Category: উপ-সম্পাকীয়

বাংলা শুধু এখন আমাদের মাতৃভাষা নয়, রাষ্ট্র ভাষাও বটে


আল-আমীন,মেহেরপুর
আমরা বাঙালী ও বাংলাদেশী। বাংলা শুধু এখন আমাদের মাতৃভাষা নয়, রাষ্ট্র ভাষাও বটে। অনেক চড়াই উৎরাই পেরিয়ে ১৯৪৭ সালে দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তান ও ভারত নামে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম হয়। সে সময় এদেশের সাধারণ মানুষের মনে একটি বিশ্বাস জন্ম নিয়েছিল যে, তারা ব্রিটিশদের কাছ থেকে যে সকল ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছিল পাকিস্তান রাষ্ট্র হলে সে সব বঞ্চনা ও সমস্যার সমাধান হবে। তখন পাকিস্তানের উভয় অংশের জনগণ ভোগ করবে সমাধিকার। কিন্তু পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর পূর্ব পাকিস্তানের সাধারণ মানুষ চরম ভাবে অবহেলিত হতে লাগল। তাদের মাঝে জমা হতে থাকে ক্ষোভ। পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ দেখতে পায় রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে এদেশের মানুষের কোন মূল্যায়ন নেই, অথচ ভাষাভাষীর দিক থেকে উর্দুভাষী মানুষ ছিল শতকরা ৮ ভাগ। আর বাংলাভাষী মানুষ ছিল ৫৬ ভাগ।
১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারী পাকিস্তান গণপরিষদের অধিবেশন শুরু হয়। অধিবেশনে পূর্ব পাকিস্তান কংগ্রেস (পূর্ব বাংলা) দলের সদস্য ধীরেন্দ্র নাথ দত্ত একটি সংশোধনী প্রস্তাব উত্থাপন করেন। সংশোধনটি ছিল খসড়া নিয়ন্ত্রণ প্রণালীর ২৯ নং ধারা সম্পর্কে। এই ধারায় বলা হয়েছিল পরিষদের সকল সদস্যকে ইংরেজি বা উর্দু ভাষায় বক্তৃতা করতে হবে। ধীরেন্দ্র নাথ দত্ত ইংরেজী ও উর্দুর পাশাপাশি বাংলাকেও গণপরিষদের সরকারী ভাষা করার প্রস্তাব করেন। ২৫ ফেব্রুয়ারী এই প্রস্তাব সম্পর্কে অধিবেশনে আলোচনা হয় এবং তুমুল বিতর্কের পরও তা অগ্রাহ্য হয়।
১৯৫২ সালে ২৭ জানুয়ারী পাকিস্তানের প্রধান মন্ত্রী খাজা নাজিমউদ্দিন ঢাকা সফরে আসেন এবং নিখিল পাকিস্তান মুসলিম লীগের পল্টন ময়দানে অনুষ্ঠিত এক জনসভায় ভাষন দেন। বক্তৃতায় তিনি উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষনা করেন। এ ঘোষনার প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ ৩০জানুয়ারী ছাত্র ধর্মঘট ও সভা আহবান করে। ২৭ জানুয়ারী থেকে ২১ ফেব্রুয়ারী পর্যন্ত যে কর্মসূচী গৃহিত হয় তাতে দুটি দাবী ছিল (১) বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করা (২) আরবী হরফে বাংলা লেখার প্রচলন বন্ধ করা।
ভাষা আন্দোলন ঃ
১৯৫২ সালের ৩১জানুয়ারী ২১ফেব্রুয়ারীকে রাষ্ট্রভাষা দিবস হিসেবে পালন করার প্রস্ততি গ্রহণ করে সর্বদলীয় রাষ্ট্র ভাষা সংগ্রাম পরিষদ এবং ঐ দিন তদানীন্তন প্রদেশের সর্বত্র সাধারণ ধর্মঘট এবং শোভাযাত্রা সহকারে ২১ফেব্রুয়ারী রাষ্ট্র ভাষা দিবস হিসেবে পালন করা হবে ঠিক হয়। ২১ফেব্রুয়ারীর আগের সভা ও মিছিলগুলির কারণে কেবল ছাত্রদের মধ্যেই নয়, সাধারণ মানুষের মধ্যেও সচেতনতা জাগ্রত হয়েছিল এবং সকলে প্রতিরোধ ও সংগ্রামের প্রত্যক্ষ কর্মসূচীই প্রত্যাশা করছিল। এরকম অবস্থায় পূর্ব পাকিস্তান (পূর্ব বাংলা) সরকার ২০ফেব্রুয়ারী থেকে ১ মাসের জন্য ১৪৪ ধারা জারি করে ঢাকা শহরে যে কোন রকম সভা সমাবেশ, শোভাযাত্রা ও মিছিল প্রভৃতি সম্পূর্ণরুপে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।
১৯৫২ সালের ২১ফেব্রুয়ারী দিনটি ছিল বৃহস্পতিবার ৮ফাল্গুন ১৩৫৮ বঙ্গাব্দ ২৪শে জমাদিউল আ্উয়াল ১৩৭১ হিজরী। ছাত্ররা ১৪৪ ধারা ভংগ করার জন্য যাবতীয় প্রস্ুস্তু শেষ করে রেখেছিল। সিদ্ধান্ত মত ছাত্ররা দু’চার জন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ এলাকায় জমায়েত হচ্ছে। বৈকাল ৩ ঘটিকায় ছাত্ররা ১৪৪ ধারা অমান্য করে মিছিল বের করে। এ সময় ছাত্রদের একটি অংশ কর্তব্যরত পুলিশ ও ইপিআর এর সাথে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। প্রচন্ড সংঘর্ষে ছাত্রদের নিক্ষিপ্ত ইটের সামনে পুলিশ পিছু হটতে বাধ্য হয়। ছাত্ররা পুলিশ ও ইপিআরদের চারদিক থেকে ঘেরাও করে বিক্ষোভ করতে থাকলে এক পর্যায়ে পুলিশ গুলিবর্ষণ করে। পুলিশের গুলিতে প্রথম নিহত হয় একজন রিকসা চালক, তারপর সালাউদ্দিন, বরকত, রফিক, জব্বার। পুলিশের গুলি বর্ষনে ছাত্র জনতা নিহত হওয়ায় সাধারণ মানুষের কান্না জড়িত ক্ষুব্ধ মুখ দেখা যায়। এরই প্রতিফলন ঘটেছিল ২২ফেব্রুয়ারী অর্থাৎ পরদিন শুক্রবার ঢাকা মেডিকেল কলেজ ব্যারাকে নিহতদের জানাযার নামাজে হাজার হাজার মানুষের অংশ গ্রহণ। সকলে চোখে মুখে ঘৃণা ও ক্রোধ নিয়ে সমবেত হয়। ২২ফেব্রুয়ারী জানাযার নামাজ শেষে ছাত্র জনতা শহীদদের লাশ নিয়ে মিছিল বের করলে পুলিশ আবারো মিছিলে গুলি চালায়। পুলিশের গুলিতে অহিউল্লাহ নামের ১৪ বছরের এক কিশোরসহ নিহত হয় ৪ জন। এঘটনার পর রাষ্ট্র ভাষার দাবী ছড়িয়ে পড়ে মফস্বল এলাকা গুলোতে।
১৯৪৭ সাল থেকে মেহেরপুরের রাজনৈতিক অঙ্গন ছিল মুসলিম লীগের দখলে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে মেহেরপুরের কোন রাজনীতিক, রাজনৈতিক দল বা ছাত্র সংগঠন কোনরুপ ভূমিকা পালন করেছিল কিনা তার কোন সঠিক ইতিহাস পাওয়া যায় না। তবে সাংবাদিক সৈয়দ আমিনুল ইসলাম রচিত মেহেরপুরের ইতিহাস ও বেঁচে থাকা অংশগ্রহণকারী ভাষা সৈনিক থেকে জানা যায়, ১৯৫২ সালের দুই দিন পর অর্থাৎ ২৪ফেব্রুয়ারী মেহেরপুর মডেল ইংরেজি হাই স্কুলের ছাত্র মুন্সি সাখাওয়াৎ হোসেন (কবি নজরুল শিক্ষা মঞ্জিলের প্রাক্তণ প্রধান শিক্ষক) কাওছার আলী (চানা) ওরফে গোলাম কাওছার (চানা) (মেহেরপুর পৌর সভার অবসর প্রাপ্ত কর্মচারী) বংকু ঘোষ ওরফে সতীনাথ ঘোষ (বড় বাজার বাগান পাড়া) শান্তিনারায়ন চক্রবর্তী (কাশ্যবপাড়া) আবুল হোসেন (তাঁতীপাড়া, সাবেক সভাপতি, বাস মালিক সমিতি) মীর মোজাম্মেল হক (মীর পাড়া, আমঝুপি) সিরাজুল ইসলাম(বাওট, গাংনী) জান মোহাম্মদ (অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক, খন্দকারপাড়া) ইছাহাক আলী বিশ^াস(অবসরপ্রাপ্ত ফুটবল খেলোয়াড়, মোহিনি মিল, কুষ্টিয়া) রফেজুদ্দীন রতন (ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের কন্ট্রাক্টর, পিরোজপুর, মেহেরপুর) সুলতান উদ্দীন (কালাচাঁদপুর, মেহেরপুর) আওলাদ হোসেন মাষ্টার (বুড়িপোতা ইউপির শালিখা) প্রমুখ ছাত্র নেতা মেহেরপুর শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবীতে পোস্টারিং, পিকেটিংসহ মিছিল বের করেছিল। উল্লেখ্য গোলাম কাওছার চানা, মীর মোজাম্মেল, সুলতান শেখ ও সিরাজুল ইসলাম জীবিত আছেন।
এরপর ১৯৫৬ সালে ২১ফেব্রুয়ারী মাতৃভাষা দিবস ২২ফেব্রুয়ারী পালনে মেহেরপুর শহরে মিছিল ও পোস্টারিং করে মেহেরপুর মডেল ইংরেজী হাইস্কুলের ছাত্ররা। বিদ্যালয়ের শৃংখলা ভংগের অপরাধে উক্ত বিদ্যালয়ের ছাত্র নজীর হোসেন (পিরোজপুর) ইসমাইল হোসেন (জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি) মরহুম কবির খান (মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের সামনে) মোশারফ হোসেন (জিকে প্রজেক্টের কর্মচারী, ভেড়ামারা কুষ্টিয়া) মরহুম সামসুল আলা (বড় বাজার, মেহেরপুর) কদম রসুল, আবুল কাশেম(সাবেক চেয়ারম্যান বুড়িপোতা ইউপি) প্রমুখকে বিদ্যালয় থেকে রাজটিকিট করা হয়। পরবর্তীতে তা পরিবর্তন করে বিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করে। এ সময় বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছিলেন শিক্ষাবিদ ও মুসলিম লীগ মহকুমা সভাপতি জনাব সাবদার আলী বিশ্বাস । এছাড়া ১৯৫৬ সালের ২২ফেব্রুয়ারী মেহেরপুরের গাংনীতে রাষ্ট্রভাষা দিবস পালিত হয়। মোঃ দাউদ হোসেন (চেংগাড়া) মোঃ সিদ্দিকুর রহমান (গাংনী চৌগাছা) ইসলাম আলী মাস্টার (যাদবপুর, মেহেরপুর) খোরশেদ আলী (গাংনী) প্রমুখ ছাত্র নেতা গাংনী শহরে রাষ্ট্র ভাষা বাংলার দাবীতে মিছিল করেছিল বলে জানা যায়।
ঐক্যবদ্ধ বাঙালীর আন্দোলনের তীব্রতায় তদানিন্তন পাকিস্তান সরকার বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে প্রস্তাব গ্রহণ করতে বাধ্য হয়। ১৯৫৩ সালে মূলনীতি কমিটির রিপোর্টেও বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম সরকারী ভাষা হিসেবে মর্যাদা প্রদানের সুপারিশ করা হয়। ১৯৫৬ সালে সংবিধানে উর্দুর সংগে বাংলাও রাষ্ট্রভাষা হিসেবে আনুষ্ঠানিক ভাবে স্বীকৃতি লাভ করে।
২১এর চেতনায় বাঙালীরা ১৯৫৪’র নির্বাচন ১৯৫৮’র সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলন ১৯৬৬’র ছয় দফা কর্মসূচী, ১৯৬৯’র ১১ দফা ও গণআন্দোলন ১৯৭০ এর নির্বাচন সর্বোপরি ১৯৭১ সালে মুক্তি সংগ্রামে ২১ফেব্রুয়ারী বাঙালী জাতিকে করে অনুপ্রাণীত। ১৯৫২ সালে কতজন ছাত্র-জনতা পুলিশের গুলিতে শহীদ হয়েছে কোন তার নির্দিষ্ট সংখ্যা এখনো অজানা রয়ে গেছে। ভাষা আন্দোলনের সঠিক ইতিহাস না জানার কারনে প্রশাসন সহ স্বেচ্ছাসেবক অনেক সংগঠন মেহেরপুরে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে অবদানকারী প্রকৃত ভাষা সৈনিকদের মূল্যায়ন না করে তাদের পাশ কাটিয়ে ১৯৫৬ সালে ভাষা দিবস পালনকারীদের ভাষা সৈনিকের মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করে বিভিন্ন সম্মানে ভূষিত করছে। এতে মেহেরপুরের ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস হচ্ছে বিকৃত। পৃথিবীর বুকে একমাত্র বাঙালী জাতিই রক্তাক্ত সংগ্রামের মাধ্যমে ছিনিয়ে এনেছে তার ভাষার অধিকার। কথা প্রসঙ্গে জনাব ইসলাম আলী মাষ্টারকে বলেছিলাম ১৯৫৬ সালে আপনি ভাষা দিবস পালন করলেন তবে কেন ভাষা সৈনিক হননি? তিনি আমাকে বললেন ভাষা সৈনিক তাঁরাই যাঁরা শুধু মাত্র ১৯৫২ সালে প্রতিবাদ করেছিলেন।
শেষ কথা ঃ
ইউনেস্কো ১৯৯৯ সালে ১৭নভেম্বর ৩০তম অধিবেশনে ২১ফেব্রুয়ারীকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণা করে। বিশ্বের ১৮৮টি দেশে ২১ফেব্রুয়ারী আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালিত হচ্ছে। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে সারা পৃথিবীতে

বাহান্নোর ভাষা আন্দোলন ও আমাদের স্বাধীনতা


এস,এম শাহাদৎ হোসাইন,গাইবান্ধা জেলা প্রতিনিধি: আমি বাংলায় ভাসি,বাংলায় হাঁসি,বাংলায় মোদের গৌরব, বাংলায় মোদের স্বাধীনতার চেতনা ও মায়ের মুখের ভাষা। আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙ্গানো একুশে ফেব্রুয়ারী, আমি কি ভূলিতে পারি। ২১শে ফেব্রুয়ারী মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। দিবসটির তাৎপর্য অপরিসীম। জাতি শহীদদের প্রতি বিনম্্র শ্রদ্ধা জানিয়ে মিনারে পুস্প অর্পণের মাধ্যমে গভীর ভালবাসার সাথে দিবসটি বিভিন্ন কর্মসুচীর মধ্য দিয়ে করে ভাষা শহীদের প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান প্রদর্শন করা হয়।। বাংলাদেশের ন্যায় বিশ্বের সকল দেশে ভাষা শহীদদের প্রতি বিনম্্র শ্রদ্ধার জানিয়ে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালত করে। রফিক সালাম জব্বার বরকতসহ নাম না জানা শহীদদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এ বাংলা ভাষার সম্মান চির দিন অটুট রাখার জন্য আমাদের নতুন প্রজন্মকে ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস সম্পর্কে জানাতে হবে বা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের প্রকৃত ইতিহাস আমাদের সন্তানদের মাঝে তুলে ধরা আমাদের সকলের দায়িত্ব।এ দায়িত্ব বোধ থেকেই আমাদের নতুন প্রজন্মকে স্বাধীনতার চেতনায় আতœবিশ্বাসী করে গড়ে তুলতে সর্বদা সচেতন থাকতে হবে। বাঙ্গালী জাতি মাথা নত করার জাতি না এ কথাটি পাকিস্তানের শাসক শ্রেণী কখনই মনে করেনি। ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ১৪ আগস্ট ভারতীয় উপমহাদেশ ভেঙ্গে পাকিস্তানের জন্ম হয়। পাকিস্তানের জাতির পিতা কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিনাহ এবং পাকিস্তানী শাসকরা সবাই উর্দুকে রাষ্ট্র ভাষা করার জন্য অড়ন রইল এবং শাসক গোষ্টি ঘোষনা করল উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। তখন বাঙ্গালী জাতি এই ঘোষনাকে কেবল সাংস্কৃতিক আঘাত বা শোষনের হাতিয়ার হিসেবে উপলব্ধ করেনি বরং এর মধ্যে অর্থনৈতিক শোষনের কালোছায়াও অনুভব করেছিল। সেই অনুভূতি থেকে মায়ের মুখের ভাষা বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবীতে ছাত্র,শিক্ষক,চিকিৎসক,কৃষকসহ নানা শ্রেণী পেশার মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়ে ভাষা আন্দোলনে রাস্তায় নেমে আসেন। বাঙ্গালী মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষ বুঝতে পেয়ে ছিল, রাষ্ট্র বা সরকারী ভাষা উর্দু হলে জীবনের বহু ক্ষেত্রে তারা এবং সাধারণ মানুষ অনেক বাঞ্চানার শিকার হবে। ইংরেজ বা বৃটিশ শাসনের অভিজ্ঞতা থেকে তারা ভালভাবে বুঝতে পেয়েছিল উপমহাদেশের রাষ্ট্রভাষা ইংরেজী থাকার ফলে যারা ইংরেজী ভাল জানতেন কেবল তারাই রাষ্ট্র শাসনের সঙ্গে যুক্ত হতেন, অন্যরা নয়। ভাষা আন্দোলন পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) জনগণকে এই চেতনায় উজ্জীবিত ও উৎকন্ঠিত করেছিল যে, পাকিস্তানের শাসক শ্রেণী পূর্ব পাকিস্তানকে শোষনের ক্ষেত্র হিসেবে দেখছে। পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তান মিলে সে সময় জনসংখ্যা ছিল ৬ কোটি ৯০ লক্ষ। পশ্চিম পাকিস্তানের বেশীর ভাগ মানুষ উর্দু বলতে পারলেও এ ভাষা কারো নিজের ভাষা ছিল না। অনেক ভাষায় কথা বলার সম্প্রদায় ছিল পাকিস্তানে। পেশোয়ারের মানুষের মাতৃভাষা ছিল পোশতু,সিন্ধু অঞ্চলের ভাষা ছিল সিন্ধু,পাঞ্জাবে পাঞ্জাবী ভাষা,বেলুচিস্তানে বেলুচ ভাষা। তারপরও যদি ধরে নেয়া যায় পশ্চিম পাকিস্তানের মানুষ উর্দুকে রাষ্ট্র ভাষা হিসেবে মানবে, তারা অনেকেই উর্দুতে কথা বলতে, পড়তে পারে তা হলেও পশ্চিম পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যা ২ কোটি ৫০ লক্ষ। আর পূর্ব পাকিস্তানের বাংলা ভাষায় কথা বলার মানুষের সংখ্যা ৪ কোটি ৪০ লক্ষ। এই হিসেবে পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা হওয়া উচিত বাংলা।এরপরও কি করে পাকিস্তানের শাসকগোষ্টি ৫৮ শতাংশ মানুষের মুখের ভাষা বাংলাকে অস্বীকার করে উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষনা দিতে পারল। পাকিস্তানী শাসক গোষ্টির ঘোষনাকে কেন্দ্র করে ছাত্র,শিক্ষক,চিকিৎসক,কৃষকসহ নানা শ্রেণী পেশার মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়ে মায়ের মুখের ভাষা বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবীতে বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দে বুদ্ধিজীবি ও সংস্কৃতিবিদরা রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করে ১১ই মার্চ ধর্মঘট আহবান করেছিলেন। ধর্মঘাটের সময় আন্দোলনের নেতা শওকত আলী, কাজী গোলাম মাহবুব,শামসুল হক,অলি আহাদ,শেখ মজিবুর রহমান, আব্দুল ওহাবকে গ্রেফতার করেন পুলিশ। ছাত্র নেতা আব্দুল মতিন, আব্দুল মালেক, উকিল প্রমুখ ঢাকায় মিছিল নিয়ে এগিয়ে যেতে থাকেন। এ সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পসে সভা চলাকালে পুলিশ আক্রমণ করে। ছাত্র নেতা তোয়াহা পুলিশের রাইফেল কেড়ে নিতে গেলে তিনি মারাতœক আহত হন। ১২মার্চ থেকে ১৫ মার্চ পর্যন্ত চলতে থাকে ধর্মঘট। ভাষা আন্দোলনের জন্য গঠিত হয় জাতীয় রাষ্ট্রভাষা কমিটি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা কমিটি, ভাষা আন্দোলনের প্রথম দিকে কমিউনিস্ট পাটি ও তার ছাত্র ফ্রন্ট ছাত্র ফেডারেশন একটি বড় ও তাৎপর্যময় ভুমিকা পালন করেছিল। তাছাড়াও ভাষা আন্দোলনের আরও দু’টি সংগঠন নেতৃত্ব দিয়েছিল। সংগঠন দু’টি হ’ল যুবলীগ ও ছাত্র ইউনিয়ন। তবে ছাত্র ইউনিয়ন ভাষা আন্দোলনের সক্রিয় ভুমিকা পালন করেছিল দেশ ব্যাপী। ফলে ভাষা আন্দোলন শুধু রাজধানী ঢাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বিক্ষোভের আগুন ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে।‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ শ্লোগানটির তাৎপর্য সেই সময়ের সাধারণ মানুষ অনেকেই না বুঝলেও সর্বস্তরের মানুষ নিজ নিজ অনুভুতি থেকে দাবী বা অধিকার আদায়ের জন্য ভাষা আন্দোলনে শরীক হয়েছিল। সংসদে পূর্ব পাকিস্তানের মূখ্যমন্ত্রী নুরুল আমিন বাঙ্গালীদের ভাষার দাবির বিরোধিতা করেন। তখন সংসদ সদস্য মাওলানা আব্দুর রশিদ তর্কবাগীশসহ বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্যগণ অধিবেশন ত্যাগ করে চলে আসেন। তারা রাজ পথে এসে ভাষা আন্দোলনের মিছিলে যোগ দেন। শাসক শ্রেণী পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের ২১শে ফেব্রুয়ারী ঢাকা শহরে ১৪৪ ধারা জারি করেন, যাতে শহরে ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সমুহ ধর্মঘট ও মিটিং মিছিল সমাবেশ করতে না পারে। ২১শে ফেব্রুয়ারী সকালে ১৪৪ ধারা উপেক্ষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালযের কলা ভবনে ছাত্র জমায়েত হয় এবং মাইকে ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’শ্লোগান ও বক্তব্য চলে। বিকাল ৩টার দিকে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে প্রাদেশিক সংসদ ভবন অভিমুখে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবীতে মিছিলটি অগ্রসর হচ্ছিল। সে সময় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ছাত্রদের ব্যারাকের সামনে পুলিশ ও মিলিটারী মিছিলটির উপর গুলি বর্ষণ করে। এতে ছাত্রসহ কয়েকজন নিহত ও বেশ কয়েকজন আহত হয়। ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের ২১শে ফেব্রুয়ারী পুলিশের গুলিতে ছাত্র শহীদ হওয়ার পর ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ব্যারাকে অবস্থান করা ছাত্ররা শহীদদের স্বরণে একটি শহীদ মিনার তৈরীর সিদ্ধান্ত নেন এবং ২৩শে ফেব্রুয়ারী রাতে ঢাকায় প্রথম শহীদ মিনার নির্মাণ করেন। ১৯৬৩ খ্রিস্টাব্দে এই অস্থায়ী শহীদ মিনারটি সরিয়ে বড় করে শহীদ মিনার বানানো হয়। শহীদ মিনারের একটি বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। দিন দিন শহীদ মিনারের গুরুত্ব বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশের গন্ডি পেরিয়ে সারা বিশ্বে শহীদ মিনার নির্মিত হচ্ছে। নিউইয়কে জাতিসংর্ঘের সদর দপ্তরের সামনে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ভাস্কর্য নির্মাণ করা হয়েছে। ভাস্কর্যটি ২০১৬ খ্রিস্টাব্দের ২১শে ফেব্রুয়ারী প্রথম প্রহরে সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। ভাস্কর্যটির স্থাপতি শিল্পী মৃনাল কান্তি। ১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দের ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কো ২১শে ফেব্রুয়ারী মহান শহীদ দিবসকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষনা করেন। ২০০০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ২১শে ফেব্রুয়ারী আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন করে বিশ্বব্যাপী। এছাড়াও ২০১৬ খ্রিস্টাব্দে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটকে ইউনেস্কো সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে ঘোষনা করেন। বাহান্নোর ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে বাঙ্গালী জতির মাঝে মহান স্বাধীনতার বাসনা ও স্বাধীনতা সংগ্রামের শক্তি সঞ্চয় করেছে। ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের বাঙ্গালী জাতির মুক্তির মহানায়ক, জাতির পিতা, স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা ও স্বাধীনতার ঘোষক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহবানে যা সাধারণ মানুষের মধ্যে মুক্তির সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়তে অনুপ্রেরণা ,উৎসাহও উদ্দেপনা দিয়েছে।

বিদ্যালয় থেকে ছিটকে পড়া সমস্যা সমাধান দরকার

 Rayhan Ahmed Topader London 

বাংলাদেশ একটি জনবহুল দেশ।বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য এই দেশের একটি গর্বের বিষয়।উত্তরে হিমালয় থেকে দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর,পূর্ব থেকে পশ্চিমের বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদ ভাণ্ডার আমাদের দেশকে বারবার আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু করে তুলেছে বহির্দেশের মানুষের কাছে।বিচিত্র এ দেশের প্রাকৃতিক শোভা,বিচিত্র তার অধিবাসীরাও। জাতি,ধর্ম,সংস্কৃতির এক মিশ্ররূপ আমাদের দেশ। বিবিধের মাঝে ও মানুষের মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধ,ঐক্যবোধ, সবার জন্য কল্যাণ কাজে,দেশের গণতান্ত্রিক ভিতকে সুদৃঢ় করার কাজে বদ্ধপরিকর আমাদের দেশ।দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বারবার বলা হয়েছে,আমাদের দেশে ক’বছরের মধ্যে প্রারম্ভিক শিক্ষা সর্বজনীন,অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক করা হবে।সর্বজনীন প্রারম্ভিক শিক্ষার লক্ষ্য পূরণের জন্য বর্তমান সরকার বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করে। তার মধ্যে রয়েছে স্কুল,কলেজ,মাদরাসা,বিশ্ববিদ্যালয়সহ নানামুখী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা।গত পয়লা জানুয়ারি সারাদেশে ২০১৭ শিক্ষাবর্ষে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে ৩৬ কোটি ১২ লাখ ৮২ হাজার বই প্রদান করা হয়েছে।দিবসটি ছিল যেন একটা আনন্দ উৎসবের দিন।এ উপলক্ষে শিক্ষমন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেন,জঙ্গি তৎপরতায় যুক্ত হয়ে নিজেকে ধ্বংস ও সমাজ সভ্যতার ধ্বংস ছাড়া কিছুই করা যায় না।তিনি বলেন,আমাদের মনে রাখতে হবে,ইসলাম শান্তির ধর্ম, মানবতার ধর্ম,কল্যাণের ধর্ম।জঙ্গি তৎপরতায় যুক্ত হয়ে শুধু নিজেকে নয়,মহান এই ধর্মকে বিতর্কিত করা হয়েছে।স্নেহ-মমতা ও ভালোবাসা দিয়ে শিক্ষার্থীদের জঙ্গি তৎপরতায় যুক্ত হওয়ার হাতছানি থেকে দূরে রাখতে হবে।শিক্ষকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, আমাদের নতুন প্রজন্ম মেধার দিক থেকে দরিদ্র নয়। তারা একদিন বিশ্ব জয় করবে।শুধু মানসম্মত শিক্ষা দিলেই হবে না,আমরা সততা,ন্যায়নিষ্ঠ,শ্রদ্ধাশীল ও পরিপূর্ণ ভালো মানুষ চাই।

নিয়মতান্ত্রিক শিক্ষাব্যবস্থার পাশাপাশি বিকল্প বা পরিপূরক শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টির চেষ্টা করা হয়েছে। দেশব্যাপী উন্নতমানের শিক্ষার সুযোগ ও প্রসার ঘটাতে বিভিন্ন সময় শিক্ষা দফতরের মাধ্যমে যে প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে বর্তমান সরকার তা প্রশংসার দাবি রাখে। পরিমাণগতভাবে গোড়ার দিকে সাফল্য এলেও যে সুদূরপ্রসারী চিন্তাভাবনা নিয়ে শিক্ষা দফতর এগিয়ে যাচ্ছিল তাতে চৈনিক দেয়ালস্বরূপ বাধা হয়ে দাঁড়ায় বিদ্যালয়-ছুটদের সমস্যা।বর্তমান বিদ্যালয়-ছুটদের সমস্যা দফতরের কাছে তথা সরকারের কাছে বিশাল একটি চ্যালেঞ্জস্বরূপ।ছাত্রছাত্রীদের বিদ্যালয়মুখী করার জন্য তাদের বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ করা থেকে শুরু করে মধ্যাহ্নকালীন আহার,পোশাক,অবৈতনিক শিক্ষা, বিভিন্ন বৃত্তি,অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা ছাত্রছাত্রীদের জন্য নানা সুবিধা দিচ্ছে সরকার।এ ছাড়াও আছে বিভিন্ন ধরনের প্রকল্প,ছাত্রছাত্রীদের জন্য রয়েছে শিক্ষামূলক ভ্রমণ,মেয়েদের জন্য সেল্ফ ডিফেন্স ট্রেনিংইত্যাদি আরও কত কী।এত কিছুর পরও আমরা কেন আমাদের কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছতে পারছি না,তা খুব ভাবনার বিষয়।কারণ শিক্ষাকে সবার কাছে পৌঁছে দেয়ার জন্য সরকার প্রাথমিক বিদ্যালয়, উচ্চতর মাধ্যমিক বিদ্যালয় স্থাপন করেছে।শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয় পর্যন্ত যাচ্ছে না বলে বিদ্যালয়কেই শিক্ষার্থীদের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়াÑ এ এক অভিনব প্রয়াস।কিন্তু তার পরেও পাওয়া যাচ্ছে না আশাপ্রদ ফল।এর পেছনের কারণ অনুসন্ধান করার জন্য দফতর বিভিন্ন কমিটিও গঠন করেছে।আমি আমার ক্ষুদ্র জ্ঞানে যতটুকু অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছি, তা এখানে তুলে ধরলাম অন্যদের সঙ্গে মত বিনিময় করার জন্য। বিদ্যালয় বললেই আমাদের মনের আয়নায় যে চিত্রটি ভেসে ওঠে,স্কুলবাড়ি,শ্রেণিকক্ষ,শিক্ষক-শিক্ষিকা,পাঠদান, পরীক্ষা ইত্যাদি।  নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু হওয়া মানে প্রথম দিন থেকেই পাঠ্যবই হাতে নিয়ে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান,এটা বড় বেশি নিয়মতান্ত্রিক।নিয়মের জাঁতাকলে পড়ে শিশুমন বা বড়রাও হাঁপিয়ে ওঠে।সন্ধ্যাবেলা বাতি জ্বালানোর জন্য যেমন সলতে পাকানো,ঠিক তেমনি বিশেষভাবে প্রথম পর্যায়ের যারা ছাত্র,সে প্রথম শ্রেণিই হোক বা ষষ্ঠ শ্রেণি, তাদের সঙ্গে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের চাই নিবিড়, আত্মিক সম্পর্ক।শিক্ষক আর শিক্ষার্থীদের মধ্যে রয়েছে বিস্তর ব্যবধান।বিদ্যালয়-ছুটদের সমস্যা যেখানে বেশি, মানে গ্রামাঞ্চল বা শহরতলিতে, সেখানে এই সম্পর্কের ব্যবধানও অতি প্রকট। আমাদের যারা শিক্ষকতা করেন, তারা সবাই কি বুকে হাত দিয়ে শপথ করে বলতে পারেন যে, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে তোলা দরকার? অল্প কিছু সংখ্যক শিক্ষক-শিক্ষিকাকে বাদ দিলে বেশির ভাগের সঙ্গে ছাত্রছাত্রীদের দূরত্ব রয়েছে। সেখানে কাজ করে ভয়,ভীতি,অনাবশ্যক দুশ্চিন্তা যার ফলে শ্রেণিকক্ষে তারা স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে না।গণিতে ছাত্রদের করুণ অবস্থার কারণ নির্ণয় করার জন্য একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে গণিতের প্রতি ভয়ই তাদের অনগ্রসরতার মূল কারণ।শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের সম্পর্ক গঠনের জন্য কোনো কর্মসূচির কথা আমরা ভাবতে পারি কি? এমন কোনো কর্মসূচি নিলে হয় না? এটা কিন্তু খুব জরুরি। ভয়মুক্ত পরিবেশে যদি তাদের না ফেলা যায়, তাহলে শিক্ষার সুফল থেকে তারা তথা দেশ বঞ্চিত হবে। সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটানো আমার মতে প্রথম পদক্ষেপ। আদর,ভালোবাসার উষ্ণতায় তাদেরকে মাতৃক্রোড়ের সুরক্ষা প্রদান করা একান্ত প্রয়োজন।সর্বশিক্ষা মিশনের লক্ষ্য অনুযায়ী সবার জন্য ভর্তি নিশ্চিত করা হলো। কিন্তু ভর্তি করিয়েই ক্ষান্ত থাকা যায় না।তাদেরকে ধরে রাখাও একটি বিশেষ কাজ।তার জন্য শ্রেণিকক্ষের পাঠদান হওয়া চাই খুব আগ্রহ সৃষ্টিকারী এবং তা দেওয়া হোক নতুনত্বের মোড়কে।   প্রথমেই বই থেকে পড়া না ধরে প্রথম শ্রেণির বাচ্চাদের নানা রকম ছড়া শেখানো যায়।সুন্দর সুন্দর গল্প বলে তাদের সঙ্গে যত তাড়াতাড়ি ভাব জমানো যায়, তার সঙ্গে যদি থাকে আদর আর দরদের মিশ্রণ,তাহলে বাচ্চারা বিদ্যালয়ে আসতে চাইবে না,তা কি বিশ্বাস করা যায়? অনেককেই বলতে শুনি, ছাত্ররা কাজে চলে যায় বলেই বিদ্যালয়ে আসে না।আরে সেটা তো একটু বড়দের ক্ষেত্রে। সেই বড় ছাত্রগুলো যদি একদম প্রথম শ্রেণিতেই আগ্রহ উদ্দীপক পরিবেশ পায় এবং সেই পরিবেশের ওপর গড়ে ওঠে দ্বিতীয় শ্রেণির ভিত, তারপর এভাবে তৃতীয়, চতুর্থ ইত্যাদি তাহলে তারাই বিদ্যালয়ে আসার জন্য বায়না করবে।তাদেরকে বাড়িতে ধরে রাখাই যাবে না।সবাই যে শুধু আর্থিক কারণেই বিদ্যালয় ছুট হয়, তা কিন্তু নয়। সব বিদ্যালয়ের পরিবেশ ছাত্রদের অনুকূল,সেটা জোর গলায় বলা যায় না।প্রথম প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের সমস্যা বহুবিধ।তারা নিজেরাই নানা রকম মানসিক ক্ষুদ্রতার শিকার হয় এবং তারাই বেশি করে বিদ্যালয়-ছুট হয়। ঘরেও তারা শিক্ষা সহায়ক পরিবেশ পায় না। সেরকম ছাত্রছাত্রীদের জন্য আলাদা কোচিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে এবং তাদের কাছে অনুরূপ বার্তা পৌঁছাতে হবে যাতে তারা অনুভব করতে পারে যে,বিদ্যালয় তাদের নানা সমস্যা সমাধানে হাত বাড়িয়ে দেবে,বিদ্যালয় তাদের কথা ভাবে।বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটিকেও তাদের নির্দিষ্ট কাজগুলো সূচারুভাবে সম্পাদন করতে হবে।অনেককে বলতে শোনা যায়, তারা মিটিংয়ে আসেন না বা অভিভাবকদের ডাকলেও তারা আসতে চান না।তারা আসেন না ঠিকই কিন্তু তাদের সন্তানরা পরীক্ষায় অসফল হলে নানা রকম ঝামেলার সৃষ্টি করেন তারাই।তারা যদি নিয়মিত বিদ্যালয়ের মিটিংগুলোতে আসতেন,তাহলে হয়তো সমস্যা এড়ানো যেত।কিন্তু অভিভাবকদের সঙ্গে খুব নিবিড়ভাবে মিশলে বোঝা যায়, পিতামাতা বা অভিভাবকদেরও আছে বিদ্যালয় সম্পর্কে ভীতি, আছে নানা রকম কুণ্ঠাবোধ, হীনম্মন্যতাবোধ।   প্রত্যেক শিক্ষক-শিক্ষিকার উচিত নিজেদের আত্মগৌরব ভুলে গিয়ে সন্তানতুল্য ছাত্রছাত্রীদের পিতামাতা, অভিভাবকদের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলা।বিদ্যালয়ের প্রতি বিকর্ষণের জায়গায় আকর্ষণ সৃষ্টি করা।প্রতিটি বিদ্যালয়ে চাই সহপাঠ্যক্রমিক কার্যাবলির স্ফূরণ ঘটানো।সহপাঠ্যক্রমিক কার্যাবলির সে কী অসীম ক্ষমতা রয়েছে তা শিক্ষক মাত্রই স্বীকার করবেন।শিক্ষাবিদ ওসমান গণীর যে বিখ্যাত উক্তি রয়েছে,এডুকেশন ইজ দ্যা মেনটিফেস্টেশন অব পারফেকশন অলরেডি ইন মেন”শিশুর ভিতরের অন্তর্নিহিত গুণাবলির বিকাশ ঘটানোই শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য এবং একে রূপ দিতে গেলে তার ভিতরের প্রতিভাকে টেনে বের করতে গেলে একমাত্র মাধ্যম হচ্ছে সহপাঠ্যক্রমিক কার্যাবলি।একটি বীজ বপন করলে তার চারাগাছে রূপান্তর থেকে শুরু করে মহীরুহ হয়ে ওঠা পর্যন্ত যে বিষয়গুলো অত্যাবশ্যক,সেগুলো হলো পানি,উপযুক্ত মাটি,বাতাস,পরিচর্যা ইত্যাদি। আমাদের পাঠ্যপুস্তকগুলোকেও হজম করে জ্ঞানে সঞ্চারিত করতে গেলে চাই সেরকম পরিচর্যা, যা সহপাঠ্যক্রমিক কার্যাবলির দ্বারা সম্পন্ন হবে।শিশুর মধ্যে আত্মবিশ্বাস, শৃঙ্খলাপরায়ণতা,সহনশীলতা,নীতিবোধ, দায়বদ্ধতা, তার দৃষ্টিভঙ্গির রূপায়ণ শুধু পরীক্ষার পড়া শেখা আর খাতায় তা উগড়ে দেওয়ার মাধ্যমেই সম্পন্ন হয় না।এর জন্য চাই দীর্ঘ অনুশীলন।সবার সামনে দাঁড়িয়ে একটি ছেলে বা মেয়ে যখন কোনো একটি গান গাইবে, বক্তৃতা বা আবৃত্তি করবে, সবার প্রশংসায় তা অপার্থিব আনন্দ নিয়ে তার কাছে ধরা দেবে।শ্রেণিকক্ষে যে ছাত্র বা ছাত্রী পিছিয়ে রয়েছে,তাকে সবার সামনে এনে দাঁড় করিয়ে তাকে দিয়ে কিছু করালে তা জাদুমন্ত্রের মতো কাজ করে।অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে,হাজার দুষ্ট প্রকৃতির ছেলেমেয়েরা আদর ভালোবাসার কাছেই হার মানে,শাস্তি দিয়ে যেটা কোনো দিনই সম্ভব নয়।বিদ্যালয়ে পড়াশোনা ভালোভাবে বজায় রেখেও করা যায় বারো মাসে তেরো পার্বণ।সকালবেলায় সম্মেলনকে যদি একটু ভিন্ন আঙ্গিকে উপস্থাপন করা যায়, সুদূরপ্রসারী ফল ফলতে পারে।

 

বিশ্ব ভালোবাসা দিবসটি শুধু প্রিয়তম-প্রিয়তমার জন্য নয়!


এস,এম শাহাদৎ হোসাইন,গাইবান্ধা প্রতিনিধি: আজ ২ ফাল্গুন ১৪ ফেব্রুয়ারী বিশ্ব ভালবাসা দিবস। দিবসটি পালনে তরুন তরুনীরা নানা সাজে সাজিয়ে মনের মানুষকে শুভেচ্ছা জানাতে কখনো ভূর করে না।এই দুনিয়ায় প্রেমিক-প্রেমিকার চিঠি চালাচালির বিষয়টি যুগে যুগে ভাস্বর। হৃ দয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে কেউ ভাল না বাসলেও, সভ্যতা খুঁড়ে প্রাচীন প্রেমপত্র খুঁজে বের করাই যায়। প্রত্নত্বত্তের পাথুরে প্রমাণ, পৃথিবীর প্রাচীনতম প্রেমপত্রটি নাকি অন্তত ৪ হাজার বছরের পুরনো। আর সেই চিঠি মানে, এক খ- পাথুরে মাটি। পাওয়া গিয়েছে ক্যালডিয়ায়। ইতিহাস থেকে জানা যায়, মেসোপটেমিয়ার এক কোণের একটা এলাকা ক্যালডিয়া, যেখানে একটা রমরমা সভ্যতা ছিল। সেখানকার লোকেরা কথা বলত- হিব্রু, আরবি, যিশুর ভাষা অ্যারামাইকসহ নানান ভাষায়। সেখানেই, সম্ভবত ২২০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে ব্যাবিলনের এক ছেলে চিঠি লিখেছিলো ইউফ্রেটিস তীরের শহর সিপারায় থাকা এক মেয়েকে। “ও আমার কাসবুয়া (ছোট্ট ভেড়ার ছানা), এই চিঠি লিখছি আমি, মারদুক (ব্যাবিলনের অধিষ্ঠাতা দেবতা)-এর ভক্ত। তোমার শরীর কেমন আছে, যদি জানতে পারতাম! থাকি ব্যাবিলনে, তোমাকে দেখিনি কোনও দিন, আর তাই খুব চিন্তায় আছি। তুমি কবে আমার কাছে আসছ? অনেক দিন বেঁচে থাকো, অন্তত আমার জন্য।” মাটির টুকরোয় লেখা এ রকম চিঠি সে কালের দিওয়ানাদের মধ্যেও চালাচালি হত। না-দেখা মেয়েটির জন্যে প্রেমিকের হৃদয় কেমন পুড়ছে! পাথুরে মাটিতে লেখা এই চিঠিতেই সেটা বোঝা যায়। বিরহী এ হৃদয়ের যন্ত্রণা বোঝাতে প্রেয়সীর কাছে সেই চিঠি পৌছে দিত মেঘদূত।এ ছাড়া ১৪৭৭ সালের ফেব্রুয়ারীতে লেখা একটা চিঠি। প্যাস্টনবাড়ির ছেলে জন প্যাস্টনকে লিখেছিলো তার প্রেমিকা মার্গারি ব্রিউস। চিঠির সম্বোধন ‘মাই রাইট ওয়েল-বিলাভেড ভ্যালেন্টাইন’। মার্গারির বক্তব্য তার শরীর-মন কোনটাই ভাল নেই। থাকবেও না, যতক্ষণ না জনের ফিরতি চিঠি আসছে। মেয়েটি লিখছে ‘আমার বিশ্বাস তুমি আমাকে ভালবাসো। জানি, তুমি আমাকে ছেড়ে যাবে না’। জন প্যাস্টন আর মার্গারি ব্রিউসের বিয়েটা পরে হয়েছিল ঠিকই। সে বিয়ে কেউ মনে রাখেনি। কিন্তু ইতিহাসে থেকে গেছে মার্গারির সেই চিঠিটা। ইংরেজি ভাষায় লেখা সেটাই প্রথম ভ্যালেন্টাইন লেটার। ভ্যালেন্টাইন, প্রেম আর বসন্তের মায়াময় সময়ের কথা সবার আগে লিখে গিয়েছেন ইংরেজ কবি জিওফ্রি চসার। চতুর্দশ শতকের শেষের দিকে লেখা তাঁর দীর্ঘ কবিতা ‘পার্লামেন্ট অব ফাউলস’ এ আছে, সেন্ট ভ্যালেন্টাইন্স ডে’তে, নরম বসন্তের দিনে পাখিরা তুমুল পাখসাটে খুঁজে নিচ্ছে নীড়বন্ধুকে। শেক্সপিয়রের ‘হ্যামলেট’ এ আবার অন্য মাত্রা। প্রেমিকের হাতে বাবা পোলোনিয়াস খুন হওয়ার পর পাগলিনিপ্রায় ওফেলিয়া গুনগুনিয়ে ওঠে,‘টুমরো ইজ সেন্ট ভ্যালেন্টাইন্স ডে, / অল ইন দ্য মর্নিং বিটাইম, / অ্যান্ড আই আ মেড অ্যাট ইয়োর উইন্ডো, / টু বি ইয়োর ভ্যালেন্টাইন’ বসন্ত বাতাসে হৃদয়ের মিথস্ক্রিয়ায় সারা বিশ্বের প্রেমপিয়াসী যুগলরা বছরের এ দিনটিকেই বেছে নেয় মনের গহিনের কথকতার কলি ফোটাতে। চ-িদাসের অনাদিকালের সেই সুর ‘দুহঁ করে দুহঁ কাঁদে বিচ্ছেদ ভাবিয়া/ আধতিল না দেখিলে যায় যে মরিয়া/ সখী কেমনে বাধিঁব হিয়া’। এ আবেদনও বাজে কারও কারও হৃদয়ে। দিনটি যে শুধু তরুণ-তরুণীদের নয়, পিতামাতা সন্তানদের ভালবাসাও বড়মাত্রায় উদ্ভাসিত করে। যারা একটু বিজ্ঞ তারা বলেন, প্রেমের কোন দিন থাকে না, ভালবাসলেই ভ্যালেন্টাইন, সেলিব্রেট করলেই ভ্যালেন্টাইন ডে। ভালবাসার এই দিনটির ইতিহাস খুঁজতে গিয়ে অনেক ধরণের কাহিনীর কথা জানা গেছে। প্রধান যে কাহিনী প্রচলিত আছে তা এক রোমান ক্যাথলিক পাদ্রি বা সন্তের কাহিনী। তার নাম সেন্ট ভ্যালেন্টাইন। তিনি ছিলেন একজন চিকিৎসক ও পাদ্রি। তখন রোমানদের দেবদেবীর পূজোর বিষয়টি ছিল মূখ্য। তারা বিশ্বাসী ছিলেন না খ্রিস্টান ধর্মে। কিন্তু খ্রিস্টান ধর্ম প্রচারের অপরাধে ২০৭ খ্রিষ্টাব্দে সাধু ভ্যালেন্টাইনের মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয় রোমের স¤্রাট দ্বিতীয় ক্লডিয়াসের আদেশে। তবে তিনি যখন জেলে বন্দী, তখন ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা ভালবাসার কথা জানিয়ে জেলের জানালা দিয়ে তাকে ছুড়ে দিত চিরকুট। বন্দী অবস্থাতেই তিনি চিকিৎসার মাধ্যমে জেলারের অন্ধ মেয়েকে ফিরিয়ে দেন দৃষ্টিশক্তি। অনুমান করা হয় মেয়েটির সঙ্গে তার প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। মৃত্যুর আগে মেয়েকে একটি চিঠি লেখেন, সেখানে তিনি উল্লেখ করেন ‘ফ্রম ইউর ভ্যালেন্টাইন’ বলে। অনেকের মতে এই সাধু ভ্যলেন্টাইনের নামানুসারে পোপ প্রথম জুলিয়াস ৪৯৬ খ্রিষ্টাব্দের ১৪ ফেব্রুয়ারীকে ভ্যালেন্টাইন ডে হিসাবে ঘোষণা করেন। আরও একটি ভ্যলেন্টাইনের নাম পাওয়া যায় ইতিহাসে। যুদ্ধের জন্য সৈন্য সংগ্রহে ছেলেদের বিয়ে করতে নিষিদ্ধ করেন রোমান স¤্রাট ক্লডিয়াস। কিন্তু যুবক ভ্যালেন্টাইন সেই নিষেধ অমান্য করে বিয়ে করেন। ফলে তাকে মৃত্যুদ- দেয়া হয়। তার নামানুসারেও এই দিনটি চালু হতে পারে এমনও ধারণা রয়েছে। ‘তোমরা যে বল তোমরা যে বল দিবস রজনী, ভালোবাসা ভালোবাসা/সখী ভালোবাসা কারে কয়’। এভাবেই কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলে গেছেন ভালোবাসার কথা। ভালোবাসা দিবস বা ভ্যালেন্টাইন’স ডে একটি বার্ষিক উৎসবের দিন যা ১৪ই ফেব্রুয়ারী ভালোবাসা এবং অনুরাগের মধ্যে উদযাপিত হয়। বিশ্বজুড়ে হাসি, আনন্দ আর ভালোবাসায় উদযাপিত হয় দিনটি। দিবসটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে উদযাপিত হয়ে থাকে, যদিও অধিকাংশ দেশেই দিনটি ছুটির দিন নয়। বর্তমান সময়ে নানা রঙ্গে, নানা আয়োজনে উদযাপন করা হলেও দিনটি শুরু হওয়ার ইতিহাস কিন্তু খুবই করুণ! এক মর্মান্তিক ভালোবাসার পরিণতি থেকেই এই দিনটির যাত্রা। ভালোবাসা দিবসটি শুধু প্রিয়তম-প্রিয়তমার জন্য নয়। এই দিবসের তাৎপর্য বিশাল ও সর্বজনীন। সন্তানের প্রতি পিতামাতার অপত্য স্নেহ এবং পিতামতার প্রতি সন্তানের আন্তরিক সংবেদন সব মিলিয়েই ভালোবাসার এই দিন। আদরের ছেলেমেয়ের জন্য বাবা-মার থাকবে অসীম মঙ্গল প্রার্থনা। ছেলেমেয়েও শ্রদ্ধা-ভালোবাসায় সিক্ত করবে বাবা-মাকে।

সামাজিকভাবে গণসচেতনতার মাধ্যমে বাল্য বিয়ে প্রতিরোধ সম্ভব


রায়হান আহমেদ তপাদার  আমাদের বিভিন্ন সামাজিক সমস্যার মধ্যে বাল্যবিয়ে অন্যতম।এ সমস্যাটি পুরনো।ছেলেমেয়ের অভিভাবকদের অনেকটা অসচেতনতার কারণে আমাদের সমাজে বাল্যবিয়ে রোধ করা যাচ্ছে না।এ কারণে সরকার বাল্যবিয়ে বন্ধে একটি আইনের খসড়া তৈরি করেন।অনেক আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে বাল্যবিয়ে নিরোধ আইন-২০১৬ গত ২৪ নভেম্বর মন্ত্রিসভায় তা অনুমোদন পায়।বাল্যবিয়ে আমাদের সমাজে একটা অভিশাপ।কন্যাশিশুরা আমাদের দেশে বেশির ভাগ অবহেলার শিকার,নির্যাতনের শিকার। আমাদের সমাজে যতটা পুত্রসন্তান আদরের ততটা কন্যাসন্তান নয়।এখনো বাংলাদেশে অধিকাংশ অভিভাবক পুত্রসন্তানের প্রতি দুর্বল।কন্যাসন্তান জন্ম নিলে পরিবারের প্রায় অধিকাংশ সদস্যই অনেকটাই মনঃক্ষুণ্ন হয়।নিম্নবিত্ত দরিদ্র পরিবারে এর প্রাধান্য বেশি। একদিকে দরিদ্রতা,লেখাপড়ার খরচ,বিয়েতে যৌতুক, নারী নির্যাতনসহ বিভিন্ন কারণে সদা সর্বদা কন্যাসন্তানকে নিয়ে চিন্তিত ও উদ্বিগ্ন থাকতে হয় অভিভাবককে।কিন্তু তাদের এ ধরনের চিন্তা-ভাবনা বর্তমান সামাজিক প্রেক্ষাপকে অমূলক না হলেও এর একটু পরিবর্তন ঘটাতে পারলে আমাদের সমাজে বাল্যবিয়ের হাত থেকে অনেক সন্তান রেহাই পেতে পারে। যা হোক, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব অল্প বয়সে কন্যাসন্তানের বিয়ে দিয়ে অনেক অভিভাবক দায় বা ঝামেলা মুক্ত হতে চান।অথচ উপযুক্ত পরিবেশ পেলে এ কন্যাশিশুটিই একদিন লেখাপড়া শেষ করে স্বাবলম্বী হয়ে পিতা-মাতার পাশে এসে দাঁড়াতে পারে। যেখানে পুত্রসন্তান পারে না এমন দৃষ্টান্ত আমাদের সমাজে রয়েছে।কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে,আমাদের সমাজের নারী শিক্ষার্থীদের বিয়ে দেয়া হয় ক্লাস সিক্স বা সেভেনে অধ্যয়নরত অবস্থায়।আমাদের গ্রামাঞ্চলে নারী শিক্ষার্থী অল্প বয়সে বিয়ে হয় মূলত অর্থনৈতিক কারণে।  একবার অভিভাবকরা ভাবেন না তার মেয়ে শ্বশুরবাড়িতে কতটা খাপ খাইয়ে চলতে পারবে,মেয়েটি কতটা সুখী,কতটা শারীরিক ও মানসিক দিক থেকে কতটা স্বাভাবিক এসব বিষয় কোনো অভিভাবক ভাবেন না।তাই বাল্যবিয়ের পর দেখা যায় বছর ছয় মাস পর মেয়েটির সংসার আর টেকে না তালাকপ্রাপ্ত হয়ে আবার পিতা-মাতার কাঁধে ঝুলে পড়ে।আবার দেখা যায় বিয়েতে রাজি না হলে অভিভাবকের কঠোরতায় শেষ পর্যন্ত মেয়েটি আত্মহত্যা করতেও বাধ্য হয়।

অতিসম্প্রতি শরীয়তপুর সদর উপজেলার মধ্যপাড়া গ্রামের পঞ্চম শ্রেণির একজন ছাত্রী আত্মহত্যা করে,যদিও অবিভাবকরা বলছে মেয়েটি হৃদরোগে মারা গেছে।তাই প্রতিটি অভিভাবককে বিশেষ করে নিম্নবিত্ত পরিবারের প্রধানকে সচেতন হতে হবে যাতে তাদের কারণে মেয়েটির জীবন নষ্ট না হয়। আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজে বাল্যবিয়ে একটি গুরুতর সমস্যা।এসমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য সরকার বাল্যবিয়ে নিরোধ আইন-২০১৬ এর খসড়া মন্ত্রিসভায় অনুমোদন করেন।কোন আইনই যখন কাজে আসছে না তখনই দরকার গণসচেতনতা।বাল্যবিয়ে শুধু আমাদের সমাজে নতুন নয় যুগের পর যুগ ধরে এ অভিশাপ চলে এসেছে। বাল্যবিয়ে নিরোধ আইন ১৯২৯ রহিত করে নতুন বাল্যবিয়ে নিরোধ আইন (খসড়া) এবং২০১৬ মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত হয়।বাংলাদেশের সংবিধান ও আইনের দৃষ্টিতে প্রত্যেক সাবালক নাগরিকের বিয়ে করার পূর্ণ অধিকার রয়েছে।এখন কতবছর বয়স হলে একজন পুরুষ সাবালক বলে গণ্য হবে।আইনানুযায়ী তাদের বয়স পুরুষের ক্ষেত্রে ২১ এবং নারীর জন্য ১৮ বছর।এটাই আইনগত বিয়ের বয়স।এর কম বয়সে বিয়ে হলে তা আইনের আওতায় পড়ে না এবং তা বাল্যবিয়ে হিসেবে গণ্য হবে।আবার ১৯২৯ সালের আইনেও মেয়েদের বয়স ১৮ ছিল।মন্ত্রিসভায় সদ্য অনুমোদিত বাল্যবিয়ে নিরোধ আইন-২০১৬-তে মেয়েদের বিয়ের বয়স ১৮ রাখলেও ‘বিশেষ ক্ষেত্রে’সর্বোত্তম স্বার্থে আদালতের নির্দেশে এবং মা-বাবার সম্মতিতে যে কোনো অপ্রাপ্ত বয়স্ক মেয়ের বিয়ে হতে পারবে।তবে বিশেষ ক্ষেত্রে ১৮-এর নিচে কত বছর বয়সে বিয়ে হতে পারে তা আইনে নির্দিষ্ট করে বলা নেই।   ২০১৫ সালে মেয়েদের বিয়ের বয়স ১৬ বছর ধরা হয়। ১৬ বছর হলেও আমাদের জন্য তা হবে আত্মঘাতী। ১৬ বছর বয়সে যেখানে একটি মেয়ে স্কুলের গন্ডি পেরোতে পারে না সেখানে এ বিয়েতে আইনগত বৈধতা দেয়া হলে তা মঙ্গলজনক হবে না।সরকার বাল্যবিয়ে নিরোধ আইন ২০১৪ খসড়া পরিবর্তন করে একটি লাইন সংযোজন করেছে। বিশেষ শর্ত সাপেক্ষে ১৬ বছর বয়সে বিয়ে।এ আইনটি আগামী ৫ বছরের জন্য সরকার বহাল রাখতে চান। যদি,তবে, কিন্তু, বিশেষ ক্ষেত্রে, শর্ত সাপেক্ষে কোনোভাবেই মেয়েদের বিয়ের বয়স ১৬ বছর করা ঠিক হবে না। সবার মনে রাখা উচিত যেখানে শর্ত থাকে তা ভঙ্গ সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়।বিশেষ শর্তসাপেক্ষে এ শব্দই বাল্যবিয়েকে উৎসাহিত করবে।তাই শর্তহীনভাবে মেয়েদের বিয়ের বয়স ১৮ বছর রাখা যুক্তিসঙ্গত। কারণ ১৬ বছরে বিয়ে হলে এ বয়সে একজন নারী কীভাবে সংসার চালাবে শারীরিক, মানসিক দিক থেকে ভেঙে পড়বে এবং অল্প বয়সে সন্তান হলে মা ও শিশু উভয়ে স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়বে। উপরন্তু নানা সমস্যা দেখা দেবে। তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে মানসিক ও সংসার জীবনে অশান্তি। এ মানসিক অশান্তি শেষ পর্যন্ত সংসার ভেঙে যাওয়ার পর্যায়েও যেতে পারে।এ দেশে একটি কন্যাশিশুর জন্ম যেন অভিশাপ। আমাদের সমাজে একজন মা তার অনাগত সন্তান ছেলে না মেয়ে হবে এ নিয়ে কুণ্ঠিত থাকে প্রতিনিয়ত। যদি ছেলে হয় তাহলে শঙ্কা কেটে যায় আর যদি কন্যাশিশু হয় তাহলে তাকে নিয়ে দুশ্চিন্তা আরও বেড়ে যায়।

এর কারণ হচ্ছে মেয়েকে বিয়ে দিতে যৌতুক বর্তমানে যে নারীর প্রতি সহিংসতা বাড়ছে তা নিয়ে চিন্তা। তাই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব মেয়ের বিয়ে দিতে চান অভিভাবকরা। দরিদ্রতা নারীর প্রতি সহিংসতা, বাল্যবিয়ের অন্য কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম।বর্তমানে সারাদেশে কন্যাশিশুর সংখ্যা ২ কোটি ৯১ লাখ ৮১ হাজার।আদমশুমারি ও গৃহ গণনা অনুযায়ী ২০১৬ সালে বাংলাদেশে ০-১৭ বছর বয়সী ও কন্যাশিশুর সংখ্যা ২ কোটি ৯১ লাখ ৮১ হাজার গণনা করা হয়।  আমাদের দেশে শিক্ষার হার বাড়লেও সামাজিক সচেতনতা বাড়েনি। নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন হয়নি। যার কারণে অন্ধ কুসংস্কার, অসচেতনতা, অশিক্ষা, প্রকৃত ধর্মীয় জ্ঞানের অভাবে ছেলে শিশুদের তুলনায় কন্যাশিশুরা নানাদিক থেকে বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। উপরন্তু বাল্যবিয়ে আমাদের শিশুদের সুরক্ষা একটি বড় বাধা।আগেই উল্লেখ করা হয়েছে সরকার ইতোমধ্যে মেয়ের সর্বনিম্ন বয়স ১৮ বছর ও ছেলের ২১ বছর ঠিক রেখেই বাল্যবিয়ে নিরোধ আইন-২০১৬’র খসড়া চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। প্রতিটি সরকারই নতুন প্রজন্ম ও অনাগত শিশুর সুরক্ষার জন্য এবং তাদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে কত নীতি-আদর্শ গ্রহণ করেন। বাল্যবিয়ে রোধে আইনের খসড়া মন্ত্রিসভায় অনুমোদন পেয়েছে। কিন্তু সেখানে এক জায়গায় একটু ফাঁক রাখা হয়েছে যা বাল্যবিয়ে উৎসাহিত করবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বিশেষ ক্ষেত্রে’ ‘সর্বোত্তম স্বার্থে’ আদালতের নির্দেশে এবং মা-বাবার সম্মতিতে অপ্রাপ্ত বয়স্ক মেয়ের বিয়ে হতে পারবে। এ হতে পারাকে ইস্যু করে অনেক অভিভাবক তাদের সন্তানকে ১৮ বছরের আগেই বিয়ে দেয়ার একটা সুযোগ পেয়ে গেল। এ প্রসঙ্গে ‘আমরাই পারি পারিবারিক নির্যাতন প্রতিরোধ’ কমিটির চেয়ারম্যান ও বিশিষ্ট মানবাধিকারকর্মী সুলতানা কামাল বলেছেন, মন্ত্রিসভায় অনুমোদন পাওয়া বাল্যবিয়ে নিরোধ আইন প্রত্যাহার ও পরিবর্তনের দাবি জানিয়ে বিশেষ প্রেক্ষাপটে ১৮ বছরের নিচে মেয়েদের বিয়ে দেয়া যাবে বলে যে আইন করা হয়েছে এ আইনের মাধ্যমে বাল্যবিয়ে রোধ নয় আরও বাড়বে।এমন কি প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভী বাল্যবিয়েসংক্রান্ত আইনের সব ফাঁকফোকর বন্ধ করার পক্ষে মত দিয়েছেন। এদিকে বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতিসহ বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক নারীবাদী সংগঠন ও বিশিষ্ট ব্যক্তিরা শর্তহীনভাবে চাচ্ছেন মেয়েদের বিয়ের বয়স ১৮ বছর।  আমাদের সমাজে কিছু সমস্যা রয়েছে যা সম্মিলিতভাবে প্রতিরোধ সচেতনতা সৃষ্টির দ্বারা অনেকটা রোধ করা সম্ভব।বাল্যবিয়ের বিরুদ্ধে আমাদের সমাজ যদি একটু সচেতন হয় তাহলে এর প্রভাব থেকে এ দেশের হাজারও নারী মুক্তি পাবে।পুরুষতান্ত্রিক সমাজে পুরুষরা বাল্যবিয়ের বিরুদ্ধে তেমন সোচ্চার না হলেও কিন্তু মেয়েরা বসে নেই।

আমাদের সমাজে কিছু মেয়ে আছে যারা অসম্ভবকে সম্ভব, অজয়কে জয় করেছে। নিশাদ মজুমদার হিমালয় জয় করেছে। মেয়েরা এখন অনেক সাহসী।নিজের ভবিষ্যৎ,স্বপ্ন সম্ভাবনাকে তারা বিনষ্ট করতে চায় না। তাই ঘুণেধরা সমাজব্যবস্থায় অন্ধ অনুকরণ, বিশ্বাস ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে তারা সোচ্চার। সাহসী প্রতিবাদী মন নিয়ে বরগুনার মেয়ে ফারাজানা যৌতুকের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে। এমনকি নিজের বিয়ের আসরে যৌতুক চাওয়ার অপরাধে বরকে সঙ্গে সঙ্গে তালাক দিয়ে সবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে অন্যায় অশুভর কাছে শুভ ও মুক্তবুদ্ধির পরাজয় কখনো হয় না। প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত বলেই যৌতুক চাওয়া ফারাজানার আত্মসম্মানে বাধছে। তাই বিয়ের অনুষ্ঠানে বরকে তালাক দিয়ে উপস্থিত সবাইকে চমকে দেয়। ঠিক একইভাবে বাল্যবিয়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে নিজের বিয়েও ভেঙে দেয় গাজীপুরের সাহিদা আক্তার স্বর্ণা। শুধু নিজ এলাকায় বা গ্রামে নয় যেখানে বাল্যবিয়ে সেখানে স্বর্ণার উপস্থিতি। স্বর্ণার স্বপ্ন গ্রামের গন্ডি পেরিয়ে দেশের অবহেলিত শিশু ও নারীদের পাশে দাঁড়ানো।স্বর্ণা বর্তমানে ‘প্ল্যান বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল শিশু সুরক্ষা’ দলের সদস্য।শুধু বাল্যবিয়ের বিরুদ্ধেই নয় স্বর্ণা শিশুদের মৌলিক অধিকার,খাদ্য,বস্ত্র,বাসস্থান,শিক্ষা,চিকিৎসা ও বিনোদন বিষয়ে জনগণের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর কাজ করে যাচ্ছে।স্বর্ণা ইতোমধ্যে শিশু ও নারীবিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলনেও অংশ নিয়েছে।   নিজের আত্মসম্মান,মর্যাদা অস্তিত্ব রক্ষা,ভবিষ্যৎ স্বপ্ন,সম্ভাবনাকে এগিয়ে নেয়ার জন্য প্রয়োজন সাহস, প্রতিবাদী মনোভাব।ফারাজানা স্বর্ণা, শারমিন আমাদের অহঙ্কার,আমাদের গর্ব।এরকম হাজারো ফারাজানা, স্বর্ণা,শারমিন বাল্যবিয়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াক, জন্ম নিক মাতৃজঠে।ইউনিসেফের এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়,বাংলাদেশে ১৮ বছরের আগে ৬৬ শতাংশ মেয়ে এবং একই বয়সে ৫ শতাংশ ছেলের বিয়ে হচ্ছে।বাংলাদেশে ১০ থেকে ১৯ বছর বয়সের দুই-তৃতীয়াংশ কিশোরীর বিয়ে হয়।সেভ দ্য চিলড্রেনের প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুযায়ী জানা যায়,বাংলা দেশের গ্রামাঞ্চলে ৬৯ শতাংশ নারীর ১৮’র আগেই বিয়ে দেয়ার কারণে তারা নানা বৈষম্য ও নির্যাতনের কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়।এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে দেশের ৬৮ শতাংশ কন্যাশিশু বিয়ের শিকার এবং তাদের মধ্যে মাত্র ৭ শতাংশ পরবর্তী সময়ে লেখাপড়া চালিয়ে যেতে পারে।বেশির ভাগ মেয়েই লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায় এবং তারা স্বামী-সংসার কাজে নিয়োজিত থেকে এক সময় তারা শিশুমায়ে পরিণত হয়।এমনকি তারা অল্প বয়সে সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে মৃত্যুর মুখে পতিত হয়। অথবা স্বাস্থ্যহীন,অস্বাস্থ্য,পুষ্টিহীন আরেক শিশুর জন্ম দেয়।আমাদের দেশে অধিকাংশ কন্যাশিশুর বিয়ে হচ্ছে ১৮ বছরের আগেই।তাই যে কোনোভাবেই বাল্যবিয়ে রোধ করতে হবে। স্কুলের সহপাঠী, শিক্ষক, সাংবাদিক, স্থানীয় প্রশাসনের হস্তক্ষেপে বাল্যবিয়ে ভেঙে দেয়ার ঘটনা আমরা বিভিন্ন গণমাধ্যমে দেখতে পাই।এমনকি বর-কনের অভিভাবককেও জেল জরিমানা দেয় ভ্রাম্যমাণ আদালত।তাই আইনের সুষ্ঠু প্রয়োগের পাশাপাশি সবাইকে বাল্যবিয়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে, গড়ে তুলতে হবে সামাজিক আন্দোলন।সরকারও চাচ্ছে বাল্যবিয়ে বন্ধ হোক, এজন্য আইনও করা হয়েছে। কিন্তু বিশেষ ক্ষেত্রে বাল্যবিয়ে হতে পারে আইনের এ ১৯ নাম্বার ধারা বাল্যবিয়ে রোধ করবে কীভাবে?তাই বাল্যবিয়ে নিরোধ আইনে বয়সের দিক থেকে কোনো শর্তারোপ বাল্যবিয়ে রোধের ক্ষেত্রে বড় বাধা।শর্তহীনভাবে ছেলেমেয়ের বিয়ের বয়স ২১-১৮ করা হোক।পাশাপাশি আইন ভঙ্গকারীর বিরুদ্ধে শাস্তির ব্যবস্থা,সামাজিকভাবে গণসচেতনতার মাধ্যমে বাল্য বিয়ে অনেকটা রোধ করা সম্ভব।এ আইন যেন কোনোভাবেই শুভঙ্করের ফাঁকিতে পরিণত না হয়।

প্রত্যেকের আত্ম-কৈফিয়ত জাগ্রত হোক !


বিচিত্র আমাদের চিন্তা-ভাবনা । চরিত্রহীনতা বলতে আমরা শুধু দু’জন নারী-পুরুষের, তরুণ-তরুণীর প্রথা-রীতি বিবর্জিত হয়ে গোপনে কথা বলা, নির্জনে সময় কাটানোকেই নির্দেশ করি । নারী-পুরুষের অবৈধ যোগে চরিত্রহীনতার গন্ডিকে আঁকড়ে রেখেছি । ঘুষ খাওয়া, অন্যায়ের সাথে আপোষ করা, কাউকে ঠকানো, মিথ্যা বলা, গোপনে কিংবা প্রকাশ্যে যে কোন ধরনের ছোট-বড় অপরাধ করাও যে চরিত্রহীনতার চরম প্রকাশ-তা যেনো আমাদের বিশ্বাসেই নাই । অবশ্য ‘চরিত্র’ নামক মানদন্ডকে আমরা বোধহয় সঠিকভাবে সংজ্ঞায়ণ এবং মুল্যায়ণ করতে পারিনি কিংবা শিখিনি । অভ্যাস+স্বভাবের ধারাবাহিকতায় সৃষ্টি হয় চরিত্রের । সমাজ অস্বীকৃত নারী-পুরুষের চালচলন-মেলামেশাকেই শুধু চরিত্রহীনতার মোড়কে আবদ্ধ করে বাকী সব মহা মহা অন্যায়ের সাথে জড়িত হয়েও আমরা চরিত্রহানী ঘটেছে বলে উচ্চারণ করিনা । অথচ যা কিছু বিবেক বর্জিত, সমাজ-রীতি বিরুদ্ধ, নৈতিক নীতি অসমর্থিত তার সাথে জড়িত হওয়ার অর্থই চরিত্রের অবদমন, এ সহজ-সরল সত্যের মুখোমুখি হওয়ার সাহস আমাদের থাকা উচিত । ….আপনি/আমি ভালো কি মন্দ তা সম্পূর্ণ শুদ্ধভাবে নির্ধারনের জন্য কোন উচ্চতর কর্তৃপক্ষের সৃষ্টি ধূলোর পৃথিবীতে আজও হয়নি । অথচ আপনার/আমার নিজের সম্পর্কে অবশ্যই অজানা নাই-আমরা কেমন ? সেই বুঝতে পারার বয়স থেকে হুঁশ থাকার সময় অবধি কোথায়, কোন অন্যায়ের সাথে জড়িয়েছি, কোথায় প্রতারণা করেছি, কার অধিকার খর্ব করেছি,ঠকিয়েছি-তা একটু চোখ মুদলেই মনে পড়ে যাবে । পশুর সাথে মানুষের ব্যবধান শুধু এটুকুই যে, মানুষের বুদ্ধি আছে; পশুর যা নেই । শক্তিতে নিশ্চয়ই মানুষের চেয়ে হাতি এগিয়ে । অথচ শুধু ‍বুদ্ধির বড়াত্বেই পালের পর পাল হাতিকে মানুষ পোষ মানিয়েছে । ক্ষণজন্মের ভার নিয়ে মানুষ হয়েও জন্মে যদি বিবেকের সুচারু প্রকাশ-প্রয়োগ না ঘটানো্ যায় তবে জীবনের মূল লক্ষ্যই বোধহয় বৃথা গেলো । ক্ষুধা নিভৃতি আর ভোগের স্পৃহা তো হিংস্র জানোয়ারেও থাকে । জীবনকালে বিবেকের উৎকর্ষত যদি না ঘটানো যায় তবে তাকে মানুষ বলি কিসে ?আইন কিংবা শাস্তির ভয় সর্বদা মানুষকে অপরাধ থেকে নিভৃত রাখতে পারে না । কেননা দুষ্টু মন (mens REA) মানুষকে বিপথে যেতে উৎসাহ দেয় । তবে সুস্থ বিবেক এবং আত্মজিজ্ঞাসার চর্চা থাকলে মানুষ এমন কোন অপরাধে জড়াতে পারে না যা ব্যক্তি, সমাজ এবং রাষ্ট্রের মর্্য্যাদাহানী ঘটায় ও অধিকার খর্ব করে । বৃহৎ স্বার্থে আইনের শাসন শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য আবশ্যকীয় কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থ এবং ব্যক্তিত্ব রক্ষায় আত্মজিজ্ঞাসু মনোভাব অব্যর্থ দাওয়া হিসেবে কাজ করে । নৈতিক শিক্ষায় উদ্বুদ্ধ করে/হয়ে যদি সবার মধ্যে আত্মজিজ্ঞাসা, বিবেক-বোধের চর্চা জাগ্রত করা যায় তবে অপরাধের সংখ্যা কমে আসবে এবং সুশাসনের বায়ু বইবে সর্বত্র । সর্বসাধারণের অধিকার প্রতিষ্ঠা ছাড়া শান্তি প্রতিষ্ঠার দাবী অবান্তর । পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্র কাঠামোর দায়িত্বশীলদের এটুকু সত্য অন্তত উপলব্ধি করার মানসিকতা রাখতে হবে ।

একুশের চেতনায় গ্রন্থমেলা

Rayhan Ahmed Topader London

গ্রন্থমেলা বা বইমেলা,বাঙালির প্রাণের মেলা,সাংস্কৃতিক ও ঐতিহ্যের মেলা।প্রতি বছর ১ ফেব্রুয়ারী থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গনে অনুষ্ঠিত বই বিক্রির মহৎসবকে আমরা বইমেলা হিসেবে জানি।বইমেলা কিংবা গ্রন্থমেলা শব্দ দুটি যেন বাঙালির প্রাণের স্পন্দে স্পন্দে রন্ধিত রয়েছে।ফেব্রুয়ারি আসলেই প্রতিটি বাঙালির নিশ্বাসে নিশ্বাসে ধ্বনিত হয় এই বইমেলা।বইমেলা শব্দটি শুনলেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে বাংলা একাডেমি আয়োজিত অমর একুশে গ্রন্থমেলা বইপ্রেমী মানুষের প্রাণে দোলা দেয়; জাতিসত্তার শক্তিবলে লাখ লাখ মানুষকে টেনে আনে একাডেমির বর্ধমান হাউস প্রাঙ্গণে।আশপাশ ঘিরে জমে ওঠে লেখকদের জমজমাট আড্ডা;কাটে লেখক ও প্রকাশকদের নির্ঘুম রাত।প্রকাশিত হয় হাজার হাজার বই।নতুন বইয়ের মৌ মৌ গন্ধে মোহিত হয় মেলায় আসা পাটক ও দর্শনার্থীরা।কিন্তু আমরা হয়ত অনেকেই জানি না এই বইমেলার ইতিহাস।কিভাবে শুরু হলো এই বইমেলা?কে বাঙালির এই প্রাণের মেলার প্রারম্ভক?১৯৭২ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি বাংলা একাডেমীর বর্ধমান হাউসের সামনের বটতলায় চটের ওপর কলকাতা থেকে আনা ৩২টি বই সাজিয়ে বিক্রি শুরু করেন শ্রী চিত্তরঞ্জন সাহা।তিনিই আমাদের প্রাণের এই বইমেলার প্রারম্ভক।তার আনা ৩২টি বই ছিল তার নিজ প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন বাংলা সাহিত্য পরিষদ (বর্তমানে মুক্তধারা প্রকাশনী) থেকে প্রকাশিত মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতে অবস্থানকারী বাংলাদেশি শরণার্থী সাহিত্যিকদের লেখা বই।১৯৭৩ সালে বাংলা একাডেমি বই মেলা উপলক্ষে ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে ২১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিশেষ হ্রাসকৃত মূল্যে বাংলা একাডেমি প্রকাশিত বই বিক্রির ব্যবস্থা করে। বাংলা একাডেমির পাশাপাশি মুক্তধারা প্রকাশনী,স্টান্ডার্ড পাবলিশার্স এবং আরও কয়েকজন বাংলা একাডেমির মাঠে নিজেদের প্রকাশিত বই বিক্রি শুরু করে।১৯৭৪ সালে বাংলা একাডেমি ১৪ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সাহিত্য সম্মেলনের আয়োজন করে।   ১৯৭৮ সালে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন আশরাফ সিদ্দিকী।তিনি বইমেলার গুরুত্ব কিছুটা হলেও বুঝতে পারেন।তার স¦উদ্যোগে বাংলা একাডেমিকে মেলার সঙ্গে সম্পৃক্ত করা হয়।শুরু হয় বইমেলার গুরুত্বপূর্ণ এক অধ্যায়ের।তারপর ১৯৭৯ সালে মেলার সঙ্গে যুক্ত হয় চিত্তরঞ্জন সাহা প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ পুস্তক বিক্রেতা ও প্রকাশক সমিতি।অমর একুশে ফেব্রুয়ারির উপর লক্ষ রেখে ৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বইমেলা অনুষ্ঠিত হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় বাংলা একাডেমি এবং বইমেলার নামকরণ করে ‘একুশে গ্রন্থমেলা’ ১৯৭৯ সাল থেকে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত এই নিয়মেই ‘একুশে গ্রন্থমেলা’পালিত হয়।আবার ১৯৮১ সালে একুশে গ্রন্থমেলায় পরিবর্তন আনে বাংলা একাডেমি কর্তৃপক্ষ। ‘একুশে গ্রন্থমেলা’র মেয়াদ কমিয়ে ২১ দিনের পরিবর্তে ১৪ দিন ধার্য করে বাংলা একাডেমি।কিন্তু প্রকাশকরা বাংলা একাডেমির এ সিন্ধান্ত মেনে নিতে পারেনি। তারা বাংলা একাডেমির এ সিন্ধান্তের বিরুদ্ধে তাদের দাবি তুলে ধরে। প্রকাশকদের এ দাবির মুখে ১৯৮২ সালে ‘একুশে গ্রন্থমেলা’র মেয়াদ পুনরায় বৃদ্ধি করতে বাধ্য হয়ে পূণরায় মেলার মেয়াদ করা হয় ২১ দিন করে এবং মেলার উদ্যোক্তা হিসেবে বাংলা একাডেমি সে মেলার আয়োজন করে।১৯৮২ সালের ঐ মেলায় সহযোগি হিসেবে ছিল জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র এবং বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতি।১৯৮৩ সালে বাংলা একাডেমির মহা পরিচালক হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন কাজী মনজুরে মওলা। তিনি বিশেষ কারণে সহযোগি প্রতিষ্ঠান থেকে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রকে বাংলা একাডেমি বাদ দিয়ে দেয়।কি কারণে বাদ দিয়ে দেয় সে তথ্য বাংলা একাডেমি প্রকাশ করেনি। বরংবাংলা একাডেমি সে সময় প্রচার করে ‘একুশে বইমেলা’কে নতুন আঙ্গিকে প্রসার করার কারণেই জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রকে বাদ দেওয়া হয়েছে।  আমরা জানি,অমর একুশে গ্রন্থমেলা শুধু বইমেলা নয়; বাঙালী জাতির আবেগ, অনুভূতি,সংস্কৃতি,ঐতিহ্য ও বাঙালী জাতির গৌরবদীপ্ত বিজয়ের বুদ্ধিবৃত্তিক এবং সাংস্কৃতিক জাগরণের প্রতীক।প্রতি বছর ফিরে আসে এই গ্রন্থমেলা।এই গ্রন্থমেলা পৃথিবীর আর দু’পাঁচটা বইমেলার মতো নয়।আমাদের বইমেলার ইতিহাস নিয়ে একটু কথা বলা যেতে পারে।শুধু দেশের মানুষ নয়,প্রবাসী বাঙালীদের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ অপেক্ষা করে এই গ্রন্থমেলার জন্য।পৃথিবীর কোথাও এতদিনব্যাপী বইমেলা হয় না।এবার তো ২৯ দিনের গ্রন্থমেলা।নানান দেশের নানান রকমের বইমেলার কথা জানি।প্রায় সবক’টিই আন্তর্জাতিক বইমেলা।যেমন দিল্লীর আন্তর্জাতিক বইমেলা হয় নয়দিনের; এবারে ৭ জানুয়ারি থেকে ১৫ জানুয়ারি পর্যন্ত হয়েছে।কলকাতার বইমেলা শুরু হয়েছে ২৫ জানুয়ারি এবং ৫ ফেব্রুয়ারি শেষ হবে।লন্ডনের তিনদিনের বইমেলা এপ্রিলের ১২ থেকে ১৪ তারিখ পর্যন্ত হবে।পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বইমেলা হয় জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্ট শহরে,যা প্রতি বছর ১৯ অক্টোবর থেকে ২৩ অক্টোবর পর্যন্ত ৫ দিনে শেষ হয়।তেহরানে আন্তর্জাতিক বইমেলা হয় ১১ দিনের;এবার শুরু হবে ৩ মে আর চলবে ১৩ মে পর্যন্ত।দুবাইয়ের আন্তর্জাতিক বইমেলা ২৬ এপ্রিল শুরু হবে এবং ৭ দিন চলবে। আগরতলার বইমেলা চলে ১২ দিনব্যাপী। অর্থাৎ আমাদের মতো মাসব্যাপী গ্রন্থমেলা পৃথিবীর কোন দেশে হয় না।বাংলাদেশের সবার আগে বইমেলা হয় যশোর জেলায়।এ আয়োজন আজও বাংলাদেশের সংস্কৃতি জগতে একটি অনন্য ঘটনা হিসেবে পরিচিত।ড.মুহম্মদ এনামুল হক,শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন,কামরুল হাসান,শওকত ওসমান,আবদুল গনি হাজারী,পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের সচিব অধ্যাপক আহমদ হোসেনসহ দেশের তৎকালীন সম্মুখভাগের বুদ্ধিজীবীদের আন্তরিক সহযোগিতায় এ মেলা অত্যন্ত সাফল্য লাভ করে।   গ্রন্থমেলাটির আয়োজন হয়েছিল বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে,২০ থেকে ২৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত।উদ্বোধন করেছিলেন বাংলাদেশের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আবু সাঈদ চৌধুরী। প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ বাঁধভাঙ্গা জোয়ারের মতো মেলাপ্রাঙ্গণ যেমন মুখরিত রেখেছিল,পাশাপাশি তেমনই মেলবন্ধন ঘটেছিল লেখক-প্রকাশকসহ গ্রন্থপ্রেমী সংস্কৃতিসেবীদের।মেলায় অংশ নেয় সে সময়কার প্রায় সকল উল্লেখযোগ্য প্রকাশক, ভারতের ন্যাশনাল বুক ট্রাস্ট, ঢাকায় অবস্থিত সোভিয়েত ব্লকের প্রায় সকল দূতাবাস, ব্রিটিশ কাউন্সিল ও আমেরিকান দূতাবাস।বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে বেসরকারীভাবে বই বিক্রির সূত্রপাত ঘটে অনানুষ্ঠানিকভাবে।১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের বাংলা একাডেমি বিশেষ মাত্রা পায়।এ উপলক্ষে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে প্রচুর জনসমাগম হয়।মুক্তধারার শ্রী চিত্তরঞ্জন সাহা ওই উপলক্ষে মুক্তিযুদ্ধকালে কলকাতায় প্রকাশিত বিভিন্ন বইসহ কতিপয় সদ্য প্রকাশিত বই বাংলা একাডেমির মাঠে বিক্রির ব্যবস্থা করেন।১৯৭৩ সালে বাংলা একাডেমি মহান একুশে মেলা উপলক্ষে ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে ২১ ফেব্রুয়ারি বিশেষ হ্রাসকৃত মূল্যে নিজস্ব বই বিক্রির ব্যবস্থা করে। পাশাপাশি মুক্তধারা, স্ট্যান্ডার্ড পাবলিশার্স এবং দেখাদেখি আরও কেউ কেউ বাংলা একাডেমির মাঠে নিজেদের বই বিক্রির ব্যবস্থা করে। ১৯৭২ কিংবা ১৯৭৩ সালে এজন্য কোন স্টল তৈরি হয়নি। ১৯৭৪ সালে বাংলা একাডেমি ১৪ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সাহিত্য সম্মেলনের আয়োজন করে। বঙ্গবন্ধু ওই সম্মেলনের উদ্বোধন করেন। এ উপলক্ষে বাংলা একাডেমি তার নিজস্ব প্রকাশিত বই প্রদর্শন ও ম্যুরাল প্রদর্শনীর আয়োজন করে। বই প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন প্রফেসর আবু মহাম্মেদ হবীবুল্লাহ।ওই গণজমায়েতকে সামনে রেখে ঢাকার বিভিন্ন প্রকাশক বাংলা একাডেমির পূর্বদিকের দেয়াল বরাবর নিজেদের পছন্দমতো জায়গায় যে যার মতো কিছু স্টল নির্মাণ করে বই বিক্রির ব্যবস্থা করেন।  আমরা জানি,গণতন্ত্র ও মুদ্রণ অঙ্গাঙ্গি সম্বন্ধে যুক্ত। সুনাগরিক গড়ে তুলতে জনগণের হাতে বই তুলে দেয়া দরকার।পুঁথির যুগে এটা সম্ভব ছিল না।বইয়ের মাধ্যমে নানা ভাবনার সংমিশ্রণে ব্যক্তিগত ধারণা ও বিশ্বাস দৃঢ় হয়।যেসব নাগরিক নিজস্ব সুচিন্তিত মতবাদের উপর আস্থাবান তারাই গণতন্ত্রের সম্পদ।আর এ রকম নাগরিক পেতে হলে দেশের লোকের হাতে বই দিতে হবে। অনেক বই নানা বিষয়ের এবং বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে লেখা। শুধু বই নয়,পত্রপত্রিকাও।বইয়ের বিকল্প যদি বা পুঁথির মধ্যে সামান্য কিছু পাওয়া যায়,পত্রিকার প্রভাবশালী জগত একান্ত মুদ্রাযন্ত্রের সৃষ্টি।সংবাদপত্র দেশ ও পৃথিবীকে আমাদের ঘরের মধ্যে এনে দিয়েছে।বই ও পত্রিকার প্রচার না ঘটলে জাতীয়তাবোধ এবং আন্তর্জাতিক ভাবনার বিকাশ ঘটত কিনা সন্দেহ।দেশ-বিদেশে অবস্থানরত বাঙালি ও তৎকালীন বাংলাদেশ সরকারের প্রচেষ্টায় ১৯৯৯ সালে মহান একুশে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে।একই বছরের ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কো একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা হিসেবে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়।ফলে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে বাংলাদেশের নাম।২০০০ সাল থেকে সারা বিশ্বে একুশে ফেব্রুয়ারি যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হয় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা হিসেবে। আন্তর্জাতিকভাবে বাংলা ভাষা আজ বিশ্বে চতুর্থ স্থানে অবস্থান করছে।আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা হিসেবে স্বীকৃতি লাভের পর থেকে একুশের গ্রন্থমেলাও এক নতুন ধারায় প্রবেশ করতে থাকে। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস এবং অমর একুশের গ্রন্থমেলা একই সূত্রে গাঁথা হয়ে যায়।এ মাসটির জন্যই যেন পুরো একটি বছর অপেক্ষা করে দেশের বাংলা ভাষাপ্রিয় মানুষ।লেখক,প্রকাশকরাও একুশের মেলায় তাদের শ্রেষ্ঠ বইটি উপহার দিতে নিরন্তর কাজ করে যান।একুশের গ্রন্থমেলায় বিভিন্ন স্টলে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অংশের প্রবীণ, নবীন লেখকের নানা ধরনের বইয়ের পসরা বসে।মেলায় সমবেত হন বাংলাদেশের বাংলাপ্রেমী লেখক,পাঠক।দিন দিন মেলায় বাড়ছে বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের ভিড়।ছুটির দিনগুলোয় উপচে পড়ছে মানুষ।বাংলা গ্রন্থমেলার মূল মঞ্চে প্রতিদিনই নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন হচ্ছে।আলোচনায় অংশ নিচ্ছেন দেশের খ্যতিমান কবি-সাহিত্যিক।সন্ধ্যায় প্রতিদিনই চলে বিভিন্ন সংগঠনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের জমকালো আয়োজন। একুশের গ্রন্থমেলার মধ্য দিয়ে লেখক-পাঠক মতবিনিময়, ভাবের আদান-প্রদানের ক্ষেত্র প্রসারিত হয়। তারপরও   স্বাধীনতার এত বছর পরও আমরা বাহান্নর আত্মত্যাগের অভিযাত্রার কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছতে পারিনি।বরংধীরে ধীরে হারাতে বসেছি আমাদের বাঙালির ঐতিহ্য,কৃষ্টি।পোশাক-পরিচ্ছদ,আচার-আচরণে আমাদের অর্জিত গৌরবও অনেকটা হারিয়ে যেতে বসেছে।বাংলার চেয়ে ইংরেজি ভাষা ব্যবহারে আগ্রহী নতুন প্রজন্ম।তারপরও ফেব্রুয়ারির প্রথম দিন থেকে দেশজুড়ে শুরু হওয়া ভাষা শহীদদের কৃতজ্ঞতায় স্মরণ করার নানা আয়োজন, বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণের গ্রন্থমেলা থেকে বয়সনির্বিশেষে হাজার হাজার মানুষের অগণিত বাংলা বই কেনা, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়া বাংলার ঐশ্বর্যের মূল্য অনেক।আশা করি,আগামীতে গ্রন্থমেলার গুণমানে বৃদ্ধি পাবে এর বিশালতা।দিন দিন সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাবে বাংলা সাহিত্যচর্চা।বাংলা ভাষার সাহিত্যকে বিশ্ব পরিমন্ডলে ছড়িয়ে দিতে মাতৃভাষা চর্চা ও গবেষণাসহ বাংলাদেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে রক্ষার উদ্যোগ নিতে হবে।বাংলায় লিখিত ভালো বইগুলোকে বিশ্বের অন্যান্য ভাষায় অনুবাদের ওপর জোর দিতে হবে।তেমনি বিদেশি বিভিন্ন উন্নতমানের বইকে বাংলায় অনুবাদের উদ্যোগ নিতে হবে।বাংলাদেশের একুশের গ্রন্থমেলাকে আন্তর্জাতিক গ্রন্থমেলায় রূপ দিতে এখানে বিদেশি প্রকাশকদের অনুপ্রাণিত করতে হবে।এ ব্যাপারে বাংলা একাডেমির বিশেষ উদ্যোগের বিকল্প নেই।অমর একুশে গ্রন্থমেলা সব অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে রুখে মাথা উঁচু করে বাঙালিকে সামনে এগিয়ে নিয়ে এক অসাম্প্রদায়িক, উন্নত সাহিত্য-সংস্কৃতিসমৃদ্ধ রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে বিশ্বের মানচিত্রে স্থান করে দেবে এটাই অমর একুশে গ্রন্থমেলা থেকে জনগণের প্রত্যাশা।সম্প্রতি শামসুজ্জামান খান বলেছেন প্রকাশকরা যেন বই প্রকাশের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকে।যে কোন বই বা সাহিত্য মুক্ত চিন্তার অংশ,সেটাতে সতর্ক থাকার প্রসঙ্গ আসলে কতটা যৌক্তিক এমন প্রশ্নে মি: খান বলেছেন,একটা অশ্লীল বিষয় খোলামেলাভাবে বলাটা ভালো দেখায়না,ওই লেখাটা যেন শিল্পিত ভাষায় হয় সেদিকটা যেন নজরে থাকে।পাশাপাশি স্পর্শকাতর বা উস্কানিমূলক কোন লেখা বা গালাগালি যেন না থাকে-যেটি বাংলাদেশের রাজনীতির কারণে সাহিত্যেও চলে এসেছে সেদিকটার কথা মাথায় রেখে সতর্ক থাকার কথা আমাদের সবার দায়িত্ব ও কর্তব্য।

লেখক ঃ প্রফেসর রাহয়ান তরফদার লন্ডন

 

পুতিন ও ট্রাম্পের ভালোবাসায় বিশ্ব নিরাপদ থাকতে পারে


রায়হান আহমেদ তপাদার 

মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প বিজয়ী হওয়ায় তাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন।তিনি দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নে ট্রাম্পের সঙ্গে কাজ করার ব্যাপারেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন।বুধবার ক্রেমলিন এক বিবৃতিতে জানিয়েছে,পুতিন মার্কিন-রুশ সম্পর্ককে গুরুতর পর্যায় থেকে বের করে আনতে পরস্পর কাজ করার ব্যাপারে আশাবাদ প্রকাশ করেছেন।পুতিন বলেন,উভয় দেশ ও বিশ্ব সম্প্রদায়ের স্বার্থে গঠনমূলক আলোচনা করতে হবে।ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে পাঠানো রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের একটি চিঠি প্রকাশ করেছে ট্রাম্পের ক্ষমতা গ্রহণ প্রক্রিয়ায় নিযুক্ত দল।চিঠি সম্পর্কে ট্রাম্প বলেছেন,পুতিনের পাঠানো চিঠি খুবই চমৎকার, তার চিন্তা-ভাবনাও সঠিক।চিঠিটি ১৫ ডিসেম্বরে পাঠানো হয়।খবর বিবিসির।বৃহস্পতিবার দুই নেতা তাদের দেশের পারমাণবিক অস্ত্রের কার্যক্রম বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন।এর আগে জাতিসমূহকে অস্ত্র প্রতিযোগিতায় স্বাগত জানান ট্রাম্প।টুইটারে পরমাণু অস্ত্র সক্ষমতা বাড়ানোর ঘোষণা দেয়ার পর এমএসএনবিসি টিভি নেটওয়ার্ককে এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন,‘অস্ত্র প্রতিযোগিতা হতে দেয়া হোক,কারণ প্রতিটি ক্ষেত্রে আমরা তাদের ছাড়িয়ে যাব এবং প্রতিযোগিতায় দীর্ঘস্থায়ী হব।বৃহস্পতিবার টুইট বার্তায় ট্রাম্প বলেন,‘যুক্তরাষ্ট্র অবশ্যই পরমাণু শক্তি বাড়াবে এবংপরমাণু সক্ষমতা সম্প্রসারিত করবে।এর কয়েক ঘণ্টা আগে পুতিন বলেন,পরমাণু শক্তি বাড়িয়ে সামরিক বাহিনীর সক্ষমতা বাড়ানো হবে। এদিকে ট্রাম্পের ক্ষমতা গ্রহণ বিষয়ক দল পুতিনের দেয়া চিঠির ইতিবাচক মূল্যায়ন করেছে।চিঠিতে পুতিন আশা প্রকাশ করেছেন,রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র গঠনমূলক ও প্রায়োগিক দিক থেকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নয়নে কাজ করবে।আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন মাত্রায় দুই দেশের সম্পর্ক বিস্তারের কথা বলেছেন পুতিন।  প্রতিবাদ চলছে আমেরিকায়,কেননা এমন এক ব্যক্তি এখন দেশটির প্রেসিডেন্ট,যাকে মার্কিন জনগণের বিরাট একটি অংশ হজম করতে পারছে না।তাই বলে বিশ্বের কেউ যুক্তরাষ্ট্রের খারাপ চায়নি ও চায় না।পৃথিবীর সবাই মনেপ্রাণে আশা করেছে,যুক্তরাষ্ট্র যোগ্যতম ব্যক্তিকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে পাক।হিলারি ক্লিনটন প্রায় ৩০ লাখ ভোট বেশি পেয়েও ট্রাম্পের কাছে হেরেছেন।মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ইলেকটোরাল কলেজ ভোটের পদ্ধতি এখন তাই চরম প্রশ্নের মুখে।যে দেশটি সারা দুনিয়ায় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য কেঁদে বেড়াচ্ছে ও যথেচ্ছ রক্তপাত ঘটিয়ে চলেছে,তার গণতন্ত্রের এই হাল দেখে মার্কিন বিশ্বরাজনীতির আসল অভিসন্ধি এখন দিবালোকের মতো পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে।বিশ্ব গণতন্ত্র দেবীর সম্মান রক্ষায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের এখন কী করা উচিত? মার্কিন বসন্তের গোড়ায় হাওয়া দিয়ে সেখানে মহান গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা!এ রকম একটি উদ্ভট ঘটনা তৃতীয় বিশ্বের কোনো দেশে ঘটলে মার্কিন প্রশাসন কী করত? অর্থনৈতিক অবরোধ,অথবা অন্যকিছু!মার্কিন শত্রু কিউবার ফিদেল ক্যাস্ত্রোকে হত্যা করতে সিআইএ ৬৩৮ বার কল্পনাতীত সব ষড়যন্ত্র করেছে। ক্যাস্ত্রো তাই কৌতুক করে বলেছিলেন,‘যদি গুপ্তহত্যার ষড়যন্ত্র থেকে বাঁচার কোনো অলিম্পিক প্রতিযোগিতা থাকত, তবে আমি স্বর্ণপদক পেতাম।ব্যাপারটি কৌতুকের নয়।কিন্তু মার্কিন প্রশাসনকে কে আসামির কাঠগড়ায় দাঁড় করাবে? সবাইকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর একচ্ছত্র অধিকার কেবল মার্কিন প্রশাসনের।মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিশ্ববাসীর অত্যন্ত আগ্রহের বিষয়।যদিও এখানে তাদের দর্শক হওয়া ছাড়া অন্য কোনো ভূমিকা নেই।যা করার তা মার্কিন জনগণ করে।কিন্তু আশ্চর্য বিষয়,এখন বলাবলি হচ্ছেÑপুতিনের পকেটে ট্রাম্প।এবারই প্রথম মার্কিন জনগণ দর্শক হয়ে গেছে।যা করার করেছে বিশ্ববাসী নয়, রাশিয়ার পুতিন।আমরা জানি না,হাঁড়ির খবর মার্কিন রাজনীতিকরাই ফাঁস করছেন।এজন্য তারা মহাখাপ্পা হয়ে আছে রাশিয়ার ওপর।এতে আমাদের খুশি লাগছে বৈকি।  মার্কিন প্রেসিডেন্টদের পকেটে থেকে পৃথিবীর কত প্রেসিডেন্ট পচে গেলেন,মরে গেলেন বা ধুলায় ধূসরিত হলেন।মার্কিন প্রেসিডেন্টরা চিরদিন সবার ধরাছোঁয়ার বাইরে।মার্কিনিরাই দেশে দেশে পুতুল সরকার গঠন করতে,পালতে ও ছুড়ে ফেলতে অভ্যস্ত।এই প্রথম একজন মার্কিন প্রেসিডেন্ট পাওয়া গেল মার্কিনিদের অভিযোগ, যে নাকি রাশিয়ার পুতুল।এটা খুশির খবর ছাড়া আর কী। কিন্তু আশ্চর্য হলো, বিশ্ববাসীর যাতে খুশি, মার্কিনিদের তাতেই দুঃখ।তাহলে মার্কিনিদের খুশিতে বিশ্ববাসীর দুঃখ পাওয়াই স্বাভাবিক।ট্রাম্প আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হওয়ায় বিশ্ববাসী যারপরনাই খুশি হয়েছে।অনেকেই তাকে আন্তরিক অভিনন্দন জানিয়েছেন ও বেড়াতে আসার আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।তাহলে মার্কিনিদের দুঃখ কেন? আর পুতিন তো ট্রাম্পকে জোর করে ক্ষমতায় বসাননি,যেমনটা আমেরিকা অন্য দেশের বেলায় করে।পশ্চিমা রাজনীতির বৈশিষ্ট্যই হচ্ছে অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে নাক গলানো।উদ্দেশ্য,শক্তিশালী সরকারকে সরিয়ে দুর্বল ও পশ্চিমাদের বশংবদ সরকার প্রতিষ্ঠা করা।অথচ পৃথিবীর বেশিরভাগ মানুষ আমেরিকায় যোগ্য প্রার্থীর বিজয় চেয়েছে।ট্রাম্পের নির্বাচনে মানুষ খুশিও হয়েছে,কেননা হিলারির মতো তার যুদ্ধবাজ পরিচয় নেই।শান্তিবাদী না হোক, কম যুদ্ধবাজ বলে পরিচিত ট্রাম্পের বিজয়ে রাশিয়া যদি হস্তক্ষেপ করে থাকে তাতে দোষ কী?পুতিন তো আর ভোট দিতে যাননি।আমেরিকা অন্য দেশের বেলায় কী করে?পুতিনকে সরিয়ে দিয়ে একজন দুর্বল ব্যক্তিকে ক্ষমতায় আনতে হিলারিরা চেষ্টার ত্রুটি করেনি।বিপরীতে,পুতিন বর্তমান আমেরিকার যোগ্যতম ব্যক্তিকেই প্রেসিডেন্ট হতে সাহায্য করেছেন।শুনেছি,কোনো জাতি নাকি তার উপযোগী নেতাই পেয়ে থাকে।  অভিযোগ উঠেছে, রাশিয়া ইমেইল মেরে দিয়ে হিলারির পরাজয়ে সহায়তা করেছে।কিন্তু হিলারি তো মোট ভোট বেশি পেয়েছেন আর ট্রাম্প নির্বাচিত হয়েছেন এক উদ্ভট মার্কিন পদ্ধতির কারণে।কিন্তু ইরাকের সাদ্দাম কী দোষ করেছিলেন? জীবাণু অস্ত্র তৈরির সম্পূর্ণ বানোয়াট অভিযোগ তুলে শুধু সাদ্দামকেই হত্যা করা হয়নি, ইরাককে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে।মার্কিন কারসাজিতে আরব দেশগুলোয় রক্তের বন্যা বইছে।ইরানকে ধ্বংসের জন্য পাঁয়তারা চলছে।অন্য দেশের ব্যাপারে ঘৃণ্য মার্কিন হস্তক্ষেপের পাশে রাশিয়ার এই নাকগলানো সমুদ্র থেকে এক কলস পানি নেওয়ার মতো।তাতেই নাকি সমুদ্র শুকিয়ে গেছে বলে হাপিত্যেশ চলছে। এখন রাশিয়াকে শায়েস্তা করার ফিকির খুঁজছে আমেরিকা। এ হচ্ছে মার্কিন ভণ্ডামির এক অনন্য উদাহরণ।প্রাক্তন সোভিয়েত রাশিয়ার নেতা নিকিতা ক্রুশ্চেভের প্রপৌত্রী নিনা এল.ক্রুশ্চেভা এর নাম দিয়েছেন ‘আমেরিকার রুশ ভণ্ডামি।ক্রুশ্চেভা নিউইয়র্কের নিউ স্কুলে আন্তর্জাতিক বিষয়ে অধ্যাপনা করেন।আমেরিকাকে তিনি এখনও পৃথিবীর জন্য একটি কল্যাণকর শক্তি মনে করেন।তথাপি মার্কিন প্রশাসনের এই মুখোশটি খুলে দিতে তিনি কার্পণ্য করেননি। আর ট্রাম্পকে নাকে দড়ি দিয়ে নাচানোর জন্য রাশিয়ার হাতে এমনসব দলিল-দস্তাবেজ আছে,যা সত্যি দুশ্চিন্তার বলে তিনি মনে করেন।তারপরও পুতিন যদি এ ট্রাম্প-নাচের খেলাটি না দেখায় তো তাকে নির্বোধ ছাড়া কী ভাবা যাবে?ক্রুশ্চেভা ‘আমেরিকা’জ রাশান হিপোক্রেসি’ শীর্ষক এ লেখাটি প্রোজেক্ট সিন্ডিকেটে (১৭ জানুয়ারি ২০১৬) প্রকাশ করেছেন।  রাশিয়া সম্পর্কে প্রচলিত মার্কিন আলোচনার একটা হাস্যকর রূপ লক্ষ করা যাক।হতে পারে রাশিয়া মার্কিন ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকানদের ইমেইল মেরে দিয়ে তা উইকিলিকসে সরবরাহ করেছে।এই কাজটি যদি চীন-রাশিয়া-ইরান বাদে অন্য কেউ করত তাতে এত মার্কিন উত্তেজনা দেখা যেত না।রাশিয়া সম্পর্কে কথা উঠলেই মার্কিন বুদ্ধিজীবীরা বলে বসেন,‘আমাদের শত্রু’।চীনও ‘আমাদের শত্রু’ হয়ে ওঠার পথে।ইরাক-ইরান তো বহুকাল আগে থেকেই তাদের শত্রু ছিল এবং থাকবে।এই ঢালাও‘শত্রু’অভিধা কিসের ভিত্তিতে দেওয়া হয়?সোজা উত্তর, আধিপত্যবাদের দৃষ্টিকোণ থেকে।আর কিছু নয়। মার্কিন আধিপত্যের হুমকি যে সেই তাদের শত্রু।যার সঙ্গে গণতন্ত্র,মানবাধিকার ইত্যাদির কোনো সম্পর্ক নেই। গণতন্ত্র ও মানবাধিকার ধুলায় মিশিয়ে দিয়েও মার্কিন বশংবদ হলে সেসব দেশ মার্কিনের বন্ধু।এ রকম একটা বর্বর নীতির শক্তিতে মার্কিন রাজনীতি চলে।অতএব রাশিয়া যা করেছে তা নিয়ে এত মাথাব্যথা।পুতিন কাশি দিলেও মার্কিন প্রশাসনের মাথাব্যথা শুরু হয়,কারণ পুতিন ও রাশিয়া যে তাদের ‘শত্রু’!ক্রুশ্চেভার মতে,মার্কিন নির্বাচনে যদি রাশিয়া হস্তক্ষেপ করে থাকে,তবে পুতিনের আশু লক্ষ্য মার্কিন পররাষ্ট্রনীতিতে দ্বিচারিতার মুখোশটি উন্মোচন করে দেওয়া ও নিজ স্বার্থ সংরক্ষণ।মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যে হস্তক্ষেপ করাকে তাদের জন্মগত অধিকার বলে মনে করে,রাশিয়া ও অন্যান্য দেশ সে কর্মের অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে কেন? নাকিকান্না বন্ধ করে এখন যুক্তরাষ্ট্রের উচিত সঠিক শিক্ষা নেওয়া।ট্রাম্পকে অভিনন্দন।এমন আশ্চর্য উপহারের জন্য অভিনন্দন পুতিনকেও।  বিশেষজ্ঞদের ধারণা,পুতিন বিশ্বাস করেন,রাশিয়ার ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করবেন ট্রাম্প।ক্রিমিয়ায় আগ্রাসন ও ইউক্রেন থেকে ক্রিমিয়াকে বিচ্ছিন্ন করে নেয়ার প্রতিবাদে অর্থনৈতিক এ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র।শুক্রবার মস্কোয় বার্ষিক গণমাধ্যম ব্রিফিংয়ে পুতিন বলেন, ট্রাম্পের টুইটে উল্লেখযোগ্য কিছু দেখছেন তিনি।এ ছাড়া তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে শক্তিশালী আগ্রাসনকারী হিসেবে দেখছেন না।পুতিন আরও বলেন, রাশিয়া ছাড়া কেউ ভাবতে পারেনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হবেন ট্রাম্প।যুক্তরাষ্ট্রের সমস্যাগুলো ধরতে পেরে সেভাবে প্রচার চালানোয় নির্বাচনে জয় হয়েছে তার।প্রেসিডেন্ট পুতিন ও রাশিয়া সরকারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে ট্রাম্পকে। এ নিয়ে রিপাবলিকান ও ডেমোক্রেটিক উভয় শিবিরে সমালোচিত হচ্ছেন ট্রাম্প।পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে রেক্স টিলারসনকে বেছে নেয়ায় ট্রাম্প তীব্র সমালোচনার মুখে রয়েছেন।কারণ টিলারসনকে রাশিয়াপন্থী হিসেবে মনে করা হয়।তেল ও গ্যাস কোম্পানি এক্সনমোবিলের প্রধান নির্বাহী রেক্স টিলারসন রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি রসনেফটের সঙ্গে কাজ করেছেন।যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে এর প্রতিবাদ জানান টিলারসন।২০১৩ সালে রাশিয়া তাকে অর্ডার অব ফ্রেন্ডশিপ’পুরস্কারে ভূষিত করে।রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সুসম্পর্কের বার্তা জোরদার হওয়ায় রাশিয়ায় স্বস্তির হাওয়া বইছে।পুতিন ও ট্রাম্পের ছবি,মুখোশ বিক্রি হচ্ছে রাশিয়ার রাস্তায় রাস্তায়।  

রায়হান আহমেদ তপাদার   

লেখক ও কলামিস্ট,যুক্তরাজ্য

raihan567@yahoo.co.uk

 

ক্লিন ঢাকা ও স্মার্ট নগরীর বহুমুখী সমস্যা

মুহাম্মদ আবদুল কাহহার

২০১৭ সালে ঢাকা হবে স্মার্ট নগরী। .রাজধানী শহরকে নিয়ে নানা স্বপ্ন রয়েছে। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে যেসব বাধা রয়েছে তা গণমাধ্যমে বার বার উঠে আসছে। ঢাকার এই সমস্যা বহুমুখী। ছোট্ট একটি আর্টিকেলে সব কথা তুলে ধরাও সম্ভব হয় না। প্রত্যেকটি সমস্যাই বিস্তারীত লেখার দাবি রাখে। নগরকেন্দ্রিকক সব সমস্যার সমাধান কখনোই সমাধান হওয়া সম্ভব নয়। কিছু কিছু সমস্যা সাময়িক আর কিছু কিছু সমস্যা সুদীর্ঘ বছরের। কিছু সমস্যা চলমান প্রক্রিয়ার সাথে জড়িত। কিছু সমস্যা এমন আছে যা একটি সমস্যা দূর করতে গিয়ে নতুন করে সৃষ্টি হচ্ছে। কেউ চাইলেই একত্রে সব সমস্যা দূর করতে পারবেন না। তাই বলে আলোচিত মৌলিক সমস্যার সমস্যার সমাধান করতে শত বছর পেরিয়ে যাবে এমনটিও হতে পারে না।  গত ১৮ জানুয়ারি দৈনিক প্রথম আলোর একটি শিরোনাম ছিল ‘এক টাকার কর দিতে তিন টাকার হয়রানি’। একই দিনে দৈনিক ‘বাংলাদেশ প্রতিদিন’ এর একটি শিরোনাম হলো ‘দেখার কেউ নেউ, রাত নামলেই চাঁদাবজির বিভীষিকা’। এর আগে গত ৩ জানুয়ারি দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকায় ‘ফ্লাইওভার নির্মাণে ধীরগতিতে ভোগান্তি’র কথা তুলে ধরা হয়েছে। ‘ফ্লাইওভার অব্যবস্থাপনা’ শিরোনামে দৈনিক নয়া দিগন্ত জনভোগান্তির কথা তুলে ধরেছে। ‘ফুটপাত থেকে হকার উচ্ছেদের পরেই দখল’ শিরোনাম করেছে দৈনিক ইনকিলাব। সংবাদমাধ্যমগুলো কম-বেশি প্রত্যেকেই এসব নাগরিক সমস্যার কথা তুলে ধরছেন। কিন্তু যে ভাবে লেখালেখি চলছে সেই তুলনায় প্রশাসনের তৎপরতা লক্ষ করা যায় না। গণমাধ্যমে যে প্রতিবেদন প্রকাশিত ও প্রচারিত হয় এগুলো কি কর্তৃপক্ষের নজরে আসে না? নাকি তারা এসব সমস্যার সমাধান দেয়া  প্রয়োজন মনে করছেন না। উপরে যে কয়েকটি সমস্যার কথা কথা বলা হয়েছে, এক টাকার কর দিতে তিন টাকার হয়রানি এবং রাত নামলেই চাঁদাবজি। এ ধরণের হয়রানি ও চাঁদাবাজি বন্ধ করা যায় না-এটি মানতে কষ্ট হচ্ছে। একাজগুলো প্রশাসনের ক্ষমতার মধ্যে রয়েছে। চাইলেই সম্ভব। তাহলে কেন হচ্ছেনা? অসাধু ব্যক্তিদের আয়ের পথ বন্ধ হয়ে যাবে তাই ইচ্ছা করেই এসব অনিয়ম দূর করা হয়ে না। সরকার যদি সামান্য সমাধানে ব্যর্থ হন তাহলে দীর্ঘ মেয়াদি যেসব সমস্যা রয়েছে সেগুলোর সমাধান হয়তো কোন দিনই পাওয়া যাবে না। উন্নয়নমূলক কাজ হয়তো থেমে থাকতে পারে তাই বলে কলম সৈনিকরা থেমে থাকতে পারে না।

গণমাধ্যমে নগরের সমস্যাবলী তুলে ধরা হলেও দু’একটি বাদে বাকিগুলোর কোনোই সমাধান হয় না। উন্নয়নের স্বার্থে ঢাকা সিটিকে দুই ভাগ করা হলো। প্রশাসক থেকে জনপ্রতিনিধি ক্ষমতা পেল। কিন্তু জনসমস্যার কথা বলতে গেলে আগের মতো থেকে গেল। গুলশান, বনানী, বারিধারা ও ধানমন্ডিসহ ভিআইপি, সিআইপি এলাকার কিছু সমস্যা দূর হলেও হাজারীবাগ, লালবাগ, কামরাঙ্গিরচরসহ কিছু এলাকা অবহেলিত। আর উন্নয়নের জন্য অর্থ বরাদ্ধ হলেও তা যৎসামান্য। আবার যে পরিমাণ টাকা বরাদ্ধ পাওয়া যায় তার অর্ধেক চলে যায় অফিসের ফাইল চালাতে, ঠিকাদার ও দলীয় নেতা-কর্মীর পকেটে। রাস্তার পাশে কয়েক হাজার ডাস্টবিন স্থাপন, বাড়ির ছাদে বাগান করার পরামর্শ, কয়েকটি পাবলিক টয়লেট পরিচ্ছন্ন করা, তেজগাঁয়ে অবৈধ ট্রাকস্ট্যান্ড দৃশ্যমান উচ্ছেদসহ নগরীতে র‌্যালি এবং সভা-সমাবেশের আয়োজন করে উন্নয়নের (?)  ফিরিস্তি তুলে ধরা যথেষ্ট নয়।

পত্রিকান্তরে প্রকাশ, ঢাকার নাগরিক সমস্যা দিন দিন বেড়েই চলছে। ঢাকার ৯৯ শতাংশ মার্কেট অগ্নিঝুঁকিতে। খেলার মাঠ নেই অনেক এলাকায়। মাদকাসক্তের সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে। সুয়ারেজ সমস্যা নিয়ে দিন কাটাচ্ছে পুরান ঢাকার কয়েক লাখ মানুষ। গ্যাস সঙ্কটে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা। অনেক এলাকায় রান্নায় গ্যাসের সমস্যা তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। রাজধানীতে বিশুদ্ধ পানির সংকট তীব্র আকার ধারণ করছে। চরম দুর্ভোগে নগরবাসী। যানজটে ক্ষতি হওয়া অর্থ দিয়ে বছরে একাধিক পদ্মা সেতু নির্মাণ করা সম্ভব বলেও গবেষণা জরিপ করেছেন কেউ কেউ। ব্য্যাক সেন্টার আয়োজিত ‘নগর পরিস্থিাতি ২০১৬ : ঢাকা মহানগরে যানজট, শাসন ব্যবস্থার পরিপ্রেক্ষিত’ শীর্ষক এক সেমিনারে প্রকাশিত এক গবেষণা রিপোর্ট থেকে জানা গেছে, যানজট ও গাড়ীর ধীর গতির কারণে বছরে ক্ষতি ১১.৪ বিলিয়ন ডলার বা লক্ষ কোটি টাকা। যানজটের কারণে ঢাকায় প্রতিদিন ৮.১ মিলিয়ন কর্মঘন্টা নষ্ট হচ্ছে। তাছাড়া ঢাকার রাস্তার সবচেয়ে বড় আতঙ্ক-‘হর্ন’। গণপরিবহনসহ সকল স্তরের চালক নিজ ইচ্ছানুযায়ী সর্ব শক্তি নিয়োগ গাড়ির হর্ণ বাজান। কোথায় হাসপাতাল আর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আছে দেখার প্রয়োজনও অনুভব করছেন না কেউ। ২০০৬ সালের শব্দ দূষণ নীতিমালায় বলা হয়েছে, আবাসিক এলাকায় সকাল ৬ টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত সর্বোচ্চ শব্দসীমা ৫৫ ডেসিবেল এবং রাত ৯ টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত ৪৫ ডেসিবেল। একই ভাবে নীরব এলাকার জন্য এই শব্দসীমা যথাক্রমে সর্বোচ্চ ৫০ ও ৪০ ডেসিবেল, মিশ্র এলাকায় ৬০ ও ৫০ ডেসিবেল, বাণিজ্যিক এলাকায় ৭০ ও ৬০ ডেসিবেল এবং শিল্প এলাকায় ৭৫ ডেসিবেল সর্বোচ্চ শব্দসীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞের ধারণা, ঢাকা শহরে যেভাবে শব্দ দূষণ বেড়ে চলছে তাতে এ শহরের অর্ধেক মানুষের শ্রবন ক্ষমতা ২০১৭ সালের মধ্যে ৩০ ডেসিবেল পর্যন্ত কমে যাবে। অথচ কেউ এই নিয়ম মানছেনা। ড্রাইভিং লাইসেন্সে যেসব নিয়মের কথা বলা হয়েছে সেগুলোও তারা মানছেনা কোনো কোনো ঘটনা  দায়িত্বেরত পুলিশের নজরে আসলেও নগদ অর্থের বিনিময়ে সব অনিয়ম নিয়মে পরিণত হচ্ছে।

রাজধানীতে আরেক সমস্যা ধুলাবালি। ঢাকা ঢেকে যায় ধুলার চাদরে। তাছাড়া বায়ু দূষণ ও শব্দ দূষণ সব সময়ের সাথী। ধূলার কারণে রাস্তার পাশের দোকানীরা ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হচ্ছেন। বিশেষকরে যে এলাকায় ফ্লাইওভার, সরকারি ভবন নির্মাণ, প্লাট বাড়ি ও রাস্তা উন্নয়নের কাজ চলছে তাদের অবস্থা খুবই খারাপ। জানা গেছে, রাজধানীর ২৫% মানুষের ফুসফুস সমস্যা হচ্ছে। দূষিত নগরী ঢাকা, রাজধানীর বিষাক্ত বাতাসে আক্রান্ত হচ্ছে গর্ভের শিশুও। রাস্তার পার্শ্বে ময়লা ফেলার জন্য ছোট ছোট ডাস্টবিন বসানো হলেও সেগুলো সঠিকভাবে দেখভাল করা হয় না। দিনের পর দিন ময়লায় ভর্তি থাকলেও কর্তৃপক্ষের নজরে আসেনা। ডাস্টবিন সংরক্ষণে মনিটরিং না থাকায় সেগুলো চুরি হয়ে যাচ্ছে। দুর্গন্ধে চলা দায়। কোথাও কোথাও আবাসিক এলাকা ময়লার বিশাল ভাগার হওয়ায় জনস্বাস্থ্য দিন দিন খারাপ হচ্ছে। যত্রতত্র ময়লার স্তুপ থাকায় চলাচল করতে সমস্যা হচ্ছে। মাঝে ময়লার গন্ধ খুব বেশী ছড়িয়ে পড়লে জনজীবন স্থবীর হয়ে পড়ে। ময়লার দুর্গন্ধে বায়ু দূষণের কারণে বাতাসের সাথে প্রবেশ করছে বিভিন্ন রোগের জীবানু। র্দুগন্ধযুক্ত আরেকটি এলাকা হলো হাজারীবাগের ট্যানারী শিল্প এলাকা। ট্যানারী স্থানান্তরীত হবে এ কথা সত্য। তবে কবে নাগাদ স্থানান্তরিত হবে সেই প্রশ্নের উত্তর কারো জানা নেই। ট্যানারী বর্জ্য থেকে মুক্ত হতে হতে হয়তো আমাদের সন্তানরা দাদা হতে শুরু করবেন।

সর্বোপরি, নির্বাচনের আগে জনপ্রতিনিধরা ভোটারদের কাছে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তা মনে রেখে তাদের কাজ করতে হবে। নগরবাসীর সমস্যা নিরসনে নজরদারী বাড়ানো না হলে জনদুর্ভোগ আরো চরমে পৌছে যাবে।  ২০১৬ সালকে পরিচ্ছন্ন বছর ঘোষণা করলেও আশানুরূপ কোন অগ্রগতি হয়নি। এমতাবস্থায় ২০১৭ সালে ঢাকা হবে স্মার্ট নগরী এমন স্বপ্ন দেখা অবান্তর। গত বছর ক্লিন ঢাকা ২০১৬ যেমন বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি তেমনিভাবে স্মার্ট ঢাকা ২০১৭ কতটা বাস্তবে পরিণত হবে তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের রেকর্ড করবেন

ট্রাম্পরায়হান আহমেদ তপাদার

যুক্তরাষ্ট্র ও মেক্সিকো সীমান্তে দেয়াল নির্মাণ করতে যাচ্ছে ট্রাম্প প্রশাসন।বৃহষ্পতিবারই আসছে সেই ঘোষণা। এছাড়া কয়েক দিনের মধ্যে জাতীয় নিরাপত্তা ও অভিবাসনসহ বেশ কয়েকটি সরকারি আদেশে সই করবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার বেশ কয়েকটি দেশ থেকে অবৈধ অভিবাসী ঠেকাতে জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ে এরই মধ্যে বেশকিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছে ট্রাম্প নেতৃত্বাধীন সরকার।যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো সীমান্তে দেয়াল নির্মাণ এরই অংশ।বুধবার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এক টুইটে বলেন,সামনে জাতীয় নিরাপত্তা পরিকল্পনা বিষয়ে একটি ‘বিশাল দিন’। মেক্সিকো সীমান্তে দেয়াল তৈরির ঘোষণা আসছে।ট্রাম্প সরকারের পরিকল্পনা হলো মেক্সিকো সীমান্তে ২ হাজার মাইল দীর্ঘ দেয়াল নির্মাণ করা।প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময়ও ট্রাম্প তার নির্বাচনী ইশতেহারে এই ঘোষণা দেন। ট্রাম্প তখন বলেন,শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়;মেক্সিকো এই দেয়ালের নির্মাণ ব্যয়ের একটা অংশ বহন করবে।কিন্তু মেক্সিকো সরকার তখন ট্রাম্পের এই পরিকল্পনা নাকচ করে দেয়।মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট এনরিক পেনা নিয়েতো তখন সাফ জানিয়ে দেন,দেয়াল নির্মাণে এক পয়সাও তারা দেবেন না।মেক্সিকো সীমান্তে দেয়াল নির্মাণে ব্যয় হবে প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলার।ট্রাম্প অবশ্য বলেন,বিশাল এই ব্যয় পরবর্তী সময়ে প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর কাছ থেকে পুষিয়ে নেয়া হবে।এ সপ্তাহের শেষের দিকে সিরিয়া, ইয়েমেন, ইরাকসহ আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি দেশের জন্য অভিবাসন নীতিমালা কঠোর করতে যাচ্ছে ট্রাম্প প্রশাসন।তাছাড়া বেশ কয়েকটি দেশ থেকে উদ্বাস্তু প্রবেশাধিকার স্থগিত ঘোষণা করতে পারেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ী ডোনাল্ড ট্রাম্প।

আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের বৈতরণী পার হতে নানা রকম প্রতিশ্রুতি আর উস্কানিমূলক বক্তব্য দেয়ার সব রেকর্ড একাই ভেঙেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।তার প্রচারণা যেমন বিতর্ক সৃষ্টি করেছে,তেমনি বিভেদের দেয়ালও বড় করে তুলেছিল।ভোটের পালা শেষ,তাই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গেরও সম্ভবত একটা রেকর্ড হতে চলেছে ট্রাম্পের। ব্রিটেনের দি ইন্ডিপেনডেন্ট পত্রিকার বিশ্লেষণ, সম্ভবত ভোটে বিতর্ক উস্কে দেয়া অধিকাংশ প্রতিশ্রুতিই ভঙ্গ করবে ট্রাম্প প্রশাসন।তবে আমেরিকা এবং বিশ্ব তার এই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গকে স্বাভাবিকভাবেই নেবে।যেমন:ওবামাকেয়ার বাতিল করা।বারাক ওবামার বিখ্যাত স্বাস্থ্যনীতি ওবামাকেয়ার বাতিলের ঘোষণা দিয়েছিলেন।অথচ ওই স্বাস্থ্যনীতির মাধ্যমেই আমেরিকার লাখ লাখ গরিব মানুষ স্বাস্থ্যসেবায় প্রবেশাধিকার পেয়েছে।নির্বাচনের আগে ট্রাম্প বলেছিলেন,আমরা কাজটি খুব দ্রুতই করব।এটি একটি বিপর্যয়।অথচ নির্বাচনের পর তিনি বলছেন,ওবামার স্বাস্থ্যনীতিতে শুধু কিছু সংস্কার আনবেন।ই-মেইল কেলেঙ্কারিতে ফৌজদারি অভিযোগ এনে হিলারিকে বিচারের মুখোমুখি করে জেল খাটানোর কথা বলেছিলেন ট্রাম্প।ওই কেলেঙ্কারিকে ট্রাম্প ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারির চেয়েও বড়’বলে আখ্যায়িত করেছিলেন।কিন্তু নির্বাচনে জয়লাভের পর এখন তিনি বলছেন,বিষয়টি নিয়ে আমি ততটা গভীরভাবে ভাবিনি।আর গত রোববার তো বলেই দিয়েছেন, হিলারিকে কষ্ট দিতে চান না তিনি।এফবিআই মুখপাত্রকে ওই তথ্যের সত্যতা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।অজ্ঞাত সূত্রের বরাত দিয়ে ওয়াশিংটন পোস্টও এ খবরের সত্যতা নিশ্চিত করেছে।এফবিআইয়ের সঙ্গে বর্তমান হোয়াইট হাউস প্রশাসনের সম্পর্ক অত্যন্ত সংবেদনশীল।কারণ, ট্রাম্প ও তার কর্মকর্তাদের সঙ্গে রাশিয়ার সম্ভাব্য গোপন যোগসূত্রের তদন্ত করছে এফবিআই।এফবিআই পরিচালক ১০ বছরের জন্য নিয়োগপ্রাপ্ত হন।তবে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা রয়েছে যেকোনো সময় তাকে পদচ্যুত করার। ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সহযোগী জানিয়েছেন,কমিকে পদচ্যুত করার পরিকল্পনা

প্রেসিডেন্টের নেই।এফবিআই মুখপাত্রকে ওই তথ্যের সত্যতা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।অজ্ঞাত সূত্রের বরাত দিয়ে ওয়াশিংটন পোস্টও এ খবরের সত্যতা নিশ্চিত করেছে।এফবিআইয়ের সঙ্গে বর্তমান হোয়াইট হাউস প্রশাসনের সম্পর্ক অত্যন্ত সংবেদনশীল।কারণ,ট্রাম্প ও তার কর্মকর্তাদের সঙ্গে রাশিয়ার সম্ভাব্য গোপন যোগসূত্রের তদন্ত করছে এফবিআই।এফবিআই পরিচালক ১০ বছরের জন্য নিয়োগপ্রাপ্ত হন।তবে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা রয়েছে যেকোনো সময় তাকে পদচ্যুত করার।ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সহযোগী জানিয়েছেন,কমিকে পদচ্যুত করার পরিকল্পনা প্রেসিডেন্টের নেই।মেক্সিকো সীমান্তে দেয়াল।মেক্সিকো সীমান্তে দেয়াল নির্মাণ ছিল সম্ভবত ট্রাম্পের সবচেয়ে অনাপসমূলক প্রতিশ্রুতি।সীমান্ত পেরিয়ে আসা মেক্সিকান অভিবাসীদের মাদক বিক্রেতা,অপরাধী এবংধর্ষক হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন ট্রাম্প।আর তাদের ঠেকাতে একটি সীমানাপ্রাচীর নির্মাণের কথাও বলেছিলেন তিনি।কিন্তু প্রতিনিধি পরিষদের সাবেক স্পিকার এবংট্রাম্পের উপদেষ্টা নিউট গিংরিচ এখন সন্দেহ প্রকাশ করছেন,ট্রাম্প মেক্সিকো সীমান্তে সত্যি সত্যিই দেয়াল নির্মাণ করবেন কিনা,তা নিশ্চিত নয়।২০১৫ সালে ট্রাম্প যখন ঘোষণা করেছিলেন,তিনি আমেরিকায় মুসলিমদের প্রবেশ পুরোপুরি বন্ধ করবেন,তখন তার সমর্থকরা উল্লসিত হয়েছিল।কিন্তু এখন তিনি বলছেন,যেসব দেশে সন্ত্রাসীরা সক্রিয় রয়েছে,শুধু সেসব দেশের মুসলিমদের ওপরই তিনি আমেরিকায় প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করবেন।কিন্তু নির্বাচনের পর একজন রিপাবলিকান নেতার সঙ্গে সাক্ষাতের সময় একজন সাংবাদিক ট্রাম্পকে প্রশ্ন করেন,আপনি কি মুসলিমদের আমেরিকায় প্রবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারির ব্যাপারে কংগ্রেসকে আহ্বান জানাবেন? কিন্তু ট্রাম্প ওই প্রশ্নের উত্তর না দিয়েই সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে চলে যান।চীনের ওপর কর আরোপ।

আমেরিকান শিল্প ধ্বংসের জন্য বিদেশি শক্তিগুলোকে দায়ী করার সময় ট্রাম্প চীনের দিকেও আঙ্গুল তুলেছিলেন।তিনি চীনা পণ্যের ওপর ৪৫ শতাংশ কর আরোপ করার কথাও বলেছিলেন।কিন্তু তার উপদেষ্টা উইলবার রস এখন বলছেন,চীন তার মুদ্রার অবমূল্যায়ন করলেই কেবল তাদের পণ্যের ওপর ৪৫ শতাংশ কর আরোপের হুমকি দিয়েছিলেন।নির্বাচনী প্রচারণার সময় ট্রাম্প ইরানকে আরেকটি কৌশলী লক্ষ্য হিসেবে কাজে লাগিয়েছেন।অক্টোবরে ট্রাম্পের রানিংমেট মাইক পেন্স বলেন,ট্রাম্প প্রশাসন ইরানকে কেটে দুই টুকরো করে ছাড়বে।কিন্তু নির্বাচনে জেতার পর ট্রাম্পের উপদেষ্টা ওয়ালিদ ফ্যারেস বিবিসিকে বলেন,কেটে দুই টুকরো করা হয়তো একটি অতিবেশি শক্তিশালী শব্দ।জয়ের পর প্রায় এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও এখনো এই বিষয়ে টুঁ শব্দটি করেননি ট্রাম্প।সবাই চমকে উঠেছিল,যখন ট্রাম্প বলেছিলেন,ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোকে প্রদত্ত অর্থ সহায়তা প্রত্যাহার করে নেবে আমেরিকা,যদি ট্রাম্পের মনে হয়, ন্যাটোভুক্ত দেশগুলো তাদের প্রতিরক্ষার জন্য যথেষ্ট অর্থ ব্যয় করছে না। তিনি আরো বলেন,দক্ষিণ কোরিয়ায় অবস্থানরত আমেরিকান সেনাবাহিনীও প্রত্যাহার করে নেয়া হবে,যদি না দক্ষিণ কোরিয়া আরো অর্থ দেয়।অথচ নির্বাচনের পর পার্ক জিউন-হাইকে ফোন করে ট্রাম্প বলেন, বিদ্যমান নিরাপত্তা মৈত্রীচুক্তির অধীনেই তিনি দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষায় সহায়তা অব্যাহত রাখবেন।রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদের সময় ওয়াটার বোর্ডিংবা পানিতে চুবানোর পদ্ধতি পুনরায় চালু করার ঘোষণা দিয়ে সমালোচকদের তোপের মুখে পড়েছিলেন ট্রাম্প।বুশযুগে পদ্ধতিটি ব্যবহারের পর তা বেআইনি বলে ঘোষণা করা হয়।সাবেক রিপাবলিকান হাউস গোয়েন্দা কমিটির চেয়ার মাইক রজার্স বলেছেন, ট্রাম্প শুধু প্রচারণার খাতিরেই ওই কথা বলেছিলেন।বহুল বিতর্কিত ও আলোচিত সেই প্রতিশ্রুতির দিকে অগ্রসর হচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প।তিনি নির্বাচনী প্রচারণার সময় প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন মুসলিম দেশগুলো থেকে যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসীদের নিষিদ্ধ করবেন।মেক্সিকো

সীমান্তে নির্মাণ করবেন দেয়াল।  আজ বুধবার কোনো এক সময় তিনি এ বিষয়ক নির্বাহী আদেশে সই করতে পারেন।এমন খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।এতে বলা হয়েছে, এ আদেশের মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে সিরিয়ার শরণার্থী ও মুসলিমদের প্রবেশ বন্ধ করে দেয়া হবে।এমন মুসলিম দেশের মধ্যে রয়েছে ইরাক, ইরান, লিবিয়া, সোমালিয়া, সুদান, সিরিয়া ও ইয়েমেন।এসব দেশের কোনো শরণার্থী,ভিসা পাওয়া ব্যক্তিদেরও এর আওতায় আনা হতে পারে।এমন তথ্য কংগ্রেসের সূত্র জানিয়েছে।এতে বলা হয়েছে,যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং হোম সিকিউরিটি ডিপার্টমেন্ট থেকে যতক্ষণ এ বিষয়ে কড়াকড়ি প্রক্রিয়া নির্ধারণ করবে ততক্ষণ সব দেশ দেশে যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসী যাওয়ার ওপর অনেক মাস (মাল্টি-মান্থ) নিষেধাজ্ঞা থাকতে পারে।ট্রাম্প প্রশাসনের এমন সিদ্ধান্তের কথা মিডিয়ায় প্রকাশ হওয়ার পর এর নিন্দা জানিয়েছেন কাউন্সিল অন আমেরিকান ইসলামিক রিলেশন্স-এর জাতীয় নির্বাহী পরিচালক নিহাদ আওয়াদ।তিনি মঙ্গলবার রাতে এ বিষয়ে একটি টুইট করেছেন।তাতে বলেছেন,এসব নির্বাহী আদেশ আমাদের জাতিকে (মার্কিন) নিরাপদ করবে না।উল্টো তাতে আরও আতঙ্ক বাড়বে।এ ছাড়া প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মেক্সিকো সীমান্তে দেয়াল নির্মাণ নিয়ে নির্বাহী আদেশেও সই করতে পারেন আজ।প্রশাসনিক দু’জন কর্মকর্তা এ তথ্য দিয়েছেন বার্তা সংস্থা এপিকে। উল্লেখ্য,নির্বাচনী প্রচারণার সময় অনেকবার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন নীতি কঠোর করার প্রত্যয় ঘোষণা করেছিলেন।এর আওতায় ছিল যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিমদের প্রবেশ পুরোপুরি বন্ধ করা।এ ছাড়া মেক্সিকো সীমান্তে যে দেয়াল নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দেন, তাতে ওই দেয়াল নির্মাণের ব্যয় মেক্সিকোকেই বহন করতে বলা হয়।নির্বাচনের কয়েকদিন আগে তিনি মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট এনরিক পেনা নিয়েতোর সঙ্গে বৈঠক করেন।পরে সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প বলেন,সীমান্তে দেয়াল নির্মাণের খরচ বহন করতে রাজি হয়েছেন নিয়েতো।কিন্তু পেনা নিয়েতো এমন দাবি প্রত্যাখ্যান করেন।


সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি: এ্যাডভোকেট শেখ মোঃ আব্দুল্লাহ
সম্পাদক-প্রকাশক : শেখ মোঃ তৈয়াবুর রহমান॥

যুগ্ম সম্পাদক: এস এম শাহিদুল আলম॥ সহযোগী সম্পাদক: শেখ মোঃ আরিফ আল আরাফাত
সহ-সম্পাদক: (প্রশাসন) হাজী হাবিবুর রহমান শাহেদ: সহ সম্পাদক: আজমাল মাহমুদ
সম্পাদক কর্তৃক বাড়ী বাড়ী নং- ৫৩/২, ৪র্থ তলা, রাজ-নারায়ন-ধর রোড, কিল্লার মোড় বাজার, লালবাগ, ঢাকা-১২১১
ফোন: ০১৯১৮-২০১৬২৬, ফোন: ০১৭১৫-৯৩৩১৬৮
ই-মেইল- notunvor.news@gmail.com
Designed By Hostlightbd.com
| Cyberboss.org
Translate »