Category: উপ-সম্পাকীয়

ট্রাম্পের নতুন ট্রাভেল ভ্যান

  প্রফেসর রায়হান আহমেদ তপাদার

  মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কিছু মুসলিম-প্রধান দেশের নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ নিষিদ্ধ করে নতুন একটি নির্দেশনা জারি করেছেন।এ ব্যাপারে আগের জারি করা নিষেধাজ্ঞা আদালতে খারিজ হয়ে যাওয়ার পর নতুন আরেকটি নির্বাহী আদেশ দেওয়া হলো।নতুন নির্দেশনায় নিষেধাজ্ঞার তালিকা থেকে ইরাকের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। তবে এবারও আগের তালিকার বাকি ছয়টি দেশকে রাখা হয়েছে-ইরান, সিরিয়া, ইয়েমেন, সুদান, লিবিয়া এবং সোমলিয়া।প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রশাসনের যুক্তি হচ্ছে এই নিষেধাজ্ঞা আমেরিকাকে সন্ত্রাসবাদের হাত থেকে নিরাপদ রাখার জন্য দরকার।প্রথম আদেশে ইরাক, ইরান, সিরিয়া, ইয়েমেন, সুদান লিবিয়া এবং সোমালিয়ার নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্রে ঢোকা নিষিদ্ধ করা হয়েছিল।ট্রাম্পের একজন সহযোগী কেলিয়ান কনওয়ে বলেছেন, নতুন এই আদেশে ইরাককে বাদ দেওয়া হলেও অন্য দেশগুলোর ওপর ৯০ দিনের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকবে।অবশ্য এসোসিয়েটেড প্রেসের এক খবরে বলা হয়েছে, কংগ্রেসের এমন একটি দলিল তারা দেখেছে যাতে বলা হয়েছে যে যাদের বৈধ ভিসা আছে তাদের ক্ষেত্রে এই নিষেধাজ্ঞা প্রযোজ্য হবে না।এছাড়া যারা গ্রীনকার্ড বা যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসের স্থায়ী অনুমোদনপ্রাপ্ত, তারাও ওই নতুন নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়বেন না। মার্কিন বাহিনীর অনুবাদক হামিদ দারভিশের মত ইরাকিরা এবার নিষেধাজ্ঞা থেকে বাদ পড়লেন।মার্কিন বাহিনীর অনুবাদক হামিদ দারভিশের মত ইরাকিরা এবার নিষেধাজ্ঞা থেকে বাদ পড়লেন।বার্তা সংস্থা রয়টার্স বলছে,নতুন আদেশে শরণার্থীদের ক্ষেত্রে ১২০ দিনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে ঢোকা নিষিদ্ধ করা হয়েছে।পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসন বলেছেন,‘কট্টর ইসলামপন্থী সন্ত্রাসীদের ধ্বংসাত্মক পরিকল্পনা নির্মূল করার লক্ষ্যেই এই আদেশ জারি করা হয়েছে।আগামী ১৬  মার্চ থেকে এই নতুন আদেশ কার্যকর হবে।ফলে ১০ দিনের এই আগাম নোটিশের কারণে হয়তো যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবন্দর গুলোতে এর আগেরবার যে বিশৃঙ্খল অবস্থা সৃষ্টি হয়েছিল তা এড়ানো সম্ভব হবে।কারণ আগের আদেশটি দেওয়া হয়েছিল কোন পূর্ব সতর্কতা ছাড়াই।   মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সাত মুসলিম-প্রধান দেশের নাগরিকদের ওপর স্থগিত হয়ে যাওয়া নিষেধাজ্ঞা সংশোধন করে নতুন ‘মুসলিম নিষেধাজ্ঞা’জারি করেছেন।তবে আগের নিষেধাজ্ঞায় যেসব বিষয় নিয়ে বিতর্কের মুখে পড়ে ট্রাম্প প্রশাসন,এবার তাতে কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে।নতুন নিষেধাজ্ঞা প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষরের পরপরই কার্যকর হচ্ছে না। ১০ দিন পর ১৬ মার্চ থেকে তা কার্যকর হবে। এর আগে ২৭ জানুয়ারির নিষেধাজ্ঞা ট্রাম্পের স্বাক্ষরের পরপরই কার্যকর হয়েছিল। এর ফলে ভিসা থাকা সত্ত্বেও হাজার হাজার মানুষ যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে পারেননি। ওই সাত দেশের অনেক নাগরিককে বিমানবন্দর থেকে, এমনকি বিমান থেকেও নেমে আসতে হয়। যারা যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেছিলেন, তাদের আটক করা হয়।আর তখনই ওই নিষেধাজ্ঞা নিয়ে প্রশ্ন উঠে বিভিন্ন মহল থেকে।মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেট (আইএস)-এর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম সহযোগী ইরাক। মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে সহযোগিতার জন্য এবারের নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকেনি ইরাক।সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসন জানান, ইরাকে স্ক্রিনিং কার্যক্রম জোরদার করার জন্যই দেশটিকে এবারের নিষেধাজ্ঞার অন্তর্ভূক্ত করা হয়নি। তিনি আরও বলেন,ইরাক আমাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে। আমরা চাই,ওই অঞ্চলের অন্যান্য দেশও এভাবে এগিয়ে আসুক।আগের নিষেধাজ্ঞায় নিষেধাজ্ঞায় বলা হয়েছিল, সাত দেশের ওপর ৯০ দিনের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা ও শরণার্থীদের ক্ষেত্রে ১২০ দিনের নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। তবে সিরীয় শরণার্থীদের গ্রহণের ক্ষেত্রে এই নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ ছিল অনির্ধারিত। তবে এবারের নিষেধাজ্ঞায় ছয়টি দেশের ওপরই ৯০ দিনের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।আগের নিষেধাজ্ঞায় বলা হয়,সিরীয় নাগরিকদের শরণার্থী হিসেবে গ্রহণ করাটা মার্কিন স্বার্থ ক্ষুণ্ন করবে।উল্লেখ্য,পূর্ববর্তী ওবামা প্রশাসন ২০১৬ সালে ১০ হাজার সিরীয় শরণার্থীকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের সুযোগ দিয়েছিল।  নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা নতুন ছয় মুসলিম-প্রধান দেশের নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাসের বৈধ কাগজপত্র থাকলে তারা নিষেধাজ্ঞায় অন্তর্ভুক্ত হবেন না। যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাসের বৈধ কাগজপত্র ‘গ্রিন কার্ড’ নামে পরিচিত।আগের নিষেধাজ্ঞায় ভিসা, গ্রিন কার্ড, বা দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকা হাজার হাজার মানুষও যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশাধিকার হারিয়েছিলেন।এবারের নিষেধাজ্ঞায় ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বিষয়ে আলাদা করে কিছু বলা হয়নি। ২৭ জানুয়ারির নিষেধাজ্ঞায় বলা হয়েছিল, নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত সাত মুসলিম-প্রধান দেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় চাইতে পারবে। এবার নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত দেশগুলোর খ্রিস্টান বা অন্য ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা কোনও ছাড় পাচ্ছেন না। ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা অবশ্য এজন্য এই নিষেধাজ্ঞাকে মুসলিম নিষেধাজ্ঞা বলতে নারাজ। এবারের নিষেধাজ্ঞায় আগেরবারের মতোই মার্কিন শরণার্থী কার্যক্রম ১২০ দিনের জন্য বন্ধ রাখা হয়েছে।এর আগে ১৬ ফেব্রুয়ারি ট্রাম্প জানিয়েছিলেন, ‘নতুন নিষেধাজ্ঞায় আদালতে তোলা প্রশ্নগুলোর মীমাংসা করা হবে। কেননা, ফেডারেল আপিল আদালতের আদেশে তার আগের নির্বাহী আদেশটি স্থগিত হয়ে গেছে।তিনি তখন আরও বলেছিলেন, ‘নতুন আদেশটি অনেক নিখুঁত হবে। আমরা এমন নির্বাহী আদেশ জারি করব, যা আমাদের দেশকে ব্যাপকভাবে সুরক্ষা দেবে।উল্লেখ্য,হোয়াইট হাউসে আয়োজিত এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশ অনুসারে নতুন ‘মুসলিম নিষেধাজ্ঞা’র ঘোষণা দেওয়া হয়। ওই সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন মার্কিন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেলি, পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসন ও আইনমন্ত্রী জেফ সেশনস।নতুন জারি করা নিষেধাজ্ঞায় আগের তালিকায় থাকা ইরাককে বাদ দেওয়া হয়েছে। তবে অপর ছয়টি দেশের নাগরিকদের জন্য নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখা হয়েছে।  ট্রাম্পের জারি করা নতুন এ নিষেধাজ্ঞায় বলা হয়েছে, ইরান, লিবিয়া, সোমালিয়া, সুদান, সিরিয়া ও ইয়েমেনের যেসব নাগরিকদের বৈধ ভিসা নেই তারা আগামী ৯০দিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে পারবেন না। ১৬ মার্চ থেকে নিষেধাজ্ঞাটি কার্যকর হবে।প্রসঙ্গত, ক্ষমতা গ্রহণের পরই ২৭ জানুয়ারি এক নির্বাহী আদেশে সাত মুসলিম-প্রধান দেশের নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্র সফরে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। পরে সিয়াটলের একজন বিচারক ট্রাম্পের ওই নিষেধাজ্ঞা স্থগিতের আদেশ দেন। ট্রাম্প প্রশাসন ওই আদেশের বিরুদ্ধে আপিল করলেও সান-ফ্রান্সিসকোভিত্তিক তিন বিচারকের প্যানেল তা খারিজ করেন।কিন্তু প্রায় সব ধরনের অভিবাসনের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ওই নির্বাহী আদেশ মূলত অবৈধ। কেননা এখন থেকে ৫০ বছর আগে জাতিগত পরিচয়ের ওপর ভিত্তি করে অভিবাসীদের বিরুদ্ধে এমন বৈষম্য বেআইনি বলে ঘোষণা করেছিল যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস। জাতিগত পরিচয়ের কারণে অভিবাসীদের যুক্তরাষ্ট্রে ঢুকতে না দেয়ার একটা দীর্ঘ ও লজ্জাকর ইতিহাস দেশটিতে ছিল। আর এ লজ্জা থেকে বাঁচতে এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছিল কংগ্রেস। এ ইতিহাস শুরু হয়েছিল ১৯ শতকের শেষের দিকে। আইন করে প্রথমে চীনের সব নাগরিকের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল। এরপর প্রায় সব জাপানিই এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়ে। তারপর তথাকথিত এশিয়াটিক ব্যারড জোন অর্থাৎ এশীয় নিষিদ্ধ অঞ্চল নামে সব এশীয়কেই নিষিদ্ধ করা হয়। অবশেষে ১৯২৪ সালে পশ্চিম ইউরোপীয়দের সুবিধা দিতে এবং অধিকাংশ পূর্ব ইউরোপীয় এশীয় ও আফ্রিকার অধিবাসীদের বাদ দিতে অভিবাসন কোটা বিকৃত করে ‘ন্যাশনাল-অরিজিন সিস্টেম’ তৈরি করে কংগ্রেস।নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে এক নতুন ধরনের এশিয়াটিক ব্যারড জোন বা এশীয় নিষিদ্ধ অঞ্চল পুনরায় চালু করলেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।   কিন্তু এক্ষেত্রে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সামনে কেবল একটি সমস্যা আর তা হল; ১৯৬৫ সালের ‘দ্য ইমিগ্রেশন অ্যান্ড ন্যাশনালিটি অ্যাক্ট’ বা অভিবাসন ও জাতীয়তা আইন জাতিগত পরিচয়ের ওপর ভিত্তি করে সব অভিবাসীর বিরুদ্ধে সব ধরনের বৈষম্য বাতিল করেছিল। এ আইন পুরনো ব্যবস্থা বদলিয়ে অভিবাসন কোটার ক্ষেত্রে প্রত্যেক দেশকে সমান সুবিধা দিয়েছিল। নতুন ওই আইনে স্বাক্ষর করে প্রেসিডেন্ট লিনডন বি. জনসন বলেছিলেন, “এই আইনের মাধ্যমে জাতিগত পরিচয়ে অভিবাসন কোটা ব্যবস্থায় যে ‘কঠিন অন্যায়’ চলছিল তার বিলোপ হল।” তা সত্ত্বেও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জোর দিয়ে বলছেন, বৈষম্য করার ক্ষমতা তার আছে। তিনি এটা বলছেন ১৯৫২ সালের একটি আইনের ওপর ভিত্তি করে। ওই আইন বলে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের জন্য ক্ষতিকর বিবেচনায় ‘যে কোনো শ্রেণীর অভিবাসীর যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ বাতিল করার ক্ষমতা প্রেসিডেন্টের রয়েছে। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ১৯৬৫ সালের অভিবাসন অ্যাক্টে এ ক্ষমতা যে কংগ্রেস রহিত করেছিল সে সত্যকে অগ্রাহ্য করছেন। ১৯৬৫ সালের ওই অভিবাসন আইনে পরিষ্কারভাবে বলা আছে, ব্যক্তির জাতি, লিঙ্গ, জাতীয়তা, জন্মস্থানের কারণে কোনো অভিবাসীর ভিসা ইস্যুর বিরুদ্ধে কোনো ধরনের বৈষম্য করা যাবে না।’ ১৯৬৫ সালে কংগ্রেস যখন ওই আইন পাস করেছিল, এটা শুধু অন্য দেশের অভিবাসীদের রক্ষা করতে চায়নি, বরং মার্কিন নাগরিকদেরকেও রক্ষা করতে চেয়েছিল। ওই আইন বলে মার্কিন নাগরিকদের তাদের পরিবারের সদস্যদের পৃষ্ঠপোষকতা দেয়া বা কোনো ধরনের বৈষম্য ছাড়াই বিদেশী কোনো নাগরিককে বিয়ে করার অধিকার রয়েছে।যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসী প্রবেশ ও ভিসা ইস্যু করার মধ্যে একটা পার্থক্য নির্দিষ্ট করে জাতিগত পরিচয়ের ওপর ভিত্তি করে কোনো বৈষম্য প্রচলন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প চাইতে পারেন। তবে সেটা নির্বোধের মতো একটা কাজ হবে।এখন দেখার বিষয় আগের আদেশটির মতো নতুন আদেশটিও আইনি চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয় কি না।                                              কলাম লেখক                                     raihan567@yahoo.com

Sent from Yahoo Mail on Android

 

প্রবাসে ঈদ আনন্দ

  রায়হান আহমেদ তপাদার

আরব দেশের পশ্চিমাকাশে শাওয়ালের চাঁদ ভেসে উঠার পরই চোখে ভেসে আসছে চিরচেনা সেই গান ‘ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে এল খুশির ঈদ‘।সৌদি আরবে শাওয়াল মাসের চাঁদ দেখা গেছে। মধ্যপ্রাচ্যর সাথে সংগতি রেখে ইউরোপ,আমেরিকাসহ পশ্চিমাপ্রায় সকল দেশেই উৎযাপিত হয় পবিত্র ঈদ উল ফিতর।পৃথিবীর প্রায় প্রত্যক দেশে ঈদ উদযাপনের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে কয়েকদিন আগে থেকেই।লন্ডনসহ ব্রিটেনজুড়ে যথাযোগ্য ধর্মীয় ভাব-গাম্ভীর্য ও উৎসাহ উদ্দীপনায় ঈদ উদযাপন সম্পন্ন হয়েছে।এক মাস সিয়াম সাধনার পর পবিত্র ঈদুল ফিতর সবার জীবনে বয়ে আনুক অনাবিল সুখ,শান্তি ও সমৃদ্ধি।সিয়াম সাধনার মাস রমজান ব্যক্তি জীবনকে সুন্দর,পরিশুদ্ধ ও সংযমি করে। মুমিন মুসলমানগণ মাসব্যাপী সিয়াম সাধনার পর অনাবিল আনন্দের বার্তা নিয়ে আসে ঈদুল ফিতর।আর ঈদুল ফিতরের উৎসবে সমাজের সকল মতভেদ ও সীমানা অতিক্রম করে মানুষে মানুষে মহামিলন ঘটায় ও সৃষ্টি করে পরষ্পরের প্রতি আন্তরিক মমতাবোধ ও শ্রদ্ধাবোধ।মাহে রমজান আসতে না আসতেই খুব দ্রুত চলে যায়। খুশির র্বাতা নিয়ে উদিত হয়- ঈদের ‘বাঁকা চাঁদ’।ঈদের চাঁদ উঠলেই হঠাৎ করে প্রবাসীদের চোখের পাতা ভিজে ওঠে।ঈদে প্রবাসীরা মা-বাবার পা ধরে ‘কদমবুছি’ করতে পারে না। মা-বাবার কবর জেয়ারতও করতে পারে না। সন্তানদের আদর করতে পারে না। সন্তানদের নানা রকম বায়না ধরার হাসি-কান্না উপভোগ করতে পারে না। ঈদের মার্কটিং নিয়ে গিন্নির মান-অভিমান দেখতে পারে না। ছোট বাচ্চাদের ‘ঈদ সেলামী’দিয়ে তাঁদের ‘তৃপ্তির হাসি’ দেখতে পারে না। এই দুঃখ বেশির ভাগ অভাগা প্রবাসীদের।আরবের ঘরে ঘরে আনন্দ। রাস্তায় রাস্তায় খুশির জোয়ার। শপিংমলে কেনা কাটা শেষে এখন অনেকটাই ফাঁকা। লাখো মানুষের পদচারণায় পিষ্ট এই শপিংমলকে ঝাড়ু দিয়ে পরিস্কার করতে করতে চোখ জলে টলমল করে উঠে আবুল মিয়ার।গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়া চোখের জল মিশে যায় তীব্র গরমে গা থেকে বেরিয়া আসা দুর্গন্ধময় ঘামের সঙ্গে। প্রবাসীদের মনে কেবল একটাই যাতনা এত কষ্টের পরও ছেলেমেয়েদের ঈদের কাপড় কিনেই টাকা শেষ।তিন ঈদ চলে গেলও মায়ের জন্য কিনতে পারেনি কিছুই।ঠিক এমন সময় দেশ থেকে ফোন আসে।ফোনে ওপার থেকে মা জিজ্ঞেস করেন,বাজান কি কর? চোখ মুছতে মুছতে আবেগ সামলে রফিক মিয়া বলেন মা,সব বন্ধু বান্ধব মিলা সেমাই খাই।এটাই হলো মধ্যপ্রাচ্যে বাঙ্গালিদের ঈদ।ব্যতিক্রম যে নাই তা নয়। যারা একটু পুরাতন, বাড়িতে টাকার চাপ যাদের একটু কম, যাদের কপাল একটু ভাল তারা অনেকে ঈদে বেশ মজাও করেন। রান্না করেন সেমাই পোলাও উটের গোস্ত। গায়ে জড়ান নতুন জামা। আরবদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ঈদগাহে ঈদের নামাজও আদায় করে থাকেন।তবে মিশরে বাংলাদেশিদের অবস্থা কিছুটা ব্যতিক্রম। এখানে সাধারণত দুই শ্রেণির বাংলাদেশি আছেন। ছাত্র এবং গার্মেন্টস কর্মী। ছাত্রদের হাতে টাকা পয়সা কম থাকলেও তারা মোটামুটিভাবে ভালই ঈদ উৎযাপন করে থাকেন।যারা হোস্টেলে থাকেন তারা বিভিন্ন দেশের বন্ধুদের সঙ্গে নামাজ আদায় করেন। খাওয়া দাওয়া সব শেয়ার করেন। নতুন জামাকাপড় পরেন। আর যারা বাসা ভাড়া করে থাকেন তারা অনেকে আগের রাতেই কিছু রান্না করে রাখেন। ভোরে নামাজ আদায় করে এসে কিছু খেয়ে ঘুম দেন। দুপুরে উঠে বন্ধু বান্ধবদের সঙ্গে দেখা করে আড্ডা দেন। সন্ধ্যায় ছাত্র সংগঠনের অনুষ্ঠানে যোগ দেন তারপর রাতভর আড্ডা অথবা নীলনদের পাড়ে ঘুরতে যান। অপরদিকে গার্মেন্টস কর্মীরা ঈদে তিন চারদিন ছুটি পান। তারা সাধারণত এক সঙ্গে অনেকজন থাকেন। কাজেই তাদের ঈদ আনন্দটা একটু বেশিই। খাবার আয়োজনেও তারা বেশ মনযোগী। পাঁচ সাত জন মিলে মিলে রান্না করেন। দুপুরে বিভিন্ন জাগায় ঘুরতে যান। সন্ধ্যায় অনেক সময় অনুষ্ঠানের আয়োজন করে থাকেন। একসঙ্গে গান গান ও মজা করেন। রাতে শুরু হয় দেশে ফোন করার প্রতিযোগিতা। কারণ পরের দিন বাংলাদেশে ঈদ। সারাদিন যতই উৎফুল্ল থাকুক রাতে দেশে কথা বলতে গিয়ে সবাই আবেগী হয়ে ওঠেন। পাওয়া না পাওয়া হিসেব মিলাতে না পেরে সবাই প্রায় একই মুখস্ত উত্তর দেয়, অনেক কিছু খাইছি অনেক মজা করছি আমি ভাল আছি আমাকে নিয়ে চিন্তা করো না। প্রবাসে যান্ত্রিক জীবনের মাঝে ঈদের মহা আনন্দকে বরণ করে নিতে হয়। যার একমাত্র যৌক্তিক কারণ দেশ নয় বিদেশ। ঈদ মানেই তো হাসি, আনন্দ ও উল্লাস। তবু আনন্দের মাঝে কোনো কোনো কাল নিরানন্দ থাকে। একটি বছর কত চড়াই উৎরাই পার করতে হয় মানব জীবনে। কিন্তু বছরের দুইটি দিন এলে দুঃখ, বিরহ-বেদনা, ক্লেশ সব দূর হয়ে যায়। ঈদের পূরবর্তী বার্তার আগমনে। ক্ষণিকের জন্য হলেও ঈদের খুশিতে সব রাগ-রাগিনীর অবসান টানে।পবিত্র ঈদুল ফিতরের একটি তাৎপর্য এবং ঈদুল আযহার আরেকটি তাৎপর্য। তাই দুটো খুশির দিন ভিন্ন মাত্রার আনন্দ বয়ে আনে আমাদের জীবনে। হাসি, খুশির মাঝে আছে নীরব কান্না। মুখ আছে, বুলিও আছে। কিন্তু বুঝাবার যেন সাধ্য নেই। দেশে বিদেশে ঈদের আনন্দ সম্পূর্ণ আলাদা।প্রবাসে আমাদের ঈদ। সকালে উঠেই কর্মময় জীবনের প্রথম অধ্যায় শুরু হয়। একজন মুসলিম হিসেবে ফজর নামাজ আদায় করে রুটিন অনুযায়ী কাজে যোগ দিতে যাত্রা শুরু করতে হয়। এরপর কর্মস্থলে একটি ব্যস্ত সময় কাটে। সকালের সূর্য পূর্বদিকে উদিত হয়ে পশ্চিম দিকে অস্ত যাওয়া পর্যন্ত জীবন পরিবর্তনের আশায় প্রবাসে কর্মময় রশি টানতে হয়। বিরতিহীন চলতে থাকে কর্মশালা।হয়তো জীবন উন্নয়নের ভাগ্য পরিবর্তন হওয়ার পূর্ব মুহূর্তে পর্যন্ত প্রবাসের এ ব্যস্ততা চালিয়ে যেতে হবে। এর মাঝে পার হবে আরো কত ঈদ। আমার কাছে অধরা হয়ে থাকবে ঈদের খুশি। তবু প্রবাসের যান্ত্রিক জীবন নিয়ে বেশি একটা খারাপ নেই। মাঝে মাঝে একটুতো খারাপ লাগবেই। কারণ বাংলাদেশ আমার মাতৃভূমি। যার কৃষ্টি, সংস্কৃতিতে জীবনের প্রথম পথচলা। তাই ইচ্ছে করলেই এই শিকড় থেকে নিজেকে বেশি দূরে রাখা সম্ভব নয়। বেশি খারাপ লাগে ঈদ এলেই।তাই হয়তো একটু বেশি আবেগে আপ্লুত হই।মায়াবী মায়ার টান বাড়ে স্বদেশে রেখে আসা মা, বাবা,আত্মীয়,পরিবার পরিজনসহ আরও আপনজনদের জন্য। স্বদেশে ঈদের এক, দুই সপ্তাহ আগেই চারিদিক আনন্দে জোয়ার বইতে শুরু করে। ঈদুল ফিতরে রমজানের বাহারি ইফতার আর ঈদুল আযহার সময় কোরবানি করার ধুম।এই ভিন্ন ভিন্ন আনন্দ মনকে উতলা করে তুলে। বেদনাসিক্ত মন থাকলেও এই মহাখুশির দিনে সব ধেয়ে যায় অজানা ঠিকানায়। প্রবাসে একজন অন্যজনের দাওয়াতী মেহমান হিসেবে বাসায় আসে। ঘরোয়া পরিবেশে কতইনা মজা হয়। যা এক সময়ে স্মৃতির ফ্রেমে বন্দী হয়ে রয়। এই আনন্দময় সময় গল্প, গুজব প্রবাসে আধুনিকায়নের যুগে সব থাকা সত্ত্বেও পাওয়া যায় না। তাই চিরস্মরণীয় এই দিনে বিলেত থেকে মনে পড়ে সবাইকে।প্রবাসে সবই আছে। নেই লাল সবুজের সুজলা,সুফলা শস্য, শ্যামলের বাংলাদেশ। ঈদ আছে। নেই ঈদের আনন্দ।প্রতিবেশীও আছে।নেই মনের মতন প্রতিবেশী।এই খন্ড খন্ড হৃদয়ের চাওয়াগুলো প্রবাসের এতো চাকচিক্যের মাঝে মন ভরে না। ফিরে যেতে মন চায় মাটির টানে স্বদেশের আঙিনায়িং।মানুষ যেখানে যায় সেখানে দুটো শক্তি যায় তার সাথে। এক- বিশ্বাস। দুই-সংস্কৃতি। বিদেশে এই সময়ে যে লাখ লাখ বাঙালি তাদের স্থায়ী নিবাস করে নিয়েছেন- তারাও মূলত এই শক্তিতে বলীয়ান। ধর্ম, বিশ্বাসের একটি স্তর। অভিবাসীদের আনন্দের একটি অন্যতম দিন হলো-ঈদ।ঈদ এলেই অভিবাসী বাঙালির মনের ক্যানভাসে যে চিত্রটি ফুটে ওঠে, তা হলো স্বদেশের মুখ। কেমন আছেন স্বজন? কেমন আছে জন্মমাটি? প্রবাসে ঈদের আনন্দ মানেই হচ্ছে এক ধরনের তীব্র শূন্যতা। কথাটি সব প্রবাসীই স্বীকার করবেন একবাক্যে। তার কারণ হচ্ছে, ঈদের দিনটি এলেই এক ধরনের নস্টালজিয়া মনটাকে ভারি করে তোলে। ফেলে আসা সেই শহর কিংবা গ্রাম, সেই আড্ডা, সেই মধুর স্মৃতি, মা-মাতৃভূমির টান বুকের পাঁজরে দোল খেয়ে যায়। আহা! সোনার আলোয় ভরা সেই দিনগুলো…।প্রবাসে ঈদের অভিজ্ঞতা আমার তিন দশকের বেশি সময়ের। বিদেশের বিভিন্ন দেশে ঈদ করতে গিয়ে যে সত্যটি খুব একান্তভাবে প্রত্যক্ষ করেছি তা হচ্ছে, প্রবাসে একজন বাঙালিই অপর বাঙালির ঘনিষ্ঠ স্বজন। তা পরিচিত হোক অথবা অপরিচিত। মুসলিম অধ্যুষিত দেশগুলোতে ঈদের আনন্দই আলাদা। পবিত্র রমজান মাস এলেই রোজার আমেজে সিক্ত হয়ে ওঠে পুরো নগরী। ধর্মপ্রাণ মানুষের উপাসনা, ইফতারির বাহারি আয়োজন সৃষ্টি করে একটি ভাবগম্ভীর পরিবেশের। ঢাকা, দুবাই কিংবা দোহা’র মতো শহরগুলোতে রমজানের বিকেলের প্রতিটি দিনই যেন হয়ে ওঠে উৎসবের দিন। তারপর আসে ঈদ,পরম উৎসবের দিন। আনন্দের সেই প্রতীক্ষিত দিন। তার আগে আছে ঈদের বাজার।ইউরোপ-আমেরিকায় সেই আবহের ভিন্নতা স্পষ্ট। তার কারণ হচ্ছে, এখানে ঈদ একটি সম্প্রদায়ের উৎসব, যে সম্প্রদায়ের লোকসংখ্যা পুরো রাষ্ট্রের জনসংখ্যার সামান্য অংশ মাত্র। আমেরিকায় ঈদ করতে গিয়ে সেই শূন্যতা আরও তীব্রভাবে অনুভব করেছি। সপরিবারে নিউইয়র্কে স্থায়ী নিবাস গড়ার পর এই নগরীটি হয়ে উঠেছে আমাদের দ্বিতীয় নিবাস। নিউইয়র্কে ক্রমবর্ধমান বাঙালি অভিবাসনের সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে ধর্মীয় কালচারও। সিলেটের জিন্দাবাজার কিংবা ঢাকার নবাবপুর রোডের স্টাইলে এখানে এখন তৈরি হচ্ছে ইফতারি। ভারতীয়-বাংলাদেশী বিপণি বিতানগুলো ঈদ উপলক্ষে সজ্জিত হচ্ছে আলোকসজ্জায়। রীতিমতো জমজমাট ঈদের বাজার। নিউইয়র্কের বাঙালি পোশাক বিক্রেতারা পণ্য ক্রয়ের উদ্দেশ্যে ছুটে যাচ্ছেন মুম্বাইয়ে। দশ হাজার ডলারের লেহেঙ্গার সংবাদ নিয়েও সংবাদ শিরোনাম হচ্ছে বাংলা সাপ্তাহিকের পাতায়। নিউইয়র্কের স্কুল-কলেজগুলোতে এখন হাজার হাজার বাঙালি অভিবাসী শিক্ষার্থী লেখাপড়া করছে। দুই ঈদে সরকারি ছুটি মঞ্জুর করা হয়েছে নিউইয়র্কে।ঈদ মানে খুশি, ঈদ মানে আনন্দ। এ কথা সত্য হলেও সবার জন্য সমান সত্য নয়। কারণ দেশে আত্মীয়-পরিজন নিয়ে মহাআনন্দে ঈদ উদযাপন করলেও প্রবাসীদের জীবনে এর বাস্তবতা খুঁজে পাওয়া যায় না। আর তাই ঈদে তাদের আনন্দটা অতটা গাঢ় রঙ ধারণ করে না। প্রবাসে অনেকেই আছেন যাদের জন্য ঈদের দিনটা অত্যন্ত কষ্টের। এই কষ্টকে বুকে নিয়েই যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি প্রবাসীরা ঈদ উদযাপন করে থাকেন।প্রবাসীদের ঈদ উদযাপনের খোঁজ-খবর নিতে গিয়ে তেমনটাই আঁচ করা গেলো।প্রবাসীরা বিভিন্ন মাধ্যমে জানিয়েছেন, বাংলাদেশসহ মুসলিম বিশ্বের মতো এখানেও ঈদকে নিয়ে আশা-আকাঙ্ক্ষা আর প্রস্তুতির কমতি থাকে না।কিন্তু প্রিয়জনদের হাজার মাইল দূরে রেখে ঈদ আনন্দ পাথর-চাপা কষ্টে পরিণত হয়।আত্মীয়-স্বজন রেখে দূর দেশে ঈদ করাটা সত্যিই বেদনার।                                     লেখক ও কলামিস্ট,যুক্তরাজ্য                                     raihan567@yahoo.com

লাশের বুকে ফিনকে কাঁদে বন্ধুত্বের দান

বাংলাদেশের জন্মের সাথে ভারতের বন্ধুত্ব জড়িয়ে । বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্থপতির জীবদ্দশায় ভারতের সাথে বাংলাদেশের যতোটা মধুর ও গভীর সম্পর্ক ছিল তার চেয়ে বর্তমান সময়ে বাংলাদেশ সরকারের সাথে ভারতের সম্পর্ক বেশি গভীর-মধুর । তবে নানাবিধ কারনে বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের সাথে ভারত সরকার ও সাধারণ মানুষের বন্ধুত্বের ভাবনায় ফাটল সৃষ্টি হচ্ছে । প্রায় প্রত্যহ, ভারতের সীমান্তরক্ষীদের নির্বিচার গুলিতে বাংলাদেশী নাগরিকদের হতাহতের ঘটনাই দূরত্বের মাত্রা নিয়ত তীব্র করছে । অথচ বাংলাদেশী সীমান্তরক্ষীদের গুলিতে বিগত দশ বছরেও কোন ভারতীয় নাগরিক নিহত হয়েছে এমন সংবাদ গণমাধ্যমে আসেনি । তারপরেও, ভারতের প্রতি রাষ্ট্রীয় উচ্চপর্যায়ের নতজানুভাব দেশপ্রেম তথা এদেশের মানুষের স্বার্থরক্ষা ও নিরাপত্তা প্রদানের প্র্রশ্নে দায়িত্বশীলদের ভূমিকাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে । প্রতিবেশী হিসেবে বাংলাদেশ ভারতের তুলনায় বহুগুন দূর্বল, আকৃতিতে ক্ষুদ্র এবং ভৌগলিক ও রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলসহ বিভিন্ন দিকের বিবেচনায় বাংলাদেশের কতিপয় রথী-মহারথী ভারতমুখী । তবে এই দুর্বলতার সুযোগে যখন ভারতের সরকারি বাহিনী কর্তৃক সীমান্তহত্যা লাঘামহীন চলছে তখন দু’দেশের বন্ধুত্বের মধুরতার কপালে তিলক এঁকে দেয় ! প্রতিবেশীর সাথে ভারতের আচরনের শিষ্টাচারের মাত্রা নিয়ে প্রশ্ন তোলে ।

উৎপত্তিগতভাবেই ভারত বাংলাদেশের নিকটতম প্রতিবেশী এবং বাংলাদেশের সীমান্ত এলাকার সিংহভাগ ভারতের সীমান্তের সাথে যুক্ত । প্রতিবেশী হিসেবে বন্ধুত্বপূর্ণ যে সুসম্পর্ক দু’দেশের সীমানায় বিরাজমান থাকা উচিত ছিল তা বারবার বিএসএফ সদস্যদের বাড়াবাড়ির দ্বারা লঙ্গিত হয়েছে । বিএসএফের আগ্রাসনের কারনে বাংলাদেশীদের বর্ষপঞ্জি থেকে এমন কোন পক্ষকাল কিংবা মাস অতিবাহিত হয়না যে সময়টাতে ভারতীয় সীমান্তরক্ষীদের গুলিতে বাংলাদেশী নাগরিক হতাহত না হয় । আসন্ন ঈদের আগে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী আবারও বাংলাদেশীদের উপহার দিল দু’টো হত্যার সংবাদ । দুর্ভাগ্য এটাই, এখন অবধি নিথর দেহ দু’টোও তাদের স্বজনরা পায়নি বরং তা বিএসএফ সদস্যরা টেনে হিঁচড়ে নিয়ে গেছে । এ বন্ধুত্বের ধারাবাহিকতায় চলতে থাকা বন্ধুত্বের বন্ধসূলভ বিনিময় ! এ প্রতিদানের ভার বইতে বইতে বাংলাদেশীদের হৃদয় আজ ভারাক্রান্ত, চোখের পানি শুষ্ক, অসহায় দৃষ্টিও ক্লান্ত ! অথচ বিজিবি কর্তৃক ভারতের দিকে বিগত কয়েক বছরে ছোঁড়া গুলিতে কেউ হতাহত হওয়া তো দূরের কথা বরং অস্ত্র ওদিকে তাক করে বিস্ফোরিত পর্যন্ত হয়নি । লাশের মিছিলে বাংলাদেশীরা এককভাবে দিয়ে যাচ্ছে বন্ধুত্বের খেসারত ! এমন বন্ধুত্বের শ্রী বিশ্ব মানচিত্রের অন্য কোথাও দুর্লভ !

সীমান্ত হত্যার সংখ্যার ধারাবাহিকতায় ভারত-বাংলাদেশের সীমান্ত হত্যা একপেশে ভারতের ধারা ক্রমশ লাঘামহীন হচ্ছে । বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে জঘণ্য ও কুখ্যাত সীমান্ত হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র এবং মেক্সিকোর মধ্যকার সনেরো লাইন ।  বিশ্ব ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি মানুষ এ লাইন অতিক্রম করার সময় পুলিশের গুলিতে নিহত হয় । তবে এদের বেশিরভাগ যুক্তরাষ্ট্রের কিংবা মেক্সিকোর নাগরিক নয় বরং মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ থেকে পাড়ি দেওয়া অভিবাসী ।  অন্যান্য দেশের মধ্যকার সীমান্ত লাইনগুলোর মধ্যে ভারত-পাকিস্তানের র‌্যাডক্লিফ, আফগানিস্তান-পাকিস্তানের ডুরান্ড, রাশিয়া-ফিনল্যান্ডের ম্যানারহেম,  লেবানন-ইসরাইল ব্লু, সিরিয়া-ইস্রাইলের পার্পল, যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা ৪৯ ডিগ্রি অক্ষরেখা, উত্তর ও দক্ষিন কোরিয়ার মধ্যকার ৩৮ ডিগ্রি অক্ষরেখা প্রভৃতি সীমান্ত লাইনগুলোতে মঝে বিবাদমান দেশগুলোর মধ্যে সংঘর্ষ হয় বটে কিন্তু তাতে এককভাবে কোন দেশের নাগরিক হতাহত হয়না বরং কোন দেশের দু’জন হতাহত হলে অন্য দেশের অন্তত একজন কিংবা একাধিক হতাহত হয় । হত্যার সমীকরণেও সেখানে সাম্যতা আছে ! অথচ বাংলাদেশের সাথে ভারতের সীমান্ত সংঘর্ষ একেবারেই ভিন্নরূপের বর্ণনা দেয় ।  এখানে একচেটিয়াভাবে হত্যা করা হচ্ছে হচ্ছে বাংলাদেশের নাগরিকদের । আমরা নীরিহ মানুষকে হত্যা সমর্থন করিনা হোক সে বাংলাদেশের, ভারতের কিংবা অন্যকোন দেশের । আমরা শুধু শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ও সমাধান চাই । অথচ আমাদের দেশের কর্তৃপক্ষের দুর্বলতা ও বিজিবির সদস্যদের আচরণ দেখে মনে হচ্ছে, ভারতীয় বাংলাদেশ সীমান্ত যাই করুক, ওদিকে গুলি ছোঁড়া তো দূরের কথা ফাঁকা আওয়াজ করার অনুমতিও বোধহয় নাই । কাজেই বর্ষপঞ্জি পাড়ি দেয়ার ফাঁক-ফোঁকড়ে দু’চারটে ফেলানীর নিথর দেহে ভারত কর্তৃক বাংলাদেশকে দেয়া বন্ধুত্বের উপহার ! মনে রাখতে হবে, শক্তের ধর্মই এমন, এ কেবল দুর্বলকে পিষে যায় । ইতিহাস সাক্ষী দেয়, অত্যাচারীর সামনে যে যত দুর্বলতা দেখাবে তার প্রতি অত্যাচারের স্টীম রোলার তত বেশিবার চালানো হবে  । ভারতের আচরণ দেখে মনে হচ্ছে, তারা এ নীতিই অনুসরণ করছে ।

ভারতীয়রা আজ আমাদের বন্ধুত্বের সংজ্ঞা, প্রকারভেদ ও প্রকৃতির পাঠ দিচ্ছে ! আমাদের দাবী ও ন্যায্য অধিকারের কোনটাই পূরনে তাদের সম্মতিটুকুও আদায় করা যাচ্ছে না । অথচ তাদের দাবীর সবগুলোই এখান থেকে হাসিমুখে দিল্লীতে পৌঁছে দেয়া হচ্ছে । আমরা তিস্তা-গঙ্গার ন্যায্য পানি পাচ্ছি না অথচ আমাদের ক্ষতি হবে জেনেও তারা বিভিন্ন সময় পানির প্লাবন ছেড়ে আমাদের ফসল নষ্ট করে দিচ্ছে, মাসের পর মাস বন্যার স্রোত বইছে এদেশের জেলায় জেলায় । তাদের ক্রিয়ায় কখনো কখনো নদী আর স্থলভূমিতে পার্থক্য করা যাচ্ছে না । অথচ আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী যে তিস্তা ও গঙ্গার পানিতে আমাদের ন্যায্য অধিকার তা অবৈধভাবে আটকে রাখায় আমাদের দেশের সমগ্র উত্তরাঞ্চল রবি মওসূমে বিরাণ মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে বছরের পর বছর । সেসব অঞ্চলের দারিদ্র্যক্লিষ্ট মানুষগুলো পেয়েছে মঙ্গাপীড়িত এলাকার অধিবাসীর উপমা । এসব কিছুই ভারতের বন্ধুত্বের বিনিময় ! কালের যাত্রায় ক্ষতিটুকু সব আমরা গ্রহন করছি আর ভালোটুকু পৌঁছে দিচ্ছি কথিত বন্ধুদের থলে ।

বিভিন্ন পর্যায়ের বৈঠকে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ কর্তৃক্ষ সীমান্ত হত্যা বন্ধের আশ্বাস বহুবার এসেছে অথচ বন্ধের বিপরীতে সীমান্ত হত্যা ক্রমাগত বেড়ে চলেছে । এই যদি হয় বন্ধুপ্রতীম দেশের আচরণ তবে শত্রুদের আচরণের অভিধা কেমন হবে ? যারা তিরস্কার করে বলেছিল,  ভারত যাদের বন্ধু তাদের আর শত্রুর দরকার পড়েনা । আজ সে উক্তিতে নিহিত সত্য দেশবাসী খুব ভালোভাবেই উপলব্ধি করছে । নয়তো ভারতের দ্বারা এভাবে সীমান্তে বাংলাদেশী হত্যার নিষ্ঠুর ও অমানবিক আচরণ চির শত্রুতাভাবাপন্ন কোন দেশের বাহিনী দ্বারা সংঘটিত হওয়ার যৌক্তিক ভিত্তি থাকতে পারেনা । অথচ ভারতীয় বাহিনী দ্বারা নারকীয় এমন হত্যাযঞ্জের ঘটনার বারবার পূনরাবৃত্তি হচ্ছে, সকালে-বিকালে হচ্ছে । প্রিয় রাষ্ট্র, তোমার নীরিহ সন্তানদেরকে এভাবে যারা হত্যা করছে তাদের বিরুদ্ধে পাল্টা ব্যবস্থার সামর্থ্য তোমার না থাকলেও অন্তত এসব অনাচার-অবিচার বন্ধে জোড়ালো প্রতিবাদ ও নিন্দা জানানোর শক্তিটুকু তো স্বাধীন ও সার্বভৌম সত্ত্বা হিসেবে তোমার অবশিষ্ট থাকা আবশ্যক ।

শিশুশ্রম বন্ধে চাই সদিচ্ছা এবং পরিকল্পনা

 রায়হান আহমেদ তপাদার  বাংলাদেশে ১৪ বছরের কম বয়সি শিশুদের কাজে নিয়োগ দেয়া আইনত নিষিদ্ধ৷ তবে সেই নিষেধাজ্ঞা বাস্তবে প্রয়োগ হচ্ছে না৷ ফলে কমছে না শিশুশ্রম, যা শিশুর বিকাশের ক্ষেত্রে অত্যন্ত ক্ষতিকর৷গত জুনে ঢাকায় এক পথশিশুর সঙ্গে দেখা হয়৷ সংসদ ভবনের সামনের সড়কে বড় বড় গাড়ি যখন ট্রাফিক সিগন্যালে দাঁড়ায় তখন সে সেসব গাড়ির দরজার কাছে গিয়ে ভিক্ষা চায়, বয়স হয়ত দু’বছরও হবে না তার৷ আমি দেখে আঁতকে উঠেছিলাম৷ এত ছোট্ট বাচ্চাকে তো গাড়ির চালকদের পক্ষে দেখা সহজ নয়৷ যে কোনো মুহূর্তে গাড়ি চলতে শুরু করলে সে হয়ত পড়তে পারে কোনো দুর্ঘটনায়৷ তখন কী হবে!বিদেশে কয়েক বছর থাকায় হয়ত হঠাৎ করে এমন দৃশ্য আমার কাছে অস্বাভাবিক, আতঙ্কের মনে হয়েছে৷ কিন্তু মেয়েটির মাকে দেখেছি নির্বিকার বসে থাকতে পাশের ফুটপাতে৷ প্রতিবার সিগন্যালে গাড়ি থামার পর ভিক্ষা করতে রাস্তায় নামে মেয়েটা, আবার গাড়ি চলতে শুরু করলে ফিরে যায় মায়ের কাছে৷ রুটিন কাজ৷ কিন্তু মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ৷আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যত। অথচ দেশে শিশুরা শিশু শ্রমিকের কাজ করছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) পরিচালিত শিশুশ্রম জরীপ-২০১৩ অনুযায়ী দেশে শিশু শ্রমিক রয়েছে সাড়ে ৩৪ লক্ষ। এর মধ্যে ১২ লক্ষের অধিক শিশু ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত রয়েছে। পূর্ণকালীন শ্রমিক হিসেবে কাজ করছে ৫-১৭ বয়সী শিশুরা।২ লাখ ৬০ হাজার শিশু অপেক্ষাকৃত বেশি ঝঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত রয়েছে। যে শিশুরা শ্রমে নিয়োজিত রয়েছে তাদের বড় অংশ স্কুলের বাইরে রয়েছে। আর্থিক অভাব-অনটন ছাড়াও পরিবারের একজন উপার্জনকারীর একজন হিসেবে শ্রমে নিয়োজিত রয়েছে তারা।প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ করা হয়েছে প্রাথমিক বিদ্যালয় শেষ করার পূর্বে যারা বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়ে তাদের অধিকাংশ বিভিন্ন যানবাহনের হেলপার হিসেবে কাজ করছে।বিশেষ করে বাস, টেম্পো, হিউম্যান হলার প্রর্ভৃতি গণপরিবহনে কাজ করে। আবার কেউ কেউ চায়ের দোকান, হোটেল, রেস্তোরাঁ, বিভিন্ন যানবাহনের গ্যারেজ ও ইটভাটাসহ নানা ধরনের ছোট ছোট কারখানায় কাজ করে।  শিশুরা ফুলের মতো।প্রতিটি শিশুই ফুলের মতো ফোটার এবং সুন্দররূপে বিকশিত হওয়ার দাবি নিয়ে পৃথিবীতে আসে। কিন্তু প্রতিকূল পরিবেশের নির্মমতায় তারা বিকশিত হতে পারে না। তাদের পরিপূর্ণ বিকাশের দায়িত্ব যাদের হাতে তারাই তাদের কাজে নিয়োজিত করছে। একটি দেশের উন্নয়নের সার্বিক চিত্র দেখতে সেই দেশের শিশুদের দিকে তাকালেই বোঝা যায়। শিশুরা যদি শ্রমে নিয়োজিত থাকে তাহলে উন্নয়নের ধারায় যে অসমতা তৈরি হবে তা ভোরের সূর্যের মতো সত্য।প্রতিটি শিশুই লেখাপড়া করবে, হাসি আনন্দে মেতে থাকবে। কিন্তু সম্পদের অসম বণ্টন ও সামাজিক অসঙ্গতির কারণে বঞ্চিত হচ্ছে এসব শিশু।খাতা-কলম তাদের হাতে উঠছে না, বরং এদের কচি হাত হয়ে উঠছে শ্রমের হাতিয়ার। ১২ জুন, বিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস। শিশু অধিকার সুরক্ষা ও ঝুঁকিপূর্ণ শিশু শ্রম প্রতিরোধের লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক শিশুশ্রম সংস্থা (আইএলও) ২০০২ সাল থেকে প্রতিবছর দিবসটি পালন করে আসছে। উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশে শিশুশ্রম এখনো অনেক বেশি অমানবিক পর্যায়ে রয়ে গেছে। সরকারের শিশুবান্ধব পরিবেশের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও কেন শিশুদের জন্য পৃথিবীটা বাসযোগ্য করা যাচ্ছে না। এর উত্তর খুঁজে পাওয়া দরকার। নতুবা এ সমস্যার সমাধান কখনই সম্ভব হবে না।আইএলও এবং জাতিসংঘ শিশু তহবিল আঠারো বছর বয়স পর্যন্ত মানুষকে যেকোনো শারীরিক ও মানসিক শ্রমে নিয়োগকে শিশুশ্রম বলেছে। কিন্তু আমরা এটা মানছি না। আমাদের কাছে এর কোনো গুরুত্ব নেই। আমরা চাই শিশু ব্যবহার করে যতটা কাজ আদায় করা যায়। একসময় বাংলাদেশে শিশুশ্রমের প্রধান কারণ সীমাহীন দারিদ্র্যতা বলেই মনে করা হতো। কিন্তু এখন! রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় সম্পদ বণ্টনের যে ব্যবস্থা বিদ্যমান, তাতে এসব শিশুর জীবনযাত্রার মান বাড়ানো আদৌ সম্ভব নয়।এর একটা পরিবর্তন হওয়া দরকার।পরিবারের মুখে দু’মুঠো অন্ন তুলে দেওয়ার জন্য শিশুরা নিজের ভবিষ্যৎকে উৎসর্গ করে অর্থ উপার্জনে নিয়োজিত হচ্ছে। যে কারণে স্কুলে যেতে পারছে না অনেক শিশু।  পরিবর্তে অনেকের ঠাঁই হচ্ছে ছোট ছোট কলকারখানায়, পাথর ভাঙা, ফেরি করে জিনিস বিক্রি, রিকশা চালানো, সিএনজি চালানো ইত্যাদি কাজে।সবাই শিশুদের প্রতি, সমাজের প্রতি, সর্বোপরি ভালোর প্রতি দায়বদ্ধ থেকে আমরা যদি জীবনযাপন করতাম তাহলে শিশুদের জন্য পরিবেশটা আরো অনুকূল হতো। আমরা বিশ্বাস করতে চাই, এক দিন পৃথিবীর প্রতিটি মানুষ ভালোবাসার হাত দিয়ে এই শিশুদের স্পর্শ করবে। বাংলাদেশ ২০১৫ সালের মধ্যে শিশুশ্রম দূর করার কথা থাকলেও সামাজিক-অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট ও আমাদের মানসিকতা তা বাস্তাবায়নে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।আগের তুলনায় শিল্প-কারখানায় শিশু শ্রমিকদের ব্যবহার কমে এসেছে। জাতীয় শিশুশ্রম জরিপ ২০১৩ অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রায় ৩৪ লাখ ৫০ হাজার শিশু কোনো না কোনো শ্রমে নিয়োজিত ছিল। বছর বছর এই সংখ্যা কমে আসছে। এটা আমাদের জন্য আশার কথা। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো পরিচালিত সেই জরিপে দেখা যায়, এর মধ্যে ১২ লাখ ৮০ হাজার শিশুই বিভিন্ন ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত। বেসরকারি এক হিসাব মতে, শুধু ঢাকা শহরে ২০ লাখ বস্তিবাসী জনগোষ্ঠীর অর্ধেকের বেশি শিশু। শিশুরা কাজ করে সর্বত্র। কিছু শিশু দেশ থেকে বিদেশে পাচার হয়ে যায়।আমরা যদি ঢাকা শহরের ব্যস্ততম এলাকা গুলোতে একটু নজর দিই, তাহলে দেখতে পাব হকারি করে যারা জিনিস বিক্রি করছে তাদের একটি বড় অংশই শিশু। কেবল জীবিকার কারণেই তারা রাস্তায় রাস্তায় উপার্জনে ব্যস্ত। সারাদিন পর হয়তো তাদের আয়ের ওপরই নির্ভর করছে কোনো কোনো পরিবার।ঘুমিয়ে আছে শিশুর পিতা সব শিশুরই অন্তরে।প্রতিটি শিশু আলাদা আলাদা মেধা নিয়ে জন্মায়।কিন্তু কেউ সেই মেধা বিকাশ করার উপযুক্ত পরিবেশ পায় আবার কেউ পায় না। প্রতিটি শিশুর নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করে দেওয়ার দায়িত্ব রাষ্ট্রের।যদি শিশুরাই দেশের ভবিষ্যৎ হয়ে থাকে, তাহলে রাষ্ট্রকেই এই শিশুদের লালন পালনের দায়িত্ব নিতে হবে।কারণ আজ যারা শিশু কাল তারা ভালো নেতা, ডাক্তার, আইনজীবী বা অন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ পেশায় নিয়োজিত কোনো ব্যক্তি।  কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, অনেক শিশুর সে সুযোগ না থাকায় তাদের দেশের বিভিন্ন কলকারখানা, গার্মেন্টস, গ্যারেজ, দোকানপাটসহ বিভিন্ন জায়গায় এদের কাজে ব্যস্ত থাকতে দেখা যায়। প্রাণ হারানোর ঝুঁকির মুখে ম্যানহোল বা সেপটিক ট্যাঙ্কের ময়লা পরিষ্কারের জন্য শিশুদের নামিয়ে দেওয়া হচ্ছে। বিষাক্ত গ্যাসের ছোবল থেকে বাঁচতে তাদের জন্য সামান্য প্রতিরক্ষার ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজনও মনে করা হচ্ছে না।পাশাপাশি ভিন্ন চিত্রও রয়েছে, তবে তা একেবারেই কম। এইভাবেই কেটে যাচ্ছে অধিকারবঞ্চিত শিশুদের দিনকাল। বছরের পর বছর তারা কষ্ট করে বেঁচে আছে। আবার এই শিশুদেরই পাচার করা হচ্ছে। ভিন দেশে গিয়ে হয়তো তারা উটের জকি হয়ে দিন কাটাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে এর কয়েকটি উদাহরণ রয়েছে। দরিদ্র বাবা-মাকে লোভ দেখিয়ে অনেক শিশুকে কিনে নিয়ে যায় নরপশুরা। তারপর মোটা টাকায় বিক্রি করে দেওয়া হয়। জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদ অনুযায়ী, ৩৮ প্রকার কাজে শিশুদের অংশগ্রহণ করা নিষেধ। কিন্তু আমাদের দেশের চিত্রটা একেবারেই আলাদা। প্রাথমিক এবং মাধ্যমিক শিক্ষার মুখ থেকে ঝরে পড়া গরিব ঘরের অসংখ্য শিশু বিভিন্ন ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ কাজের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে। জাতিসংঘ বা আইএলও সনদে শিশুদের অধিকার রক্ষায় বাংলাদেশ স্বাক্ষর করলেও কার্যত শিশুশ্রম আর ঝুঁকিপূর্ণ কাজে শিশুদের নিয়োগ এখনো চোখে পড়ার মতো-যা দেখার জন্য আমরা প্রস্তুত নই।অথচ গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতিমালা অনুসারে ১৪ বছরের কম বয়সী কাউকে গৃহকর্মী হিসেবে নিয়োগ করা যাবে না। জাতীয় শিশুনীতি-২০১১ অনুসারে ৫-১৮ বছরের শিশু কোন ঝঁকিপূর্ণ কাজ করতে পারবে না। ৫-১৪ বছরের শিশুকে কর্মে নিয়োগ দেয়া দন্ডনীয় অপরাধ। দারিদ্র্য শিশু শ্রমিক তৈরী করছে কথাটি যেমন সঠিক তেমনি নিয়োগকারীরা সস্তা মজুরীর লোভে শিশু শ্রমিক নিয়োগ করছে। ফলে সরকার ২০১৬ সালের মধ্যে শিশু শ্রম সম্পূর্ণভাবে বন্ধ র্কার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। শিশু শ্রমের ডাটাবেজ তৈরীর জন্য দায়িত্ব দেয়া হয়েছে ইউনিয়ন পরিষদকে।  ২০২১সালের মধ্যে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করতে শিশু শ্রম বন্ধের পরিকল্পনা সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। সরকারের এ পরিকল্পনা নি:সন্দেহে প্রশংসনীয়। শিশু বন্ধের জন্য বিভিন্ন ঘরে ফেরা কর্মসূচি গ্রহণ করা যেতে পারে।গ্রাম পুনর্বাসন প্রকল্প: শিশু শ্রম বন্ধে গ্রামভিত্তিক পুনর্বাসন প্রকল্প গ্রহন করা যেতে পারে।দারিদ্র্যের কারণে যে সব শিশু শ্রম দিচ্ছে তাদের তালিকা তৈরী করে শিশু ভাতা প্রদান করতে হবে। এ ব্যাপারে ইউনিয়ন পরিষদকে দায়িত্ব দেয়া যেতে পারে। ইউনিয়ন পরিষদ এলাকার শিশু শ্রমিকে লেখাপড়ার আওতায় আনাসহ তাদের জন্য আত্মকর্মসংস্থান কর্মসূচি প্রকল্প গ্রহন করতে হবে।উপজেলা ভিত্তিক আবাসিক শিশু শ্রমিক বিদ্যালয়: বাসস্থানবিহীন এতিম শিশুসহ শিশু শ্রমিকের জন্য উপজেলা ভিত্তিক একটি করে আবাসিক শিশু শ্রমিক বিদ্যালয় স্থাপন করতে হবে।যেখানে শিশুদেরা থাকা-খাওয়াসহ লেখাপড়ার সুযোগ থাকবে। এছাড়াও বিদ্যালয়টিতে শিশুদের আত্মকর্মসংস্থান কর্মসূচির ব্যবস্থা থাকতে হবে। যাতে করে তারা পড়ালেখার পাশাপাশি আত্মনির্ভরশীল কর্মী হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।শিশু ভিক্ষাবৃত্তি বন্ধে আইন: দেশে শিশু ভিক্ষাবৃত্তি বন্ধের জন্য সরকারকে আইন করতে হবে। ভিক্ষাবৃত্তি নয়, লেখাপড়ায় হয় আত্মনির্ভরশীল-এ বিশ্বাসে তাদেরকে গড়ে তুলতে হবে। ইতোমধ্যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভিক্ষাবৃত্তি বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।পরিশেষে বলা যায়, উপরের কর্মসূচি বাস্তবায়নসহ সরকার উদ্যোগী হলে শিশু শ্রম বন্ধ করা কোন ব্যাপারই নয়। আর দেশের নাগরিকরা সচেতন হলে শিশু শ্রম বন্ধ করা যায়। বিশেষ করে নিজের কাজ নিজে করব, শিশু শ্রমিককে না বলব এরকম মন-মানসিকতার অধিকারী হতে হবে। তাহলে শিশু শ্রম বন্ধে সরকারের উদ্যোগ সফল হবে।  শিশুদেরকে শিশুশ্রমে নিয়োগ করে কার্যত তাদের ভবিষ্যতকে ধ্বংস করে দেয়া হচ্ছে৷ কেননা অল্প বয়সে কাজ করতে গিয়ে তারা লেখাপড়ার সুযোগ হারাচ্ছে, মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ছে৷ আর শিশুদের বৃদ্ধির যে স্বাভাবিক পন্থা, সেই পন্থা থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে৷ তারা এমন সব কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে যেগুলো তাদের বয়সে করার কথা স্বাভাবিক অবস্থায় ভাবাই যায় না৷সমস্যার সমাধান না দিয়ে লেখা শেষ করা উচিত নয়৷ বাংলাদেশের আইনেই আছে ১৪ বছরের কম বয়সিদের কাজে নিয়োগ দেয়া যাবে না৷ আমি মনে করি, এই আইনের প্রয়োগ করতে হবে কঠোরভাবে৷ এখানে সরকারের দায়িত্ব অনেক৷ জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে শিশুশ্রম বন্ধ করে সেসব শিশুকে লেখাপড়ার সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়া, তাদের লেখাপড়ায় উৎসাহিত করার জন্য উদ্যোগ নিতে হবে, বিনিয়োগ করতে হবে৷ প্রয়োজনে শিশুদের উপর নির্ভরশীলদের ভরণপোষণের দায়িত্ব নিতে হবে৷ এক্ষেত্রে জাগো ফাউন্ডেশনের মতো বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোর সহায়তা নেয়া যেতে পারে৷ মনে রাখতে হবে, আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যত।লেখক ও কলামিস্ট,যুক্তরাজ্যraihan567@yahoo.com

 

যে কথাটি তোমাদের মনে রাখা দরকার

 

রাজু আহমেদ, কলামিষ্ট

এ লেখা শুধুমাত্র আমার সেই সব আদরের ছোট ভাই-বোনদের জন্য যারা বয়সসীমায় ১২ থেকে ২২ অতিক্রম করতেছো । বয়সের এই স্তরটি ভালোলাগার । এই বয়সের চোখগুলো যা দেখে তাই ভালোলাগে । কেননা এই সময়ের তরুণ-তরুণীদের মন পবিত্র থাকে এবং জীবন বাস্তবতার তেমন কোন আঘাতের মোকাবেলা করতে হয়না । চারদিকে মন্দের ছড়াছড়ির মধ্যে ভালোলাগার গুনটি দারুণ প্রশংসার তবে এমন কিছু ক্ষতিকর বস্তু আমাদের চারপাশে সর্বদা ঘুর্ণনরত, যা কোনভাবে ভালোলাগলে জীবনের সর্বনাশে ঘন্টি বাজতে শুরু করে । কাজেই ভালোলাগায়ও সীমা রাখতে হবে । আসল ভালোকে ছদ্মরূপে অবস্থানরত ভালো থেকে পার্থক্য করার জ্ঞান অর্জন করতে হবে ।

ছকিনার চোখ, জরিনার ঠোঁট কিংবা অন্যকারো অন্যকিছু এই বয়সটাতে বিচারহীনভাবে ভালোলাগতে পারে; লাগে । একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের সারাজীবনে যত স্বপ্নের জন্ম হয় তার দুই-তৃতীয়াংশ এই মাত্র ৮-১০ বছরের মধ্যে জাগ্রত হয় । কাজেই ভুল কোন স্বপ্ন যদি আঁকড়ে ধরা হয় তবে ধ্বংস নিশ্চিত । কোন সাময়িক মোহে যদি কেউ নিজের দোষে কিংবা বন্ধুদের অসৎ সঙ্গে মত্ত হয় তবে তাকে সারা জীবনের জন্য প্রায়শ্চিত্তে পুড়তে হবে । অতীতে একদল এ পথে ব্যর্থ হয়েছে; কাজেই আর কেউ ব্যর্থ হোক সেটা কোনভাবেই কাম্য নয় ।

নগেনের কথা, হরেনের সুর কিংবা অন্যকারো অন্যকোন ভ্রান্ত মায়ার গুনে যদি বয়সের এই জোয়ারবেলায় নিজেকে খুইয়ে ফেলো তবে সারাজীবন ব্যথার ধকল বয়ে বেড়াতে হবে । সময়ের এই গন্ডিটুকুর প্রায় সবটা জুড়ে প্রবল আবেগ ক্রিয়াশীল থাকে । আর আবেগের আধিক্য কোন কালেই মঙ্গল আনয়ন করেনি ।  উত্তেজনা সাময়িক কিছুটা শান্তি বোধহয় দিয়েছে কিন্তু পরিনামে যে কি পরিমান আঘাত অপেক্ষা করছে তার উপলব্ধি কেবল ক্ষতিগ্রস্থের আহাজারি আর অশ্রু দ্বারাই নিরূপণ করা সম্ভব । আশা নয় বিশ্বাস, তোমরা ভুল পথে হাঁটবে না ।আমি এই সমাজের সাদমান-সাফাত কিংবা ঐশীদের প্রতিনিধিত্ব করিনা । আমি যাদের প্রতিনিধিত্ব করি, তাদের পরিবার তাদের সন্তানদের নিয়ে স্বপ্ন দেখে । সন্তানকে মানুষ করার নিরলস প্রচেষ্টা তাদের চোখেমুখে । ভোগের সব পথ পরিত্যাগ করে এ আঙিনার অভিভাবকরা তাদের সন্তানের দ্বারা নিজেদের স্বপ্নকে আলোর মুখ দেখাতে চেষ্টা করে । বিশ্বাস না হয় ইতিহাস খোঁজ, সফল মানুষদের সিংহভাগ সেই সব অভাবী সংসার থেকে আবির্ভূত হয়েছে যাদের পরিবার তোমার-আমার পরিবারের মতে কোনমতে টেনেটুনে দিনের হিসাব বজায় রাখে । এরা সপ্তাহে দাঁড়িয়ে বছরের পরিকল্পনা করতে পারেনা । এদের যা সামর্থ্য তাতে আগামীদিনে বাঁচবে কিনা তা সংশয়ের অথচ এই মহৎজনেরা তাদের সন্তানকে মানুষের মত মানুষ করতে দীর্ঘ পরিকল্পনা সাজায় । কাজেই কষ্ট-ক্লেশে নিজেদেরকে বিলীন করে যারা তাদের সন্তানদের আলোর মানুষ হিসেবে গড়তে শেষ চেষ্টাটুকু করে যাচ্ছে তাদের স্বপ্ন ভঙ্গের অধিকার কি আমাদের আছে ?

একটু অপেক্ষা, নিজেকে আরেকটুখানি নিয়ন্ত্রন করো । ইতিহাস সাক্ষী, অপেক্ষার ফল কোন কালেই তেঁতো হয়নি । সেই সময়টা খুব বেশি দূরে নয় যেদিন তোমার সাফল্য তোমার সাথে সাথে তোমার পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে আলোকিত করবে । সমাজে তোমার জন্য সম্মানের আসন বরাদ্ধ হবে । বয়সমাখা আবেগের একটুখানি ভুল যদি তোমাকে সাফল্যপ্রাপ্তদের যাত্রা থেকে বিফলদের যাত্রায় ছিটকে ফেলে, ভাবো তবে, তোমার জীবনের স্বার্থকতা কোথায় ? যে অমূল্য জীবনের অধিকারী তোমরা হলে সে জীবনকে মহৎজীবনে রূপায়ণ করার স্বপ্ন কি ধারণ করা উচিত নয় ?এইসব সহজ সহজ অথচ জীবনঘনিষ্ট প্রশ্নগুলোর উত্তর দেয়ার বুদ্ধি তোমাদের এখনো অর্জিত হয়নি কেননা এসব স্বপ্নের বিপরীতে যেসকল মোহ সমাজের চারপাশে বিরাজিত তা সাময়িকভাবে আরো আনন্দের ঠেকছে, আরও মধুর । তোমাদের অনেকেই সে পথটাকে আপন ভাবছো । অথচ সেসব যে তোমাদের মানুষ হিসেবে প্রতিষ্টিত হওয়ার মেরুদন্ড ভেঙে দিচ্ছে তা তোমরা অনুধাবন করতে পারছো না । এজন্য তোমাদের উচিত অভিভাকদের কথা মান্য করা, শিক্ষকদের প্রতি আনুগত্য রাখা, নীতি-নৈতিকতার পথে রাষ্ট্রীয় আইন-আচারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা, ধর্মীয় রীতি-নীতির অনুসরণ করা এবং মেধাকে ধীরে ধীরে পরিচর্যার মাধ্যমে সেই গন্তব্যের পানে যাত্রা করা, যেখানে একেকজন সাফল্যমন্ডিত মহৎ মানুষের অনন্য জীবন্ত গল্প আঁকা । ভালো থেকো তোমরা সবাই । রাষ্ট্র তোমাদের নিয়ে স্বপ্ন বুঁনছে । কাজেই তোমারা রাষ্ট্রের স্বপ্ন ভেঙ্গে নিজেদের জীবনকে অর্থহীন করো না । তোমাদের প্রতিষ্ঠার সাথে পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রের উন্নতির স্বপ্নের বাস্তবায়ন জড়িয়ে । আশা নয় বিশ্বাস পুষি, তোমাদের হাত ধরেই বিশ্ববুকে বাংলাদেশের পতাকা মর্যাদার সাথে উড্ডীত হবে ।

রাজু আহমেদ । কলামিষ্ট ।

fb.com/rajucolumnist/

সকল বৈষম্যের উর্ধে ঈদুল ফিতর

রায়হান আহমেদ তপাদার ঃ সারা বিশ্বের মুসলমানের সর্বজনীন আনন্দ-উৎসব ঈদুল ফিতর।বছরজুড়ে নানা প্রতিকূ লতা,দুঃখ-বেদনা সব ভুলে ঈদের দিন মানুষ সবার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে মিলিত হন।ঈদগাহে কোলাকুলি সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি ও ভালোবাসার বন্ধনে সবাইকে নতুন করে আবদ্ধ করে।ঈদ এমন এক নির্মল আনন্দের আয়োজন, যেখানে মানুষ আত্মশুদ্ধির আনন্দে পরস্পরের মিল বন্ধনে ঐক্যবদ্ধ হন এবং আনন্দ সমভাগা ভাগি করেন।মাহে রমজানের এক মাসের সিয়াম সাধনার মাধ্যমে নিজেদের অতীত জীবনের সব পাপ-পঙ্কিলতা থেকে মুক্ত হতে পারার পবিত্র অনুভূতি ধারণ করেই পরিপূর্ণতা লাভ করে ঈদের খুশি।আর আনন্দ ও পুণ্যের অনুভূতিই জগতে এমন এক দুর্লভ জিনিস, যা ভাগাভাগি করলে ক্রমেই তা বৃদ্ধি পায়।ঈদুল ফিতর বা রোজা ভাঙার আনন্দ-উৎসব এমন এক পরিচ্ছন্ন আনন্দ অনুভূতি জাগ্রত করে, যা মানবিক মূল্যবোধ সমুন্নত করে এবংআল্লাহর সন্তুষ্টি ও নৈকট্য লাভের পথপরি ক্রমায় চলতে ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের উদ্বুদ্ধ করে।ঈদ ধনী-গরিব সব মানুষের মহামিলনের বার্তা বহন করে।ঈদের দিন ধনী-গরিব বাদশা ফকির মালিক-শ্রমিক নির্বিশেষে সব মুসলমান এক কাতারে ঈদের দুই রাকাত ওয়াজিব আদায় এবংএকে অপরের সঙ্গে কোলাকুলি করে সাম্যের জয়ধ্বনি করেন।রমজান মাসে সংযম ও আত্মশুদ্ধি অনুশীল নের পর ঈদুল ফিতর ধনী-দরিদ্রনি র্বিশেষে সব শ্রেণীর মানুষকে আরও ঘনিষ্ঠ বন্ধনে আবদ্ধ করে,গড়ে ওঠে সবার মধ্যে সম্প্রীতি,সৌহার্দ্য ও ঐক্যের বন্ধন ঈদের দিন মসজিদে,ময়দানে ঈদের নামাজে বিপুল সংখ্যক ধর্মপ্রাণ মুসল্লির সমাগম হয়ে থাকে।সবাই সুশৃঙ্খলভাবে কাতারবদ্ধ হয়ে ঈদের নামাজ পড়েন।নামাজ শেষে ধনী-নির্ধন পরিচিত-অপরি চিত সবাই সানন্দে কোলাকুলি করেন। রাজধানীতে জাতীয় ঈদগাহ ময়দান, বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদসহ দেশে র সব ঈদগাহ ও মসজিদে ঈদের জামাতে পার্থিব সুখ-শান্তি,স্বস্তি আর পারলৌকিক মুক্তি কামনা করে আল্লাহর দরবারে বিশেষ মোনা জাত করা হয়। সেই সঙ্গে বিশ্বশান্তি এবং দেশ-জাতি ও মুসলিম উম্মাহর উত্তরোত্তর শান্তি,সমৃদ্ধি,অগ্রগতি ও সংহতি কামনা করা হয়।প্রকৃত পক্ষে ঈদ ধনী-দরিদ্র,সুখী-অসুখী,আবাল বৃদ্ধবনিতা সব মানুষের জন্য কোনো না কোনোভাবে নিয়ে

ঈদ ধর্মীয় বিধিবিধানের মাধ্যমে সর্বস্তরের মানুষকে ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ ও ঐক্যবদ্ধ করার প্রয়াস নেয় এবং পরস্পরের জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারের শিক্ষা দেয়। মহান সৃষ্টিকর্তার দরবারে আমাদের কায়মনো বাক্যে প্রার্থনা হলো জগতের সব মানুষের সুখ,শান্তি ও সমৃদ্ধি।পৃথিবী সর্বপ্রকার হিংসা-বিদ্বেষ ও হানাহানিমুক্ত হোক! সন্ত্রাসের বিভী ষিকা দূর হোক! আন্তধর্মীয় সম্প্রীতি ও সৌহা র্দ্যের বন্ধন দৃঢ়তর হোক! আগামী দিনগু লো সুন্দর ও সৌন্দর্য মণ্ডিত হোক! হাসি-খুশি ও ঈদের আনন্দে ভরে উঠুক প্রতিটি প্রাণ।ব্যক্তি,পরিবার,সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে সংযম সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির পরিবেশ পরিব্যা প্তি লাভ করুক-এটাই হোক ঈদ উৎসবের ঐকান্তিক কামনা।একটি ঈদ-উল-ফিতর ও অন্যদিন ঈদ-উল-আযহা।হিংসা বিদ্বেষ বিভেদ ভুলে আজ একে অন্যকে বুকে টেনে আনার দিন।ধনী রোজাদারদের গরিবের পাশে দাঁড়ানোর আহবান জানিয়ে কবি নজরুলের কণ্ঠে ধ্বনিত হয়-বুক খালি করে আপনারে আজ দাও জাকাত/করোনা হিসাবী,আজি হিসাবের অধপাত/একদিন কর ভুল হিসাব।আমাদের জীবনে পাপ পঙ্কিলতা ও মিথ্যা চারের গণ্ডিতে ঘেরা।বিগত দিনের পঙ্কিল জীবনচক্রে যে অবিশ্বাস,দ্ব›দ্ব-দূরত্ব তৈরি হয় তা বেমালুম ভুলে গিয়ে সবাই আজ একই কাতারে শামিল।মুসলিম উম্মাহর অনা বিল আনন্দে মেতে ওঠার দিন ঈদুল ফিতর প্রীতির এক পুণ্যময় বন্ধনে গ্রথিত করে সবাইকে।বিশ্ব মুসলিম সমাজের কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে উদ্ভাসিত হয় ঈদের আনন্দা বেগ।বর্ণ,গোত্র ও ভৌগোলিক সীমানা অতিক্রম করে সব মুসলিমই এ দিনটিতে উৎসবে শামিল হয়। তাই ঈদ মুসলিম জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন এবং ইসলামি কৃষ্টি-সংস্কৃতির শুদ্ধতম বহিঃ প্রকাশ।ঈদ শব্দের অর্থ ফিরে আসা,আনন্দ, খুশি, উৎসব প্রভৃতি।যে খুশির দিনটি মানুষের মাঝে বারবার ফিরে আসে তাই ঈদ। এবারের ঈদুল ফিতর দেশ ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে মানব তার বিপর্যস্ত মুহূর্তে শান্তি ও কল্যাণের স্রোতে একাত্ম হবার আহ্বানে ফিরে এসেছে।ঈদুল ফিতর ডাক দেয় ঘুরে দাঁড়াবার,সত্য ও সুন্দরের পক্ষে গণজাগর ণের বার্তা নিয়ে এসেছে ঈদুল ফিতর।মূলত মুসলমানগণ ঈদুল আজহার চেয়ে ঈদুল ফিতরেই বেশি আনন্দ উৎসব করে থাকে।

এই দিনটি নারী,পুরুষ,ধনী,গরিব,সবাই এক অনা বিল আনন্দের স্রোতে ভাসিয়ে দেয়।সকলেই এক মাঠে নামাজ পড়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে।সবার দ্বার থাকে অবারিত।ধনীরা সাদকাতুল ফিতরের মাধ্যমে নিঃস্ব ও বঞ্চিতকেও তাদের আনন্দের ধারায় শামিল করে নেয়।আমাদের দেশে এই দিনটিতে সবাই সামর্থ্য অনুযায়ী নতুন পোশাক ভূষিত হয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ে।সমাজের দরিদ্র শ্রেণিও এদিন থাকে আনন্দা প্লুত।তাদের পেট সেদিন অভুক্ত থাকেনা তাদের পকেটও থাকে না অর্থশূন্য ইসলামে র অর্থনৈতিক সাম্যের বিধান এ দিনই মূর্ত হয়ে ওঠে।সবাই নতুন পোশাক পরিধান,একই মাঠে জমায়েত একই ইমা মের পেছনে তাকবির ধ্বনির সঙ্গে নামাজ আদায়,বুকে বুক মিশিয়ে কোলা কুলি-এক নয়নাভিরাম স্বর্গীয় দৃশ্যের অবতারণা করে।একই দৃশ্য সর্বত্র।দীর্ঘ রোজার পর ঈদুল ফিতর পরিশুদ্ধ আত্মাকে সিরাতুল মুস্তাকিমে অবিচল রাখতে প্রেরণা জোগায় এবংদীর্ঘ তাকওয়ার প্রশিক্ষ ণকে বাস্তব রূপ দিতে শুরু করে।এক টুকরো চাঁদ একটি জাতির জীবনে কতখানি আলোড়ন সৃষ্টি করতে পারে তার জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত শাওয়ালের নতুন এক ফালি চাঁদ। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো ঈদের প্রকৃত চেতনা ও শিক্ষা থেকে আমরা যোজন যোজন দূরত্বে থেকে এর ফজিলত ও মাহাত্ম্য ভুলে গেছি।ঈদ যেন আজ কেবলই আচার-আনুষ্ঠা নিকতা ও খেল-তামাশায় রূপ নিয়েছে।ঈদের মূল শিক্ষা ও সংস্কৃতিকে ছেড়ে মুসলিম জাতি ক্রমশই ভোগবাদী অপসংস্কৃতির দিকে ঝুঁকে পড়ছে।ভোগসর্বস্ব জীবনই বেছে নিচ্ছে আমা দের অনেকেই।অথচ নিঃস্ব অসহায়দের মুখে হাসি ফোটা নোই ঈদের অন্তর্নিহিত তাৎপর্য ও শিক্ষা।আজ ঈদের মূল শিক্ষা আমাদের মধ্যে আবার ফিরিয়ে আনতে হবে।ব্যথিতের কষ্ট দূর করা ও তার ব্যথায় সমব্যথী হওয়াই ঈদের শিক্ষা।সেই ব্যথিত ব্যক্তি আমার প্রতিবেশী হোক,আত্মীয় হোক কিংবা তার অবস্থান হোক সহস্র যোজন দূরে।নবী করিম (দ.) বলেছেন-মুমিন সমগ্র একটি দেহের ন্যায়।তার কোনো একটি অঙ্গ অসুস্থ হলে গোটা দেহ কষ্ট অনুভব করে।মুমিন দের আত্মাগুলোকে একটি সূত্রে গ্রন্থনই ঈদের মৌলিক আবেদন।

আজ আমরা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গভীর সংকট ও হতাশার মধ্য দিয়ে দিন পার করছি।পৃথিবীতে মানুষ বাড়ছে প্রতিনিয়ত আর তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ক্রমেই কমছে মানুষের দাম।শান্তি,স্বস্তি নেই কোথাও।সর্বত্র অরাজকতা বিশৃঙ্খলা সন্ত্রাস, জুলুম,নিপীড়নের ভেতর দিয়ে আমা দের নিত্য পথ চলা।সিরি য়া,মিসর,ইরাক ইরানলিবিয়া ফিলিস্তিন আফগানি স্তান,পাকিস্তান, কাশ্মিরসহ সর্বত্র মুসলমা নরা আজ করুণ অবস্থার শিকার।পরাশক্তির হিংস্র ছোব লে সমগ্র মুসলিম জনপদ আজ ক্ষতবিক্ষত ও দলিত।সেখানে তাদের জীবন ও সম্পদের কোনো নিরাপত্তা নেই।পরাশক্তির অস্ত্রের গোলায় ছিন্নভিন্ন হচ্ছে মুসলিম জনপদ। সুতরাং ঈদুল ফিতরের আনন্দের মুহূর্তে দুর্দশাগ্রন্ত নিপীড়িত মজলুম মানবতার কথাও আমাদের ভাবতে হবে।কিভাবে একটি সুখী সমৃদ্ধ মানবতাবাদী বিশ্ব গড়া যায় সেদিকে দৃষ্টি দিতে হবে জাতীয় ও বিশ্বনেতৃত্বকে।আমরা শুধু নিজেকে নিয়ে ব্যস্ততায় না থেকে চারপাশে চোখ মেলে তাকাতে হবে আমাদের।অভাবী,দুঃখ ক্লিষ্ট নিরন্ন মানুষের মুখে হাসি ফোটানোই যে ঈদের আসল শিক্ষা তা আমা দের হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করতে হবে।মেকি অশ্লীল ভোগসর্বস্ব আনন্দ উৎসবে মত্ত না হয়ে নিগৃহীতদের ব্যথায় ব্যথিত হয়ে ঈদ পালন করা প্রয়োজন।ঈদের প্রকৃত শিক্ষা অনুধাব নের মাধ্যমে ধনী-গরিব সবার মধ্যে স¤প্রীতির বন্ধন সুদৃঢ় ও মজবুত হোক।বিভেদ বিদ্বেষ ভুলে গড়াগড়ি-কোলাকুলিতে কাটুক এইদিন।কিছু মানুষের লোভ ও নিষ্ঠুরতায় প্রতি বছর ঈদে লাখ লাখ মানুষ অতি কষ্টে ঈদ উদযাপনে বাধ্য হন।বিশেষ করে রাজধানী ঢাকা-চট্টগ্রাম সহ সারা দেশের শহরাঞ্চল থেকে নাড়ির টানে গ্রামে ছুটে যাওয়া মানুষের কষ্টের সীমা থাকে না।লঞ্চ,ট্রেন বাসের টিকিট পেতে গ্রামমুখী মানুষকে কী যে দুর্ভোগে পড়তে হয় তা ভাষায় বর্ণনা করাও দুঃসাধ্য।নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে অতিরিক্ত ভাডা আদায় করে কিছু কুচকরি মহল যা ঈদের আনন্দ থেকে মানুষকে দূরে টেলে দেয়।এখানে সরকারের কি দুষ।মানুষ মানুষের দায়িত্ব না বুঝলে সরকারের কি করার আছে।

মহান আল্লাহ ধনিদেরকে দায়িত্ব দিয়েছেন।গরীবদের খুঁজ খবর রাখার জন্য এবং তারা গরীবদের সুখ-সুবিধার যেন কমতি না হয় সে দিক নিশ্চিত করার জন্য ঈদের দিনের সকাল বা তার আগে গরীবদের কে তার অর্থসম্প দের নির্দিষ্ট অংশ দান করবেন।এর নাম সদকায়ে ফিতর।এ সদকায়ে ফিতর গরীব দেরকে মালিক বানিয়ে দান করতে হবে।এ অর্থে গরীবরা আল্লাহর নির্ধারিত ঈদের খুশী উপভোগ করে। ঈদের আনন্দ শুধু খাওয়া-দাওয়া আর সদকায়ে ফিতরের মত এবাদত আদায়ের মাঝেই সীমাবদ্ধ নয়।এর এবাদতের সীমানা আরও ব্যাপক।তাই ঈদের দিন সকালে এলাকার সব মুসলমান মিলে নিকটস্থ ঈদগাহে মিলিত হয়ে জামা তের সাথে পবিত্র ঈদের নামাজ আদায় করবে।ধনী-দরিদ্র,ছোট-বড়,আমির ফকির, নির্বিশেষে সবাই একই কাতারে শামিল হয়ে ঐক্যের এক অনুপম দৃষ্টান্ত স্থাপন করে সকলে আল্লাহর উদ্দেশ্যে কৃতজ্ঞতার নিদর্শন হিসেবে মাথা নত করে।ঈদ উৎসব পালনকালে সেই সব ভাই-বোনদের কথাও আমাদের মনে রাখতে হবে, যারা কঠিন পীড়ায় অসুস্থ হয়ে বাড়ীতে কিংবা হাসপাতালে পড়ে আছে।ব্যথা,যন্ত্রণা ও মানসিক পীড়নে ঈদের আনন্দ তাদের মাটি হয়ে গিয়েছে।আমা দের উচিৎ প্রথমত:আল্লাহ যে সুস্থতা ও নিরা পত্তার অশেষ নিয়ামতের উপর আমাদেরকে রেখেছেন তার জন্য শুকরিয়া আদায় করা এবং দ্বিতীয়ত:এ সবল রোগাক্রান্তদের আরোগ্য লাভের জন্যে দোয়া করা এবংসম্ভব হলে তাদের শুশ্রষা করা।আমরা আমাদের সাধ্যানু যায়ী আর্থিক সহযো গিতা প্রদানের মাধ্যমে এদের সাথে আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতে পারি এবং আল্লাহ যেন তাদেরকে বিপদ থেকে উদ্ধার করেন সে দোয়াও করতে পারি।প্রতি ঈদেই সবাই সাধ্যানুযায়ী নতুন নতুন মডেলের সুন্দর সুন্দর পোষাক ক্রয় করে থাকে।আমরা কি কখনো ভাবি সে-সব ভাই-বোনদের কথা দারিদ্রের কষাঘাতে যাদের জীবন জর্জরি ত।নতুন পোষাক কেনা দূরে থাক,পুরানো কোন ভাল পোষাকই তাদের নেই।বরংপ্রতিদিনের অন্নের প্রয়োজনীয় যোগানও তাদের নেই। আমরা যারা স্বচছল তারা কি সামান্যতম হাসিও এদের মুখে ফোটাতে পরি না? ঈদুল ফিতর এসব প্রশ্নের সুন্দর জবাব খুঁজে পেতে আমাদেরকে অনুপ্রাণিত করে।এবারের ঈদুল ফিতরকে তেমনই অর্থবহ ও তাৎপর্যপূর্ণ করার পাশাপাশি আমাদের উচিত হবে ঈদের সাথে সংশ্লিষ্ট শরয়ী বিধান মেনে চলা ও শিষ্টা চারিতা রক্ষা করা।

আমরা গানে কিংবা কবিতার ছন্দে কবিদের ভাষায় যদি ঈদকে উদযাপন করতে চাই,তা আরও বেশি আনন্দের।যেমন:-গরীব-দুঃখি ও অসহায়দের মনের আকুতি প্রকাশ পেয়েছে এভাবে:-ঈদ মোবারক-সালাম বন্ধু,-আজি এই খোশ রোজে-দাওয়াত কবুল কর মানুষের বেদ নার মহাভোজে।কহিব কি আর-চির-মানুষের ওগো বেদনার সাথী-ঈদের এ দিন শেষ হয়ে আসে-সমুখে ঘনায় রাতি।আবার ঈদ উপলক্ষে দোয়া চেয়ে পিতার কাছে লেখা একটি চিঠি এমন:-ঈদের সালাম নিও-দোয়া করো আগামী বছর-কাটিয়ে উঠতে পারি যেন-এই তিক্ত বছরের সমস্ত ব্যর্থতা।অন্তত ঈদের দিন সাদাসিধে লুঙ্গি একখানি-একটি পাঞ্জাবী আর সাদা গোলটুপি তোমাকে পাঠাতে যেন পারি-আর দিতে পারি পাঁচটি নগদ টাকা।আবার ঈদের চাঁদের হাসিতে দেখতে পাই নতুন দিনের বারতা এমন:-এসেছে নূতন দিন-আলো শতদল পাপড়ি মেলেছে-কুয়াশা হয়েছে ক্ষীণ।জরির জোব্বা-শেরোয়ানী আর আমামা র সজ্জায়-আতরের পানি,মেশেকর রেণু খোশবু বিলায়ে যায়।বাতাসে বাতাসে কলরোলআজি- ভেঙেছে তন্দ্রা ঘোর-সাহেবজাদীর নেকাব টুটেছে-রাত্রি হয়েছে ভোর।এসেছে নূতন দিন।”অন্যদিকে সমাজে ঈদের খুশীর প্রভাব প্রকাশ পেয়েছে এভাবে:-ঈদ আসে হাসিখুশী তোমাদে র আমাদের সকলের ঘরে-অনেক আনন্দ নিয়ে কিছুক্ষণ ভুলে যাই দুঃখ জ্বালা যত।আজ শুধু মেলামেশা অন্তরঙ্গ হয়ে থাকা অবিরত।আল্লাহর প্রশংসায় গান-তাঁর দয়া দাক্ষিণ্যের অমৃত ঝরে।আবার শিশুদের গানে গানে ঈদের আনন্দ এমন:-আজ আনন্দ প্রতি প্রাণে প্রাণে-দুলছে খুশীর নদী প্লাবনে।ঘরে ঘরে জনে জনে-আজি মুখর হব মোরা গানে গানে।ঈদ মোবারক-ঈদ মোবারক আজ-বল ঈদ মোবারক আজ।হতে পারে এটাই আমার,আপনার এবংআমাদের শেষ রামজান।একটি মাস ধরে আমরা যারা নিজেদেরকে এভাবে প্রস্তুত করেছি,মাসটি অতিবাহিত হওয়ার সাথে সাথে যদি তা ভুলে যাই এবং আল্লাহর ইবাদাত ও আনুগত্য থেকে দুরে সরে যাই,তাহলে তা কুতটুকু যুক্তিযুক্ত তা আপনাদের বিবেচনায় রেখে বিদায় চাইছি আমি।ঈদ মোবারক”।

                                       রায়হান আহমেদ তপাদার

                                       raihan567@yahoo.com

চাঁদ দেখাতেই বন্দী যাদের ঈদের খুশি…

কুহেলির অন্ধকার হঁটিয়ে হাসি-আনন্দের পয়গাম নিয়ে ঈদের চাঁদ উঠি উঠি করছে । শাওয়ালের একফালি বাঁকা চাঁদ ধরাবাসীর জন্য পূর্ণত্তোম আনন্দের বার্তা নিয়ে আগমনের প্রতীক্ষায় । সাম্যের কবি কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায়, ‘শত যোজনের কত মরুভূমি পারায়ে গো/কত বালুচরে কত আঁখি-ধরা ঝড়ায়ে গো/বরষের পরে আসিল ঈদ !’ ঈদের আগমন ঘটবে অথচ আমাদের নতুন পোশাক হবেনা-এটা যেন মানার নয় । তাইতো ঈদকে সামনে রেখে দেশব্যাপী কেশাগ্র থেকে নখাগ্র অর্থ্যাৎ শরীরের প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের জন্য নতুন কিছু কেনার আয়োজন চলছে । শহর-বন্দরের সর্বত্রজুড়ে লেগেছে কেনাকাটার ধুম । নতুন জামা, নতুন শাড়ী-সবকিছুতেই কেবল নতুনের সমারোহ । ঈদের আনন্দকে পূর্ণতা দিতে এ যেন এক বাউলা সমীরণ; চারদিকে কেবল নতুনের জয়গান । ওয়ারড্রব, আলমিরা ভর্তি ডজন ডজন নতুন পোশাক, যার অধিকাংশের ভাগ্যে এখনো ত্বকের স্পর্শ জোটেনি, তারপরেও ঈদ উপলক্ষে আরও নতুন কিছু কেনা-পাওয়ার অবিরাম চেষ্টা ।

ঈদকে সামনে রেখে ব্যবসায়ীরাও নতুন করে সব কিছুর পসরা সাজিয়েছে । কৃত্রিম আলোর ঝলকানিতে চিরচেনা শহরগুলো যেন নতুন খোলস জড়িয়েছে । সেমাই প্রস্তুতালয়গুলোতে শ্রমিকদের মুহূর্তুকাল বিশ্রাম নাই । ঈদ আগমনের আগেই চারদিকে শুধু ঈদ ঈদ রব । গ্রামের কিংবা শহরের বর্ণিল জীবন থেকে অনেকটা দূরে অবস্থানরত লোকজন শহরের পানে ছুটছে নতুন কিছু কেনার আশায় । সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর শহর-নগরের অভিজাত শপিংমলগুলোতে প্রবেশাধিকার হয়তো সামর্থের বাইরে কিন্তু ফুটপাতের সস্তা দরের দোকানগুলো তাদের আহ্লাদকেও পূর্ণতা দিচ্ছে । এই সবকিছু মিলেই ঈদের আনন্দ, ঈদের পূর্ণতা । তারপরেও প্রশ্ন অবশিষ্ট থেকে যায়, সামাজিক জীব হিসেবে মানুষে মানুষের ভেদাভেদ ঘুঁচিয়ে, বৈষম্যবাদীদের সৃষ্ট জঞ্জাল সরিয়ে আমরা কি সবার  জন্য সাম্যের মন্ত্রে, মানবতার দীক্ষায় পরিপূর্ণ আনন্দ উপভোগ করার উপলক্ষ সম্পূর্ণভাবে সৃষ্টি করতে পেরেছি ? দূর করতে পেরেছি, আশরাফ-আতরাফের দ্বন্দ্ব ? কেবল মানুষ পরিচয়ে আমীর-ফকিরকে কি মানবতার মঞ্চে পাশাপাশি দাঁড় করাতে পেরেছি ?

সমাজবিজ্ঞানীদের বিভাজিত উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত এবং তুলনামূলক নিম্নবিত্ত সাথে আমাদের সমাজে আরও এক শ্রেণীর মানুষ বাস করে, যাদের অবস্থান চরম দারিদ্র্যসীমারও কয়েক ধাপ নিচে ! হতদরিদ্র বলতে যা বুঝায় এরা বোধহয় তাই । এদের ভাগ্যই সর্বদা নুন আনতে পান্তা ফুরানোর খেলায় মত্ত । আমাদের চারপাশে এদের সংখ্যা নেহায়েত কম নয় । এদের চোখসীমার আকাশেও প্রতিবছর ঈদের চাঁদের উদয় ঘটে কিন্তু মনে খুশির রঙ ধরা দেয় না । শুধু ঈদের চাঁদ দর্শনেই বন্দী থাকে তাদের খুশির রঙ । সে রঙ বিবর্ণ-ফ্যাকাশেও বটে । ঈদের আনন্দে শামিল হতে নতুন পোশাক অঙ্গে চাপানো তো দূরের কথা, বরং এদের সামর্থ্য বারবার জানিয়ে দেয় নতুন পোশাকের কল্পনাও তাদের জন্য পাপ ! ঈদের সকালে একটু মিষ্টান্নের সংস্থান করতেই এরা হাঁপিয়ে ওঠে কিংবা কারো অনুগ্রহ লাভের আশায় তাকিয়ে থাকে ।

সংখ্যায় ১৬ কোটির অধিক মানুষের আবাসের এদেশে চরম দারিদ্র্যপীড়িত কিংবা প্রকৃতির আঘাতে বিধ্বস্ত জনগোষ্ঠীর মুখে হাসি ফোটানো খুব বেশি কঠিন কোন কাজ নয় । শুধু সবার প্রতি সবার ভ্রাতৃপ্রতীম মানসিকতার পরিচয় দিয়ে একটুখানি সহমর্মিতার আদর্শে, কিছুটা ত্যাগের মানসিকতায় আমরাই ছিন্নমূল শিশু, বস্তির অসহায় বৃদ্ধ এবং চরম দারিদ্র্যপীড়িত এলাকায় অবস্থানরত মানুষের মনে উৎসবের রঙ ছড়াতে পারি । এজন্য এককভাবে বড় অঙ্কের সাহায্যেরও প্রয়োজন পড়ে না বরং শধু ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সামর্থ্যের সম্মিলিত অংশগ্রহন এবং সেবাধর্মী মানসিকতাই যথেষ্ট । ধর্ম এবং মানবতা আমাদের নিয়ত সেই শিক্ষাই দেয়, যা মানুষের মধ্যকার বৈষম্য ঘুচিয়ে সবাইকে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার মহিমান্বিত সুযোগ তৈরি করে দেয় ।

সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব এবং ভাগ্যবান সম্পদশালী হিসেবে এমন মহৎ কাজে অংশগ্রহনের সুযোগ থেকে নিজেদেরকে বঞ্চিত করার মানসিকতা কেবল ক্ষুদ্ররাই দেখাতে পারে । সুতরাং আমরা প্রত্যেকেই যদি স্বসাধ্য অনুযায়ী সম্মিলিত কিংবা একক প্রচেষ্টায় কোন এক কিংবা একাধিক অসহায়ের মুখে হাসি ফুটিয়ে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে পারি তবে তারচেয়ে মহোত্তম কর্ম আর কি হতে পারে ? বাঁচতে যদি হয় তবে সাম্যের স্লোগান তুলে প্রকৃত মানুষ পরিচয়েই বাঁচি । যে সম্পদে গরীবের নৈতিক অধিকার রয়েছে সে সম্পদ অমানবিকভাবে কুক্ষিগত করে রাখলে তাতে মুক্তি মিলবে কি  ?

আমাদের এবং আমাদের সন্তানদের ঈদ উপলক্ষে নানাদিকের সম্পর্ক থেকে হালি হালি দামি দামি নতুন কাপড় জুটবে । অথচ এই দেশে হাজারাও মানুষ অবশিষ্ট থাকবে যাদের সন্তানদের কয়েক বছরের পুরাতন ছেঁড়া কাপড় কিংবা উধোল শরীরে ঈদের দিনকে বরণ করতে হবে । তাদের জন্য আমাদের কি একটু মানবিক হওয়া উচিত নয় ? সাহায্যের হাত সম্প্রসারিত করে যদি গৃহভৃত্য থেকে শুরু করে অন্নহীনে অন্ন এবং পোশাকহীনে একটু নতুন পোশাক কিংবা আমাদের সন্তানদের ব্যবহৃত পোশাক থেকে দু’একটি দান করতে পারি তবে জান্নাতের আবহ কি ধূলা-মাটির ধরাতে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয় ? আসুন বিবেকের কাছে প্রশ্ন রাখি, আমাদের করণীয় কি  ?

রাজু আহমেদ । কলামিষ্ট ।

fb.com/rajucolumnist/

জঙ্গিবাদের পেছনে রাজনৈতিক স্বার্থ জড়িত


মোঃ সজিব খান: আমরা বাঙালীরা শান্তিপ্রিয় জাতি হিসেবে পরিচিত। দাঙ্গা-হাঙ্গামা অশান্তি এইসব আমাদের একদমই পছন্দ নয়। এছাড়া এদেশের ৯২ শতাংশ মানুষ শান্তির ধর্ম ইসলামের অনুসারী হওয়ায় সর্বোত্ত শান্তি বিরাজ করছে। তার উপর বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার পর এদেশে গতিশীল উন্নয়নের ছোঁয়া লেগেছে। দরিদ্রের হার কমেছে, মাথাপিছু আয় বাড়ছে। যোগাযোগ ব্যবস্থা, শিক্ষাব্যবস্থাসহ সকল ক্ষেত্রে উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে কাজ চলছে। শেখ হাসিনার হাত ধরে এই দেশ যখন দিনকে দিন উন্নয়নের দিকে এগিয়ে চলেছে, যখন এ দেশে রাজাকারদের বিচার হচ্ছে, বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিচার হচ্ছে। ঠিক তখনি একটি কুচক্রি মহল নিজেদের ব্যক্তি স্বার্থ, সমষ্টিগত বা দলীয় স্বার্থে এ দেশে জঙ্গি হামলা, গুম, খুন, বোমা হামলা, ইত্যাদি সন্ত্রাসীমূলক কার্যক্রম চালিয়ে দেশের শান্তি বিনষ্ট করে চলেছে। মূলত দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডকে বাধাগ্রস্ত করা সহ বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল ও ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করাই বর্তমানে এদের মূল উদ্দেশ্য। এ দেশের মানুষ কখনই জঙ্গিবাদে সমর্থন করেনা।
গত কয়েকদিনের পত্রিকার পাতা উল্টালে বুঝা যায় আমাদের দেশ এবং দেশের মানুষ কতটা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। সাধারণ মানুষ অনেকটা শঙ্কার মধ্যে জীবন যাপন করছেন। কখন কোথায় বোমা ফাটে, কোথায় জঙ্গি হামলা হয় তার কোন ঠিক ঠিকানা নেই। এই তো কয়েকদিন আগে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ থেকে প্রথমে এলএমজি পিস্তল উদ্ধার করা হল এবং তার পরপরই উপজেলার পূর্বাচল উপশহর থেকে উদ্ধার করা হল বিপুল পরিমাণ অস্ত্র, গোলা বারুধ সহ গ্রেনেড ও রকেট লঞ্চার। পুলিশের মহাপরিদর্শক শহীদুল হক বলেছিলেন; হয়তো বড় ধরণের কোন নাশকতা চালানোর উদ্দেশ্য নিয়ে অস্ত্রগুলো সংগ্রহ করা হয়েছিল। তবে সেই নাশকতা যে কি ধরনের আর কখন কোথায় ঘটানোর উদ্দেশ্য ছিল সে সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট কোন তথ্য এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। হয়তো কিছুদিন পর এ ব্যপারে আমরা জানতে পারবো।
কয়দিন পর পরই দেশের বিভিন্ন জায়গায় জঙ্গি আস্তানার সন্ধান মিলছে সেই সাথে উদ্ধার হচ্ছে অস্ত্র, গোলা বারুধসহ বোমা, জিহাদি বই পুস্তক ইত্যাদি। জঙ্গিরা মূলত কি চায়, কোন উদ্দেশ্যে তারা নাশকতা ঘটাচ্ছেন সে সম্পর্কেও সুনির্দিষ্ট কিছু জানা যাচ্ছে না। পত্র পত্রিকায় শুধু দেখতে পাচ্ছি জঙ্গি হামলার ঘটনা এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে নাশকতার সাথে জামায়াত শিবির এবং নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জামাতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ (জেএমবি)এর সম্পৃক্ততা পাওয়া যাচ্ছে। তবে এইসব হামলার নেপথ্যে মূলত কারা রয়েছে, কারা জঙ্গিদের মদদ দাতা, অর্থের যোগান দাতা, তাদের মূল উদ্দেশ্যই বা কি? এসবকিছুই যেন ধোঁয়াশাই রয়ে যাচ্ছে। তবে একটু সময় সাপেক্ষ হলেও এইসব জঙ্গি হামলার নেপথ্যে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মুখোশ জনসম্মুখে উন্মুক্ত করা উচিত বলে মনে করছি।
গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলার মধ্যদিয়ে বাংলাদেশে ইসলামি জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেট (আইএস) এর অস্তিত্বের প্রমাণ পাওয়া যায়। যদিও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান তখন বিবৃতি দিয়েছিলেন; “গুলশানে হামলায় আইএস জড়িত নয়, দেশে আইএস-এর কোনো অস্তিত্ব নেই”। কিন্তু পরে দেখা যায় গুলশান হামলার সাথে জড়িত জঙ্গিদের প্রত্যেকেই বাংলাদেশী হলেও তারা সকলেই আইএস এর সদস্য ছিলেন।
জঙ্গিবাদের একাধিক ঘটনায় দেশ আক্রান্ত, দেশের মানুষ আক্রান্ত। সবচেয়ে শুনে কষ্ট লাগে যখন জানতে পারি জঙ্গিরা ইসলাম ধর্মের অনুসারী। কিন্তু ইসলাম তো কখনই জঙ্গিবাদে সমর্থন করেনা। মানুষ হত্যা, হামলা, বোমাবাজি এইসব করে জঙ্গিরা কি ধরনের ইসলামিক শাসন প্রতিষ্ঠা করতে চাচ্ছে আমার জানা নেই। কতটা নিচে নামতে পারলে জঙ্গিরা জান্নাত-আখিরাতের পাসপোর্ট বানাচ্ছে, আল্লাহর নাম নিয়ে মানুষ খুন করছে, বিভিন্নরকম জঙ্গিবাদে উৎসাহি জিহাদি বই লিখছে। সত্যিই কি এরা মুসলিম? এরা মূলত ইসলাম ধর্মকে ব্যবহার করছে। ইসলাম শান্তির ধর্ম, ইসলাম মানুষকে নর্মও বিনয়ী হওয়ার শিক্ষা দেয়। নাশকতা মূলক কর্মকাণ্ড করে জঙ্গিরা কিভাবে নিজেদের মুসলিম বলে দাবি করে?
পরিশেষে বলতে চাই বড় ধরনের রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের জন্য দেশে দিনের পরদিন নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড ঘটে চলেছে। সেই সাথে ইসলাম ধর্মকে অপব্যবহার করা হচ্ছে। এই অবস্থায় আমাদের দেশকে উন্নতির দিকে এগিয়ে নিতে হলে, দেশের শান্তি ফিরিয়ে আনতে হলে সুশাসনের মাধ্যমে ন্যায়বিচার ভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। সেইসাথে সঠিকভাবে গণতন্ত্রের চর্চা করতে হবে। জঙ্গিদের পুরোপুরিভাবে নির্মূল করতে হলে জনগণকে সাথে নিয়ে এদের বিরদ্ধে কাজ করতে হবে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে দেশে কোন ধরনের নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড ঘটার পূর্বেই নিজে থেকে উদ্যোগ নিয়ে তা অঙ্কুরেই ধ্বংস করার মতো সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। এছাড়া আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে যে সমন্বয়হীনতার সমস্যাগুলো রয়েছে তা রোধ করতে হবে।
জনসচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। জঙ্গিরা কোন ভিন গ্রহের প্রাণী নয়, তারাও আমাদের মত মানুষ। তাদেরও আমাদের মত বাবা-মা পরিবার পরিজন রয়েছে। যেকোনোভাবে তারা ভুল শিক্ষা পেয়ে বা সঙ্গ পেয়ে জঙ্গি সংশ্লিষ্টতায় চলে গেছে। আমাদের উচিৎ আমাদের সন্তানদেরকে সঠিক শিক্ষায় শিক্ষিত করা, তাদের কে সবসময় নজরদারিতে রাখা। যাতে করে সন্তানরা ভুল পথে চলে না যায়, ভুল শিক্ষা না পায়, সেইদিকে খেয়াল রাখা। এছাড়া ইসলামকে সঠিকভাবে তাদেরকে জানানো। তা নাহলে হয়তো আপনার-আপনার সন্তানটিও একদিন জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়বে।

তারা করে পলিটিকস…আমরা হই পণ্য !

সারা দেশজুড়ে রাজনীতির হাট সরাগরম হয়েছে । বিক্রেতা মাত্র জনাকয়েক আর পণ্য দেশের কোটি কোটি মানুষ ! নির্বাচনের সময় ঘণাচ্ছে বলে পণ্যের দামেও কিছুটা উঠতি ভাব । ক্ষমতা ও ক্ষমতার বাইরের ক্ষমতাবনরা এবার নির্বাচনী পণ্যকে ঝেড়ে-ফুঁকে উজ্জ্বলতা দেয়ার চেষ্টা করেছে । যদিও বারবার বলা হয়, জনগণের মদদ নিয়েই একেকদল ক্ষমতায় আসা-যাওয়া করে কিন্তু এর ভেতরে-বাইরে যে রঙ্গরসের চতুর্মূখী খেলা চলে তা পণ্যেরা বোঝে বটে কিন্তু আহা-উঁহু করার শক্তি ও স্বাধীনতা বেশ পূর্বেই খুইয়ে এখন তারা সতীত্ব হারানো সাধুর ভূমিকায় । কি আওয়ামীলীগ, কি বিএনপি কিংবা কি অন্যান্য-যারা যখন কোনভাবে ক্ষমতায় গিয়েছে তখন ক্ষমতার সবটুকু তারা মালিকানা ভেবে দখলে নিয়ে সাম্রাজ্য সাজাতে কৌশল-অপকৌশলের সবটুকু বিনিয়োগ করেছে । সাধারণ জনগণের মতামতের যে একটু ভূমিকা আছে তা বেমালুম ভুলে যাওয়া হয় । জনগণের মত তখন অবিক্রীত পণ্যের থেকে বেশি উপেক্ষিত-লাঞ্ছিত হয় ।

অতিসম্প্রতি বৃটেনে অনুষ্ঠিত হলো সাধারণ নির্বাচন । সেখানে প্রধান দু’দলের মধ্যে শুধু ভোটের লড়াই নয় বরং কথার লড়াই হয়েছে তুমুল, জমেছেও বটে । তবে কেউ শালীনতার সীমা ত্যাগ করেনি একটুকুনও ।  তাদের ভাবখানা খেলোয়ারসূলভ ছিল । খেলার মধ্যে যত দ্বন্দ্ব-প্রতিযোগীতাই হোক জয়-পরাজয় নির্ধারিত হওয়ার পর পরাজিত দল যেমন জয়ী দলকে অভিনন্দন জানায় তেমন জয়ী দলও পরাজিত দলকে বুকে টেনে নেয়, জয়ী হতে প্রেরণা দেয়া । বৃটেনের রাজনীতির যুদ্ধেও তেমনি খেলোয়ারসূলভ মনোভাব বিরাজিত । বৃটেনের সামগ্রিক স্বার্থ রক্ষায় জয়ী কনজারভেটিভের চেয়ে পরাজিত লেবারের ভূমিকা কোনভাবেই কম নয় । এছাড়াও ৬৫০ আসনের বিশাল নির্বাচনে পরাজিত দলগুলোর কোন সদস্যই একটুখানি ভোট কারচুপির অভিযোগ আনেনি কিংবা কোথাও নির্বাচনী আচরণ বিধি লঙ্গিত হয়েছে এমন সংবাদও গনমাধ্যম দিতে পারেনি ।

অথচ আমাদের প্রিয় স্বদেশ ? এখানে সামান্য চৌকিদারীর নির্বাচন হলেও সরকার ও বিরোধীদলের কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে হস্তক্ষেপ আসে । সর্বশেষ কবে সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ ও স্বচ্ছ নির্বাচন হয়েছিল তার খোঁজ পেতে এ প্রজন্মকে ইতিহাসের পাতা হাতরাতে হবে । রাজনীতি যদি কেবল জনসেবা ও দেশসেবার উদ্দেশ্যে হতো তবে এমন নীতি অসংলঙ্গ আচরণের সাক্ষী হওয়ার মত দুর্ভাগ্য এ জাতিকে বরণ করতে হতনা । এ ভূমিতে রাজনীতি এখন ব্যবসায়ের সর্বোচ্চ স্থান নিয়েছে । রাজনীতির হর্তাকর্তাদের বেশিরভাগ নামে-বেনামে ব্যবসায়ের হাট খুলেছে । তাদের কাছে চাকরি পাওয়া যায়, পয়সা-কড়ি মেলে । জনগণকে তারা বেশ ভালোভাবেই পণ্যের ভূমিকায় ব্যবহার করতে সক্ষম হয়েছে । নির্বাচনে যদি রাষ্ট্রের নাগরিকদের মতামত দেয়ার স্বচ্ছ ভূমিকা না থাকে তবে সে রাষ্ট্রের নাগরিকদের পণ্য হিসেবে ব্যবহৃত হওয়া ছাড়া আর কি ভূমিকা থাকতে পারে ? গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় যদি জনমতের বাস্তব প্রয়োগ-প্রতিফলন না ঘটে তবে গণতান্ত্রিক মুখোশ পড়ে লাভ কি ? গণতন্ত্রের বাইরেও তো ক্ষমতায় থাকার আরও বহু পথ-পদ্ধতি আছে ।

নির্বাচন ! এটার আয়োজন বোধহয় না করলেই ভালো !!  স্বার্বিক স্বচ্ছতা যদি নিশ্চিত করা না যায় তবে অহেতুক রাষ্ট্রাভ্যন্তরে পারস্পারিক শত্রুতা-বিদ্বেষ উসকে দিয়ে এবং দশ কোটির অধিক ভোটারের নাগরিক অধিকার নিয়ে খেলার আয়োজন করে লাভ কি ? ভারতের মত একটি বিশাল আয়তন ও জনসংখ্যার দেশে কয়েক ধাপে লোকসভা ও বিধানসভার নির্বাচন অনুষ্ঠান আয়োজনে একজন মানুষ নিহত তো দূরের কথা হতাহত হওয়ার খবর পর্যন্ত পাওয়া যায়না অথচ আমাদের দেশে ? সাধারণ  একটি ইউনিয়ন পরিষদ কিংবা উপজেলার নির্বাচনে হালি হালি লোক নিহত হয় । এটাই কি রাজনীতির শিক্ষা ?

….

ইতিহাসের জঘন্যতম নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো আমেরিকায় । অনাকাঙ্খিতভাবে প্রেসিডিন্টে হলেন ট্রাম্প । অথচ নির্বাচনকালীন সময়ে ট্রাম্প তার প্রতিপক্ষ প্রার্থীর সম্পর্কে যাসব বলেছে তার সাথে বর্তমান ট্রাম্পের কোন মিল কি কেউ খুঁজে পেতে পারবে ? নির্বাচিত হওয়ার পর ট্রাম্প অসম্মানের সাথে হিলারির নাম পর্যন্ত উচ্চারণ করেনি । অথচ আমাদের দেশে রাজনৈতিক অঙ্গনের সর্বোচ্চ মহলের ক্ষমতাধরেরা পরস্পরকে যেভাবে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমন করেন, কটূক্তি করেন তা দেশে এবং দেশের বাইরে নজীরবিহিনী । ভাগ্যসহায় কেননা বাংলাদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গছাড়া বিদেশীদের কেউ বাংলা তেমন বোঝেনা নয়ত রাজনৈতিক অঙ্গনের তুখোড় নেতাদের এমন বাক্যচয়ন শুনে তারা লজ্জিত হতেন । কেননা রাজনীতির ইথিকসের কোন ধারাতেই বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতাদের আগ্রাসী প্রকাশকে মেলানো যায়না ।

বিশ্বের তাবৎ জাতি উচ্চারণ ও আচারণে যখন আলোর পথের যাত্রী তখন বোধহয় কেবল আমরাই কিছুটা অন্ধকারে হাঁটছি । আমাদের গর্বিত তিন মেয়ে বৃটেনের কমন্সসভার সদস্য নির্বাচিত হয়েছে । তাদের রাজনৈতিক ইমেজের সাথে আমাদের দেশের রাজনৈতিক কিছু নেতা-কর্তার ভাব মেলাতে গেলে লজ্জিত হতে হয় । এ মাটির সন্তান হয়ে তারা বৃটেনে স্বচ্ছভাবে নির্বাচিত হতে পারলে এখানে মানুষগুলো কেন স্বচ্ছভাবে নির্বাচিত হয়ে জনগণের প্রতিনিধিত্ব করার সাহস পোষণ করেন না ? অনৈতিকতা ও অস্পষ্টতা ছাড়া কোন কিছু অর্জন করতেই বোধহয় আমরা দিনে দিনে ভুলে যাচ্ছি । ক্রমশ অসহিষ্ণুতার যে স্ফূলিঙ্গ আমাদের থেকে বহিমূর্খী হচ্ছে তা মোটেও আশার প্রদীপ দেখায় না । কোন সন্দেহ নাই, অর্থে-উন্নয়নে আমরা খানিকটা উন্নত হয়েছি কিন্তু নৈতিকতার মানদন্ডে, অন্যের অধিকার নিশ্চিত করতে, নিরপেক্ষ ভূমিকা পালনে, দেশের কল্যান-মঙ্গল অটুট রাখতে এবং সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমরা কি দল-মতের উর্ধ্বে সত্য গ্রহনকে প্রাধাণ্য দিতে পেরেছি ? নিকট অতীতের ২০১৪ পারিনি, আসছে আগামীর ২০১৮ এর শেষে পারবো কি ?

রাজু আহমেদ । কলামিষ্ট ।

fb.com/rajucolumnist

বন্ধ হোক নকল ও ভেজাল ওষুধের

 দৌরাত্ম্যরায়হান আহমেদ তপাদার   দেশে ঔষধ সম্পর্কে যে কিছু করা আবশ্যক এই উদ্বেগ স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় মুদ্রিত হয় এ ভাবে-‘অনেক তথাকথিত ঔষধ নির্মাতারা আসলে এ দেশে কাঁচামাল আমদানী করে বোতলজাত করে মাত্র এবং তারা বিদেশী কোম্পানীর মূলতঃ এজেন্ট। ঔষধের মান নিয়ন্ত্রণ দুর্বল এবং নকল ঔষধের ছড়াছড়ি।তাই প্রয়োজন জীবনরক্ষাকারী ঔষধের, পর্যাপ্ত প্রয়োজনীয় ঔষধের, ঔষধ-নিয়ন্ত্রণ আইনের পর্যালোচনা এবং সংশোধনের।স্বাধীনতার পর পর প্রধানত বৈদেশিক মুদ্রার অভাবের কারণে টিসিবি-এর মাধ্যমে সরাসরি ইউরোপিয়ান সোস্যালিস্ট দেশগুলি হতে বিনিময় ভিত্তিতে সস্তায় জেনেরিক নামে ঔষধ কেনা হত।কিন্তু তখনই এ সমস্ত ব্যাপারে বিদেশী ঔষধ কোম্পানীগুলি এবং ঔষধ আমদানীকারকরা তাদের ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার কারণে ক্ষুব্ধ হতে থাকে। তারা বিভিন্ন গুজব, বিশেষ করে সস্তায় নিম্নমানের ঔষধ আমদানী করা হচ্ছে ইত্যাদি প্রচার করতে থাকে। সে সময় দেশী-বিদেশী চাপের মুখে সরকার ঔষধ সম্পর্কে বেশী কিছু করার আর সুযোগ পায় নি।এরপর ১৯৭৭/৭৮-এর দিকে ১৯৪০ সালের ঔষধ আইন পর্যালোচনা ও প্রয়োজনীয় সংশোধনের চেষ্টা করা হয় যাতে করে প্রয়োজনীয় ঔষধ তৈরী, ঔষধ কোম্পানীর স্বেচ্ছাচারিতা, ইত্যাদি বিষয়ে কঠোর আইন প্রণয়ন করা যায়। কিন্তু বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প সমিতি, বিদেশী ও স্থানীয় বড় বড় ঔষধ কোম্পানী যার সদস্য,সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং তারা যে শুধুমাত্র ঔষধ-আইন পরিবর্তন রোধে সক্ষম হয় তাই নয় বরঞ্চ তখনকার যিনি স্বাস্থ্যমন্ত্রী এবং এ ব্যাপারে যিনি সক্রিয় ও উদ্যোগী ছিলেন তাঁকে মন্ত্রিত্ব হতে অপসারণ করতেও সফল হয়।ঠিক এই সময়কালে বহির্বিশ্বে জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট শাখাগুলির মাধ্যমে ঔষধনীতির সহায়ক কিছু কিছু পদক্ষেপ গৃহীত হয় যা উন্নয়নশীল দেশগুলির আগ্রহ বৃদ্ধি করতে সক্ষম হয়।এ ছিল শক্তিশালী বিরোধিতার মুখে উত্তম কিছু পদক্ষেপের স্বাক্ষর।বাংলাদেশের মতো একটি জনবহুল দেশে জনস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা স্বাভাবিকভাবেই বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ। এটা ঠিক যে, জনস্বাস্থ্যের বিষয়টি আমলে নিয়ে সরকার নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করছে।   কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, যে ওষুধ মানুষের জীবন বাঁচায়, যে ওষুধের মাধ্যমে আরোগ্য লাভ হয়, সেই ওষুধই যখন ভেজাল বা নকল হয়ে আসে; তখন এ ধরনের পরিস্থিতি নিশ্চিতভাবেই ভয়ানক বাস্তবতাকে নির্দেশ করে। দেশে নকল ও ভেজাল ওষুধ তৈরির বিষয়টি বারবার আলোচনায় আসে। সরকারের বিশেষ অভিযানে নকল ওষুধ তৈরির কারখানার সন্ধান মিললে মিডিয়ায় তা ফলাও করে প্রকাশ করা হয়। সরকারের ওষুধ প্রশাসন নড়েচড়ে বসে। তবে কিছুদিন পর সবকিছু আগের মতো। ফার্মেসিগুলোয় নকল ওষুধ বিক্রি শুরু হয়।ওষুধ ভেজাল হচ্ছে দীর্ঘদিন ধরে। এই ভেজাল ওষুধ সেবন করে মানুষ আরো বেশি করে রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। এমনকি অনেকে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে। দেশে এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী আছে যারা ভেজাল ওষুধ তৈরি করে বাজারে ছাড়ছে। ভালো কোম্পানির যেসব ওষুধ বাজারে চালু সেসব ওষুধেই বেশি ভেজাল হচ্ছে। ভেজাল ওষুধ প্রস্তুতকারীরা নামিদামি কোম্পানির ওষুধের লেবেল নকল করে ওই কোম্পানির নামেই ভেজাল ওষুধ বাজারজাত করছে। ক্রেতা সাধারণ বুঝতেই পারছে না নামিদামি কোম্পানির যে ওষুধ তারা কিনছে তা নকল। ভেজালকারীরা অনেক সময় পাইকারি ওষুধ বিক্রেতাদের মাধ্যমে তাদের নকল ও ভেজাল ওষুধ ফার্মেসিগুলোতে সরবরাহ করছে। ওষুধ সরবরাহকারীরা অনেক সময় মেয়াদ শেষ হওয়া ওষুধের লেবেল পরিবর্তন করে মেয়াদ বাড়িয়ে সেগুলোও বিক্রি করছে। এছাড়া ওষুধের দোকানগুলো নিম্নমানের চোরাইকৃত ও অরেজিস্ট্রিকৃত ওষুধ দেদারসে বিক্রি করছে। দেশের সবচেয়ে বড় ওষুধের বাজার হলো রাজধানীর মিটফোর্ড। এখানেই ভেজাল ও নকল ওষুধের ব্যবসা জমজমাট। বেশ কিছু দিন আগে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও ওষুধ প্রশাসন অধিদফতর দেশের বিভিন্ন ওষুধের দোকানে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে অভিযান চালিয়ে ১৭ কোটি টাকার ভেজাল ও অরেজিস্ট্রিকৃত ওষুধ আটক করেছিল।   ভেজাল ওষুধ বিক্রির অভিযোগে ৬১ জন ওষুধ ব্যবসায়ী ও কর্মচারীকে গ্রেফতার করে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদ-ও দিয়েছেন আদালত। আর এসব ঘটনায় মামলা হয়েছে ২ হাজার ২৯৭টি। এরপরও থেমে থাকেনি নকল, ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধের দৌরাত্ম্য।মিথ্যা কারণ দেখিয়ে ঔষধের মূল্য নির্ধারণ, একই ঔষধ এক দেশে নির্মাতারা ব্যবহার উপযোগী নয় বলে নিষিদ্ধ করছে এবং অন্যদেশে তা চালু করছে, একই ঔষধের মূল্য পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে অযৌক্তিকভাবে কম বেশী করা হচ্ছে, গবেষণা ব্যয় বেশী দেখানো হচ্ছে, লাভের অংকে আয়কর ফাঁকি দেওয়ার জন্য অসম্ভব রকম কম দেখানো হচ্ছে, অপ্রয়োজনীয় ক্ষতিকারক ঔষধ প্রচলন করা হচ্ছে ইত্যাদি নানাবিধ কারণে বিভিন্ন দেশে এই সমস্ত অনিয়ম দূর করার জন্য ঔষধনীতি প্রচলনের প্রচেষ্টা নেয়া হয়েছে। কিন্তু যখনই ঔষধনীতি প্রচলন করার চেষ্টা করা হয়েছে তখনই ঔষধ শিল্পের মালিকরা এবং সেইসঙ্গে কিছুসংখ্যক চিকিৎসকরাও এর বিরুদ্ধাচরণ করে এসেছেন। তাঁদের সেই প্রতিরোধ, প্রচার ও প্রভাব এতই শক্তিশালী ছিল যে অনেক দেশেরই উদ্যোগী সরকার ঔষধনীতি প্রয়োগ করা হতে বিরত থাকতে বাধ্য হয়েছেন। আমরা নিজেদের ও পার্শ্ববর্তী কয়েকটি দেশ সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোচনায় কিছু ঘটনা তুলে ধরতে চাই যা জানলে বুঝতে অসুবিধা হবে না যে ঔষধনীতি প্রচলন করাটা অনন্ত সংগ্রামেরই অপর নাম।ওষুধ নিয়ে বিভিন্ন সময়েই অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। ফলে ওষুধ খাতে কেউ যেন কোনো প্রকার অসাধু উপায় অবলম্বন না করতে পারে সেই বিষয়টি নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প থাকতে পারে না। যে ওষুধ খেয়ে মানুষ।আরোগ্য লাভ করবে, সেই ওষুধই যদি জীবনের জন্য হুমকি হয়, তবে তার চেয়ে ভয়ঙ্কর আর কিছু হতে পারে না।সংশ্লিষ্টদের মনে রাখা দরকার, এর আগে ওষুধের পাইকারি মার্কেটে জব্দ হয়েছিল বিপুল পরিমাণ নকল ও ভেজাল ওষুধ। মাঝেমধ্যে ভেজাল ও নকল ওষুধের বিরুদ্ধে।অভিযান চালানো হয়। এতে নকল ও ভেজাল ওষুধ উদ্ধার হলেও প্রকৃত দোষীদের অনেকেই থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে।   দেশের ভেতরে একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী যেমন এসব নকল ও ভেজাল ওষুধ বানিয়ে বাজারে ছাড়ছে, তেমনি আরেকটি চক্র চোরাইপথে বিভিন্ন দেশ থেকে নিয়ে আসছে অনুমোদনহীন নানা ওষুধ।আমাদের দুর্ভাগ্য যে, ভেজালের সঙ্গেই আমাদের বসবাস করতে হচ্ছে। এমন কোনো পণ্য মেলা ভার যেখানে ভেজালের ছোঁয়া নেই। জীবন রক্ষার জন্য মানুষ ওষুধ ব্যবহার করে। সেই ওষুধই যদি ভেজাল হয় তাহলে এর মতো দুঃখজনক সংবাদ আর কী হতে পারে! তবুও দেশে ব্যাপক হারে চলছে নকল ওষুধ তৈরি। একশ্রেণির দুর্বৃত্ত রাজধানীসহ সারাদেশে গড়ে তুলেছে ওষুধ তৈরির অবৈধ কারখানা। এসব কারখানায় নকল ওষুধ তৈরি করে বাজারজাত করা হয়। সংসদীয় কমিটির তদন্তেও ধরা পড়েছিল নিম্নমানের ওষুধ উৎপাদনের চিত্র। নিম্নমানের কাঁচামাল দিয়েই শুধু নয়, আটা-ময়দা-চিনি-বেসন দিয়েও তৈরি হয় নকল ও ভেজাল ওষুধ। যা অত্যন্ত বিপজ্জনক। ভ্রাম্যমাণ আদালত অপরাধীদের তাৎক্ষণিক শাস্তির ব্যবস্থা করলেও তাতে স্থায়ী কোনো সমাধান হচ্ছে না। দেশে গড়ে উঠছে একের পর এক নকল ও নি¤œমানের ওষুধ তৈরির কারখানা। সাধারণ মানুষের জীবন বিপন্ন করে এরা হাতিয়ে নিচ্ছে বিপুল পরিমাণ অর্থ। অথচ ওষুধের মতো জীবন রক্ষাকারী একটি পণ্য নিয়ে এ ধরনের হঠকারী ব্যবসা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। আমরা মনে করি, ওষুধ নকলকারীদের এ ধরনের লঘু শাস্তির কারণে দেশে ভেজাল ও নকল ওষুধের ব্যবসা বাড়ছে বৈ কমছে না। জরিমানার টাকা পরিশোধ করে, জামিনে বের হয়ে কিংবা শাস্তি ভোগ করে আবার একই অপকর্ম করে বেড়ানোর সুযোগ পাচ্ছে অপরাধীরা। আর এই সুযোগ দেওয়ার অর্থই হচ্ছে একটি জাতিকে ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া। অর্থাৎ একটি জাতিকে অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় হত্যা অথবা পঙ্গু করা। যা কখনো কোনো সচেতন মানুষ মেনে নিতে পারে না। সম্ভবত দেশে সচেতন মানুষের সংখ্যা নিচের দিকে নেমে গেছে। তা না হলে এতদিনে একটা বিস্ফোরণ ঘটত।সরকারি কর্তাব্যক্তিদের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টাও করছেন নানা প্রক্রিয়ায়। তার মতে, পেশাদারি, মানুষের প্রতি মমত্ববোধের অভাব আর দুর্নীতির কারণে এ দেশে ওষুধ শিল্পে বিশৃঙ্খলা চলছে।  এ দেশে মানুষ গণতন্ত্রের জন্য রাস্তায় নেমে গুলি খায়। কিন্তু স্বাস্থ্যের জন্য কয়জন এ পর্যন্ত গুলি খেয়েছে। কেউ কি এজন্য আন্দোলন করেছে? করেনি।ভালো মানের ওষুধ বানাতে উপাদান বিদেশ থেকে আনতে হয়। এজন্য খরচ বেড়ে যায়। এ কারণে ওষুধের দাম বাড়াটা অস্বাভাবিক নয়। আমাদের দেশে পৃথিবীর অন্যান্য দেশের তুলনায় ওষুধের দাম অনেক কম। আমরা যে ওষুধ ৪০ টাকায় কিনি সেই ওষুধের দাম আমেরিকাতে ২০০ ডলার।তাছাড়া ওষুধের মান নিয়েও তো বড় ধরনের প্রশ্ন আছে..আমাদের দুটি ড্রাগ টেস্টিং ল্যাবরেটরি আছে। তাদের কাজ হচ্ছে-প্রতিটি ব্যাচের ওষুধ পরীক্ষা করা। প্রতিবছর তারা তিন থেকে চার হাজার ব্র্যান্ডের ওষুধ পরীক্ষা করতে পারে। কিন্তু প্রতিবছর এক লাখ ব্র্যান্ডের ওষুধ বাজরে আসে। প্রতিটি কোম্পানি প্রতিবছর তিন চারটা ব্যাচে ওষুধ বাজারে আনে। তাহলে কীভাবে তারা এত ওষুধের মান যাচাই করবে?যেমন অ্যান্টিবায়োটিকে কোনো কাজ করছে না।এটা কি মান খারাপের জন্য।যে ওষুধে কাজ করছে না সেটার মান খারাপ, এটা তো বলাই যায়। আমাদের দেশে ঔষধ প্রশাসন নিয়ন্ত্রণ করেন যেসব ব্যক্তি তারাই এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। এখন যেই ব্যক্তি ওষুধ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত তিনি যদি অনুমোদন প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত থাকেন তাহলে কিভাবে মান রক্ষায় ভূমিকা রাখবেন?চিকিৎসকদের কাছে গেলেই অতিরিক্ত ওষুধ দেওয়ার অভিযোগ আছে।এটা কতটা সত্য?চিকিৎসকরা ওষুধ কোম্পানির কাছে চুক্তিবদ্ধ হয়ে পড়েছেন। তারা সকালে লেখেন একটি প্রতিষ্ঠানের ওষুধ, তো বিকেলে লেখেন অন্যটির।এভাবে তারা সব কোম্পানিকেই খুশি রেখে কাজ করতে চান।তারা রোগীর স্বার্থের কথা কখনো চিন্তা করেন না।এ থেকে উত্তরণে কোনো পথ নেই।কারণ নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের লোকরাও দুর্নীতিতে জর্জরিত। কোনো সঠিক নির্দেশনা নেই।দেশের প্রভাবশালী মহলই ওষুধ শিল্পকে নিয়ন্ত্রণ করে।আমি একবার এক চিকিৎসকের কাছে গেলাম,তিনি আমাকে দুটি ওষুধ দিলেন।এর একটি ভিটামিন। এর কারণ জানতে চাইলে বললেন, এটা খেলে তো কোনো সমস্যা নেই।আমি বললাম,‘এর দাম আপনি দেবেন? তখন তিনি রেগে গেলেন।আমি কথা বলার পর তিনি তখন ভিটামিন বাদ দিলেন।আমি না হয় একজন সচেতন মানুষ হিসেবে এসব বাদই দিলাম।কিন্তু সাধারণ মানুষের কী অবস্থা একটু ভেবে দেখুন।                                      লেখক ও কলামিস্ট,যুক্তরাজ্য                                       raihan567@yahoo.com

 


সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি: এ্যাডভোকেট শেখ মোঃ আব্দুল্লাহ
সম্পাদক-প্রকাশক : শেখ মোঃ তৈয়াবুর রহমান॥

যুগ্ম সম্পাদক: এস এম শাহিদুল আলম॥ সহযোগী সম্পাদক: শেখ মোঃ আরিফ আল আরাফাত
সহ-সম্পাদক: (প্রশাসন) হাজী হাবিবুর রহমান শাহেদ: সহ সম্পাদক: আজমাল মাহমুদ
সম্পাদক কর্তৃক বাড়ী বাড়ী নং- ৫৩/২, ৪র্থ তলা, রাজ-নারায়ন-ধর রোড, কিল্লার মোড় বাজার, লালবাগ, ঢাকা-১২১১
ফোন: ০১৯১৮-২০১৬২৬, ফোন: ০১৭১৫-৯৩৩১৬৮
ই-মেইল- notunvor.news@gmail.com
Designed By Hostlightbd.com
| Cyberboss.org
Translate »