও টেনিসনের সঙ্গে লড়াই করে ‘জিততে’ হয়নি কখনো। অথচ আজ দৌড়ের সব ব্যাকরণ মেনে চলেও কেউ কেউ শুধু প্রদীপের আলোয় আলোকিত থাকতে চান। সুতরাং মৌলিক প্রশ্নটা হল এই যে, প্রতিযোগিতার আসর না বসালে যে গুণপনা বিশেষ উন্নয়ন হয় না। এমন বিষয়কেই গুরুত্ব দেওয়া উচিৎ বৈকি? যদি মানুষের দৌড়ের সর্বনিম্ন সময় খুবই কম, স্বল্প সময়ে জীবনে রেখে যাওয়া অর্জনটাই থাকে যুগ যুগ। এমনি একজন ব্যক্তি, পরিবাহিক রক্তের ধমনি শিরা-উপশিরায় সর্বদা কথা বলে অভিনয়ের সংলাপে, নাট্য পরিচালনায়। নাট্যজীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা নিয়ে যিনি দর্শক নন্দিত তিনিই অভিনয় জগতের একজন মহীরূহ পুরুষ মাহমুদ সরকার নান্নু।

রাজশাহী সাংস্কৃতি অঙ্গনে ব্যাপক তাঁর পরিচিতি এবং টেলিভিশন জগতেও তাঁর পরিচিতি রয়েছে সুদীর্ঘ প্রায় ৩০ বছর যাবত। রাজশাহী তথা উত্তরাঞ্চলে নাট্য জগতে রয়েছে তাঁর অবাধ বিচরণ। তাছাড়াও একজন সফল মেকাপ ম্যান, সেট নির্মাণ বা মঞ্চ সজ্জার রুপকার, নাট্য পরিচালক ও প্রয়োজকের কাজে অক্লান্ত পরিশ্রমী ব্যক্তি হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছেন। একাধারে তিনি রেডিও, মঞ্চ, পথ নাটকের সুনাম অর্জন করেছেন। তিনি মিডিয়া নাটকে অনেক চমৎকার চরিত্রে অভিনয় করেছেন, যা বিভিন্ন চ্যানেলে প্রচারিত হয়েছে এবং হচ্ছে। আসলেই তাঁর চ্যানেল নাটক নির্মাণের যোগ্যতা কোন অংশেই কমতি নেই। অনেক নাটক নির্মাণ করেছেন এবং সেসব নাটকে অভিনয় করে চ্যানেলে চ্যানেলে প্রচার করেছেন। নাট্যাঙ্গনের এই পরিচিত মুখ নান্নু, অনেক মঞ্চ ও শুটিং স্পর্টের সেট পরিকল্পনার সহিত লাইটিং এবং সাউন্ড ইফেক্টের জন্য একজন দক্ষ ডিজাইনার।

জীবনের শুরুতে নাটকে হাতে খড়ি তাঁর নাট্যগুরু আনোয়ারুল ইসলামের রচনা ও পরিচালনায় ‘রক্তের রং লাল’ নাটকে। তিনি জানালেন এই নাটকে শিশু চরিত্রে ভালো অভিনয় করেছেন। রাজশাহীর পুরনো এক ভূবন মোহন পার্কের উম্মুক্ত মঞ্চে। দিনটি ছিল ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের পড়ন্ত বিকেল। পরে তিনি অভিনয়ের অভিজ্ঞতা পরিপূর্ণতা এনে অর্জন করে সাফল্য, তারপর ধিরেধিরে রাজশাহী বেতারের অনিয়মিত নাট্যকার, নাট্যশিল্পী ও প্রযোজক হিসেবে দ্বায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর প্রযোজনা ও রচনা নাটক হচ্ছে আলোকিত প্রেম কুমার, শেষ বিদ্ধান্ত, অন্যরকম বোঝাপড়া এবং আবুল আশরাফ রচিত বসন্তে ফুটলো ফুল নাটকের প্রযোজনা কাজ তিনি সুদক্ষ ভাবে সম্পূর্ণ করেছিলেন। বর্তমানে তাঁর রচিত যে তিনটি নাটক প্রচারের অপেক্ষায় তা হলো হ্যাবলা হাবুর কান্ড, অস্তিত্বের লড়াই, রক্তাক্ত পলাশী। আবার নজরুল ইসলাম তোফাকে জানালেন, প্রয়াত পরিচালক নাট্যগুরু গোলাম পাঞ্জাতনের জীবদ্দশায় তিনি তাঁর সাথে অনেক গুলো নাটকে নির্মান কাজে সহযোগিতা ও অভিনয় করেছেন। নাট্যগুরুর মৃত্যুর আগ মুহুর্তে নান্নু তাঁর সাথে দেখা করে নাটক সংক্রান্ত অনেক তালিম নিয়েছিলেন এবং নাট্যগুরু বলেছিলেন যে, তাঁর নাটক গুলো যেন সংগ্রহ করে রাখা হয়, প্রচার করা হয়। সুতরাং সে কথা নান্নু রেখেই ম্যাই টিভিতে প্রচার করেন জনপ্রিয় নাটক ‘ভন্ড উপাখ্যান’। যাকি না, গত ১৭ জানুয়ারী ২০১৬ সালে রাত ১১ টায়, বঙ্গবন্ধু প্রত্যাবর্তন দিবসে প্রচার হয়।

১৯৬৪ সালে রাণীনগর (হাদির মোড় এলাকায়) সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলে মাহমুদ সরকার নান্নু জন্মগ্রহন করেন। তাঁর বাবা আলী আকবর সরকার সি এন্ড বি অফিসে হেডক্লার্ক পদে চাকরি করতেন। তাঁর বাবা আর এম পি ডি ক্লাবে নাট্যচর্চা করেছিলেন। শুধুই বাবা যে নাট্যচর্চায় ছিলেন তা নয়, পরিবারের অন্যান্য গুনোধর সদস্যরাও বেশ এগিয়ে ছিলেন। মাহমুদ সরকার নান্নু জানালেন, পাঁচ ভাই তিন বোন নিয়ে তাঁর বাবা এক বড় সংসার। তিনি পাঁচ ভাইদের মধ্যে তৃতীয় বড় ভাই শ্রদ্ধেয় গোলাম কিবরিয়া নাট্যশিল্পী, মেজো ভাই আব্দুল মান্নান সন্ধানী সাংস্কৃতিক সংস্হার পরিচালক এবং বাংলাদেশ বেতারের সঙ্গীত শিল্পী। আব্দুল মান্নানের বড় ছেলে অঙ্কুর ও বড় মেয়ে অন্তরা উভয়েই সঙ্গীতশিল্পী। নজরুল ইসলাম তোফাকে বলেন, সেই যে শৈববে শিশুশিল্পী হিসেবে অভিনয় জগতে আনাগোনা তারই রেশ ধরে আজও নাট্যাঙ্গনে কাজ করছেন। প্রথম দিকে নৈশভোজ, সূর্যমহল, দায়ি কে, রনদুন্দভি, মুখোশ যখন খুলবে, ডাকাত, পাকা রাস্তা নাটকে অভিনয় ও পরিকল্পনা করেন। যাত্রা পালা জগতেও তাঁর বিচরণ রয়েছিল, সেহেতু সে জগতে অসংখ্য যাত্রা পালা করেছেন এবং রেডিওতে প্রচার হয়েছে। বাঈনুদ্দিন সরকার বানু পরিচালিত অনেক ঐতিহাসিক এবং সামাজিক যাত্রাপালায় অভিনয় করেছেন। যেমন: ময়না মতির মায়া, আনার কলি, অভিশপ্ত ফুলসজ্জা, একটি পয়সা, রূপ হলো অভিশাপ, রাণী ভবানী, টিপু সুলতান, নাচ মহল, সিরাজ-উ-দৌল্লা এছাড়াও নিজস্ব চিন্তার আলোকে পরিচালনা করেন অনেক যাত্রাপালা এবং তাতে অভিনয় করে দর্শক নন্দিত হয়ে পুরস্কার পেয়েছেন বারবার।

সংসার জীবনে দুইপুত্র অনিক মাহমুদ ও অরিত্র মাহমুদ নিয়ে কষ্টেশিষ্টে কোন ভাবে চলছেন। বড় ছেলে অনিক মাহমুদ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স পরিসংখ্যানের মেধাবী ছাত্র এবং সহধর্মিনী জেসমিন মাহমুদ জাপানি একজন গৃহিণী। ছোট ছেলে তাঁর পড়াশুনা করে তাইফ মন্তেশ্বরী স্কুলে। এক দিকে ছেলেদের চাহিদা মতো লেখাপড়ার খরচ যোগাতে ব্যর্থ অন্যদিকে সহধর্মিনীর জটিল রোগের চিকিৎসা খরচেও অনেক অংশে ব্যর্থ হয়, এক পর্যায়ে এ পৃথিবী থেকে চীরবিদায় নিয়ে পরলোকগমন করেন। আসলে সব মিলিয়ে কষ্টেই বর্তমানে তিনি আর্থিক দৈন্যতায় জীবন অতিবাহিত করছেন। সৃজনশীল কোন কাজে উল্লসীত ভাবে অগ্রসর হতেই যেন এক চরম বাধা। মনে হাজারও যন্ত্রণা নিয়ে নাট্যাঙ্গনের নাটকে তবুও আজ গভীর স্বপ্নে বিভর। অপরদিকে নাট্যপ্রেমী মাহমুদ সরকার নান্নু বলেন, মনে সৃষ্টির যন্ত্রণা না থাকলে সৃজনশীল কোন কাজ করা যায় না, তার যথাযত প্রমান রেখে চলেছেন এটিএন চ্যানেলে প্রচারিত ধারাবাহিক ক্রাইম প্রেট্রোল নাটকে। প্রতি শনিবার সন্ধ্যায় পোনে আটটায় তা প্রচার হয়। দ্বীপ্ত টিভিতে শ্যামল বিশ্বাসের পরিচালনায় ধারাবাহিক নাটক অপরাজিতা প্রতি মঙ্গলবার ও বুধবার সন্ধ্যা ৬ টায় প্রচার হয়। তিনি সেখানেও চমৎকার অভিনয় দেখিয়ে দর্শক নন্দিত হয়েছেন। রহমতউল্ল্যাহ তুহিন পরিচালিত টক অব দ্যা টাওন নাটকে অভিনয় করেন। এটি অবশ্য চ্যানেল আইতে রবিবারে সন্ধ্যা ৮টা ৪৫ মিনিটে প্রচার হয়। অঞ্জন আইচ পরিচালিত খাঁচা ২৬ মার্চ বেলা ২ টায় তাঁর অভিনীত নাটক বৈশাখী চ্যানেলে প্রচার হয় এবং মাছ কই নাটক ১৭ জানুয়ারি চ্যানেল আইতে বেলা ২ টায় প্রচার হয়। সুমন আহমেদ পরিচালিত এই নাটকেও নান্নু অভিনয় করেছেন। ওয়াজেদ আলী সুমন পরিচালিত অপেক্ষার হালচাল নাটকে সফল অভিনয় সহ তাঁর নিজস্ব পরিচালনা ও অভিনীত নাটক থাবা, যা ম্যাই টিভিতে ৩১ মার্চ সন্ধ্যা ৮ টা ৪৫ মিনিটে হয়। তাছাড়াও অন্যান্য নামি দামি অসংখ্য পরিচালকের নাটকে অভিনয় করে দর্শকনন্দিত হয়েছেন।

ফিরে যাই একটু গুড়ার দিকে, নান্নুকে জানতে ও চিনতে রাজশাহী বাসীর এমন কোন লোক নেই যে তাঁকে চিনে না। এমন প্রতিভাবান নাট্যপ্রেমী মানুষ আধুনিক যুগের তরুণ তরুণীদের সাথে নাটকে অভিনয় ও পরিচালনার কাজ করছেন। যুগোপযোগী চিন্তা নিয়ে নাট্যাঙ্গনে নিজ অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছেন। তিনি বলেন নাট্যগুরু গোলাম পাঞ্জাতের পরিচালনায় বহু নাটকে অভিনয় করেছেন। যেমন: রক্ত গোলাপ, পরিনতি, এখন দুঃসময় ইত্যাদি। উত্তরা সাংস্কৃতিক গোষ্ঠির জন্ম লগ্ন থেকে গাঁয়ের বধু, বিদ্যা লংকার প্রেস এছাড়াও বিভিন্ন নাটকে অভিনয় ও নাট্য প্রতিযোগিতায় অংশ গ্রহন করেছেন। এরপর নাট্যাচার্য অনীল বন্ধু রায়ের পরিচালনায় ‘ঘটনা ও কাহিনী’, মানুষ নাটকে অভিনয় করে রাজশাহীতে ব্যাপক পরিচিত হন। তিনি রাজশাহী সাংস্কৃতিক সংঘের আজীবন সদস্য। এখানে তিনি ‘চারিদিকে যুদ্ধ’, যুদ্ধ এবং যুদ্ধ চোর, ড়ীর চরের রাঙ্গা বুড়ি, ইলেকশন ক্যারিক্যাচার নাটকে অভিনয় করেন। সে সময়ে তিনি ‘শিমুল গাঁয়ের বলির বয়ান’, ‘হারাধনের দশটি ছেলে’, ‘জুতা আবিস্কার’, নাটকে দক্ষতার সহিত নির্দেশনা দিয়ে মঞ্চ সফল হিসেবে দর্শক মহলে ব্যাপক সাড়া জাগিয়ে ছিলেন। মাষ্টার তোফাজ্জল হোসেন পরিচালিত ‘বট তলার মোড়ে’, ‘জিন্না হকের মানুষ’, এক যে ছিল কুটনি বুড়ি’, ‘ভাঙ্গা মেলা’, ‘দিন বদলের পালা’, ‘বেজন্মা হ্যাবলা স্বদেশ’, ‘পলাশি থেকে একাত্তর’, এবং পথ নাটকে খ্যাপা পাগলার প্যাচাল নাটকে অভিনয় করেছেন। ১৯৮০ সালে তিনি বেতার শ্রুতিনাট্যে অডিশন দিয়ে পাশ করে তালিকা ভূক্ত শ্রুতিনাট্যের গুনি শিল্পী হয়েছেন। সেই থেকে অদ্যাবধি নিয়োমিত জীবন্তিকা ও বিভিন্ন শ্রুতিনাট্যে অংশ গ্রহন করেন এবং ১৯৮৫ সালে বিটিতে অডিশন দিয়েও পাশ করে অনেক লোককথা নাটকে অভিনয় করেছেন। তাছাড়া নাট্য পরিচালক রাশেদুল হক পাশা রচিত ‘মোটর সাইকেল’ নাটকে অভিনয় করেছেন।

নাট্যকার, পরিচালক এবং অভিনেতা নান্নু, নজরুল ইসলাম তোফাকে বলেন, তাঁর জীবন যাপন সেকেলের সাহিত্যিক, নাট্যকার ও অভিনেতাদের আদলে না রেখে যুগোপযোগী শিল্পচর্চা নিয়ে আধুনিক প্যাটার্নে চলেন। একদা এক প্রাচীন সংস্কৃতির নাট্যকার, পরিচালক ও অভিনেতাদের যেসব ভাবধারা কখনো সখনো খুব জরুরী মনে হয়েছে তা কাজেও লাগিয়েছেন। মানুষ ও বিশ্বজগৎ সম্পর্কে তীব্র যুক্তিবাদী প্রতিবাদ সহ নানান শিল্পমতবাদের পরিপোষক ভাব-ধারণায় মাহমুদ সরকার নান্নু’ তাঁর নাটক ও অভিনয় জীবনে সমৃদ্ধ করেছেন। তাঁর অভিনীত চরিত্রগুলো এতো বিরাট ও শক্তিশালী তা কেবলই মর্মান্তিক নয়, ভয়ঙ্করও বটে। জীবনের শেষ দিকে এসে তিনি অনেক অভাবের সংসার নিয়ে প্রতিটি মুহুর্ত কষ্টে কাটাচ্ছেন। সারা জীবন তিনি নাট্যাঙ্গনে ত্যাগী এক বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের অধিকারী হয়ে রয়েছেন, তিনি কোন দিন বাঁধা রাস্তায় চলেননি, বাঁধা গৎ আওড়াননি, কর্মজীবনে তিনি আর পাঁচ জন নাট্যকার, পরিচালক এবং অভিনেতাদের মতো একই চিন্তার পুনরাবৃত্তি করেনি। সমসাময়িক জীবনে অনেক অপ্রত্যাশিত দুর্ঘটনা এবং এদেশের সমস্যাসঙ্কুল পরিবেশ ও জীবনের অনেক আকস্মিক পরিণাম সম্পর্কে নান্নু মোটেও উদাসীন ছিলেন না। তার ভবিষ্যত পরিকল্পনা জানতে চাইলে বলেন, সমসাময়িক ঘটনা নিয়ে মঞ্চ নাটক এবং রাজশাহীর গুনিজনদের নিয়ে জীবন ভিক্তিক ডকুমেন্টরি তৈরীর বাসনা পোষন করেন। তাছাড়াও জানালেন আমৃত্য সাংস্কৃতি চর্চা করতে পারেন সেটা ছাড়া আর কোনো কিছুর কামনা করেন না।

সাম্প্রদায়িকতা ও জাতীয়তাবোধের মূর্ত প্রতীক কবি নজরুল

রায়হান আহমেদ তপাদার

কবি নজরুল বলতে কাউকে বাড়তি কোনো কথা বা বিশ্লেষণ দিয়ে আবার চিনিয়ে দিতে হয় সেটা আমি কখনো শুনিনি।কারণ কবি নজরুল হলেন বাংলার কবি, বাঙালির কবি, বাংলার সর্বসাধারণের কবি।ক্ষণজন্মা ও ক্ষণকালীন সক্রিয় এ কবি যদি বাংলা সাহিত্যে না আসতো তাহলে বাংলা সাহিত্য এতটা সমৃদ্ধ হতো না। তার কবি প্রতিভা সম্পর্কে কারো সন্দেহ নেই। এমনকি তার সমালোচকরাও তার কবি প্রতিভাকে কখনোই খাটো করে দেখেননি।স্বয়ং বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ নজরুলকে তার জীবদ্দশাতেই বড়মাপের কবি হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে গেছেন।কবিগুরু নজরুলের কবিসত্তার স্বীকৃতিস্বরূপ তার সঞ্চয়িতা গ্রন্থটি কবি নজরুলকে উৎসর্গ করে গেছেন। নজরুল কবি হিসেবে পরিচিত হলেও তিনি শুধু কবিতা রচনাতেই থেমে থাকেন নি। সাহিত্যের এমন কোনো শাখা নেই যেখানে তিনি অবদান রাখেন নি।
কিছু বিখ্যাত ব্যক্তির নামের সঙ্গে কিছু স্থানের নাম এমনভাবে অঙ্গা-অঙ্গিভাবে জড়িয়ে থাকে যেন সেসব ব্যক্তির নাম থেকে সেসব স্থানের নামও কোনোভাবে আলাদা করা যায় না। জাতিরজনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ক্ষেত্রে বাইগার নদী, মধুমতি নদী, টুঙ্গিপাড়া গ্রাম, গোপালগঞ্জ, ফরিদপুর, ঢাকার ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর ইত্যাদি স্থান। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ক্ষেত্রে জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি, বিশ্বভারতী, শান্তি নিকেতন, কুষ্টিয়ার শিলাইদহ, কুঠিবাড়ি, সিরাজগঞ্জের শাহাজাদপুর, নওগাঁর পতিসর ইত্যাদি স্থান বিখ্যাত হয়ে প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। ঠিক একইরকমভাবে প্রসিদ্ধি লাভ করেছে কবি নজরুলের জন্য বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার চুরুলিয়া গ্রাম। সেখানেই শেষ নয়, তার জন্য আরো বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়েছে ত্রিশালের দরিরামপুর, কাজির সিমলা দারোগা বাড়ি, বটতলা ও বিচুতিয়া বেপারি বাড়ি। কবি নজরুলের নামের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে রয়েছে কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, মানিকগঞ্জসহ আরো অনেক জায়গা। এদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে ঢাকায় কবিভবন।আজ জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১১৮তম জন্মবার্ষিকী।নজরুল শুধু একটি নামই নয়, বিপ্লবী জীবনের একটি সফল প্রতিচ্ছবি।
অভাবী দুখু নিজেকে চালিত করতে অল্প বয়সেই নেমে পড়েন কর্মখোঁজে। লেটো দলের বাদক, রেল গার্ডের খানসামা, রুটির দোকানের শ্রমিক,সৈনিক কিংবা সাংবাদিকতা, কখনো আবার কাজ করছেন কলকাতা বেতারে। সাহিত্য সাধনার পাশাপাশি নেমেছেন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে। শাসকগোষ্ঠীর রোষানলে পড়ে কারারুদ্ধ হয়েছেন, কিন্তু থামেনি প্রতিবাদী নজরুলের কলম। শোষিত ও বঞ্চিত মানুষের পক্ষে জুলুমবাজ, অত্যাচারী ও সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে কথা বলেছে তার কাগজ-কালি।যুগে যুগে পৃথিবীতে কিছু মানুষ এসেছেন প্রেরণার উৎস হয়ে। যারা স্ব-স্ব প্রতিভার বিচ্ছুরণ ঘটিয়ে এনেছেন আলোর সন্ধান, নিজেদের সৃষ্টি বা কর্ম দ্বারা গড়েছেন ইতিহাস। তেমন একজনকে নিয়েই আজকের আলোচনা। সাধারণ থেকে অসাধারণ হয়ে ওঠা এক দুখু মিয়া। যিনি পৃথিবীতে আবির্ভূত হন অভাব-অনটন আর দুঃখ-কষ্টের অন্ধকার কুঠিরের নিভু নিভু প্রদীপরূপে। তিনি কাজী নজরুল ইসলাম। বাবা-মায়ের দুঃখের সংসারে জন্ম হওয়ায় তাকে ডাকা হতো দুখু মিয়া নামে। সেই দুখু মিয়া একসময় আপন কর্মগুণে কবি খ্যাতি অর্জন করেন। ১৩০৬ বঙ্গাব্দের ১১ জ্যৈষ্ঠ (১৮৯৯ সালের ২৫ মে) পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার আসানসোল শহরস্থ চুরুলিয়া গ্রামের বাসিন্দা পিতা কাজী ফরিদ উদ্দিন ও মাতা জাহেদা খাতুনের সংসারে জন্ম প্রেম, দ্রোহ, মানবতা ও সাম্যের কবি বিদ্রোহী নজরুলের। ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাকে জাতীয় কবির মর্যাদা দিয়ে ভারত থেকে বাংলাদেশে নিয়ে আসেন। এরপর থেকেই নজরুল আমাদের জাতীয় কবি।পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশ দুই বাংলাতেই তার কবিতা ও গান সমানভাবে সমাদৃত। তার কবিতায় বিদ্রোহী দৃষ্টিভঙ্গির কারণে তাকে বিদ্রোহী কবি নামে আখ্যায়িত করা হয়েছে। তার কবিতার মূল বিষয়বস্তু ছিল মানুষের ওপর মানুষের অত্যাচার এবং সামাজিক অনাচার ও শোষণের বিরুদ্ধে সোচ্চার প্রতিবাদ। বিংশ শতাব্দীর বাংলা মননে কাজী নজরুল ইসলামের মর্যাদা ও গুরুত্ব অপরিসীম। সকল অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে নজরুল সর্বদাই ছিলেন সোচ্চার। তার কবিতা ও গানে এই মনোভাবই প্রতিফলিত হয়েছে।
অগ্নিবীণা হাতে তার প্রবেশ, ধূমকেতুর মতো তার প্রকাশ।তার সাহিত্যকর্মে প্রাধান্য পেয়েছে ভালোবাসা, মুক্তি এবং বিদ্রোহ। ধর্মীয় লিঙ্গভেদের বিরুদ্ধেও তিনি লিখেছেন। ছোট গল্প, উপন্যাস, নাটক লিখলেও তিনি মূলত কবি হিসেবেই বেশি পরিচিত। বাংলা কাব্য তিনি এক নতুন ধারার জন্ম দেন। এর পাশাপাশি তিনি অনেক উৎকৃষ্ট শ্যামাসংগীত ও হিন্দু ভক্তিগীতিও রচনা করেন। নজরুল প্রায় ৩০০০ গান রচনা এবং অধিকাংশে সুরারোপ করেছেন যেগুলো এখন নজরুল সংগীত বা নজরুল গীতি নামে পরিচিত এবং বিশেষ জনপ্রিয়।জাত ভেদাভেদ ভুলে গেয়েছেন সাম্যের গান। সৃষ্টির সেরা মানব জাতিকে একই কাতারে মিলিত করতে ‘সাম্যবাদী’ কবিতায় তিনি বলেছেন-গাহি সাম্যের গান-যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা-ব্যবধান যেখানে মিশছে হিন্দু-বৌদ্ধ-মুস্লিম-ক্রীশ্চান।আবার ‘মানুষ’ শিরোনামের অন্য একটি কবিতায় লিখেছেন-গাহি সাম্যের গান-মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান!নাই দেশ-কাল-পাত্রের ভেদ, অভেদ ধর্ম জাতি,সব দেশে, সব কালে, ঘরে ঘরে তিনি মানুষের জ্ঞাতি।মানবপ্রেমী নজরুল কর্মগুণে হয়েছেন মহীয়ান। তিনি অবস্থান নিয়েছিলেন মানবতা ও সত্য-সুন্দরের পক্ষে।দুখু মিয়া খেটেখাওয়া মানুষের দুঃখ-দুর্দশার সঙ্গী হতে পেরেছেন। তাইতো তিনি ‘কুলি-মজুর’ কবিতায় বলেছেন-দেখিনু সেদিন রেলে,/কুলি ব’লে এক বাবু সা’ব তারে ঠেলে দিলে নীচে ফেলে!/চোখ ফেটে এল জল, এমনি ক’রে কি জগৎ জুড়িয়া মার খাবে দুর্বল?’ গরিব-দুখি, অসহায় মানুষদের প্রতি সমাজের বিত্তবানদের এমন আচরণ সইতে না পেরে কবি লেখনীর মাধ্যমে প্রতিবাদ জানিয়েছেন বারবার।জন্ম-মৃত্যুর মাঝখানে দাঁড়িয়ে ‘অভিশাপ’ নামক কবিতায় তিনি লিখেছিলেন-যেদিন আমি হারিয়ে যাব, বুঝবে সেদিন বুঝবে অস্তপারের সন্ধ্যাতারায় আমার খবর পুছবে,
বুঝবে সেদিন বুঝবে।ছবি আমার বুকে বেঁধে পাগল হয়ে কেঁদে কেঁদে ফিরবে মরু কানন গিরি, সাগর আকাশ বাতাস চিরি,সেদিন আমায় খুঁজবে,বুঝবে সেদিন বুঝবে।অভিমানভরা মনে লেখা কথাগুলো নজরুল ভক্তদের হৃদয়ে আজও দাগ কাটে।
মৃত্যুর মাঝে দেহ নিঃশেষ হলেও নজরুল যে হারিয়ে যাননি ওই কবিতাংশটুকু বহন করে চলেছে তার সত্যতা। গোধূলি লগনে মাথার ওপর মিটিমিটি তারাগুলোও যেন পৃথিবীর বুকে খুঁজে ফিরে কবির হারানো স্মৃতিগুলো।
অশ্রুসিক্ত নয়নে পাহাড়-পর্বত, ধু-ধু ফাটল প্রান্তর, ফুলের বাগান, সমুদ্র-নদী কিংবা উড়ন্ত মেঘের বুক চিরে গগনপানে অপূর্ণ হৃদয়টি তন্ন তন্ন হয়ে খুঁজে ফিরছে নজরুলের অদৃশ্য চেহারাটি। হ্যাঁ বুঝেছি আমরা, সবাই বুঝেছি তোমার শূন্যতা।১৯২৯ সালের ১৫ ডিসেম্বর কলকাতা এলবার্ট হলে বাংলার হিন্দু-মুসলমানদের পক্ষ থেকে সংবর্ধিত করা হয় কাজী নজরুল ইসলামকে। উক্ত সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে বক্তব্যের একাংশে তিনি বলেছিলেন -বিংশ শতাব্দীর অসম্ভবের সম্ভাবনার যুগে আমি জন্মগ্রহণ করেছি। ওই অভিযান-সেনাদলের তূর্যবাদকদের একজন আমি। এটাই আমার বড় পরিচয়। যাঁরা আমার নামে অভিযোগ করেন তাঁদের অনুরোধ, আকাশের পাখিকে, বনের ফুলকে, গানের কবিকে তাঁরা যেন সকলের করে দেখেন। আমি এই দেশে, এই সমাজে জন্মেছি বলেই শুধু এই দেশেরই, এই সমাজেরই নই; আমি সকল দেশের, সকল মানুষের। যে কুলে, যে সমাজে, যে ধর্মে, যে দেশেই জন্মগ্রহণ করি, সে আমার দৈব। আমি তাকে ছাড়িয়ে উঠতে পেরেছি বলেই কবি।নজরুলের প্রতি সম্মান রেখে অন্নদাশঙ্কর রায় লিখেছিলেন- ‘ভাগ হয়ে গেছে বিলকুল/ভাগ হয়ে গেছে সব কিছু আজ/ভাগ হয়নিকো নজরুল।’ সত্যিই নজরুল সব কিছুর ঊর্ধ্বে। বিধাতার অপূর্ব সৃষ্টি ঝাঁকরা চুলের বাবরি দোলানো মহান পুরুষ।স্রষ্টা নিজ হস্তে ভিন্ন কোনো বস্তু দিয়ে গড়ে তুলেছেন বাঙালি এই দেহটি। নজরুল অতুলনীয়। তিনি ৭৭ বছরের জীবনে ৩৪ বছরই ছিলেন নির্বাক। নানা ঘাত-প্রতিঘাতে ২৪ বছরের সাহিত্যচর্চায় তিনি সৃষ্টি করে গেছেন ২২টি কাব্যগ্রন্থ, ৭ হাজার গানসহ ১৪টি সংগীত গ্রন্থ, ৩টি কাব্যানুবাদ ও ৩টি উপন্যাস গ্রন্থ, ৩টি নাটক, ৩টি গল্পগ্রন্থ, ৫টি প্রবন্ধ, ২টি কিশোর নাটিকা, ২টি কিশোর কাব্য, ৭টি চলচ্চিত্র কাহিনিসহ অসংখ্য কালজয়ী রচনা।নজরুল একাধারে কবি, গল্পকার, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার, শিশু সাহিত্যিক, অনুবাদক, প্রাবন্ধিক, সম্পাদক, সাংবাদিক, গীতিকার, সুরকার, স্বরলিপিকার, গীতিনাট্যকার, গীতালেখ্য রচয়িতা, চলচ্চিত্র কাহিনিকার, চলচ্চিত্র পরিচালক, সংগীত পরিচালক, গায়ক, বাদক, সংগীতজ্ঞ ও অভিনেতা।
১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট তৎকালীন পিজি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন আমাদের প্রেম, ভালোবাসায় গড়া এক মহান পুরুষ, মানবতার কবি কাজী নজরুল ইসলাম।নজরুল গণমানুষের চেতনার কবি। তিনি সবার মধ্যেই বাস করে থাকেন। আমরা যখন ছোটবেলায় সিনেমা হলে গিয়ে সিনেমা দেখতাম। তখন একেকটি সিনেমার কাহিনী, প্রত্যেকটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রের ওপর মনে পরম রেখাপাত করতো। কয়েকদিন পেরিয়ে গেলেও তা মন থেকে চলে যেতো না। তেমনি একটি সিনেমা ছিল ‘ছুটির ঘণ্টা’ যেখানে একজন স্কুলপড় য়া শিক্ষার্থীর করুন জীবনাবসানের কাহিনী চিত্রিত হয়েছে। অপরদিকে বলতে গেলে ‘এতিম’ সিনেমাটিও আমার মনে খুবই রেখাপাত করেছিল, যেখানে একটি ছোট্ট ছেলের মা-বাবা মারা যাওয়ার পর এতিম হয়ে যাওয়ার করুন কাহিনী ফুটে উঠেছে।নজরুলকে নিয়ে এমন আগ্রহ যে শুধু আমাদের দেশে তা নয়। পশ্চিমবঙ্গসহ পুরো ভারতবর্ষে তো বটেই এমনকি সারাবিশ্বে আগ্রহ আছে। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার চুরুলিয়া গ্রামে ১৮৯৯ সালের ২৫ মে কবি নজরুলের যখন জন্ম তখন ভারতবর্ষ বৃটিশ শাসিত অবিভক্ত বাংলা নামে পরিচিত ছিল। তখন আমরা কিংবা তারা একটি দেশেরই অধীনে ছিলাম।কিশোর বয়সে ১৩-১৪ বছর বয়সে কিশোর নজরুল যখন কাজী রফিজ উল্লাহ দারোগার হাত ধরে ত্রিশালে আসেন তখন তিনি এক বছর সময়কাল ত্রিশালে এবং তারপর বিভিন্ন সময়ে এ বাংলার আরো কিছু স্থানে বেশ কিছুদিন দফায় দফায় অবস্থান করেছিলেন। এসব স্থানে প্রণয়-বিরহ বিয়ে করেছেন। যেভাবেই এ বঙ্গে থাকুন না কেন সারাবিশ্বের বাঙালির মতো আমাদের বাংলাদেশের বাঙালিরাও নজরুলকে আমাদের দেশের কবি হিসেবেই আত্মস্থ করে মেনে নিয়েছিলেন। আর তার সর্বশেষ পরিণতি দিলেন ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক কবিকে বাংলাদেশে এনে জাতীয় কবির মর্যাদার আসনে সিক্ত করার মধ্য দিয়ে।
রায়হান আহমেদ তপাদার, লেখক ও কলামিস্ট,যুক্তরাজ্য

নজরুল-কাব্যে প্রেম

নজরুল-কাব্যে প্রেম
আতিক আজিজ

মানুষের শক্তি অসীম, তাই তার কন্ঠে ধ্বনিত হয় বিচিত্র সুর- পুনরাবৃত্তিতে ধরা পড়ে তার দুর্বলতা। নব নব সুর ও স্বর-বৈচিত্র্যে রূপ লাভ করে মানুষের সৃজনীশক্তি। এই শক্তিরই নাম প্রতিভা। এই শক্তি যার যত বেশী, সে তত প্রতিভাবান। প্রতিভাবানের মনের পরিধি বহুধা ও ব্যাপকতর- তার কন্ঠেই ধ্বনিত হয় নানা সুর। বিশুদ্ধ বাংলায় এই শক্তিরই বিশেষণ হচ্ছে ‘নব নব উন্মেষশালিনী’। নজরুলও অসাধারণ প্রতিভার অধিকারী তাঁর রচনার পরিধি বহুবিস্তৃত ও বহুমুখী, তাতে ঘটেছে নানা বিচিত্র সুরের সমাবেশ। কিন্তু সাধারণ পাঠক দেখে শুধু তাঁর রাজনৈতিক ও জাতীয় ভূমিকা। ‘যুগ প্রতিনিধি’ তিনি- এ কথার উপরেই বেশী করে জোর দেওয়া হয়। ফলে তিনি যে যুগাতীতেরও কবি সেই বিষয়টি আমরা প্রায় ভুলে যেতে বসেছি।

জাতীয় কবির ভূমিকা তিনি সার্থকভাবেই অভিনয় করেছেন,এই বিষয়ে সন্দেহ নেই; কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে মহৎ প্রতিভার যা ধর্ম তাও তিনি বিস্মৃত হননি; অর্থাৎ, মানব মনের চিরন্তন আকুলি-ব্যাকুলি, প্রেম-বিরহ,ব্যথা-বেদনাকেও তিনি রূপ দিয়েছেন সার্থকভাবে। সাম্প্রদায়িক তো বটেই, জাতীয়তা – আন্তর্জাতীয়তার দ্বন্দ্ব, শ্রেণী সংগ্রাম, পরস্পর বিরোধী সামাজিক ও রাজনৈতিক সংঘর্ষের কল-কোলাহল একদিন স্বাভাবিক নিয়মেই থেমে যাবে- সেই দিন নিছক এই সব পটভূমিকায় রচিত সাহিত্যেও হয়ত শুধু ইতিহাসের উপকরণেই পর্যবসিত হবে। কিন্তু মানুষের মতো মানুষের হৃদয়-বেদনাও চিরন্তন, অজর, অমর ও অক্ষয় এবং চির নূতন ও চির -মধুর।

Our sweetest songs are those that tell of saddest thoughts.কবি –কণ্ঠের এই বাণীর মধ্যে চিরন্তন সত্য শুধু ধ্বনিত নয়, কালের অক্ষয় পটে বিধৃত হয়ে রয়েছে, বলা যায়। কালের কণ্ঠে নজরুল ও এমনি বহু হৃদয়-বেদনার রঙে রাঙা গানের মালা পরিয়েছেন এবং কাব্যে দিয়েছেন প্রেম বিরহের মধুময় মুহুর্তকে রূপ। বলাবাহুল্য, সাহিত্যের ইতিহাসে নজরুল বেঁচে থাকবেন প্রেমের ও ব্যথা-বিরহের কবি হিসেবেই। জাতীয় কবিতা ও সংগীতে তাঁর ছন্দ ও ভাষা যেমন হয়েছে অদম্য ও অগ্নিস্রাবী তেমনি তাঁর প্রেম -বিরহের সংগীতের ছন্দ ও ভাষা হয়েছে চোখের জলে সিক্ত ও পুষ্প-কোমল। তাঁর হৃদয় বেদনার সঙ্গে একাতœ হয়ে মিশে গেছে প্রকৃতি- বাংলা দেশেরই প্রকৃতি। প্রকৃতির প্রতীক দিয়েই তিনি মানব -মনের চিরন্তন বিরহ-বেদনাকে দিয়েছেন রূপ তাই তা হয়েছে অধিকতর মর্ম স্পর্শী। তাঁর সুবিখ্যাত বিদ্রোহী কবিতাও অসার্থক হতো যদি তাতে শুধু বিদ্রোহ ও ভাঙনের কথাই থাকতো । বিদ্রোহী ও মানুষ তাই তার মুখেই শোভা পায়ঃ
মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী,
আর হাতে রণতুর্য।
এই বিদ্রোহী মানুষের মুখে যখন আমরা শুনিঃ
আমি অভিমানী চির ক্ষুব্ধ হিয়ার কাতরতা,
ব্যথা সুনিবিড়
চিত চূম্বন-চোর-কম্পন আমি থর থর থর
প্রথম পরশ কুমারীর।
আমি গোপন- প্রিয়ার চকিত চাহনি,
ছল করে দেখা অনুখন,
আমি চপল মেয়ের ভালোবাসা , তার
কাঁকন চুড়ির কন কন
আমি চির শিশু চির কিশোর,
আমি যৌবন ভীতু পল্লীবালার আঁচল
কাঁচলি নিচোর।

তখন বিদ্রোহীর প্রচণ্ড মূর্তি ভুলে গিয়ে আমরা আমাদের চির পরিচিত রক্ত-মাংসে গঠিত মাটির মানুষকে দেখতে পাই, চিনতে পারি। এ না হলে বিদ্রোহী হ’ত অতি মানুষ, বা অ-মানুষ, না হয় বড় জোর খণ্ডিত-মানুষ। কবির প্রতিভা ও পরিমিতি – জ্ঞান এই ভাবে ‘বিদ্রোহী’ কে চিরন্তন মানুষ ও কবিতাকে সার্থক কবিতা করে তুলেছে।

কবি নিজে সকল মানুষ এবং তাঁর রচনায় সর্বত্র ফুটিয়ে তুলেছেন সবল মানুষকে। কাব্যে, সংগীতে,গদ্যে সর্বত্র জয় ঘোষণা করেছেন তিনি সবল মনুষ্যত্বের। তাঁর প্রেম ও সবল মানুষের প্রেম। তার প্রেমে পরিপূর্ন আতœসমর্পন আছে, কিন্তু ন্যাকামি নেই। মান,অভিমান, রাগ, দ্বেষ কিছুই তার প্রেম থেকে বাদ পড়েনি; কিন্তু এই সবকেই রূপ দিয়েছেন তিনি সবল মানুষের মতই। তাঁর প্রথম দিকের প্রেমের কবিতাগুলির মধ্যে ‘ পুজারিণী’ নিঃসন্দেহে উল্লেখযোগ্য। তাঁর প্রেম-বঞ্চিত কবির হৃদয়-মথিত বেদনার ইতিহাস। কিন্তু কবি হননি উ™£ান্ত, হারাননি আতœপ্রত্যয়, কবির প্রেম সর্বগ্রাহী, কবি চান প্রেয়সীর অখন্ড প্রেম, ‘খন্ডিতা’ র খন্ড প্রেম নিয়ে কবি-চিত্ত তৃপ্তি পান না, তাই খন্ডিতার উদ্দেশ্যে তার ওষ্ঠে ফুটে উঠেছে নির্মম বিদ্রুপ ও কঠোর জিজ্ঞাসা ঃ

ছিল আশা ছিল শক্তি বিশ্বটারে টেনে,
ছিড়ে তব রাঙা পদতলে ছিন্ন রাঙা পদ্মসম পূজা দেব এনে।
কিন্তু হায়! কোথা সেই তুমি? কোথা সেই প্রাণ?
কোথা সেই নাড়ী-ছেড়া প্রাণে প্রাণে টান?

কিন্তু কবির এই অখন্ড ও সুগভীর ভালোবাসার মর্যাদা দেয়নি প্রেয়সী। স্ফটিক-স্বচ্ছ কবি-চিত্তকে ফাকিঁ দেওয়া সহজ নয়, সম্ভব নয়Ñ তাই তাঁর এই রোষ-কষায়িত বিদ্রুপঃ

এ তুমি আজ সে-তুমি তো নহে;
আজ হেরি-তুমিও ছলনাময়ী,
তুমিও চাইতে চাও মিথ্যা দিয়া জয়ী।
কিছু মোরে দিতে চাও, অন্য তরে রাখ কিছু বাকী
দুর্ভাগিনী ! দেখে হেসে মরি! কারে তুমি দিতে চাও ফাঁকি?

কবির দুর্লভ প্রেমকে যে নারী এই ভাবে লাঞ্ছিত করে সে সত্যই দূর্ভাগিনী বৈ কি! অভিশাপ কবিতায় এই দূর্ভাগিনী কবি রীতিমত খোটা দিয়ে অভিশাপ দিয়েছেন বেশ কঠোর ঃ

স্বপন ভেঙে নিশুত রাতে জাগবে হঠাৎ চমকে
কাহার যেন চেনা ছোঁয়ায় উঠবে ও বুক ছমকে
জাগবে হঠাৎ চমকে!
ভাববে বুঝি আমিই এসে
বসনু বুকের কোলটি ঘেঁসে
ধরতে গিয়ে দেখবে যখন
শূন্য শয্যা! মিথ্যা স্বপন!
বেদনাতে চোখ বুজবে
বুঝবে সেদিন বুঝবে।
ভালোবাসা অন্ধ। কবির ভালোবাসার গভীরতা বেশী বলে তাঁর ভালোবাসা অধিকতর অন্ধ। কবি নিজের মন দিয়ে প্রেয়সীর মনকেও বিচার করেছেন। না হয় তিনি অনয়াসেই বুঝতে পারতেন, যে প্রেয়সী তাঁর ভালোবাসাকে অপমান করতে পারে, তার পক্ষে কবিকে বে মালুম ভুলে গিয়ে নতুন প্রেমিকের নবতর প্রেমে মগ্ন হয়ে থাকা বা নিরূপদ্রব শান্তিতে জীবনযাপন করা কিছুমাত্র অসম্ভব নয়।
পিছু ডাক কবিতাতেও কবি নিজের কল্পনা দিয়েই প্রেয়সীর প্রতি প্রেম জিজ্ঞাসা নিবেদন করেছেনঃ

সখি! নতুন ঘরে গিয়ে আমায় পড়বে কি মনে?
সেথায় তোমার নতুন পূজা নতুন আয়োজনে
প্রথম দেখা তোমার আমায়
যে গৃহ-ছায় যে আঙিনায়,
যেথায় প্রতি ধূলি কণায়,
লতাপাতার সনে।
নিত্য চেনার চিত্ত রাজে চিত্ত আরাধনে,
শূন্য সে ঘর শূন্য এখন কাঁদছে নিরজনে।
আমরা জানি, এ শূন্য গৃহের কান্না নয়, এ বিরহ কাতার কবি- হৃদয়েরই নীরব অশ্র“পাত। সব শিল্পের মূলে রয়েছে প্রেমের প্রেরণা। জীবনের সঙ্গে সঙ্গে সেই প্রেমও বিস্তৃততর ও বহুক্ষেত্রে প্রসারিত হতে পারে। কিন্তু তার সূচনা নারী-প্রেম, তাই কবি মাত্রই প্রেমিক। তাঁর কাব্যজীবনের গোড়াতেই নজরুলও জানিয়েছেন এই স্বীকারোক্তিঃ

তুমি আমায় ভালবাস তাই তো আমি কবি।
আমার এ রূপ -সে যে তোমার ভালোবাসার ছবি।
আপন জেনে হাত বাড়ালো-
আকাশ বাতাস প্রভাত আলো,
বিদায় বেলার সন্ধ্যা তারা
পূবের অরুণ রব্-ি
তুমি ভালোবাসো বলে ভালোবাসে সবি।

একজনের ভালোবাসা বিশ্বের ভালোবাসা হয়ে কবি চিত্তকে মাধুর্য মণ্ডিত করে দিয়েছে। এর ফলেই ঘটে কবি চিত্তের স্বপ্নভঙ্গ- কবি মানসের ঘটে নব জাগরণ ও আতেœাপলদ্ধি। তাই কবি বলেছেনঃ

আমার আমি লুকিয়েছিল তোমার ভালোবাসায়,
আমার আশা বাইরে এলো তোমার হঠাৎ আসায়।

কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা আতœসমর্পণ – আতœসমর্পণ ছাড়া গভীর ভালোবাসার তৃপ্তি নেই। দিয়ে যে সুখ তার কাছে পেয়ে যে সুখ, সিন্ধুর কাছে বিন্ধুর মতোই। বণিকবৃত্তি কবির ধর্ম নয়, তাই জগতে এক মাত্র কবিই পারে প্রিয়ার গগুদেশের একটি কৃষ্ণ তিলের পরিবর্তে অকাতরে সমরখন্দ ও বোখারা দান করে দিতে। বিদ্রোহী কবি ও বলেছেনঃ

হে মোর রাণী! তোমার কাছে হার মানি আজ শেষে।
আমার বিজয় কেতন লুটায় তোমার চরণ তলে এসে।

তিনি যদি কবি না হয়ে শুধু বিদ্রোহী হতেন তা হ‘লে কখনো হার মানতেন না। এই মানার মধ্যেই তাঁর কবি প্রতিভার সার্থকতা। কবি গুরু রবীন্দ্রনাথও বলেছেনঃ আমি তব মালঞ্চের হব মালাকার। রবীন্দ্রনাথ সৌন্দর্যের কবি তাই মালঞ্চের মালাকর হওয়াই তাঁর পক্ষে চরম আতœসমর্পণ, কিন্তু নজরুল ব্যথার কবি চোখের জলের কবি, তাই তার আতœসমর্পনঃ

আজ বিদ্রোহীর এই রক্ত রথের চূড়ে,
বিজয়িনী! নীলাম্বরীর আঁচল তোমার উড়ে,
যত তৃণ আমার আজ তোমার মালায় পুরে,
আমি বিজয়ী আজ নয়ন জলে ভেসে।

ভালোবাসার রণে পরাজয়ই তো সত্যিকার জয়! বিজয়ী হলেও এখানে চোখ অশ্র“ ছলছল করে। বাংলাদেশ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ, এই প্রকৃতির সঙ্গে রয়েছে আমাদের মনের ও ভাবের নিবিড় যোগ। আমাদের প্রেম মিলন বিরহের উপর প্রকৃতির ছায়া না পড়েই পারে না । এই প্রকৃতির মাধ্যমেই আমাদের কবিরা তাদের হৃদয়ানুভুতিকে রূপ দিয়েছেন বারে বারে। চৈতী হাওয়া কবিতায় নজরুলও তাঁর হৃদয়ের বিরহ বেদনাকে প্রকৃতির ভিতর দিয়ে এক অপূর্ব ভাষা মূর্তি দিয়েছেন। এই কবিতাটিতে তাঁর ভাষা পেয়েছে এক অপূর্ব ব্যঞ্জনা।
শূন্য ছিল নিতল দীঘির কালো জল,
কেন তুমি ফুটলে সেথা ব্যথার নীলোৎপল?
আঁধার দীঘির ভাঙলে বুক-
কোন পূজারী নিল ছিঁড়ে? ছিন্ন তোমার দল
ঢেকেছে আছে কোন দেবতার কোন সে পাষাণ তল?

ব্যথা ও বিদ্রুপ মিশ্রিত শেষের দুইটি লাইন গভীর অর্থপূর্ণ। এই কবিতাটির প্রত্যেকটি স্তবকে শব্দচয়ন ও প্রকাশ- শক্তির যে অসাধারণ নৈপুণ্য ও তার যে সচ্ছন্দ গতির পরিচয় ফুটে উঠেছে তার তুলনা বাংলা সাহিত্যের খুব বেশী নেই।
পারাবারের ঢেউ দোলানী হানছে বুকে ঘা।
আমি খুঁজি ভিড়ের মাঝে চেনা কমল পা।

চমৎকার নয় কি? কবি- চিত্তের আবেগ-রঞ্জিত ভাষা প্রকৃতিকে করে তুলেছে সজীব ও মুখরঃ
পড়ছে মনে টগর চাঁপা বেল চামেলী যুঁই
মধুপ দেখে যাদের শাখা আপনি যেত নুই।
হাসতে তুমি দুলিয়ে ডাল,
গোলাপ হয়ে ফুটতু গাল।
গোলাপ হ’ত টলমলাতে ভুঁই।

নজরুল প্রেমের গান লিখেছেন দেদার, কবিতাও কম লেখেননি। গোপন প্রিয়া গানের আড়াল এ মোর অহঙ্কার ভীরু তুমি মোরে ভুলিয়াছ হিংসাতুর প্রভৃতি বহু কবিতায় প্রেম বিরহের বহু চিত্রই কবি এঁকেছেন। কিন্তু তাঁর অধিকাংশ কবিতায় প্রিয় মিলনের অনির্বচনীয় আনন্দের পরিবর্তে মান অভিমানের পরিচয়ই বেশী দেখতে পাওয়া যায়। গানের আড়াল কবিতার একটি স্তবক এইঃ

হয় তো কেবলি গাহিয়াছি গান, হয় তো কহিনি কথা,
গানের বাণী সে শুধু কি বিলাস মিছে তার আকুলতা?
হৃদয়ে কখন জাগিল জোয়ার তাহারি প্রতিধ্বনি
কণ্ঠের তটে উঠেছে আমার অহরহ রণরণি,-
উপকুলে বসে শুনছে সে সুর বোঝ নাই তার মানে?
বেঁধেনি হৃদয়ে সে সুর দুলেছে দুল হয়ে শুধু কানে?

বলাবাহুল্য এই সবই অভিমানের কথা। কিন্তু অভিমান তো দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। আতœাসমর্পণেই ভালবাসার শুধু নয় মান অভিমানেরও চরিতার্থতা। তাই মন থেকে সমস্ত মান –অভিমান ঝেড়ে ফেলে এ মোর অহঙ্কার কবিতায় কবি বলতে পেরেছেনঃ

নাই বা পেলাম কণ্ঠে আমার তোমার কণ্ঠহার,
তোমায় আমি করব সৃজন এ মোর অহঙ্কার!
এবং চাই না দেবীর দয়া যাচি প্রিয়ার আঁখিজল,
একটু দুখে অভিমানে নয়ন টলমল।

নজরুলের প্রেম মানুষের এই চিরন্তন আঁখিজলেই খুঁজেছে সার্থকতা এবং পেয়েছে চরিতার্থতা। ভীরু কবিতায় কবি কিশোরী চিত্তে নব এক অর্পূব চিত্র এঁকেছেন। এই কবিতার প্রতি স্তবকে প্রণয়-ভীতু স্পর্শ কাতর কিশোরী মনের ভালোবাসা মূর্তিমান হয়ে রূপ পেয়েছে:

আমি জানি তুমি কেন কহ না‘ক কথা।
সেদিনো তোমার বনপথে যেথে
পায়ে জড়াত না লতা।
সেদিনো বে-ভুল ভুলিয়াছ ফুল
ফুল বিঁধিতে গো বিঁধেনি আঙুল,
মালার সাথে যে হৃদয়ও শুকায় জানিতে না সে বারতা
জানিতে না, কাঁদে মুখর মুখের আড়ালে নিঃসঙ্গতা।
আমি জামি তুমি কেন কহ না’ক কথা।

যে সব কবিতার কথা উল্লেখ করা হ’ল এই গুলি লেখা হয়েছে অপেক্ষাকৃত তরুণ বয়সে যখন আবেগ উদ্বেগে নজরুল চিত্ত ভরপুর, জীবন যখন তাঁর রাজনৈতিক ঘূর্ণা বর্তে আবর্তিত, আলোড়িত ও বিপর্যস্ত,তখন। কাজেই গভীরতর আতœজিজ্ঞাসা ও সুস্থির প্রেমের সুস্নিগ্ধ ও মধুরতর স্পর্শে এইসব কবিতা শান্ত সৌন্দর্যের মহিমা লাভ করেনি । সেই মহিমা লাভ করেছে তাঁর সংখ্যাতীত গানে যা রচিত হয়েছে এই কবিতাগুলোর অনেক পরে; যখন কবির জীবনে ফিরে এসেছে শান্তি ও ধৈর্য আবেগ যখন পরিণত হয়েছে ধ্যানে।

এই গান সংখ্যায় এত বেশী এবং তাতে প্রেমের এত বিচিত্র সুর ধ্বনিত হয়েছে যে তার সম্যক আলোচনা এই ক্ষুদ্র নিবন্ধে সন্তব নয়। গানে শুধু জ্ঞান নয় কবির ভাষাও পেয়েছে এক শিল্পরূপ সুর- বৈচিত্র্যের তো কথাই নেই। এই সব গানে এক অদ্ভুত দক্ষতার সঙ্গে এক একটি ছবি ফুটিয়ে তোলা হয়েছে এক-একটি লাইন যেন এক একটি চিত্র -শুধু চিত্র নয়, চিত্রের সঙ্গে ঘটেছে ভাবের সমন্বয়। শোনার দরকার নেই, এই সব গান শুধু পড়ে গেলেও যাকে বলা হয় কাব্য-সুধা-রস। জোর করে বলতে পারি তার অনির্বচনীয় আনন্দ থেকে কোনো পাঠকই বঞ্চিত হবে না।

বই

এস এম সেবুল

বই মানুষের জীবন গড়ে
প্রাজ্ঞরা তাই কেবল পড়ে
বইয়ের ভেতর চাঁদের আলো
বই মানুষের চেয়েও ভালো।

বই মানুষের বুদ্ধি বাড়ায়
ছড়িয়ে আলো নগর পাড়ায়
বইয়ের ভেতর বিচিত্র সুখ
বই খোলে দেয় মনের দু’চোখ।

বই জীবনের আঁধার কাটে
দেখায় সে পথ ঘাটে ঘাটে
বই পড়ে হয় মানুষ বড়
মূর্খ মানব কেবল পড়।

বইয়ের ভেতর বিশ্ব থাকে
বই ইতিহাস আগলে রাখে
বইয়ের ভেতর প্রবল জোয়ার
বই খোলে দেয় মনের দুয়ার।

প্রকৃত বই দেয়না ধোঁকা
বই পড়েনা মূর্খ বোকা
বইয়ের ভেতর পদ্য গীতি
বই রেখে যায় জীবন স্মৃতি।
—————————————–
মনে পড়ে
এস এম সেবুল

মনে পড়ে হাকালুকি হাওরের তীর
সবুজ ঘাসের বুকে সোনালি শিশির
আঁকাবাঁকা মেঠোপথ বলে আয় আয়
আমন ধানের শীষ স্বাগত জানায়।

এখানে বিকেল নামে পাখির ডানায়
আকাশে মেঘের কণা সুদূরে হারায়
ধান খেতে মিঠে রোদে সারসের খেলা
ছবি তুলে কেটে গেছে সোনাঝরা বেলা।

আনমনে ডানা মেলে উড়ে গাঙচিল
ইশারায় ডাকে যেন নীলকুঁড়ি বিল
ধূসর স্মৃতির মাঝে কত কথা হাসি
হাকালুকি তোমাকে যে বড়ো ভালবাসি।

মনে পড়ে হাকালুকি হাওরের তীর সোনাঝরা মাটিগুলো রোদে চৌচির।

শ্রমিক সাথী


-বিল্লাল হোসাইন

সভ্যতা আজি রুপে হাসে, কারো নৈতিক ঋণে
চলার পথে সূক্ষ জ্ঞানে, ভাবনা জাগায় মনে।

কে করেছে শিল্পের বিকাশ, সকাল সন্ধ্যায় ছুটে।
গড়েছে প্রাসাদ গড়েছে রাজপথ মাটি, মার্বেল, ইটে।

ওরা কারা? শস্য বোনে, মাটি-কাঁদার মাঠে
মন আনন্দের তৃপ্তি মিটায়, দুখের সারির জোটে।

চলে কারা তীব্র বেগে? জাহাজে মাস্তুল তুলে
অথৈই সাগর পাড়ি জমায় জীবন মায়া ভুলে।

মস্তক ঘেমে অশ্রু গড়ে, তবু সবাই হাটে
কোটি অর্থের গুটির আশায় সংগ্রামী জীবন কাটে।

ওরা তারা, প্রান্তে যারা, বিশ্বের শ্রমিক জাতি
ক্ষুধার দায়ে নবরূপকার, মালিক যাদের সাথী।

ওরা শ্রমিক, ওরা প্রেমিক, ওরা দেশের দেশী
ওরা আছে রক্তে মিশে, তাইতো ভালোবাসি।

ওরা গান গায়, যেন ন্যয্য পায়, ক্ষুধার আহারাদি
কর্ম মোদের, অর্থ তাদের, তারা সুখী হয় যদি।

তারাই গুণী, তারাই শ্রেষ্ঠ, তারাই চালায় বিশ্ব
সুখ,স্বর্গের ভোগের বিলাস, তাদের রবি-শস্য।

রানাপ্লাজা ধ্বসে এক মর্মান্তিক দূর্ঘটনায় ৮ম তলা থেকে উদ্ধার হয়ে প্রান ফিরে পাওয়া নারী শ্রমিক শিরিনের ঘটে যাওয়া জীবন সংগ্রাম ভবিষ্যত

মোঃ গোলাম মোস্তফা, ঢাকাজেলা (উত্তর) প্রতিনিধিঃ
২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সকালে রানা প্লাজা ৯ ম তলা থেকে নিচ তলা পর্যন্ত বিল্ডিংটি সম্পূর্ণ ধ্বসে মাটির সাথে মিশে যায় এর মধ্য প্রান হারায় ১১৩৮ জন শ্রমিক। আহত হয় ১৫’শত শ্রমিক। এ ঘটনার ৪ বছর হতে চলছে।
তার কর্মজীবন শুরু করে রানা প্লাজার ৮ম তলা নিউ ওয়েফ ষ্টাইল লি: গার্মেন্টস কারখানার সুইং হেলাপার হিসেবে কাজ করেন ৬ মাস। এর মধ্যে ঘটে যায় এক মর্মান্তিক দূর্ঘটনা।
এ মর্মান্তিক কোন গাড়ী দূর্ঘটনা নয় এই দূর্ঘটানাটি হচ্ছে বিল্ডিং ধ্বসের ঘটনা। এ মর্মান্তিক দূর্ঘটনায় প্রান হারায় হাজারের উপরে শ্রমিক আবার অনেকে বেচে যান এ দূর্ঘটানায় থেকে আহত অবস্থ্যায় প্রান ফিরে পান বহু শ্রমিক।
২৪ শে এপ্রিল তার জীবনের স্মৃতিতে জড়িয়ে রয়েছে একটি দিন। হয়তো বা অনেকেই ভুলে গেছে এই দিন। কিন্তু আজও ভুলিনি তিনি। তার কানে আজও বেজে উঠে সেই ভাই- বোন, মা- বাবা, ছোট ছোট শিশুর বাঁচাও বাঁচাও চিৎকার, আকুতি মিনতি, কান্নার বিভিন্ন প্রকারের আওয়াজ । এখনো ভাবতে গেলে দু-চোখে পানি চলে আসে তার। ওই স্মৃতিগুলো মনে করতে চায় না, কারন মনে পড়লে সে নিজেকে নিয়ন্ত্রনে রাখতে পারে না। অনেক চেষ্টা করেও ভুলতে পারে না সে। ভোলা যায় না সেই মর্মান্তিক দূর্ঘটনার কথা। এমন একটি ভয়ানক মর্মান্তিক দূর্ঘটনা জীবনে এনে দিয়েছে বিশাল পরিবর্তন। নিজেকে যখন ভাবে তখনই সেই ভয়ানক স্মৃতিগুলো চোখের সামনে ভেসে বেড়ায় তার জীবনে প্রতিটি অংশে।
বেচেঁ যাওয়া শ্রমিকের জন্য বিভিন্ন জনগন,কারকাখানার মালিক, সংঘঠন’র পাশাপাশি সরকার তাদের আশার আলোর হাত বাড়িয়ে দেন অল্প কিছুদিনের মধ্যেই।
এমননি এক নারী শ্রমিক শিরিন আক্তারের বাড়ী ময়মনসিংহ জেলার সোনাকান্দী গ্রামে তার বাবা আক্কাস মিয়া একজন খেটে খাওয়া কৃষক। জমি-জমা বলতে নেই তাদের কিছুই । রয়েছে সামান্য একটু ভিটে মাটি। সংসার চলে তার অর্থ এবং এক অভাবে মধ্য দিয়ে । নূন আনতে মানতা ফুরায় পানতা আনতে ঘি যেন এক ভগ্যের ব্যাপার হয়ে দারায় তার জীবনে। তার পরিবারে রয়েছে ২ বোন ১ ভাই । তিনি ভাই বোনের মধ্য বড় মেয়ে পরেছেন মাত্র ৭ম শ্রেণি পর্যন্ত । তার জীবনের জন্য লেখা-পরা শেষ না করেই সংসারের দু:খ -কষ্ট লাগবের জন্য চাকুরির আশায় তিনি চলে আসেন সাভারের তার খালার বাসায় । বয়স কম থাকায় বিভিন্ন স্থানে ঘুরা ফেরা করার পর চাকুরি না পেয়ে এক হতাশা গ্রস্থ হয়ে পরেছিলেন তিনি।
হতাশা গ্রস্থ , দু:খ-কষ্টের জীবন নিয়ে তার ভাগ্যে জুটেছিল ধ্বসে যাওয়া রানা প্লাজার ৮ম তলা নিউ ওয়েফ ষ্টাইল লি: গার্মেন্টস কারখানার সুইং হেলাপার হিসেবে ৬ মাস কাজ করার পর যেন এক ভংকর মৃত্যর ফাদঁ সৃষ্টি হয় সেখানে। ধ্বসের পর বিভিন্ন স্থানে তার খালা সরুফা আক্তার ( জোৎ¯œাবাুন) ও পরিবার লোক খুজাখুজির পর একপর্যায়ে হতাস হয়ে পরছিল। পরিবার ভেবে নিয়েছিল সে বেছে আছে কি নেই।
শিরিন আত্ব রক্ষার জন্য বেছে নেন সুইং মেশিনের নিচের স্থানে। তারপর সে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে । পরে দেড় ঘন্টা অচেতন অবস্থ্যায় থাকার পর সে জ্ঞান ফিরে পায়। তার আত্ব চিৎকারের শব্দ শুনে তার পাশেই বেচেঁ থাকা এক শ্রমিক মোবাইল ফোন দিয়ে তাকে সহযোগিতা করে এবং সে তার পরিবারকে ফোন দিয়ে তার বেচে থাকার নির্দিষ্ট জায়গার ঠিকানা জানালে চলে উদ্ধার তৎপরতা। উদ্ধার কর্মীদের কে জানালে বেলা ১১ ঘটিকার সময় তাকে আহত অবস্থ্যায় প্রথমে এনাম মেডিকেল হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয় । তিনি জানান আহত অবস্থ্যায় তার একটি ডান পা ভেঙ্গে যায় এবং নাকের মধ্য দিয়ে রক্ত ঝরে। ডাক্তাররা সঠিক ভাবে চিকিৎসার ফলে সে এখনো সুস্থ্য হয়ে বেচে আছেন।
শিরিন আক্তার জানান, মুহুর্তেই তার আশে পাশে শ্রমিকদের মধ্য নাম জানা মেহেদী সুপারভাজারসহ অনেক শ্রমিক মারা গেছে আবার ফ্লোরে থাকা লাইনচীপ মো: খোকন জীবনকে জয় করে কোন একটা ফাকা গলির মধ্য দিয়ে নিজের চেষ্টায় বের হয় সে সি আর পিতে চিকিৎসাধীন থেকে সুস্থ্য রয়েছেন। আবার পঙ্গ হয়ে বা বাক প্রতিবন্ধি হয়ে কষ্টের সাথে বেচে রয়েছে বহুশ্রমিকের।
বেচেঁ যাওয়া শ্রমিক শিরিন আরো জানায় আগের দিন শ্রমিকরা বুঝতে পারছিল বিল্ডিংটি ধ্বস হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে তারা কাজে যোগ দেওয়ার আগে থেকেই সতর্ক ছিল। কারন ৭ম তলার ১টি পিলার আগে থেকেই ও ৩য় তলায় ৩টি পিলার ফেটে গিয়েছিল ২৩ এপ্রিল। দুপুরে ছুটি ঘোষনা করে। কিন্তু উপায় নেই একদিন হাজিরা না দিলে চাকুরির যাওয়ার ভয় ছিল তাদের মধ্য তবুও জীবন-যুদ্ধে বেচে থাকার জন্য শ্রমিকরা কাজে যোগদান করে ২৪ এপ্রিল।
২৪ এপ্রিল ঐ দিন সকালে বিদ্যুৎ না থাকায় জেনারেটর চলছিল হঠাৎ জেনারেটর বন্ধ হয়ে গেলে নেমে আসে এক অন্ধকারাচ্ছন্ন। তারপর সকাল ৯ ঘটিকার সময় মিনিটের মহুর্তেই এক ধ্বস নামে বিল্ডংটির। রানাপ্লাজার চারদিকে ধুলুবালিতের দিশেহারা হয়ে পরছিলেন পথচারিরা । তারাও জীবন বাচার জন্য ছুটতে থাকে এদিক-সেদিক। তারপর ধুলাবালী শেষ হলে এক হৃদয় বিদারক সৃষ্টি হয়। খবর সংগ্রহ করতে নামে ইলেট্রনিক্স ও অনলাইন এবং প্রিন্ট মিডিয়ায় সংবাদ কর্মীরা সংবাদটি টপ অব দ্যা শিরোনাম হয় এবং ছড়িয়ে পরে সাভারসহ সারা বাংলাদেশে ও বিদেশের বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে। ধ্বসে যাওয়ার পর থেকেই চলতে থাকে উদ্ধার কর্মী দিয়ে উদ্ধার তৎপরতা । উদ্বারকর্মীদের পাশাপাশি সেনাবাহীনির উদ্ধার তৎপরাতার মধ্য দিয়ে শেষ হয়।
শিরিন আক্তারের মতো অনেক শ্রমিকরা তাদের এই শ্রমের বিনিময়ে যে টাকা পান তা দিয়ে চলে তাদের সংসার জীবন। শিরিন আক্তার আহত অবস্থ্যায় দির্ঘ ছয় মাস বসে ঔষদ,চিকিৎসা, খাওয়ার পর নিজেকে সে ভোজা মনে করেন। পরে সকল ভয়-ভীতি ছেড়ে আবার চাকুরীর আশায় ঘুরতে থাকেন। চাকুরি নেন সাভারের নয়াবাড়ী একটি সাব-গার্মেন্টস কারখানায়। সেখানে বেতন ভাতা ঠিক মত না দিলে চাকুরি ছেড়ে দেন তিনি। পরে বেবীলন ক্যাজিওয়্যার গার্মেন্টস কারখানায় সুইং অপারেটর হিসেবে চাকুরিতে যোগদান করেন । জীবন সংগ্রামে বেঁচে থাকার জন্য বর্তমানে বেবীলন ক্যাজিওয়্যার গার্মেন্টস কারখানায় সিনিয়র সুইং অপারেটর হিসেবে কাছ করছেন। বর্তমানে বেতন পান ৭ হাজার ৩ শত টাকা ও অতিরিক্ত টাকা। তিনি আরো জানান এ বেতন ও অতিরিক্ত টাকা দিয়ে সাভারের বাসা ভাড়া ও নিজের খরচ চালিয়ে কিছু টাকা থাকে সে টাকা বাবা-মার কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। তার এই টাকা দিয়ে চলে সাভার ও বাড়ির বাবা-মার সংসার। এ অর্থ পেয়ে সংসারে খরচা করে সঞ্চয় করা সম্ভব হয় না। তিনি চিন্তিত ভবিষ্যৎ জীবন কিভাবে অতিবাহিত করবেন তার জানা নেই । সকলের কাছে তিনি তার জীবনের মঙ্গল কামনা করে দোয়া চেয়েছেন।

মুকুল মজুমদারের গল্পগ্রন্থ ‘মেহেরুন’

আজিম উল্যাহ হানিফ
মেহেরুন একটি গল্পের নাম,পাশাপাশি গল্পটি সংযোজিত গ্রন্থের নাম ও। গ্রন্থটিতে রয়েছে ৮টি গল্প। গল্পগুলোর নাম মেহেরুন, সময়, অভিজ্ঞতা, ক্যামেলিয়া, টোকাই, নীলগিরী, মোড়, অতীত। বইটি প্রকাশিত হয়েছে বাবুই প্রকাশনী,কাটাবন ঢাকা থেকে। প্রকাশকাল একুশে বইমেলা ২০১৭ মূল্য-১৫০ টাকা। গ্রন্থটির সারাংশ এই রকম যে, লেখকের শুরুটা ছড়া লেখার মধ্য দিয়ে সাহিত্য জগতে প্রবেশ। তারপর কবিতা,গল্প, প্রবন্ধ, কলাম,রম্য ও উপন্যাস। ইতিমধ্যে কাব্যগ্রন্থ ও উপন্যাস প্রকাশিত হলেও এ প্রথম তার গল্পগ্রন্থ মেহেরুন প্রকাশ পেয়েছে। তার বইটির ছোট ছোট লেখাগুলো পাঠক/পাঠিকাদের অন্তরে একটি সফল ছোট গল্প হিসেবে স্থান পেতে পারে। গ্রন্থটির প্রতিটি গল্প কাল্পনিক ভাবে লেখা হলেও এক একটি বাস্তব মানবচিত্র থেকে তুলে আনা ঘটনা ভান্ডার। হয়তো কোনটির বাস্তবতা বর্তমান কিংবা কোনটির বাস্তবতা অতীত অথবা ঘটতে চলেছে! পত্রিকার পাতায় রোজই আমরা দেখি দু’চারটা ঝুমার জীবন চিত্র, আবিদের মত মার্স্টাস পাশ করা ছেলেদের, যারা প্রতিদিন সকালে পত্রিকায় চাকরির বিজ্ঞপ্তি দেখেন রোজ একবার করে। প্রিতমরাও অনাহারে জীবন কাটায় প্রতিনিয়ত রাস্তার ধারে। এসব কোন কল্পকাহিনী নয়,এসব জীবনের বাস্তবতারই অংশ। আর এ বাস্তবতার উর্ধ্বে আমরা কেউ নই,লেখক ও নন। বইটি সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে কবি আল মাহমুদ বলেন- ‘জীবনের পড়ন্ত বেলায় এসে আমার মনে হচ্ছে,সাহিত্যে ঘাম ঝরিয়ে নাম কিনতে হয়। পরাক্রম প্রকাশ করতে হয় পরিশ্রম করে। পন্ডশ্রম করার ফলাফল অবশ্য শূণ্য। শিল্প-সাহিত্য নিয়মিত চর্চা সাধনার ব্যাপার। লেগে থাকলে খালি হাতে ফিরতে হয় না। একসময় কবি তার হাত খুলে মুঠোতে পেয়ে যেতে পারেন একটি সোনার মুদ্রা। মুকুল মজুমদারের নামটি আমার কাছে নতুন বলে তার প্রতি কৌতুহলী হয়ে উঠেছি। সে একটি গল্পের পান্ডুলিপি প্রস্তুত করেছে,যার নাম মেহেরুন। আমার দৃষ্টিশক্তি ও বার্ধক্যের কারণে ভালো করে পড়ে দেখার সুযোগ কম। আসলে নবীন লেখকের মূল্যায়ন করা আমার জন্য সহজসাধ্য নয়। ভুল ধরিয়ে দেয়ার চেয়ে উৎসাহিত করতে পারলেই আমি পুলকবোধ করি। জানতে পেরেছি, মুকুল কবিতা ও গল্প লেখার পাশাপাশি সাহিত্য সংগঠন করে, শুনে আমার কাছে ভালো লেগেছে। তারুন্যের কলকাকলীতে মুখরিত হয়ে উঠুক সাহিত্য জগৎ। মুকুল ভালো মন্দ যাই লিখুক না কেন, তার প্রচেষ্টাকে আমি অভিনন্দন জানাই। পড়তে পড়তে লিখতে লিখতে তবেই না লেখক। গল্পের বই মেহেরুন কেমন হয়েছে,তার মূল্যায়ণ করবে পাঠক। অতি তরুন এই লেখকের গল্পের ভেতর জীবন বাস্তবতাই তুলে আনার চেষ্টা করেছেন হয়তো। তবে সার্থকতায় উত্তীর্ণ হতে হলে, প্রতিনিয়ত লেগে থাকতে হবে-পড়তে হবে বেশি। সময়ের তরুনদের আমি সাহিত্যে নতুনত্ব সৃষ্টির আহবান জানাই। আগামী সাহিত্যের ভিত নির্মিত হোক তরুনদের হাতেই। লেখক ও কবিদের কাজ হলো তার জাতিকে স্বপ্ন দেখানো।সত্য সুন্দর ও কল্যাণের স্বপ্ন। আশার স্বপ্ন,ভালোবাসার স্বপ্ন। আমি ¯েœহভাজন মুকুল মজুমদারকে প্রতিনিয়ত পরিশ্রম অধ্যাবসায় চর্চা আর সৃষ্টিশীলতায় নিবেদিত থাকার অনুরোধ জানাই। মুকুলের সফলতার জন্য দুই হাত তুলে রাখলাম।’
লেখক কবি ও গল্পকার মো: নাজমুল হক মুকুল মজুমদার ১৯৮৯ সালের ২৪ এপ্রিল কুমিল্লা জেলার নাঙ্গলকোট উপজেলার মক্রবপুর ইউনিয়নের মক্রবপুর গ্রামে সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা- মরহুম মো: আবদুল মালেক, মাতার নাম রাবেয়া বেগম। তিনি বাবা মায়ের ৫ম সন্তান। মক্রবপুর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এস এস সি, নওয়াব ফয়জুন্নেছা সরকারী কলেজ থেকে এইচ এস সি, কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজে ডিগ্রিতে পড়াশুনা। লেখালেখি শুরু ২০০৬ সালের মে মাস থেকে। চর্চার প্রথম বিষয় হলো কৌতুক লেখা, ছড়া। প্রথম কবিতা প্রকাশ পায় ২০০৮ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি বিশ্ব ভালোবাসা দিবস সংখ্যা দৈনিক কুমিল্লার কাগজে। এরপর অনেক পত্রিকায় স্থান হয়েছে এ লেখকের লেখা। ২০১১ সালে প্রকাশ পায় লেখকের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ডায়েরী তার কয়েকদিন পর প্রকাশ পায় এনগেজম্যান্ট উপন্যাসটি। সমাজের কিছু অনিয়ম দুর্নীতি দেখে কবি নিজেকে সাংবাদিক হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেন। কবি ও লেখক মুকুল ২০০৯ সালে যখন লাকসাম নওয়াব ফয়জুন্নেছা সরকারি কলেজে পড়েন তখন থেকে সাপ্তাহিক আলোর দিশারী’র হাত ধরে লেখা শুরু। তারপর থেকে জাতীয় দৈনিক, আঞ্চলিক দৈনিক,সাপ্তাহিক, পাক্ষিক, মাসিক, ছোট কাগজ সাহিত্য পত্রিকা, দেয়ালিকা ও অনলাইন পত্রিকাতে নিয়মিত লেখালেখি করে আসছেন। তারই ধারাবাহিকতায় মেহেরুন নামক গল্পগ্রন্থটি কবি মুকুল মজুমদারের ৬ষ্ঠ গ্রন্থ হিসেবে প্রকাশ হলো অমর একুশে বইমেলা ২০১৭ তে। লেখকের অন্যান্য গ্রন্থগুলোর মত এই গ্রন্থটিও পাঠক প্রিয়তা অর্জন করবে বলে আমার বিশ্বাস। মুকুল মজুমদার নাঙ্গলকোট রাইটার্স এসোসিয়েশনের বর্তমান কমিটির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ কবি সভা (বাকস) এর কেন্দ্রীয় কমিটির দপ্তর সম্পাদক, লাকসাম লেখক সংঘের সদস্য, নাঙ্গলকোট প্রেসক্লাবের সদস্য, নাঙ্গলকোট ইয়ুথ জার্নালিষ্ট এসোসিয়েশনের সহ-সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

সিডি চয়েস মিউজিক (CD Choice Music) এর পহেলা বৈশাখ আয়োজন!

নিজস্ব প্রতিবেদন : পহেলা বৈশাখ বাঙালির সার্বজনীন উৎসব। বাংলা নববর্ষের উৎসব আয়োজনকে পূর্ণতা দিতে বরাবরই মুখর হয়ে উঠে দেশের সঙ্গীতাঙ্গন। দেশের সব জায়গায় অনুষ্ঠিত হয় গানের অনুষ্ঠান।পহেলfবৈশাখ উপলক্ষে অডিও বাজারে বের হয় নতুন নতুন গানের অ্যালবাম, এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। গত বেশ কিছু বছরের তুলনায় এবারের পহেলা বৈশাখে অনেক তারকা শিল্পীর অ্যালবাম এসেছে।পহেলা বৈশাখ সামনে রেখে জমে উঠেছে অডিও বাজার।পহেলা বৈশাখ মানেই নিত্যনতুন গানের অ্যালবাম। বাঙালির এ উৎসবকে উপলক্ষ করেই শিল্পীদের মধ্যে পড়ে নতুন অ্যালবাম বের করার হিড়িক।শিল্পীরা তাদের সুর দিয়ে ভরিয়ে তুলতে চান ভুবন। সেই ধারাবাহিকতাই পহেলা বৈশাখকে সামনে রেখে অডিও-ভিডিও প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান সিডি চয়েস মিউজিক প্রকাশ করতে যাচ্ছে বর্তমান সময়ের তমুল জনপ্রিয় শিল্পীদের অ্যালবাম।তাহলে চলুন জেনে নেই সিডি চয়েস মিউজিকে পহেল বৈশাখ উপলক্ষে কী কী অ্যালবাম থাকছে।কন্ঠশিল্পী তৈাসিফ এর একক অ্যালবাম অচিন পাখি। গানের কথা লিখেছেন এমদাদ সুমন, এইচ এম রিপন, সুর তৈাসিফ, সঙ্গীত রাজীব হোসাইন ও রাহুল মুৎসুদ্দী।সহ শিল্পী আছেন কনিকা।কন্ঠশিল্পী রাকিব মুসাব্বিরের একক অ্যালবাম মনটা ছুঁয়ে দেখো না”। গানের কথা লিখেছেন এমদাদ সুমন ও খাইরুল বাবুই।সুর ও সঙ্গীত করেছেন রাকিব মুসাব্বির।সহ শিল্পী আছেন ফারাবি।কন্ঠশিল্পী সাবরিনা সাবার একক অ্যালবাম অনলি সাবা থ্রি”। গানের কথা লিখেছেন এমদাদ সুমন, সুর ও সঙ্গীত করেছেন অনিক সাহান। কন্ঠশিল্পী অনিক শাহানের একক অ্যালবাম সোনার পাখি। সহ শিল্পী সাবা। কথা সুর ও সঙ্গীত অনিক শাহান।

কন্ঠশিল্পী এফ এ প্রীতমের একক অ্যালবাম ”ভালোবাসিরে”। গানের কথা লিখেছেন এমদাদ সুমন ও এফ এ প্রীতম।সুর করেছেন প্রীতম ও সঙ্গীত করেছেন রাহুল মুৎসুদ্দী। সহ শিল্পী আছেন তিথী।মনির বাউলার একক অ্যালবাম দে দে পাল তুলে দে”। গানের কথা লিখেছেন মনির ও রিপন। সুর করেছেন মনির।সঙ্গীত আকাশ। সহ শিল্পী আছেন লিজা।মাহবুব সাগরের সলো অ্যালবাম এক জোনাকির গল্প। গানের কথা ও সুর রোহান রাজ, সঙ্গীত শুভ্র। সহ শিল্পী আছেন তিথী। সহ শিল্পী আছেন তিথী।কন্ঠশিল্পী আরিয়ান একক অ্যালবাম মনচুরি”। গানের কথা লিখেছেন অরন্য ভোমিক ও আরিয়ান সুর আরিয়ান ও সঙ্গীত করেছেন রিমো বিপ্লব।সহ শিল্পী আছেন সেনিজ ও কনিকা।কন্ঠশিল্পী আখি চৌধুরীর একক অ্যালবাম লালনের গান”। সঙ্গীত করেছেন সুজন।সঙ্গীতশিল্পী ফিরোজের একক অ্যালবাম আড়ালে, সহ শিল্পী দিশা। কথা ফিরোজ ও শুভ।সুর ফিরোজ ও অনিম। সঙ্গীত অনিম খান।সঙ্গীতশিল্পী আদনানের একক অ্যালবাম প্রিয়তমা টু। সহ শিল্পী ফারাবি, কথা এমদাদ সুমন ও আদনান। সুর ও সঙ্গীত আদনান।সঞ্জয় শীলের মিক্সড এ্যালবাম পুর্ন মিলনের সুখ নাই। শিল্পী রাজিব শাহ্, মারুফ, ইয়াছিন, অপু, দুখু আরমান, প্রফুল্ল। সঙ্গীত পরিচালক এস রুহুল ও আলী আক্তার রুনু।মিক্সড এ্যালবাম এডি আকাইদের নামের মালা” সুর এস রুহুল, কথা লিখেছেন এডি আকাইদ, সঙ্গীত এস রুহুল ও আক্তার রুনু।আল আমিন ফিচারিং প্রিয় তুমি তো জানো না। গানের কথা লিখেছেন মাসুদ রানা রুবেল, নিরব চন্দন, কামাল মাহবুব জয়, নিরব খান। সুর ও সঙ্গীত আল আমিন। শিল্প আল আমিন খান, ইমন জামান, সানিয়া নিঝুম, রাজিব রায়হান, নিরব খান, নাসির হোসেন।কাজী শুভ ও কনিকার একটি মিষ্টি মধুর প্রেমের গান। গানটি লিখেছেন তরুন সিং, সুর রিগান হাসান, সঙ্গীত মাহমুদুল হাসান। গানটি অডিও ও ভিডিও একই সাথে প্রকাশ পাচ্ছে।

সঙ্গীতশিল্পী নাজু ও পুলকের একক গান ”নাচ আমার ময়না”। গানের কথা এমদাদ সুমন, সুর ও সঙ্গীত  রাজীব হোসাইন। সঙ্গীত শিল্পী শাহরিয়ার রাফাতের আদর মাখা ঠোঁটে”। কথা এন আই বুলবুল। সুর ও সঙ্গীত শাহরিয়ার রাফাত। বঙ্গবন্ধুকে উৎসর্গ করে সঙ্গীত শিল্পী সিনথিয়ার একক গান হাজার সালাম, কথা ও সুর সিনথিয়া, সঙ্গীত টিংকু। সঙ্গীতশিল্পী মাটির একক গান কিভাবে তোকে বলবো, কথা ও সুর ফিদেল, সঙ্গীত ওয়াহেদ শাহিন।

সঙ্গীতশিল্পী কামরুজ্জামানের একক গান চিরদিন বাসবো ভালো তোকে। কথা ও সুর কামরুজ্জামান, সঙ্গীত মাহমুদুর রহমান। সব একক গান গুলো অডিও ও ভিডিও আকারে প্রকাশ পাচ্ছে। সঙ্গীতশিল্পী এফ এ প্রীতমের একক গান ইচ্ছে হয়। কথা মুন্না। সুর এফ এ প্রীতম। সঙ্গীত রাহুল মুৎসুদ্দী। সঙ্গীতশিল্পী অরিক এর একক গান প্রেম কাহিনি। কথা ও সুর অরিক। সঙ্গীত মোশারফ। সঙ্গীতশিল্পী রকির একক গান বলছি তোমায় ভালোবাসি। কথা ও সুর রাতুল। সঙ্গীত বাবু। সঙ্গীত শিল্পী আনিসার একক গান বন্ধু তুমি আইলা না”। কথা রবিন্দ গোব, সুর প্রিন্স গোব, সঙ্গীত প্রিন্স শুভ। গানটি অডিও ভিডিও প্রকাশ পাচ্ছে। সঙ্গীত শিল্পী কাউসার খানের ”মন শুধু তোমাকে চায়” কথা ও সুর কাউসার, সঙ্গীত অনিম খান। সঙ্গীত শিল্পী শুভ রহমানের একক গান ”বোঝনাকি তুমি“। খানের মন শুধু তোমাকে চায়, কথা ও সুর কাউসার, সঙ্গীত অনিম খান। তবে হ্যা অবশ্যই সিডি চয়েস মিউজিক এর ইউটিউব চ্যানেল এ সাবস্ক্রাইব করুন, এবং সিডি চয়েস মিউজিক ফেসবুক পেইজে এ লাইক দিয়ে একটিভ থেকে জেনে নিন বাংলা গান ও মিউজিক ভিডিওর সকল আপডেট।

 

প্রিয় ঝালবিবির শ্রদ্ধেয় বাপ !


পরম শ্রদ্ধাপিয়াসু শ্বশুর মশাই ! আপনার সমীপে পত্র লিখিবার কোন প্রয়োজনীয়তা আপাতত রহিয়াছিলো না কেননা আপনার কন্যার নিকট চিঠি লিখতে লিখতে প্রায়শঃই ক্লান্ত বোধকরি ! তারপরেও বিশেষ ঠেকায় পড়িয়া আপনার কাছে পত্র লিখিতে বাধ্য হইলাম । ঐতিহাসিক এই পত্রের শেষের দিকে ভুলত্রুটি যা ঘটিবে তাহার জন্য শুরুতেই ক্ষমা মাঙিয়া লইলাম । আপনি কেমন রহিয়াছে তাহা শ্বাশুড়ী মহীয়সীকে জানাইবেন, কেননা আপনার ভালো-মন্দ থাকাতে আমার কিছু যায় আসে না !
বউয়ের বাপ, আপনার অলক্ষ্মী কন্যাকে আমার বিবি হইবার সুযোগ দিয়া আমাকে অত্যন্ত দূর্ভাগা করিয়াছে । এজন্য বছরের পর বছর আপনার গোষ্ঠীশুদ্ধ সবাইকে লইয়া ক্ষমা চাহিলেও ক্ষমা করিবার খায়েশ আমার এ জনমে হইবে বলিয়া মালুম হইতেছে না । এখন কথা হচ্ছে, আপনার কন্যাকে যেহেতু আমার বিবিরূপে বরণ করাইয়াছেন সেহেতু আপনাকে এবার এক’দুখানা টিভি দিতেই হইবে । আপনি জানেন কিনা জানিনা, (অবশ্য না জানারই কথা কেননা শ্বাশুড়ীর ঝগড়া আর ঝামটা শুনিতে শুনিতেই তো আপনার কম্ম সারা)রাষ্ট্র ঘোষণা করিয়াছে, বাসায় টিভি না থাকিলে নাকি কি এক আজব চিজ হইবার সম্ভাবনা রহিয়াছে । আমার বংশে এমন জীব অতীতে কেউ না হওয়ায় আমারও তাহা হইবার খায়েশ নাই । কাজেই, বুঝতেই তো পারছেন ! মাইয়ার চোখে পানি না দেখিতে চাইলে টিভিখানা অতিসত্ত্বর পাঠিয়ে দিবেন । ইচ্ছা করিলে আমিও একখান যান্ত্রিক টিভি কিনিয়া লইতে পারতাম কিন্তু আপনি রক্ত মাংসের যে টিভি উৎপাদন করিয়া আমার নরম ঘাড়ে চাপাইয়া দিয়াছেন তাহা সামলাইতেই তো বেলা যায় ! ….
বিবিজানের বাপজান, টিভি দেওয়ার ব্যাপারটিকে আপনি যৌতুকের মধ্যে টাইনেন না । তবে কিন্তু আপনার মেয়েকে কৌতুক শোনানো বন্ধ করিয়া দেবো । যৌতুক যা দিবেন তা আলাদা লিষ্ট কইরা দিয়েন । বদনা যৌতুকের মধ্যে পড়ে কিনা জানিনা তবে কয়েকখানি বদনা পাঠাতে মোটেও ভুল করবেন না ! আর এই সময়ের সবচেয়ে মূল্যবান বস্তু ঐ টিভিখানাকে হাদিয়া হিসেবেই দিয়েন ! আপনি এটা দেওনকে রাষ্ট্রীয় আইন হিসেবেও ধরিয় লইতেপারেন কেননা টিভি ছাঢ়া আপনার মেয়ে ও জামাইবাপ জঙ্গি হইলে তাতে সর্বনাশটা তো আপনারই । তাড়াতাড়ি বাজারের দিকে ছোটেন ! রাষ্ট্রের যে হাল তাতে টিভির মজুদ শেষ হয়ে গেলে আপনার মেয়ের কপাল পুড়বে ! এরপরেও যদি মোড়ামুড়ি করেন তবে আপনাকে মাসয়ালা শোনাইতে হইবে ! আপনি নিশ্চয়ই জানেন, হাদিয়া দিতে কিংবা লইতে কোনরূপ নিষেধ নাই ! বৈধ বস্তু দিয়া যদি অবৈধ অপবাদ থেকে আপনার নাতির বাপ-মা রক্ষা পায় তবে তো জামাইবাপ আপনার মাইয়ার কাছাকাছি বেশি থাকতে পারবে ! সোয়াত-ফোয়াতের ভয়ে ভীত হইবার কোন সুযোগ থাকিবে না ! আপনি একেবারে বোকা না হলে নিশ্চয়ই এতে আপনার মেয়ের লাভের হিসাব বুঝিতে পারতেছেন এবং শ্বাশুড়ীর সাথে আলাপান্তে বাকীটুকুনও পারিবেন ! টাকা নাই একথা বলিয়া টিভি দেওনের ব্যাপারে মোড়ামুড়ি করিবেন না যেনো ! যতোই মোড়ামুড়ি করেন বাছা, টিভি আপনাকে দিতেই হইবে । দরকার হইলে খয়রাত কইরা একখানা টিভির নাট-বল্টু কিনে দিবেন ! বিবিরে আপনার কাছে চিঠির সাথে পাঠিয়ে দিলাম, ওবেলায় ফিরে আসার সময় টিভিহীন বিবিরে ঘরে ওঠানোর মত দুষ্কাম করিবো না বলিয়া দিলুম !
টিভি রান এবং বন্ধ করাইবার জন্য একখান রিমোটও দিবেন জানি কিন্তু ভাবতেছি ঝালবিবিরে চালানো আর বন্ধ রাখার জন্যে একখান রিমোটও চাইবো কিনা ভাবিতেছি ! ইস ! কর্তৃপক্ষ যদি বাসায় টিভি রাখা বাধ্যতামূলক করার সাথে সাথে এমন একখান ফরমান জারি করিতো যেখানে বিবি বন্ধ-চালু করিবার তরে রিমোট উৎপাদন, বিপণন এবং সংরক্ষণ করা বাধ্যতামূলক করিতো তবে এ জাতিকে আর যাঁতাকলে জড়িয়ে পিষ্ট হওয়ার সুযেগ ছিলো না ! অভাগাদের কানে কি আর এমন ঘোষণা এজম্মে আসিবে !! সবাই যে ঐ পক্ষে !!
ইতি, ঝালবিবির একমাত্র সোয়ামী এবং আপনার গুনবান জামাইবাপ !!


সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি: এ্যাডভোকেট শেখ মোঃ আব্দুল্লাহ
সম্পাদক-প্রকাশক : শেখ মোঃ তৈয়াবুর রহমান॥

যুগ্ম সম্পাদক: এস এম শাহিদুল আলম॥ সহযোগী সম্পাদক: শেখ মোঃ আরিফ আল আরাফাত
সহ-সম্পাদক: (প্রশাসন) হাজী হাবিবুর রহমান শাহেদ: সহ সম্পাদক: আজমাল মাহমুদ
সম্পাদক কর্তৃক বাড়ী বাড়ী নং- ৫৩/২, ৪র্থ তলা, রাজ-নারায়ন-ধর রোড, কিল্লার মোড় বাজার, লালবাগ, ঢাকা-১২১১
ফোন: ০১৯১৮-২০১৬২৬, ফোন: ০১৭১৫-৯৩৩১৬৮
ই-মেইল- notunvor.news@gmail.com
Designed By Hostlightbd.com
| Cyberboss.org
Translate »