Category: উপ-সম্পাকীয়

পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে উদ্বেগজনক বজ্রপাত! এ দায় কার?


এস.কে.দোয়েল
পৃথিবী যে ধবংসের শেষ স্তরে এসে পৌছেছে তা বোধয় জগৎশ্রেষ্ঠ মহান সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত আল কোরআন সে কথা বারবার স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে মানুষকে। পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে-এরকম বহুবার্তা বিজ্ঞানীরা দিয়ে যাচ্ছেন এরকম আতংক সংকেত শুনতে পাওয়া যায়। ২০১২ সালেও ২১ ডিসেম্বর পৃথিবী ধ্বংসের বিষয়ে স্যাটেলাইট ডিসকভারী বিখ্যাত মায়ানসভ্যতার সর্বশেষ ক্যালেন্ডারের ভিত্তি করে ব্যাপক প্রচারণা চালায়। এরপরে আরো কয়েকবার এরকম ভিন্ন ভিন্ন তারিখে পৃথিবী ধ্বংসের ব্যাপারে সতর্ক সংকেত দিয়ে আসছে বিজ্ঞানীরা। তবে এই সংকেত যে একদিন সত্যিই বাস্তব হবে এটারও কোন সংশয় নেই। এ বিষয়ে মহান সৃষ্টিকর্তার কাছ হতে বারবার সতর্ক বার্তা বিভিন্ন ধর্মীয় গ্রন্থে পাওয়া যায়। বিশেষ করে পবিত্র কুরআনে কেয়ামতের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষ করে বজ্রপাতকে খোদায়ি দুর্যোগ হিসেবে ধরা হয়। এটা একমাত্র মানুষের অত্যাধিক পাপাচারের কারণে হয়ে থাকে বলে পবিত্র কুরআন হাদিসে বলা হয়েছে। সে কারণে পৃথিবী ধ্বংসের ব্যাপারে কুরআনে বলা হয়েছে- “যখন কেয়ামত সংঘটিত হবে। যার সংঘটিত হওয়াতে মিথ্যার কোন অবকাশ নেই। যা কতককে করবে নিচু, কতককে করবে সমুন্নত। যখন জমি ভীষণভাবে প্রকম্পিত হবে। আর পাহাড়-পর্বত ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যাবে। ফলে তা বিক্ষিপ্ত ধূলিকণায় পর্যবসিত হবে” (সূরা ওয়াকি’আ-১-৬)। পরিস্থিতি এমনই হয়ে দাঁড়িয়েছে আজ। মানুষ পাপাচারের দিকে ধাবিত হচ্ছে। নীতি-নৈতিকতা উঠে যাচ্ছে। বিবেক ক্রয়-বিক্রয় শুরু হয়েছে। মিথ্যাচারের কারণে এখন কেউ কাউকে মন থেকে বিশ্বাস করতে পারছেনা।  প্রাকৃতিক দুর্যোগের নতুনমাত্রা হিসেবে যোগ হয়েছে মাত্রাতিরিক্ত বজ্রপাত, শিলাবৃষ্টি, ঘুর্ণীঝড়। মাত্রাতিরিক্ত বজ্রপাতের অন্যতম কারণ হচ্ছে পৃথিবীর তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়া। যার কারণে বিশ্বব্যাপী বজ্রপাত উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। বিজ্ঞান বিষয়ক সাময়িকী ‘সায়েন্স’ এর মতে, পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বজ্রপাতের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বিদ্যমান। যুক্তরাষ্ট্রের ডেভিড রম্প ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ায় বজ্রপাত নিয়ে গবেষণা করে বলছেন- ২০০০ সালে যেখানে বছরের একটি নির্ধারিত সময়ে দুইবার বজ্রপাত রেকর্ড করা হয়েছে, সেখানে এখন ওই একই সময়ে তিনবার বজ্রপাত হচ্ছে। তার হিসেবে তাপমাত্রা এক ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়লে বজ্রপাতের হার বাড়ে ১২ শতাংশ। জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি, অত্যধিক শীততাপ নিয়ন্ত্রিত যন্ত্রের ব্যবহার, গ্রিন হাউজ গ্যাসের নির্গমন বৃদ্ধির কারণে গোটা বিশ্বেই বজ্রপাত বাড়ছে। অধ্যাপক রম্প মনে করেন, উল্লিখিত কারণে ভূ-মণ্ডলে নাইট্রোজেন অক্সাইডের পরিমাণ বাড়ছে। এ কারণেই হয়তো ১৬ মে মঙ্গলবার বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে একযোগে চার হাজারেরও বেশি বার বজ্রপাতের ঘটনা ঘটে। যুক্তরাষ্ট্রের আবহাওয়া দপ্তর এ তথ্য রেকর্ড করেছে। ওই দপ্তরের মতে জলবায়ু পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় আগামী ২০ বছরের মধ্যে বজ্রপাত বর্তমানের তুলনায় ৫০ শতাংশ বাড়বে। সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশে আশঙ্কাজনকভাবে বজ্রপাত বেড়েছে। সঙ্গে প্রাণহানির সংখ্যাও পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। একটা হিসাবে দেখা যায়-গত এক দশকে দেশে বজ্রপাতে মারা গেছে ২ হাজার ৩৫৬ জন। আহত হয়েছে কয়েক হাজার। এই বজ্রপাতের আঘাতে মৃত্যু থেকে রেহাই পায়নি গৃহপালিত পশুও। ২০১০ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত সারাদেশে মৃতের সংখ্যা ১ হাজার ৭২২ জন। এর মধ্যে ২০১০ সালে ১২৩ জন মারা গেছে। এই হিসাব অনুসারে বিগত ২০১১ সালে ১৭৯ জন, ২০১২ সালে ৩০১ জন, ২০১৩ সালে ২৮৫ জন, ২০১৪ সালে ২১০ জন, ২০১৫ সালে ২৭৮ জন এবং গতবছর (২০১৬) এক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ ৩৫০ জন।

প্রাকৃতিক এই নতুন দুর্যোগ বজ্রপাত থেকে বাঁচার ওপর কী আর এটা নিরোধের উপায়ই বা কী? সে সম্পর্কে জানতে হবে। জানাতে হবে। কেননা বজ্রপাত ঘিরে জনমনে চরম ভয়-আতঙ্ক বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রতি বছর মারা যাচ্ছে শতশত মানুষ। বজ্রপাতের কারণ হিসেবে ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার অধ্যাপক ডেভিড রম্প বলেছেন যে, জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি, অত্যধিক শীততাপ নিয়ন্ত্রিত যন্ত্রের ব্যবহার, গ্রিন হাউজ গ্যাসের নির্গমন বৃদ্ধির কারণে গোটা বিশ্বেই বজ্রপাত বাড়ছে। উল্লিখিত কারণে ভূ-মণ্ডলে নাইট্রোজেন অক্সাইডের পরিমাণ বাড়ছে। এই গ্যাস নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে ওজোন স্তর এবং মিথেনের মতো ক্ষতিকর গ্যাসও নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। তখন বজ্রপাতের হার কমতে পারে। রম্প আরো বলেন, একবিংশ শতাব্দীর শেষে ধরিত্রীর তাপমাত্রা চার ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ফলে বজ্রপাতের হার আরো বাড়তে পারে। দেশের হাওর এলাকাগুলোতে বেশির ভাগ বজ্রপাতের খবর পাওয়া যাচ্ছে। গত কয়েক বছরে সুনামগঞ্চ, হবিগঞ্চ, সিলেট, কিশোরগঞ্জ প্রভৃতি অঞ্চলে বজ্রপাতে হতাহতের ঘটনা ঘটেছে বেশি। এদিকে উত্তরবঙ্গেও বজ্রপাত ও শিলাবৃষ্টির মাত্রা বেশি লক্ষ্য করা যায়। ২২ এপ্রিল/১৭ দেশের পাঁচটি জেলায় বজ্রপাতে অন্তত সাতজন নিহত হয়েছে। এর মধ্যে চট্টগ্রামে তিন এবং পটুয়াখালী, কিশোরগঞ্জ, বাগেরহাট ও কক্সবাজারে একজন করে প্রাণ হারিয়েছেন। গত ৬ মে পঞ্চগড় জেলার তেঁতুলিয়া উপজেলার ভজনপুর, দেব নগর, বুড়াবুড়ি ও শালবাহান ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত এলাকাগুলোতে বজ্রপাতের সাথে শিলাবৃষ্টিতে ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছে। শিলাখন্ডগুলো ছিল বেশ বড়। দেখা গেছে, সেদিন ওই শিলাবৃষ্টিতে ঘরের চাল পর্যন্ত ফুটো হয়েছে। গাড়ীর সামনের কাচ ভেঙ্গেছে। এরপর ৯ মে/১৭ মঙ্গলবার একদিনেই দেশের ১৫টি জেলায় বজ্রপাতে মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে ২১ জনের।

প্রাকৃতিক এই দুর্যোগের একমাত্র দায়ী বৈশ্বিক উষ্ণায়ন। আর এটা সৃষ্টি করছি আমরাই। এ থেকে রক্ষা পেতে হলে সবুজায়ন পৃথিবী গড়তে হবে। বৃক্ষরোপন করতে হবে। তাল গাছ, নারকেল গাছের মতো গাছ লাগাতে হবে। যেহেতু বৈশ্বিক উষ্ণায়ন তৈরির একমাত্র মানুষই দায়ী সেক্ষেত্রে এ থেকে বাঁচার ও সুরক্ষা থাকার পথ আমাদেরই তৈরি করতে হবে। পাপাচারের পথ হতে সরে আসতে হবে। কেননা পৃথিবী ধ্বংসের একমাত্র কারণ হবে মানুষের কর্মফল। এটাই হবে ভয়ংকর কিয়ামত। অত্যাধিক নির্যাতন, খুন, ধর্ষণ, পরকীয়া বেড়ে যাবে। বিকৃত যৌনাচার বৃদ্ধি পাবে। পুরুষরা দাসে পরিণত হবে। ধর্মকে বিকৃত করতে তৈরি হবে লেবাস আতঙ্ক। ধর্ম ব্যবসা বেড়ে যাবে। এইসব অনৈতিক কর্মকান্ড হতে সরে আসতে হবে সবাইকে। আর বজ্রপাত থেকে রক্ষা পেতে হলে আকাশের মেঘের অবস্থা লক্ষ্য করতে হবে। সেসময় নিরাপদ আশ্রয় খুজে নিতে হবে। দ্রুত ফাঁকা জায়গা ত্যাগ করা, কোনো ধরনের গাছ-গাছালির নিচে অবস্থান না করা, উচু ভবনের ফাঁকা ছাদে না থাকা অপেক্ষাকৃত নিচু ঘরে অবস্থান করা সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হতে পারে। বজ্রপাতের সময় ধাতব বস্তু স্পর্শ করা ঠিক নয়। এমনকি টিভি ফ্রিজ পানির মোটর বন্ধ থাকলেও তার স্পর্শ থেকে সাবধানে থাকা ভাল। এ সময় বৈদ্যুতিক ঝরনায় গোসল করা ঠিক নয়। পাকা বাড়ি হলেও তার ধাতব জানালায় হাত রাখা বিপদ হতে পারে। বিদ্যুতের সুইচ অফ রাখা বাঞ্ছনীয়। তারযুক্ত ফোন এবং মোবাইল ফোন ব্যবহারও ঠিক নয়। কারণ মোবাইল ফোনের টাওয়ার বজ্রপাত টেনে নেয়। সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ার একজন গবেষক জানিয়েছেন, ১ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে বজ্রপাত ১০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। বাংলাদেশে জনসংখ্যার ঘনত্ব বৃদ্ধির সাথে সাথে খোলা জায়গায় কাজকর্ম ও চলাচল বেড়ে যাওয়া এবং জীবনযাত্রার (লাইফস্টাইল) পরিবর্তন যেমন- মোবাইল সেলফোনসহ বিভিন্ন ইলেকট্রিক ও ইলেকট্রনিক্স সামগ্রীর (গেজেট) মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারও অনেকটা দায়ী। এ ধরনের কোনো কোনো যন্ত্রপাতি বজ্রকে উপর থেকে মানুষের দিকে টেনে নিয়ে এসে বিপদ ঘটাতে পারে। তাই এ থেকে সব সময় সর্তকতা অবলম্বন করতে হবে।# ২০/০৫/১৭

লেখক, গবেষক ও কলামিষ্ট এস কে দোয়েল

কোরীয় সংকটে উদ্বিগ্ন বিশ্ব

রায়হান আহমেদ তপাদার

বিশ্বের শান্তিকামী মানুষ কেউ চায় না নতুন করে একটা ভয়াবহ চরিত্রের যুদ্ধ বাধুক।কারণ এ ক্ষেত্রে সেটা ইরাক যুদ্ধ হবে না,হবে আঞ্চলিক আণবিক যুদ্ধ,যার পরিণতি বিশ্বের মানবসভ্যতার জন্য হবে ভয়াবহ।সংগত কারণে সন্নিহিত দেশ জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ায় দেখা দিয়েছে রাজনৈতিক উত্তাপ।অন্যদিকে হুমকি ডোনাল্ড ট্রাম্পের। বৈশ্বিক উত্তেজনার পারদ ওঠানামা করছে। উত্তেজনা কোরীয় উপদ্বীপেও।পশ্চিমা রাজনৈতিক শক্তি এ জন্য দায়ী করছে উত্তর কোরিয়াকে।তারা কিন্তু কোরীয় জাতিসত্তা অধ্যুষিত ভূখণ্ডটিকে বিভক্ত করা ও বিভাজিত একটিতে বিদেশি সৈন্য মোতায়েন রাখার অনধিকার ও অগণতান্ত্রিকতা নিয়ে কোনো কথা বলছে না।স্মরণ করছে না বিভাজনের অনৈতিকতা।অথচ বিভক্ত জার্মানি নিয়ে প্রচারণার অভাব দেখা যায়নি।বিশ্ব পরিপ্রেক্ষিতে সম্প্রতি হঠাৎ উত্তেজনার কারণ হয়ে উঠেছে উত্তর কোরিয়ার সামরিক মহড়া ও কিছু উগ্র কথাবার্তা।চীন উত্তর কোরিয়ার একদা আদর্শিক সমর্থক হলেও সেখানকার বর্তমান শাসকের উগ্র ঘোষণাদির পক্ষে নয়। তাদের চেষ্টা কোরীয় নমনীয়তার পক্ষে।সম্প্রতি রাশিয়াও এ বিষয়ে সচেতনতার প্রকাশ ঘটাতে শুরু করেছে।হয়তো এর কারণ হোয়াইট হাউসে ক্ষমতার আসনে এখন এক খ্যাপাটে মানুষের অবস্থান,যার সম্পর্কে শেষ কথা বলা বড় কঠিন।দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিপুল মানবিক ও জাগতিক ক্ষয়ক্ষতির মধ্যে একটিই সদর্থক বিষয় মিত্রশক্তির জয় এবং ফ্যাসিস্ট শক্তির পরাজয়।একই পরিণামে ঔপনিবেশিক রাজশক্তিগুলোর অর্থনৈতিক দুস্থ অবস্থা ও ক্রমান্বয়ে উপনিবেশ হারানোর ফলে জাতীয় সমৃদ্ধির গভীর ক্ষয়।ব্রিটেন, ফ্রান্স প্রভৃতি ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের যুদ্ধোত্তর পিছু হটার মধ্যে অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক অভিধায় নব্য পরাশক্তি হিসেবে, শাসকশক্তি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের আবির্ভাব,বলা হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দান।হঠাৎ করেই কোরীয় অঞ্চলে সৃষ্ট উত্তেজনা কিছুটা হালকা হয়ে সামগ্রিক পরিস্থিতিতে ভিন্ন আবহের সূচনা করেছে। কিন্তু যুদ্ধের আশঙ্কা কমিয়ে এনেছে এমনটি এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। তবে যেকোনো মুহূর্তেই যুদ্ধ শুরু হতে পারে গত কয়েক সপ্তাহের এই প্রবল আশঙ্কা আপাতত দূর হয়েছে। কিন্তু স্থায়ীভাবে যুদ্ধের আশঙ্কা কমে আসেনি একটুও। উল্টো উভয় পক্ষের ব্যাপকভিত্তিক সামরিক উপস্থিতি দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ পরিকল্পনার অংশ বলেই ধারণা করা হচ্ছে। যদিও এ পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে কূটনৈতিক সক্রিয়তা বৃদ্ধি পাওয়ায় আপাতত পরিস্থিতিতে কিছুটা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়েছে। উল্লেখ্য, গত মাস থেকে উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের তোড়জোড় লক্ষ করা যায়। এ লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র নিজের অত্যাধুনিক রণতরী কার্ল ভিনসেন্টসহ কয়েকটি ডেস্ট্রয়ার কোরিয়ান পেনিনসুলা অভিমুখে প্রেরণ করলে পরিস্থিতি চরম উতপ্ত হয়ে ওঠে। যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপ কোরীয় সংকটের দীর্ঘ জটিলতাকে প্রায় যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্র এবং উত্তর কোরিয়ার পাল্টাপাল্টি হুমকি হুশিয়ারির মুখে এই সংকটের গুরুত্বপূর্ণ পক্ষগুলো বিশেষত উত্তর কোরিয়া, চীন এবং যুক্তরাষ্ট্রের দুই আঞ্চলিক মিত্র দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান যুদ্ধের চূড়ান্ত প্রস্তুতি সম্পন্ন করে। কিন্তু হঠাৎ করেই কোরীয় উপদ্বীপ অভিমুখী মার্কিন রণতরী ভিনসেন্ট গতিপথ পাল্টে অস্ট্রেলিয়ার দিকে যাত্রা শুরু করলে মার্কিন অভিপ্রায় নিয়ে অস্পষ্টতা দেখা দেয়। এরপর ডোনাল্ড ট্র্যাম্প এবং পেন্টাগনের বক্তব্যের ভিত্তিতে কথিত স্ট্রাইক গ্রুপের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে সবাই সন্দিহান হয়ে পড়ে। ততক্ষণে উত্তর কোরিয়া এবং চীন নানা ধরনের পাল্টা পদক্ষেপ নিলে পরিস্থিতি চরম শোচনীয় আকার ধারণ করে। যদিও চীন ওই সময়গুলোতে কোরীয় উপদ্বীপ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সংযত হওয়ার আহ্বান জানায়।একই সঙ্গে উত্তর কোরিয়াকে আরো দায়িত্ববান হতে পিয়ং ইয়ংয়ের প্রতিও কড়া হুশিয়ারি উচ্চারণ করে বেইজিং। এতদসত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে বাগযুদ্ধ অব্যাহত থাকে।এ পর্যায়ে পরিস্থিতি শান্ত করতে রাশিয়ার হস্তক্ষেপ প্রত্যাশা করে চীন। যদিও ততক্ষণে চীন প্রথম কোরীয় যুদ্ধে জাতিসংঘ বাহিনীর সঙ্গে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের স্থান কোরিয়া-চীন সীমান্তের কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ স্থানে প্রায় দেড় লাখ সেনা মোতায়েন করে বলে সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়। আবার এ ধরনের উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মধ্যেই গত ২৫ এপ্রিল মিলিটারি ডেতে বিরাট সামরিক কুচকাওয়াজের মাধ্যমে উত্তর কোরিয়া নিজের শক্তি প্রদর্শন করলে পরিস্থিতি আরেক দফা নাজুক হয়ে পড়ে। এরপর হঠাৎ করেই যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে কূটনৈতিক প্রক্রিয়া শুরু হয়। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ কোরিয়া ইস্যুতে বৈঠকে বসে। ওই সব ঘটনার পর ডোনাল্ড ট্রাম্প স্বভাবসুলভ আচরণে প্রথমে চীনের প্রেসিডেন্ট এবং তৎপরবর্তী উত্তর কোরিয়ার সুপ্রিম লিডার কিম জং উনকে ভালো এবং বুদ্ধিমান মানুষ হিসেবে আখ্যায়িত করে সবাইকে চমকে দেন। শুধু এটুকুই নয়, ডোনাল্ড ট্রাম্প উত্তর কোরীয় নেতাকে চৌকস আখ্যায়িত করে তার সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে সাক্ষাৎ করতে চাইলে সামগ্রিক পরিস্থিতি রীতিমতো উল্টে যায়। ট্রাম্পের এমন অবাক করা ব্যক্তিগত অভিমত ওয়াশিংটনের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক অবস্থানের বৈশিষ্ট্য নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেয়। শুধু তাই নয়, ট্রাম্পের এ ধরনের কথাবার্তা বিশ্ব ব্যবস্থায় মার্কিন ভূমিকা নিয়ে সংশয়ের অবতারণা করে। সব মিলিয়ে কোরীয় পরিস্থিতি নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসী অবস্থান কিছুটা নমনীয় হয়েছে। কিন্তু যুদ্ধ কিংবা সামগ্রিক পরিস্থিতি সংক্রান্ত যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান এখনো পরিষ্কার নয়।সঙ্গত কারণেই সর্বশেষ কোরীয় পরিস্থিতি কী সেটাই আলোচ্য বিষয়। ইতোমধ্যে ব্যাপক সামরিক উপস্থিতির কারণে যেকোনো মুহূর্তেই কোরীয় পরিস্থিতি সব পক্ষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার প্রেক্ষাপট বহাল আছে। বিশেষত সামরিক আনাগোনা বৃদ্ধির জেরে উসকানি মূলক কর্মকান্ডের ভেতর দিয়ে অনাকাক্সিক্ষত সংঘাতের সূত্রপাত হতে পারে। এক্ষেত্রে চীন-জাপানের ভূখ-গত বিরোধের কেন্দ্রস্থল পূর্ব চীন সাগরকেন্দ্রিক চীনের নতুন আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জাপান ও যুক্তরাষ্ট্র আজো মেনে নেয়নি।
বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে ক্রম সঙ্কুচিত আকাশসীমার নিরাপত্তা সংক্রান্ত স্থিতিশীলতা খুব ভঙ্গুর। তাই পূর্ব চীন সাগরের কৌশলগত এলাকার আকাশসীমাকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ বলে ধরে নেওয়া হচ্ছে। একটু হেরফের হলেই অনাকাক্সিক্ষত দুর্ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা খুবই প্রবল। আবার পীত সাগরের বিরোধপূর্ণ বিতর্কিত কোরীয় জলসীমা নর্দার্ন লিমিট লাইন ও জাপান সাগর পরিস্থিতি মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। এমন পরিস্থিতিতে ওই অঞ্চলে সৃষ্ট উত্তেজনার অবসান করে স্থায়ী শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফেরানোর পদক্ষেপ নেওয়া আশু প্রায়োজন। এক্ষেত্রে প্রথম পূর্বশর্ত হচ্ছে দ্রুত সব পক্ষের সামরিক মোতায়েনের মাত্রা কমিয়ে এনে পারস্পরিক আস্থা বৃদ্ধি করা। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ওই অঞ্চলে মোতায়েনকৃত শক্তি খুব শিগগিরই কমাবে এমন আভাস নেই। তাই কোরীয় পরিস্থিতির ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো পক্ষই নিশ্চিন্ত হতে পারছে না। যে কারণে দ্রুত কাক্সিক্ষত স্থিতিশীলতা ফিরে আসার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। যা ভবিষ্যতে আরো গভীর সংকটে রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।গত এক দশকে কোরীয় সমীকরণে বিস্তর পরিবর্তন এসেছে। এর মধ্যে উত্তর কোরিয়ার পরমাণু প্রকল্পের সাফল্য ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যে মার্কিন আধিপত্য হুমকিতে পড়ে। উত্তর কোরিয়ার ক্রমাগত সামরিক সাফল্য স্পষ্টত দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের নিরাপত্তার জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে ওঠে। যে ঘটনা ওই দুই দেশে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিসমূহের জন্যও রীতিমতো আতঙ্ক হিসেবে দেখা দেয়। ফলে কোরীয় পরিস্থিতির সামরিক সমীকরণ অনুকূল রাখতে যুক্তরাষ্ট্র নানা ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করে। এর আগে কোরীয় সংকট প্রশমনে ছয় জাতি আলোচনার ফলকে প্রাধান্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র উত্তর কোরিয়ার ওপর চাপ প্রয়োগ করতে চীনকে পদক্ষেপ নিতে আহ্বান জানায়। কিন্তু উত্তর কোরিয়া ওই আলোচনার শর্ত পূরণে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে অভিযুক্ত করে।অন্যদিকে দক্ষিণ চীন সাগরসহ নানা ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে সব ধরনের বিরোধের মাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ায় কোরীয় ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র সর্বশেষ পদক্ষেপ নিয়ে থাকতে পারে। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র প্রথমত শক্তির ভারসাম্য ফিরিয়ে এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় রণ পরিস্থিতিতে চালকের আসনে বসল।সম্প্রতি চীনের প্রথম বিমানবাহী রণতরী সমুদ্রে টহল দেওয়া শুরু করলে আঞ্চলিক পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ে। এই রণতরী পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকায় টহলে অংশ নিলে মার্কিন জাতীয় স্বার্থ সরাসরি বাধাগ্রস্ত হয়। উল্লেখ্য, পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরের বিস্তীর্ণ এলাকা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিজের সব ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার জন্য সংরক্ষিত স্থান বলে বিবেচনা করে। এর বাইরে উত্তর কোরিয়ার বহুমাত্রিক হুমকি মোকাবিলার লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রের এই স্ট্রাইক গ্রুপ স্থায়ীভাবে কোরীয় উপদ্বীপে অবস্থান নিতে পারে বলেই আশঙ্কা করা হচ্ছে।  এছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র সিউলে নিজের অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি থ্রাড মোতায়েন করেছে। এই প্রযুক্তির সাহায্যে উত্তর কোরিয়ার বিধ্বংশী ক্ষেপণাস্ত্র আক্রমণ প্রতিহত করা হবে সহজতর।এই পরিস্থিতির মধ্যে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে কোরীয় ইস্যুতে বেশ কয়েক দফা আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এসব বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র পিয়ংইয়ংয়ের সঙ্গে নতুন আলোচনা শুরু করতে অনীহা প্রকাশ করেছে। একই সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সংলাপ শুরু করতে চীনের আহ্বান প্রত্যাখ্যান করে যুক্তরাষ্ট্র পূর্বের আলোচনার ফলের দিকে আলোকপাত করে। যুক্তরাষ্ট্রের এই দাবি স্পষ্টত চীনের ওপর চাপ বৃদ্ধি করেছে। মূল কথা কোরীয় ইস্যুকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে চলছে প্রচ্ছন্ন বাগযুদ্ধ। এর মধ্য দিয়ে আঞ্চলিক অন্যান্য বিরোধপূর্ণ ইস্যুতে চীনকে কৌশলে চাপে ফেলতে চাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। এক্ষেত্রে প্রথমত যুদ্ধের আবহে যুক্তরাষ্ট্র চাইছে কূটনৈতিকভাবে লাভবান হতে। কিন্তু এতে নিজের মনোবাসনা পূরণ না হলে যুদ্ধের প্রস্তুতিও রাখছে দেশটি। তাই সর্বশেষ কোরীয় পরিস্থিতিতে ভিন্ন আবহ তৈরি হলেও সংকটের স্থায়ী সমাধান হয়নি।যেকোনো মুহূর্তেই আবারও পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে। আবার কেউ উত্তর কোরিয়াকেই দায়ী করে লিখেছেন এমন শিরোনামে:‘উত্তর কোরিয়ার সামরিক কর্মকাণ্ড যেন পারমাণবিক যুদ্ধের প্রস্তুতি’ ইত্যাদি।অধিকাংশ ক্ষেত্রে অন্ধ সাম্রাজ্যবাদপ্রীতির প্রকাশ।তবে মাইক হুইটনি, কী কারণে জানি না,এ প্রসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেও এর দায় ওয়াশিংটনের বিদেশনীতির ওপরই চাপিয়েছেন। উত্তর কোরিয়ার আন্তর্মহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষাদি বন্ধ করাতে সামরিক ব্যবস্থা নয়, তাত্ক্ষণিক ‘গঠনমূলক সংলাপে’র ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন।পরামর্শ দিয়েছেন, দেশটিকে উদার মানবিক সহায়তা দিয়ে তার সঙ্গে তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চুক্তি স্বাক্ষরে এগিয়ে যেতে।বিস্ময়কর যে তিনি এমন কথাও লিখেছেন,প্রয়োজনে কোরীয় উপদ্বীপ থেকে দখলদার বাহিনী ও অস্ত্রশস্ত্র সরিয়ে নেওয়ার সুস্পষ্ট সময়সীমা বেঁধে দিয়ে চুক্তি স্বাক্ষর করা যেতে পারে।কিন্তু ওয়াশিংটন শান্তির পথ অনুসরণ না করে আঘাত-প্রত্যাঘাতের অশান্ত পথই সঠিক বিবেচনা করছে।কারণ তার হাতে উন্নত প্রযুক্তির অস্ত্র আছে, যথেষ্ট অর্থের আপাত সরবরাহও রয়েছে। আর বর্তমানে রয়েছেন ট্রাম্পের মতো উগ্র,বদমেজাজি একজন প্রেসিডেন্ট। বিশ্ব ধ্বংস হয়ে গেলেও তাঁর কিছু যায়-আসে না।যে কথাটি হুইটনি হয়তো বলতে ভুলে গেছেন তা হলো, বর্তমান সংকট বা সমস্যা সমাধানে কার্যকর উপায় হলো চীনের কূটনৈতিক-রাজনৈতিক সাহায্য নেওয়া।বলার অপেক্ষা রাখে না,উত্তর কোরিয়াকে পরমাণু প্রযুক্তি সরবরাহ করেছে সম্ভবত চীনই।সে ক্ষেত্রে একমাত্র চীনই পারে এ সংকটের মধ্যস্থতা করতে।

লেখক ও কলামিস্ট,যুক্তরাজ্য

মাগো, তোমায় ভালোবাসি !

মাগো, তোমায় ভালোবাসি !

এক হরফে দিলেম লিখে একটি ইতিহাস….

সৃষ্টি মাঝে তুমি মা’যে শ্রেষ্ঠ সে প্রকাশ….

তোমার ত্যাগে প্রাণ পেল মা এ ধরণীর সব…

ভূবন মাঝে তুমি মাগো আমার সেরা রব….

আমার রক্তকণার অনুকণায় একজন মানুষের অস্তিত্ব সর্বদা বিরাজিত ।  সে মানুষটির ত্যাগে আমার অস্থি-মজ্জার প্রতিটি পরত গঠিত হয়েছে, তিনি আমার গর্ভধারিণী, জন্মদাত্রী প্রিয় মা । আমার সবকিছুর যোগফলে আমি তাই, যা আমার মা আমাকে বানিয়েছে । যার ত্যাগে আমি প্রাণ পেয়েছি, যার ধৈর্যে আমি বেড়ে উঠেছি, তিনি-ই আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ কিংবদন্তী, সময়ের শ্রেষ্ঠ শিক্ষক, নিঃস্বার্থ শুভাকাক্ষী, মমতা-করুণার আধার, সেরাদের সেরা মহীয়সী, জগৎ জননী মা আমার । একজীবনে তার কাছে যতখানি ঋণী হয়েছি, হাজারবার জনম পেলেও তার ছিঁটেফোঁটা শোধ করার সাধ্য আমার হবে না; কারো নেই ।

নতুন করে বলার মতো মায়ের গল্প নেই…

জন্ম দিয়েই ত্যাগ করেননি, মা’তো আমার সেই…

ভুল করেও যে মায়ের কাছে নিরাপরাধ ছিলাম…

সেই মা’কে ভুলে যাওয়ার নির্বোধ কেমনে হলাম…

স্বার্থের পৃথিবীতে মা’গুলোকে খুব বেশি বোকা মনে হয় ! তাইনা ? তাদের ভালো যেন তারা বুঝতেই পারেন না ! সন্তানের জন্য নিমিষেই ত্যাগ করেন ভোগের সব পথ । সন্তানকে বাঁচাতে কিংবা রক্ষা করতে গিয়ে প্রাণ দিয়েছেন এমন মায়ের দৃষ্টান্ত ধূলোর ধরাতে অযুত-নিযুত ঘুরে-ফিরে মায়ের শ্রেষ্ঠত্বের জানান দিচ্ছে । পৃথিবীতে একমাত্র স্বার্থহীন মানুষ মা, যিনি তার সন্তানকে স্বার্থহীনভাবে ভালোবাসেন । আবার এই মা-ই সবচেয়ে বড় স্বার্থপর কেননা সন্তানের স্বার্থ রক্ষার জন্য তিনি তার সকল আপন-স্বজন এমনকি গোটা পৃথিবীর সাথে স্বার্থনিজ কলহে জড়িয়ে যেতে দ্বিতীয়বার ভাবেন না । সন্তানের স্বার্থ রক্ষার উর্ধ্বে তার কাছে কোন নৈতিকতা নাই, নাই দায়িত্বের বাধ্যবাধকতা । একজন মায়ের কাছে একদিকে তার সন্তান, অন্যদিকে গোটা পৃথিবীর সব ।

মুত্যু পথে যে মা দিলেন নতুন জীবন উপহার…

ব্যথা সয়েও তিনি হলেন জীবন গড়ার কারিগর….

প্রভূ আমার ভালো রেখো আমার মাকে সবখানে….

জান্নাত নিজে লিখে দিও সব মায়েদের নসীবে…

মা’কে নিয়ে নতুন করে কাব্য, মহাকাব্য লেখার দরকার পড়ে না । শুধু ‘মা’ ডাকেই বাধা পড়েছে সৃষ্টির সব সুবর্ণ রেখা । যে রব তুলতে স্বর ক্লান্ত হয়নি, জিহ্বা অবসাদক্লিষ্ট হয়না, সে কেবল মা’য়ের ডাক । পৃথিবীর সকল মধু যেনো ঢেলে রাখা হয়েছে মা’য়ের রবে । কিংবদন্তীর গল্প খুঁজতে ইতিহাসের পাতা হাতরাতে হবে না, আমাদের প্রত্যেকটা মা-ই সোনালী অক্ষরে লেখা একেকজন মূর্ত কিংবদন্তী । কোন লেখা কিংবা উপমা দ্বারা মায়ের মহত্ত্ব-শ্রেষ্ঠত্বের সবটুকু ভাব ফুটিয়ে তোলার সাধ্য কারো নাই । মায়ের চেয়ে বড় সাধক নাই-জ্ঞানরাজ্যের দীক্ষক নাই । বেলা-অবেলায় মাগো তোমায় ভালোবেসে শুধু তৃপ্তি পেতে চাই । আমাদের সবার মায়েরা ভালো থাকুক, সুস্থ্য থাকুক, থাকুক শান্তিতে । আমাদের জীবনের বিনিময়ে হলেও মায়েরা বাঁচুক আরামে ।

রক্ত-ঋণের বোঝা শোধের শক্তি মোদের নাই…

প্রভূর কাছে মায়ের জন্য শুধু কল্যান চাই…

যেমন করে ছোট্ট বেলায় আগলে ছিলেন মোদের…

প্রভূ তুমি তেমন করে দেখে রেখো তাদের…

রাজু আহমেদ । কলামিষ্ট ।

fb.com/rajucolumnist/

বিশ্বজুড়ে ইন্টারনেট অশোভন বার্তা

 

রায়হান আহমেদ তপাদার   ইন্টারনেট ব্যবহার করে যে অপরাধ করা হয়,তাকে সাইবার ক্রাইম বলে।উন্নত বিশ্বে সাইবার অপরাধকে অপরাধের তালিকায় শীর্ষে স্থান দেয়া হয়েছে।তৈরি করা হয়েছে সাইবার অপরাধীদের জন্য নতুন নতুন আইন | বর্তমান বিশ্বে বহুল আলোচিত কয়েকটি সাইবার ক্রাইম হলো-(এক)সাইবার পর্ণোগ্রাফী (দুই) হ্যাকিং (তিন) স্প্যাম (চার) বোমাবাজি (পাঁচ)এ্যাকশান গেম ইত্যাদি।বাংলাদেশে সাইবার ক্রাইমের পরিচিতি বা এ সংক্রান্ত অপরাধ দমনের জন্য সংশ্লিষ্ট আইনটি অনেকেরই জানা নেই।তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন ২০০৬ আমাদের এ বিষয়ে নির্দেশনা দেয়।এই আইনে ইন্টারনেট অর্থ এমন একটি আন্তর্জাতিক কম্পিউটার নেটওয়ার্ক যার মাধ্যমে কম্পিউটার, সেলুলার ফোন বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক পদ্ধতি ব্যবহারকারীরা বিশ্বব্যাপী একে অন্যের সঙ্গে যোগাযোগ ও তথ্যের আদান-প্রদান এবং ওয়েবসাইটে উপস্থাপিত তথ্য অবলোকন করতে পারে।তথ্যপ্রযুক্তি আইন ২০০৬-এর ৫৬ ধারায় বলা হয়েছে,যদি কোনো ব্যক্তি জনসাধারণের বা কোনো ব্যক্তির ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে বা ক্ষতি হবে মর্মে জানা সত্ত্বেও এমন কোনো কাজ করেন, যার ফলে কোনো কম্পিউটার রিসোর্সের কোনো তথ্যবিনাশ,বাতিল বা পরিবর্তিত হয় বা তার মূল্য বা উপযোগিতা হ্রাস পায় বা অন্য কোনোভাবে একে ক্ষতিগ্রস্ত করে এমন কোনো কম্পিউটার সার্ভার কম্পিউটার নেটওয়ার্ক বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক সিস্টেমে অবৈধভাবে প্রবেশ করার মাধ্যমে এর ক্ষতিসাধন করেন যাতে তিনি মালিক বা দখলদার নন,তাহলে তাঁর এই কাজ হবে একটি হ্যাকিং অপরাধ।ইন্টারনেটের ব্যবহার বৃদ্ধির পাশাপাশি অনলাইনে শিশুদের নিরাপদ রাখার চ্যালেঞ্জ ও অনলাইনের হুমকি থেকে তাদের সুরক্ষিত রাখার গুরুত্বও বাড়ছে।দেশের ৪৯ শতাংশ স্কুলশিক্ষার্থী সাইবার বুলিং বা ইন্টারনেটে অশোভন বার্তা পাওয়ার মতো ঘটনার শিকার হচ্ছে। দেশের শীর্ষ সেলফোন অপারেটর গ্রামীণফোনের সিংহভাগ শেয়ারের মালিক টেলিনর।এ প্রতিষ্ঠানটি সূত্রে জানা যায়,বাংলাদেশের প্রধান শহরগুলোয় ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সী ১ হাজার ৮৯৬ শিক্ষার্থীর মধ্যে ইন্টারনেট বিষয়ক জ্ঞান নিয়ে জরিপ চালানো হয়। এর ভিত্তিতে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। টেলিনরের হেড অব সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি ওলা জো বলেন, নিরাপদে ইন্টারনেট ব্যবহারের বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ করছে টেলিনর। বিশেষ করে শিশু ও তরুণদের মধ্যে এটির গুরুত্ব রয়েছে। টেলিনরের দেশভিত্তিক এ গবেষণা ইন্টারনেট ব্যবহারের প্রতি ইতিবাচক মা-বাবা ও শিক্ষকদের নিরাপদ ইন্টারনেটের গুরুত্ব বোঝার ক্ষেত্রে সহায়তা করবে। পাশাপাশি এ গবেষণা সম্ভাবনা, মা-বাবাকে শিশুদের সঙ্গে এ ব্যাপারে আলোচনা ও এ নিয়ে তাদের পরামর্শ দেয়ার বিষয়ে উৎসাহ জোগাবে। সাইবার বুলিংসহ ইন্টারনেট-সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয়ে স্কুলশিক্ষার্থীদের প্রতিক্রিয়া বিশ্লেষণ করে টেলিনর এ গবেষণা করে। এতে বলা হয়, শিশুদের ইন্টারনেটে সহজে প্রবেশাধিকারের কারণে মা-বাবার কাছে আলোচিত ও শঙ্কার একটি বিষয় হচ্ছে সাইবার বুলিং। বাংলাদেশের ৪৯ শতাংশ স্কুলশিক্ষার্থীর একই ব্যক্তি দ্বারা উৎপীড়নের শিকার হওয়া অথবা অনলাইনে উত্ত্যক্ত হওয়ার অভিজ্ঞতা রয়েছে। বাংলাদেশের ৬১ শতাংশ শিক্ষার্থী জানিয়েছে, তারা অনলাইনে অশোভন কোনো বার্তা পাঠাবে না। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, অভিভাবকদের এ নিয়ে শিশুদের সঙ্গে খোলাখুলি কথা বলা, আলোচনা করা ও অনলাইনে এ ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হলে যেন শিশুরা তাদের মা-বাবার কাছে সাহায্য চাইতে পারে, এ ধরনের পরিবেশ তৈরি করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারী নারীর মধ্যে ৭৩ শতাংশ নানা ধরনের সাইবার অপরাধের শিকার হচ্ছে এবং ৪৯ শতাংশ স্কুলশিক্ষার্থী সাইবার হুমকির শিকার। তবে ২৩ শতাংশই অভিযোগ করে না।ইন্টারনেট ব্যবহার করে কিছু পোস্ট করাই স্মার্টনেস নয়, স্মার্টনেস হচ্ছে নিজেকে নিরাপদ রাখা। ইন্টারনেটের দুইটি দিক আছে একটি গঠনমূলক, অপরটি ধ্বংসাত্মক। গঠনমূলক দিকটি শিক্ষার্থীদের সমৃদ্ধ করবে, জ্ঞানের পরিধি বাড়ানোর জন্য অবশ্যই ইন্টারনেটের ব্যবহার প্রয়োজন। একই সঙ্গে দেশ ও সমাজকে নিরাপদ রাখার দায়িত্বও সবার।বর্তমানে তথ্যপ্রযুক্তির সুবিধা বাংলাদেশকে অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে লাভবান করেছে সত্যি; কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে তরুণদের একটি বড় অংশ এর অপব্যবহারের মাধ্যমে নিজেদের মেধা ও যোগ্যতার অপচয় করছে। আমরা যদি ফেসবুকের দিকে তাকাই, তাহলে দেখতে পাব তারা এক ধরনের একাকিত্বে ভুগছে, সমাজের বাস্তব ও মূলধারার সঙ্গে এক ধরনের দূরত্ব তৈরি করে ফেসবুকের বন্ধু-বান্ধবী, ফেইক বন্ধু ও বান্ধবীদের সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় কাটাচ্ছে। সারা রাত এ কাজ করতে করতে অনেকেই ক্লাস মিস করে কিংবা ক্লাসে উপস্থিত হলেও মনোযোগী হতে পারে না। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ শিক্ষার্থীদের মধ্যে এ প্রবণতা যেন আরও বেশি। বিষয়টি তাদের অলস, কর্মবিমুখ ও বিচ্ছিন্নতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ধীরে ধীরে তারা মাদকেও আসক্ত হয়ে পড়ছে। কেউ কেউ আন্তর্জাতিক অপরাধী চক্রের সঙ্গেও জড়িয়ে পড়ছে, সন্ত্রাসবাদে জড়িয়ে পড়ছে। এসব বিষয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষক, অভিভাবক ও জনপ্রতিনিধিদের সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। ডিজিটাল যুগে তাদের ভূমিকাও ডিজিটাল হতে হবে, শুধু ট্র্যাডিশনাল দায়িত্ব পালন করলে চলবে না।বিখ্যাত ব্যক্তিত্বের সঙ্গে, তাদের চিন্তাচেতনার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ কম পাচ্ছে এসব তরুণ ফেসবুক ইন্টারনেটের প্রতি অত্যধিক ঝুঁকে পড়ার কারণে। তাদের পাঠাভ্যাস গড়ে উঠছে না, উঠছে ফেসবুকে লাইক দেয়া, মেসেজ দেয়া, স্ট্যাটাস দেয়া ও কমেন্ট করা ইত্যাদির মধ্যে আটকে আছে তাদের জীবন। তাদের চিন্তাচেতনার ও কল্পনার জগৎ অন্যভাবে রাঙানো হচ্ছে। বিখ্যাত গল্প, উপন্যাস, কবিতা ও সাহিত্যের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছে না এসব তরুণ। মুক্ত খোলা মাঠে খেলাধুলার চর্চা, ঘুরে বেড়ানো, প্রকৃতির সংস্পর্শে এসে হৃদয়কে বড় করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এসব তরুণ।  তাছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, জনপ্রতিনিধি, সামাজিক নেতা এবং সর্বোপরি সরকারের এ বিষয়ে পরিবর্তিত ভূমিকা পালন করার সময় এসেছে। আমাদের মতো শুধু উন্নয়নশীল দেশ, উন্নত বিশ্ব ও শিল্পোন্নত দেশও সাইবার হামলার শিকার। আমরা একটি উদাহরণ দিয়ে বিষয়টির ভয়াবহতা অনুমান করতে পারি। দক্ষিণ কোরিয়ায় ইংরেজি শিক্ষার সবচেয়ে জনপ্রিয় লিডারস এডুর ওয়েবসাইটটি হ্যাক করেছে চীনারা। এখন পর্যন্ত হওয়া সবচেয়ে বড় সাইবার হামলাটি হয়েছে গেল মার্চের প্রথম সপ্তাহে। ওই সময় চীনা হ্যাকাররা দক্ষিণ কোরিয়ার সবচেয়ে বড় রিটেইলার লোটের ডিউটি ফ্রি শপের ওয়েবসাইটে হামলা করে। এতে প্রতিষ্ঠানটির কোরীয়, ইংরেজি, চীনা ও জাপানি ভাষার চারটি ভার্সনের ওয়েবসাইট বন্ধ হয়ে যায়। এতে চীনে লোটে মার্টকে প্রায় ৪ লাখ ৩১ হাজার ডলার লোকসান গুনতে হয়। এমনকি হামলার ব্যাপ্তি এতটাই ছিল যে, প্রতিষ্ঠানটি এর ওয়েবসাইট সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। হ্যাকাররা সাধারণত দুইভাবে এ হামলা পরিচালনা করছে।বিভিন্ন ওয়েবসাইটে প্রবেশ করে এর সৌন্দর্যহানির মাধ্যমে তারা হামলা করছে। এতে সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইটের অ্যাপিয়ারেন্স বদলে যায়। পাশাপাশি কনটেন্টসহ বিভিন্ন ধরনের বিকৃতি ঘটানো হয়। ফলে ওয়েবসাইটটির নিয়মিত ট্রাফিক আশঙ্কাজনক হারে কমে যায়।এছাড়া আরেক ধরনের হামলা করা হয়, যাকে ‘ডিস্ট্রিবিউটেড ডিনাইয়াল অব সার্ভিস’ সংক্ষেপে ডিডস নামে অভিহিত করা হয়।এ প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন অনলাইন সার্ভিসের প্রাপ্যতায় ব্যাঘাত ঘটানো হয়। এ দুই ধরনের হামলাই করা হয় সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক ছড়ানোর উদ্দেশ্যে। কোরিয়া ইউনিভার্সিটির স্কুল অব ইনফরমেশন সিকিউরিটির অধ্যাপক লিম জং-ইন বলেন, হ্যাকাররা যদি ব্যাংক, বিমানবন্দরসহ বিভিন্ন গণঅবকাঠামোর ওপর হামলা শুরু করে, তাহলে এটি একটি বড় সংকটের সৃষ্টি করবে। এতে ভয়াবহ পরিস্থিতির উদ্ভব হবে, যা দুই দেশকে সাইবার যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে। বর্তমানে চীনের সাইবার নিয়ন্ত্রণ খাতে প্রায় ১ লাখ দক্ষ লোক রয়েছেন, আর দক্ষিণ কোরিয়ায় এ সংখ্যা ৬০০-এর মতো।নারীরাও পুরুষদের সাইবার ক্রাইমে জড়িয়ে ফেলে। তারা বিভিন্ন ধরনের মেসেজ ও আবেদনময়ী ছবি পাঠিয়ে সহজেই পুরুষের মন দুর্বল করে ফেলে এবং কেউ কেউ লাঞ্চনের লেডি গেস্টের মতো পরিস্থিতিতে পড়ে, কেউবা হারায়। আবার অনেক পুরুষ নারী সেজে অন্য পুরুষকে ধোঁকা দিয়ে থাকে। কাজেই সাইবার ক্রাইম সম্পর্কে সবাইকে সচেতন হতে হবে। ইন্টারনেটে সবচেয়ে বেশি যে জিনিস খোঁজা হয় সেটা পর্নো। আর তাই এ জগতের বাসিন্দাদের সম্পর্কেও মানুষের জানার কৌতূহল কম নয়। তাদের জীবনযাপন, সংসার, আয়-রোজগার সবকিছুই মানুষ জানতে চায়। শুনতে অদ্ভুত লাগলেও পর্নো অভিনেত্রীদের থেকে অভিনেতাদের গড় আয় বেশি। একটি পুরুষ-নারী দৃশ্যে নায়িকা পান ৩০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ মার্কিন ডলার। নারী-নারী দৃশ্যে নায়িকা পান ৭০০ থেকে ১ হাজার ২০০ মার্কিন ডলার। নায়ক পান ৫০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ মার্কিন ডলার। আর একজন পরিচালক পান ১ হাজার থেকে ৩ হাজার মার্কিন ডলার। অর্থাৎ বিরাট এক আন্তর্জাতিক চক্র ও সিন্ডিকেট এই পর্নো ব্যবসার পসার জমিয়েছে, আর তা ছড়িয়ে দিচ্ছে পৃথিবীময়।গোটা বিশ্বের সমাজ বিজ্ঞানী ও ধর্মীয় নেতাদের ভাবিয়ে তুলছে এসব নতুন নতুন সামাজিক সমস্যা।এসবের সমাধান কোথায়?যদি কোনো ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে ওয়েবসাইটে বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক বিন্যাসে এমন কিছু প্রকাশ বা সম্প্রচার করেন যা মিথ্যা ও অশ্লীল বা সংশ্লিষ্ট অবস্থা বিবেচনায় কেউ পড়লে বা শুনলে নীতিভ্রষ্ট বা অসৎ হতে উদ্বুদ্ধ হতে পারে বা যার দ্বারা মানহানি ঘটে, আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটে বা ঘটার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়,রাষ্ট্র বা ব্যক্তির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয় বা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে বা করতে পারে বা এ ধরনের তথ্যাদির মাধ্যমে কোনো ব্যক্তি বা সংগঠনের বিরুদ্ধে উস্কানি প্রদান করা হয়,তাহলে তার এই কাজ অপরাধ বলে গণ্য হবে।তাই আমাদের প্রজন্মদের জন্য এসব ব্যাপারে সতর্ক থাকার এখনই সময়।

লেখক ও কলামিস্ট,যুক্তরাজ্য  

 

শবে বরাত: ফজিলত ও ইবাদত

এস,এম শাহাদৎ হোসাইন, গাইবান্ধা প্রতিনিধি: লাইলাতুল বরাত এ উম্মাতে মুহাম্মাদী নামাজ , কোরআন তেলাওয়াত ও জিকির এর মাধমে ইবাদত করে থাকেন। এটা খুব ফজিলতের রাত্রি। বান্দার উচিত যতদুর সম্ভব নফল নামাজ, জিকির-আসকার, কোরআন তেলাওয়াত ও দরুদ শরীফ পাঠ করা এবং নফল নিয়তে দিবাভাগে রোজা রাখা ভাল। এ রাতকে ইবাদতের জন্য নির্দিষ্ট করা, আতশবাজি, আলোকসজ্জা ইত্যাদি সবই বেদআতের পর্যায়ভূক্ত বলে মত দেন মুহাক্কিক আলেমগণ।লাইলাতুল বরাত বা ভাগ্য জননীর রাতে সৃষ্টি কর্তা আল্লাহ প্রথম আকাশে এসে তার বান্দাদের উদ্দেশ্য করে আহবান করেন যে যার যা চাওয়ার প্রয়োজন আছে তোমরা আমার নিকট প্রার্থনা করো আমি তোমাদের তা দিয়ে দিব। মহান দয়ালু আল্লাহ তায়ালা নিজে বান্দাদের ওপর দয়া ও ক্ষমার কেবল অসিলা তালাশ করেন যেকোনো পথেই হোক ক্ষমা করার সুযোগ খোঁজেন। তাই দয়াময় আল্লাহ তায়ালা তাঁর গুনাহগার বান্দাদের ক্ষমা করার জন্য বিভিন্ন স্থান ও সময়-সুযোগ বাতলে দিয়েছেন যাতে বান্দা নিজ কৃতকর্মে অনুতপ্ত হয়ে ক্ষমা চায় আর আল্লাহ তায়ালা ক্ষমা করে দেবেন। সেসব সময়ের একটি হলো শাবান মাসের ১৪ তারিখ দিবাগত রাত যাকে আমাদের প্রচলিত ভাষায় শবেবরাত বলা হয়। কোরআনে কারিমের ভাষায় একে বলা হয়েছে ‘লাইলাতুম মুবারাকা’ বা বরকতময় রাত আর হাদিস শরিফে এটি ‘লাইলাতুন নিস্ফ মিন শাবান’ বলে উল্লেখ রয়েছে। আমাদের বর্তমান সমাজে মানুষ এ রাত নিয়ে অনেক প্রান্তিকতার শিকার। একটি দল তা পালনে এ পরিমাণ বাড়াবাড়ি করে যে মসজিদ ও বাড়িঘরে আলোকসজ্জা, কবরে পুষ্প অর্পণ, আতশবাজি, হালুয়া-রুটি ও মিষ্টি বিতরণকেই এ রাতের আমল বানিয়ে নিয়েছে। ইসলামী শরিয়তে এ ধরনের কুসংস্কারের কোনো ভিত্তি নেই। পক্ষান্তরে এর সম্পূর্ণ বিপরীতে একটি দল উপরোক্ত ভ্রান্ত কাজকর্মের বিরোধিতা করতে গিয়ে শবে বরাতের অস্তিত্বকেই অস্বীকার করে বসেছে এবং তারা এ রাতের কোন বৈশিষ্ট্যই মানে না বরং এ রাতের সব কিছুকেই বিদআত বলে থাকে। বাস্তবে এ দলটিও ভ্রষ্টতায় রয়েছে কেননা শরিয়তে ওইসব কুসংস্কারের কোন ভিত্তি না থাকলেও শবে বরাতের একাধিক ফজিলত, তাৎপর্য ও বিভিন্ন করণীয় কোরআনে কারিম ও সহিহ হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। নিম্নে অতি সংক্ষেপে এর বিবরণ পেশ করা হলো। ক্ষমা ও রহমতের রজনী শবে বরাত হজরত মুআজ ইবনে জাবাল (রা.) সূত্রে বর্ণিত রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন অর্ধ শাবানের রাতে অর্থাৎ শাবান মাসের ১৪ তারিখ দিবাগত রাতে আল্লাহ তায়ালা সৃষ্টিকুলের প্রতি রহমতের দৃষ্টি দেন এবং মুশরিক ও হিংসুক-বিদ্বেষী লোক ছাড়া সবাইকে ক্ষমা করে দেন। অষ্টম শতাব্দীর যুগশ্রেষ্ঠ হাদিস বিশারদ আল্লামা নূরুদ্দীন হাইসামি (রহ.) বলেন হাদিসটির সূত্রের সব বর্ণনাকারী নির্ভরযোগ্য। এছাড়া এ মর্মে হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.), আলী ইবনে আবি তালিব (রা.), আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.), আবু মুসা আশআরি (রা.), আবু হুরাইরা (রা.), আয়েশা (রা.) প্রমুখ সাহাবী থেকেও হাদিস বর্ণিত হয়েছে। হজরত আয়েশা (রা.) বলেন এক রাতে রাসুলুল্লাহ (সা.) উঠে নামাজে দাঁড়িয়ে গেলেন, এতে এত দীর্ঘ সময় ধরে সিজদা করলেন যে আমার ভয় হলো তিনি মারাই গেছেন কি না। এ চিন্তা করে আমি বিছানা থেকে উঠে রাসুল (সা.)-এর বৃদ্ধাঙ্গুলি নাড়া দিই, এতে আমার বিশ্বাস হলো তিনি জীবিত আছেন। তারপর নিজ বিছানায় ফিরে এলাম। এরপর তিনি সিজদা থেকে মাথা ওঠালেন এবং নামাজ শেষ করে আমাকে লক্ষ্য করে বললেন, হে আয়েশা! তোমার কি ধারণা হয়েছে যে নবী তোমার সঙ্গে সীমা লংঘন করেছে? আমি বলি, জি না, হে আল্লাহর রাসুল! তবে আপনার দীর্ঘ সময় ধরে সিজদার কারণে আমার মনে হয়েছে আপনি মৃত্যুবরণ করেছেন। এরপর রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, হে আয়েশা! তুমি কি জানো, আজকের এ রাতটি কোন রাত? আমি বললাম, আল্লাহ ও তাঁর রাসুল এ বিষয়ে অধিক জ্ঞাত। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, এ রাতটি অর্ধ শাবানের রাত। এ রাতে আল্লাহ তায়ালা নিজ বান্দাদের প্রতি বিশেষ করুণার দৃষ্টি দেন, অনুগ্রহপ্রার্থীদের দয়া করেন। তবে হিংসুক লোকদের তার অবস্থার ওপর ছেড়ে দেন। যুগশ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস ইমাম বায়হাকি (রহ.) বলেন, এটি উত্তম মুরসাল হাদিস। শবে বরাতে রাত জেগে ইবাদত করা ও পরদিন রোজা রাখার গুরুত্ব অপরিসীম। হজরত আলী (রা.) সূত্রে বর্ণিত রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন ১৫ শাবানের রাত যখন হয়, তোমরা রাতটি ইবাদত-বন্দেগিতে পালন করো এবং দিনের বেলা রোজা রাখো। কেননা এ রাতে সূর্যান্তের পর আল্লাহ তায়ালা প্রথম আসমানে এসে বলেন, কোন ক্ষমাপ্রার্থী আছে কি? আমি তাকে ক্ষমা করে দেব। কোন রিজিক অন্বেষণকারী আছে কি? আমি তাকে রিজিক প্রদান করব। আছে কি কোন রোগাক্রান্ত ? আমি তাকে আরোগ্য দান করব। এভাবে সুবহে সাদিক পর্যন্ত আল্লাহ তায়ালা মানুষের বিভিন্ন প্রয়োজনের কথা উল্লেখ করে তাদের ডাকতে থাকেন। মহান আল্লাহ তায়ালা এ রাতে সকলকে ক্ষমা করলেও শিরিককারী, মদ্যপানকারী, বাবা মায়ের অবাধ্য সন্তানকে ক্ষমা করবেন না। এছাড়াও গনক ও যারা গননায় বিশ্বাস করে, যে সকল পুরুষ পায়ের টাকনুর নীচে কাপড় পরিধান করে। হাদিস বিশারদগণের গবেষণা মতে এ হাদিসের সব বর্ণনাকারী নির্ভরযোগ্য। তবে এতে শুধু ইবনে আবি সাবরা নামের এক ব্যক্তি রয়েছেন, তাঁর স্মৃতিশক্তির দুর্বলতার কারণে হাদিসটি সামান্য দুর্বল বলে গণ্য হবে। আর এ ধরনের দুর্বল হাদিস ফাজায়েলের ক্ষেত্রে সর্বসম্মতিক্রমে গ্রহণযোগ্য। এছাড়া শবে বরাত সম্পর্কীয় হাদিসগুলোকে যুগশ্রেষ্ঠ হাদিসবিশারদ ইমামগণ সমষ্টিগতভাবে ‘সহিহ’ বা বিশুদ্ধ বলে উল্লেখ করেছেন, যাঁদের মধ্যে ইমাম ইবনে হিব্বান, হাফেজ ইবনে রজব হাম্বলী, হাফেজ ইবনে তাইমিয়া (রহ.) প্রমুখ উল্লেখযোগ্য। বছরব্যাপী ভাগ্যনির্ধারণের রজনী শবে বরাত। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন ‘নিশ্চয়ই আমি কোরআন অবতীর্ণ করেছি বরকতময় রাতে। নিশ্চয়ই আমি সতর্ককারী। এই রাতে হেকমতপূর্ণ সব বিষয়ে সিদ্ধান্ত করা হয়। কোরআনের ব্যাখ্যাকারদের অনেকে আয়াতে উল্লিখিত ‘লাইল’ থেকে শবেকদর উদ্দেশ্য বললেও কয়েকজন ব্যাখ্যাকার এর অর্থ শবেবরাত বলেছেন। এ ব্যাপারে ইকরামা (রহ.) সূত্রে হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা অর্ধশাবানের রাতে যাবতীয় সিদ্ধান্তের চূড়ান্ত ফয়সালা করেন। আর শবে কদরে তা নির্দিষ্ট দায়িত্বশীলদের অর্পণ করেন। হজরত আয়েশা (রা.) সূত্রে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন অর্ধশাবানের রাতের কার্যক্রম হলো, এ বছর যারা জন্মগ্রহণ করবে এবং যারা মারা যাবে তা লিপিবদ্ধ করা হয়। এ রাতেই মানুষের আমল পৌঁছানো হয়। এতেই তাদের রিজিকের বাজেট করা হয়। তাই এ রাতে তসবিহ-তাহলিল, ইসতিগফার, কোরআন তেলাওয়াত বেশি বেশি করতে হবে। কায়মনোবাক্যে আল্লাহর কাছে নিজের প্রয়োজনের কথা বলতে হবে। এছাড়া উমরি কাজা ও নফল নামাজ অধিক পরিমাণে পড়তে হবে। তবে শবে বরাতের নির্দিষ্ট কোন নামাজ নেই। হাজারিকা নামাজ বলতে ইসলামে কিছু নেই। এটি বেদআত। এ রাতে কবর জিয়ারতের বিশেষ ফজিলত রয়েছে। আল্লাহ আমাদের নেক আমল করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ বাস্তবায়ন ও স্বাধীনতার সুফল লাভের একমাত্র উপায় !


আবু জাফর মুহাম্মাদ ইকবাল
পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠির অন্যায়, অবিচার, শোষণ, জুলুম, নির্যাতন থেকে মুক্ত হওয়ার সংগ্রাম ছিল স্বাধীনতার সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধ এবং এদেশের মানুষদের সকল অধিকার আদায় ও সংরক্ষণ, দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠন, শোষণমুক্ত অর্থনীতি এবং সুশাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার চেতনা’ই” ছিল মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। বহু মানুষের রক্তের বিনিময়ে স্বাধীনতা অর্জনের দীর্ঘ ৪৫ বছর পরও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাংলাদেশের মানুষের জীবনে বাস্তবায়ন হয়নি কেন? কেন জাতির মানুষ দল, উপদল, জোট ও মহাজোটে বিভক্ত হয়ে সংঘাত ও সংঘর্ষে লিপ্ত? কেন দেশের মানুষ তাদের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে দুর্ভোগ ও অশান্তিতে কাল কাটাচ্ছে? কেন জান, মাল, ইজ্জতের নিরাপত্তাহীনতায় ভূগছে স্বাধীন বাংলাদেশের মানুষ? কেন খাদ্যদ্রব্যসহ নিত্য প্রয়োজনীয় সকল পণ্যের ক্রম উর্ধগতিতে জন জীবন বিপন্ন? দুর্ভোগ ও অশান্তি থেকে জনগণকে মুক্ত করার জন্য দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রন ও বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে পদক্ষেপ না নিয়ে বর্তমান সরকার প্রেসিডেন্ট, মন্ত্রী, এম.পি. থেকে শুরু করে তার সকল সহযোগী প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা, কর্মচারীদের বেতনভাতা সরকারী কোষাগার অর্থাৎ জনগণের টাকায় বৃদ্ধির ব্যবস্থা করে সাধারণ মানুষের জন্য দুর্ভোগ ও অশান্তি বৃদ্ধি করে কেন? ক্ষমতা পেলেই ভোগ বিলাসের জীবন যাপনের জন্য সরকারী দলের মন্ত্রী, এম.পি’রা এবং তাদের সমর্থক অন্যান্য দলের নেতা কর্মী ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, কর্মী ও সমর্থকরা অর্থ বিত্তের পাহাড় গড়ায় ব্যস্ত হয় কেন? আবার শুধুমাত্র ক্ষমতায় টিকে থাকার এবং ক্ষমতায় যাবার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়ে সরকারী দল বিরোধী দলসহ সকল রাজনৈতিক দল সমূহ পরস্পর শত্রুতে পরিণত হয়ে দেশের মানুষের জীবনকে দুর্বিসহ করছে কেন? কেন সমাজ ও রাষ্ট্রের সকল স্তর ঘুষ ও দুর্নীতিতে ছেয়ে গেছে? সন্ত্রাস, চাদাবাজি, গুম, খুন, হত্যা, ধর্ষণসহ অসামাজিক কার্যকলাপসহ বিভিন্ন অন্যায় ও অপকর্ম ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে কেন? কারা দেশের যুব সমাজকে পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করার জন্য অস্ত্র, গোলা বারুদ ও নেশা জাতীয় সামগ্রী তাদের হাতে তুলে দিচ্ছে? কারা জাতিকে অন্ধকারের অতল গহ্বরে নিয়ে যাচ্ছে? নিজেদের দেশ নিজেরা পরিচালনা করে দেশের মানুষদের শান্তি ও কল্যাণে যথাযথ ভূমিকা না রেখে দেশের সাধারণ মানুষদেরকে শাসন ও শোষণ করছে কেন? রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনের পূর্বে “জনগণকে সকল ক্ষমতার উৎস বা মালিক” বলে দেশের সাধারণ মানুষকে ধোকা দিয়ে সরকার গঠন করার পরেই সরকার জনগণকে ভৃত্য মনে করে নিজেরা প্রভু হয়ে যায় কেন? সরকার ও তাদের সহযোগী প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের ভোগবিলাসের জন্য বেতনভাতা, চিকিৎসাভাতা, ভ্রমনভাতাসহ বিভিন্ন ভাতা জনগণের কাছ থেকে বিভিন্ন কর ও খাজনার মাধ্যমে আদায়কৃত টাকায় পরিশোধ করা হয় আর জনগণ! যার অর্থ আছে তার খাদ্য, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা, চিকিৎসা সব আছে; যার অর্থ নাই সে ভূখা থাকে, মুর্খ হয়, ফুটপাতে বা রেলষ্টেশনে ঘুমায়, অসুস্থ হলে বিনা চিকিৎসায় মারা যায়, বেওয়ারিশ লাশ হয় কেন? এমন টি হবার জন্যই কি এ দেশের মানুষ স্বাধীনতার সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধ করেছিল? এজন্যই কি দেশের মানুষ ও মুক্তিযোদ্ধাগণ প্রাণ দিয়েছিল? স্বাধীন দেশে কেন এমন হলো? এ অবস্থার কি পরিবর্তন হওয়া উচিত নয়? এ অবস্থার যারা পরিবর্তন চান, দুর্ভোগ ও অশান্তি থেকে যারা মুক্তি পেতে এবং জাতির সাধারণ মানুষদের মুক্ত করতে চান, যারা মানবতার কল্যাণ কামনা করেন এবং সমাজ ও রাষ্ট্রে সুশাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার কথা ভাবেন, তাদের জন্য বলছি- শান্তি ও কল্যাণ পেতে এবং সুশাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে হলে “আমাদেরকে অবশ্যই শান্তি ও কল্যাণ লাভ এবং সুশাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পথে চলতে হবে” । শান্তি ও কল্যাণ লাভ এবং সুশাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পথ হলো “বিশ্বজগতের সকল কিছুর সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ প্রদত্ত মানব জাতির সমাজ ও রাষ্ট্রসহ সমগ্র জীবন পরিচালনার জন্য একমাত্র জীবন ব্যবস্থা ‘ইসলাম’এর আইন-বিধানের আনুগত্য করার মাধ্যমে শুধুমাত্র আল্লাহর দাসত্ব করার পথ”। আর এজন্য সকল মানুষের জন্য একমাত্র আদর্শ নেতা আল্লাহর রাসূল মুহাম্মাদ (সাঃ)প্রদর্শিত পদ্ধতিতে সমাজ ও রাষ্ট্রে ‘ইসলাম’ প্রতিষ্ঠার চূড়ান্ত চেষ্টা করা এবং মানুষের নয়, আল্লাহর সার্বভৌমত্বের প্রতিনিধিত্বকারী নেতার নেতৃত্বে আল্লাহর সার্বভৌমত্বের ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ কিছু লোকের সমন্বয়ে সরকার গঠন করে আল্লাহ প্রদত্ত আইন-বিধান দ্বারা সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনার ব্যবস্থা করা। তাহলেই আমাদের অভিষ্ট লক্ষ্য- ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ বাস্তবায়ন ও ‘স্বাধীনতার সুফল’ ধর্ম, বর্ণ ও দল মত নির্বিশেষে জাতির “সকল মানুষের সকল অধিকার আদায় ও সংরক্ষণের ব্যবস্থাসহ সকল অধিকার প্রাপ্তি, শান্তি ও কল্যাণ লাভ এবং সমাজ ও রাষ্ট্রে সুশাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে”।
সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর অবাধ্য হয়ে ‘গণতন্ত্র’ বা মানব রচিত ব্যবস্থা ও মানুষের মনগড়া আইন-বিধানের আনুগত্য স্বীকার করে জীবন যাপন করলে ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ বাস্তবায়ন ও ‘স্বাধীনতার সুফল’ অর্জন তথা দুনিয়াতে শান্তি ও কল্যাণ এবং সুশাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা একেবারেই অসম্ভব। কারণ মানব রচিত ব্যবস্থা ও মানুষের মনগড়া আইন-বিধানের আনুগত্য মানুষকে মানুষের দাস বানায় এবং মানুষকে আল্লাহর সাথে শির্ক, আল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ও আল্লাহর চরম অবাধ্যতা করতে বাধ্য করে। আল্লাহর দাস না হয়ে মানুষের দাস হয়ে সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর সাথে শির্ক করে তাঁর অবাধ্য হয়ে জীবন যাপনের পরিণাম- আল্লাহর বিশেষ রহমত থেকে বঞ্চিত হয়ে তাঁর আযাব গজবের শিকার হয়ে দুনিয়াতে দুর্ভোগ ও অশান্তিতে কাল কাটাতে হয় এবং আখিরাতের জীবনে নিশ্চিত জাহান্নামই হবে স্থায়ীবাস। আল্লাহর সাথে শির্ক করে তাঁর অবাধ্য জীবন যাপন করে দুনিয়াতে শান্তি ও কল্যাণ এবং আখিরাতে চির সুখের স্থান জান্নাত লাভ আদৌ কি সম্ভব? বিবেকের রায় কি? সৃষ্টিকর্তা আল্লাহকেই সার্বভৌম ক্ষমতার একমাত্র মালিক, আইনদাতা-বিধানদাতা ও নিরংকুশ কর্তা স্বীকার করে আল্লাহ প্রদত্ত ব্যবস্থা ‘ইসলাম’এর আইন-বিধানের আনুগত্য ব্যতিত শান্তি ও কল্যাণ লাভ অসম্ভব। তবে, ‘ইসলাম’ প্রতিষ্ঠার জন্য ‘গণতন্ত্র’ বা মানব রচিত ব্যবস্থার অধীনে নির্বাচনে অংশগ্রহন কিংবা সশস্ত্র সংগ্রাম ও বোমাবাজি সমাজ ও রাষ্ট্রে ‘ইসলাম’ প্রতিষ্ঠার পদ্ধতি নয়। গণতন্ত্রের অধীনে নির্বাচন করতে হলে মানুষের সার্বভৌমত্ব, আইন-বিধান ও কর্তৃত্ব মেনে মানুষের মনগড়া আইন-বিধানের আনুগত্য স্বীকার করতেই হয়; যা সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর সাথে শির্ক ও কূফর। আল্লাহর সাথে শির্ক ও কুফর করলে ইসলামের বাহিরেই তার অবস্থান হয়। অপরদিকে রাষ্ট্রীয় শাসন ক্ষমতা অর্জন ব্যতীত কিঁতাল বা যুদ্ধের আদেশ করার অধিকার কোন ঈমানদার ব্যক্তির নেই। আল্লাহর রাসূল হযরত মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যখন মক্কা থেকে হিজরত করে মদিনায় গিয়ে রাষ্ট্রীয় শাসন ক্ষমতা লাভ করেন, তখনি বিভিন্ন পরিস্থিতিতে কিঁতাল বা যুদ্ধ করেছেন। মক্কায় আবু জাহিল গংদের শাসন চলাকালীন সময়ে আল্লাহর পক্ষ থেকে যুদ্ধের কোন নির্দেশ ছিল না, নির্দেশ ছিল ছবর ও ক্ষমার; তাই তিনি তাঁর অনুসারীদের ছবর ও ক্ষমার উপদেশ দিয়েছেন। কাজেই সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনায় মানব রচিত ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত থাকা অবস্থায় সমাজ ও রাষ্ট্রে ‘ইসলাম’ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সশস্ত্র লড়াই ‘সন্ত্রাস’ ব্যতীত আর কিছুই নয়। সুতরাং ‘সশস্ত্র লড়াইও’ সমাজ ও রাষ্ট্রে ‘ইসলাম’ প্রতিষ্ঠার পদ্ধতি নয়। এসব পদ্ধতি গ্রহন করলে কুরআন ও সুন্নাহ’র লংঘণ হয় এবং আল্লাহর সাথে শির্ক, আল্লাহর সাথে কুফুরী এবং আল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ হয়। যার ফলে আল্লাহর বিশেষ সাহায্য আসবে না, ইসলামও প্রতিষ্ঠা হবেনা। বরং দুনিয়াতে দুর্ভোগ ও অশান্তি এবং আখিরাতে নিশ্চিত জাহান্নামের আগুনেই স্থায়ী আবাস হবে। ‘ইসলাম’ প্রতিষ্ঠা করতে হলে আল্লাহর রাসূল হযরত মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রদর্শিত পদ্ধতিতে “সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনাসহ জীবনের সর্বক্ষেত্রে আল্লাহকেই সার্বভৌম ক্ষমতার একমাত্র মালিক, আইনদাতা-বিধানদাতা ও নিরংকুশ কর্তা স্বীকার করে” আল্লাহর প্রতি “ঈমান আনার ঘোষণা দিয়ে” সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনায় মানুষের সার্বভৌমত্ব, আইন-বিধান ও কর্তৃত্ব এবং মানব রচিত ব্যবস্থা ও এর প্রতিনিধিত্বকারী নেতা বা সরকারের আনুগত্য এবং মানুষের মনগড়া আইন-বিধানের আনুগত্য অস্বীকার অমান্য করে আল্লাহর সার্বভৌমত্বের প্রতিনিধিত্বকারী নেতার আনুগত্যে অধীনে থেকে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচীর মাধ্যমে অন্যদেরকে “আল্লাহর প্রতি ঈমান আনার এবং আল্লাহর দাসত্ব ও রাসূল মুহাম্মাদ (সাঃ)এর শর্তহীন আনুগত্য– অনুসরণ ও অনুকরণের অঙ্গীকার করার দাওয়াত প্রদান, এ লক্ষ্যে নিজ অর্থ ও সময় ব্যয় এবং সকল বিরোধীতা মোকাবিলা করার দায়িত্ব আল্লাহর উপর ছেড়ে দিয়ে ছবর ও ছালাতের মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করার (আমলে সালেহ’র) চূড়ান্ত চেষ্টা করাই সমাজ ও রাষ্ট্রে ‘ইসলাম’ প্রতিষ্ঠার অর্থাৎ ঈমানদারদের রাষ্ট্রীয় শাসন ক্ষমতা (খিলাফাত) লাভের একমাত্র পদ্ধতি। আল কুরআনে সুরা নূর’এর ৫৫ নং আয়াতে আল্লাহ ঈমানদারদের জন্য এ ওয়াদা’র কথাই জানিয়েছেন।
সকল মানুষের কল্যাণে “ইসলামী সমাজ” আল্লাহর রাসূল মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রদর্শিত পদ্ধতিতে করে আল্লাহর সার্বভৌমত্বের প্রতিনিধিত্বকারী নেতার নেতৃত্বে সমাজ ও রাষ্ট্রে ‘ইসলাম’ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে চূড়ান্ত চেষ্টা করে যাচ্ছে এবং সকলকে এই মহতী কাজে শামিল হওয়ার আন্তরিক আহ্বান জানাচ্ছে। সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনায় আল্লাহর সার্বভৌমত্ব, আইন-বিধান ও কর্তৃত্বের ভিত্তিতে ‘ইসলাম’ প্রতিষ্ঠিত হলেই ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ বাস্তবায়ন ও স্বাধীনতার সুফল লাভের মাধ্যমে সকল মানুষের জীবনে সুখ, শান্তি, সমৃদ্ধি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে; ধর্ম, বর্ণ ও দল মত নির্বিশেষে জাতির “সকল মানুষের সকল অধিকার আদায় ও সংরক্ষণের ব্যবস্থাসহ সকল অধিকার প্রাপ্তি, শান্তি ও কল্যাণ লাভ এবং সমাজ ও রাষ্ট্রে সুশাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে”। নিজ জীবনের কল্যাণ প্রত্যাশী জাতি, ধর্ম নির্বিশেষে সকল ভাই বোন এবং মানবতার কল্যাণকামী সকল বন্ধুদেরকে বিষয়টি ভেবে দেখার অনুরোধ করছি। “ইসলামী সমাজ”এর বিস্তারিত জানতে ভিজিট করুন:

ব্রেক্সিট নয়,এক্সিটের ভোটম্যাপে যুক্তরাজ্য

রায়হান আহমেদ তপাদার (লন্ডন)

আগামী ৮ই জুনের সংসদ নির্বাচনের ফলাফল কি ঘটবে এটি নিঃসন্দেহে ধারণা করা যায়।নিদেনপক্ষে, বৃটেনের রাজনীতি নিয়ে যারা ন্যূনতম যারা ধারণা রাখেন তারা জানেন, ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ পার্টিই জিতবে। যে নির্বাচনে ক্ষমতায় থাকা দলটির সন্দেহাতীতভাবে জয়ী হবার সমূহ সম্ভাবনা, এমন নির্বাচন কেন সরকারই হঠাৎ করে আয়োজনের তাগিদ অনুভব করলো? এ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বৃটেন রাষ্ট্র বা জনগনের প্রাপ্তি-প্রত্যাশা কোথায়;ব্রেক্সিট ট্রিগারের পর্যায়ে বৃটেনে একটি অন্তর্বর্তীকালীন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে, সেটি প্রায় বছরখানেক আগে থেকেই লিখছি। কারণ, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তেরেসা মের এ সরকারের এক অর্থে জনগণের সরাসরি ম্যান্ডেট নেই। বহুবার অন্তর্বর্তী নির্বাচনের দাবি উঠলেও প্রধানমন্ত্রী এ ব্যাপারে ছিলেন নিশ্চুপ। তাহলে হঠাৎ তিনি কেন গত ১৮ই এপ্রিল আচমকাই নির্বাচনের ঘোষণা দিলেন? তাও খুব কম সময় মাঝখানে রেখে। বৃটেনের বিরোধীদল লেবার পার্টি স্মরণকালের মধ্যে নেতৃত্বের জটিলতায় এখন সবচেয়ে খারাপ সময় পার করছে। দলের অভ্যন্তরে প্রশ্নবিদ্ধ পার্টি লিডার জেরেমি করবিনের নেতৃত্ব। সোশ্যাল বেনিফিট বা শুধু নাগরিক সুবিধার প্রতিশ্রুতি দিয়ে দলটি নতুন প্রজন্মের ভোটারদের আগের মতো ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। পক্ষান্তরে, ব্যক্তিগত সুবিধার আগে বৃটেনের অর্থনীতি; কনজারভেটিভের এমন নীতির পাশাপাশি লিবডেম ও ইউকিপে আস্থা হারানো বিরক্ত ভোটার শেষ পর্যন্ত মন্দের ভালো খুঁজছেন টোরির দলেই।গত দশকে আস্তে আস্তে বাম ধারার দল লেবার পার্টি ক্রমশ নেতৃত্বের পথ বেয়ে ডান ধারায় ঝুঁকছিল। আর, দুনিয়াজুড়েই এক ধরনের জোয়ার ছিল উগ্র জাতীয়তাবাদের। সেটি কেবল যে আমেরিকায় ডোনাল্ড ট্রাম্প বা ইউরোপের কিছু দেশে তা কিন্তু নয়। ভারতের সদ্য সমাপ্ত লোকসভা নির্বাচনেও দেখেছি অভিন্ন চিত্র।

সম্প্রতি ফ্রান্স ও এর আগে বছরের শুরুতে নেদাল্যান্ডসের নির্বাচনেও অতি ডানদের পিছু হটা শুরু হয়েছে। এখন, বৃটেনে ফের ফার লেফটের পথে জেরেমির নেতৃত্বে লেবার পার্টির মূল নীতিতে ফিরবার পুনঃযাত্রায় বৃটিশ, বিশেষ করে ইংলিশ জনগণ কতটা প্রস্তুত, সেটিও প্রশ্নবোধক। লেবারের নেতৃত্ব নিয়ে ঘনীভূত সংকটের শতভাগ সুযোগ নিতে চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তেরেসা। বিরোধী শিবিরের প্রতিকূল বাস্তবতাকে শতভাগ নিজের অনুকূলে কাজে লাগাতে চেয়েছেন তিনি। যেখানে অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে লেবার পার্টি ভোটের লড়াইয়ের জন্য দল হিসেবে অনেকটাই অপ্রস্তুত। সরকারের উপকূলে থাকা মাঠে এ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে লেবার পার্টি টানা তৃতীয়বারের মতো জনগণের ভোটে প্রত্যাখ্যাত হবে। এ পরাজয় আর দলীয় সংকটের বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসা হবে দলটির জন্য যথেষ্ট  সময়সাপেক্ষ। বর্তমান পার্টি লিডার জেরেমি করবিন একই সঙ্গে ব্যর্থ নেতৃত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবেন। এর অব্যাবহিত পরবর্তী সময়ে লেবার পার্টি দলটির নতুন নেতৃত্বের জন্য ব্যস্ত থাকবে। আর ওই সময়ে তেরেসা মের সরকার থাকবে বিরোধীদলের অভ্যন্তরীণ বিরোধের সুযোগে নিরাপদ। এরই মাঝে অবশ্য দু’শিবিরের অনেক সিনিয়র পার্লামেন্টারিয়ান আসছে নির্বাচনে না লড়ার ঘোষণা দিয়েছেন। সার্বিক বিচারে এখন পর্যন্ত এ নির্বাচন কার্যত দেশটির সবচেয়ে আকর্ষণহীন সংসদ নির্বাচনে রূপ নিয়েছে।আসন্ন নির্বাচনে লেবার পার্টি কেন পরাজিত হবে, এমন প্রশ্নের জবাবে এটুকু বলতে পারি,ব্রেক্সিটই একমাত্র কারণ নয়। লেবারের যে এমপি প্রার্থীরা এবারের নির্বাচনে লড়ছেন, তাদের বেশিরভাগ ব্রেক্সিটের গণভোটে রিমেইনের পক্ষে ক্যাম্পেইন করে হেরেছেন।গত বছরের ২৩শে জুন থেকে এ বছরের ৮ই জুন। মাঝখানের সময়স্বল্পতার নিরিখেই ভোটারদের ভুলবার নয়।দলীয় অভ্যন্তরীণ সংকটে দলটির বহু নেতাকর্মী নিজেরাই দল নির্বাচনে ক্ষমতায় যাবে এটি বিশ্বাস করেন না।যদিও, লেবার সমর্থকরা বলছেন, এ নির্বাচন তেরেসা মে আয়োজন করছেন তার নিজের নেতৃত্বে আরো শক্তিশালী সরকার ও পছন্দসই ব্রেক্সিটের জন্য,আসলে বৃটেনের জনগণের জন্য নয়।  দৃশ্যত, তেরেসা মে বিরোধী শিবিরের প্রতিকূলতাকে কাজে লাগাতে এ সময়টিকে মোক্ষম মনে করেছেন। আর নির্বাচন ঘোষণার পর পুুঁজিবাজার ও পাউন্ডের দরপতনের যে আশঙ্কা করা হয়েছিল, তাও সত্য হয়নি। একথাও সত্য, বৃটেনে জনগণ ভোট দেয় দলগুলোর মূলত ম্যানিফেস্টো দেখে। শুধু শুরু থেকে ফেভারিট হিসেবে নয়, লন্ডনের গত মেয়র নির্বাচনে লেবারের সাদিক খানের জয়ের নেপথ্যে তার হোপার টিকিট, হাউজিংগের ব্যাপারে প্রতিশ্রুতি দেয়া ইশতেহারটিও প্রভাবক ভূমিকা রাখে। যদিও, শুরু থেকে তার প্রতিদ্বন্দ্বী জ্যাক গোল্ডস্মিথ সাদিকের চেয়ে পিছিয়ে ছিলেন। লন্ডনের বারাগুলো বেশিরভাগই লেবার অধ্যুষিত। সাদিক খান ওই নির্বাচনে ৫৬.৮ শতাংশ ভোট পান। গোল্ডস্মিথ পান ৪৩.২ শতাংশ।আসন্ন সংসদ নির্বাচনে কোনো দলের এককভাবে সরকার গঠন করতে হলে ৬৫০টি সংসদীয় আসনের মধ্যে জিততে হবে ৩২৬টি আসনে। গত নির্বাচনে কনজারভেটিভ ৩৩০ আর লেবার পার্টি ২২৯টি আসনে জেতে। বাংলাদেশে বর্তমানে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার নির্বাচিত সরকার দেশ শাসন করছে। বিএনপির রাজনৈতিক ব্যর্থতার উপর সরকার যেভাবে দেশ চালাচ্ছে, এখানকার সরকারি দলেরও এগিয়ে থাকার নেপথ্যে রয়েছে লেবারের সিদ্বান্তগত, কৌশলগত রাজনৈতিক ব্যর্থতা।বৃটেনের জনগণ সব সময় শক্তিশালী সরকার চায়। এবার এক্ষেত্রে লেবার সরকার গঠন যদি শেষ অবধি গঠন করেও (যদিও সবগুলো জনমত জরিপ বলছে সে সম্ভাবনা নেই ) সেটি হবে দুর্বল কোয়ালিশন সরকার। একথা সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীও বল্টনে নির্বাচনী প্রচারণায় নিজে বলেছেন।নির্বাচনে আমার ধারণা, বড় জয় পাবে কনজারভেটিভ। আসনসংখ্যা বাড়বে ব্যবধানে।বর্ণবাদী দল হিসেবে চিহ্নিত ইউকিপের ভোট কমতে পারে বড় ব্যবধানে। গত নির্বাচনে যেসব ভোট পড়েছিল ইউকিপের বাক্সে, এবার সেসব ভোটের একটি বড় অংশের গন্তব্য হতে পারে কনজারভেটিভ।  লিবডেম কিছুটা পরিসংখ্যানের গ্রাফে এগুলেও সেটি ক্ষমতার নিয়ামক হবে না। বর্তমান পার্লামেন্টে ৫৪টি আসন নিয়ে স্বতন্ত্র স্বদেশের দাবিদার স্কটিশ ন্যাশন্যাল পার্টি আগামীতেও ফ্যাক্টর হিসেবে থাকবে বৃটেনের রাজনীতিতে।বিশ্বজুড়ে উগ্র আর একাধিপত্ববাদী জাতীয়তাবাদের জোয়ারের বিপরীতে বৃটেন কিছুটা হলেও ব্যতিক্রম। এখানে আগামী নির্বাচনে রাইট ব্লক বিজয়ী হবে কিন্তু ফার রাইটিস্টরা নয়। অন্তত ইউকিপের মতো বর্ণবিদ্বেষী হিসেবে চিহ্নিত দলগুলো যে ক্ষমতার নিয়ামক হতে পারছে না, উল্টো হারিয়ে যাচ্ছে; সেটি বৃটিশ গণতন্ত্রের ভারসাম্যের বাহ্যিক সৌন্দর্য।আগামী নির্বাচন বৃটেনের জন্য কেন দরকার, এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজবার আগে একটি কথা বলে নিই। তেরেসা মে ইজ ভেরি স্পেসিফিক এন্ড ইউনিক এজ অ্যা লিডার। অনেকে তাকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচারের অনমনীয় চরিত্রের সঙ্গে তুলনা করতে ভালোবাসেন। আগামী নির্বাচনেও জয়ের পথ বেয়ে তেরেসা মের সরকার ব্রেক্সিট  সংহতভাবে বাস্তবায়ন করবে। জনগণের পুনরায় সরকারকে সার্বিক বিচারে আরো শক্তি জোগাবে। লেবারের ঐতিহাসিক পরাজয়ে কনজারভেটিভ পাবে আলটিমেট এন্ড এবসলিউট পাওয়ার।এ লেখার পাঠকদের কথা মাথায় রেখেই কিছু শব্দের বাংলা অনুবাদে সচেতনভাবেই যাইনি আমি। এ লেখা নিবেদিত বাংলাদেশিদের জন্য বিশেষত বিলেত প্রবাসী আমাদের পাঠকদের জন্য। যা হোক, এবার মূল কথায় আসি। কেননা,এ বিষয়টি এখনো বৃটেনের কোন ধারার মিডিয়াতে আলোচনায় আসেনি, যেটি আমি অনুভব করি।বৃটেনে এখন ব্রেক্সিটই একমাত্র সংকট নয়।৮০০ বছর ধরে দেশটি লিখিত সংবিধান ছাড়া চলছে।কিন্তু, জেনোফোবিয়া বা প্রবাসীদের প্রতি বিদ্বেষ, বর্ডার, নাগরিক অধিকার বা প্রতিরক্ষায় জনগণের জবাব দিহিতার প্রশ্নে লিখিত সংবিধানের প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য হয়ে পড়ছে।  এমআই ফাইভ বা সিক্স, সিক্রেট সার্ভিসের মডিফাই বা রেগুলেশন এখন আর আলোচনার বাইরের বিষয় নয়। আর বিশেষত ব্রেক্সিট চূড়ান্ত বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া, তৎপরবর্তী প্রতিবেশী আর সীমান্ত সমস্যার সমাধান, সার্বিক বাস্তবতায় সাংবিধানিক উদ্যোগ এসবের জন্য দরকার সর্বোতভাবে শক্তিশালী সরকার।সঙ্গত কারণে, আসন্ন আকস্মিকতাময় এ নির্বাচন শুধু ব্রেক্সিট কেন্দ্রিক নয়, এখানে অনেক সামাজিক, ভূরাজনৈতিক এবং মনস্তাত্ত্বিক ইস্যু অনিষ্পন্ন। আসছে নির্বাচনের মধ্য দিয়ে জনরায়ের পথ বেয়ে সরকার আসলে সাংবিধানিক সংস্কারের রুদ্ধ দুয়ারটিই উন্মুক্ত করতে চায়। আমি বিশ্বাস করি, ব্রেক্সিটের কিছুদিন পরই আমরা সিটিজেন এসেম্বলি কনসালটেশনের আলোচনা শুনতে পাবো। আমাদের তিন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এমপির অন্তত দু’জন ফের জিতে আসবেন বিলেতের পার্লামেন্টে। তৃতীয়জনের চান্স ফিফটি ফিফটি।গণতন্ত্র বা ভোটের রাজনীতি মানে ৫১ শতাংশের জয়ের বিপরীতে ৪৯ শতাংশ জনগণের নীতিবদ্ধ পরাজয়।কূটকৌশলের খেলা।দেশে দেশে রাজনীতির অন্দরমহলের যাপিত সৌন্দর্য।কিন্তু শেষ বিচারে বৃটেনে বহমান গণতন্ত্রেরই জয় হয়।                                   লেখক ও কলামিস্ট,যুক্তরাজ্য

 

মেহনতি-শ্রমিক-জনতার দিন বদলের মানুষ ছিলেন শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার


*নাসির উদ্দীন বুলবুল* নাসির উদ্দীন বুলবুল: ৭ মে ২০১৭ শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টারের ১৩ম শাহাদাৎ বার্ষিকী ।২০০৪ সালের ৭ মে শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টারকে তৎকালীন বিএনপি-জামাত জোট সরকারের লালিত সন্ত্রাসীরা দিন-দুপুরে জনসভার মঞ্চে গুলি করে হত্যা করে। আমার স্যার (শিক্ষক) শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার প্রান্তিক সমাজের বাইরের মানুষের অধিকার আদায়ে সোচ্চার কন্ঠ ছিলেন । তিনি শ্রমিক জনতার কাতারে দাঁড়িয়ে থেকেই মেহনতি-শ্রমিক-জনতার দিন বদলের জন্য নিরন্তর সংগ্রামী আদর্শিক আলো ফেলেছিলেন শ্রমিক-জনতার অধিকার আদায়ে। সে আলো ছিল সমাজভেদী। এক দরদি সমাজমনষ্কতা নিয়ে তিনি প্রান্তিক সমাজের মেহনতি-শ্রমিক-জনতার জীবনমান উন্নয়নে আজীবন কাজ করতে ব্রত হয়েছিলেন। শহীদ আহসান উল¬াহ মাস্টার এমপি ছিলেন আপাদমস্তক দেশপ্রেমিক। ছাত্রজীবনে তিনি সোচ্চার ছিলেন অসাম্প্রদায়িক চেতনায়, সত্য প্রতিষ্ঠায় এবং সব আন্দোলনে।

গত শতকের ষাট দশকে বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর সম্পর্কে আহসান উল্লাহ মাস্টারের দ্ব্যর্থহীন উচ্চারণ ছিলÑ‘বঙ্গবন্ধু ছাড়া আমাদের স্বাধীনতা অর্জন সম্ভব নয়।’ আহসান উল্লাহ মাস্টার জীবন বাজি রেখে দেশমাতৃকার মুক্তির জন্য অবতীর্ণ হয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধে। শহীদ আহসান উল্ল¬াহ মাস্টার ছিলেন দশের মধ্যে একক। তাকে মানুষ ভক্তি করতো, তিনিও মানুষকে ভক্তি করতেন। স্বাতন্ত্র্যে ও বৈশিষ্ট্যের আর দশজন থেকে তাকে পৃথক করা যায় এবং তিনি দীপ্যমান হয়ে উঠেন জ্যোতির্ময় সূর্যের মতো। সকলের প্রিয় শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার ছিলেন সর্বস্তরের মানুষের গভীর শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় সিক্ত একজন মানুষ। দেশ ও মানুষের জন্য তিনি কাজ করেছেন এবং জীবন উৎসর্গ করেছেন। শহীদ আহসান উল্ল¬াহ মাস্টার বহুমুখী প্রতিভা ও যোগ্যতার অধিকারী ছিলেন। ২০০৪ সালের ৭ মে আজকের এদিনে শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টারকে তৎকালীন বিএনপি-জামাত জোট সরকারের লালিত সন্ত্রাসীরা দিন-দুপুরে জনসভার মঞ্চে গুলি করে হত্যা করে। তিনি ছিলেন সহস্র তরুণের আদর্শ, জনকল্যাণমুখী চিন্তাধারার একজন রাজনীতিবিদ। শহীদ আহসান উল্ল¬াহ মাস্টার সাংবাদিকদের ভালোবাসতেন,টঙ্গী ও গাজীপুরের (স্থানীয়) সাংবাদিকদের বিপদ-আপদে পাশে ছিলেন,টঙ্গী প্রেসক্লাব নির্মানে সহযোগিতাসহ যে কোন উৎসব-অনুষ্ঠানে অংশ নিতেন। সালটা ২০০৩।টঙ্গী প্রেসক্লাব সাংবাদিকদের জন্য সপরিবারে বনভোজনের আয়োজন করে। আহসানউল্লা মাস্টারের মৃত্যুর আগের বছর। তখন প্রেসক্লাবের সভাপতি শাজাহান সিরাজ সজু। আমি সাবেক সভাপতি। বনভোজনের স্থান গজীপরের ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান। দুপুরে আহসান উল্লা মাস্টার এম পি’র গাড়িটি গিয়ে থামে আমাদের পিকনিক স্পটে। গাড়ি দেখেই প্রেসক্লাবের সভাপতি শাহজাহান সিরাজ সাজুসহ আমরা কয়েকজন এগিয়ে যাই। গাড়ির দরজা খুলে বেড়িয়ে এলেন আহসানউল্লা মাস্টার। তাঁর পরনে সাদা ধবধপে পা’জামা-পাঞ্জাবী। ঠোঁটে মন জুরানো হাসি। হাসি মুখে আমাদের সালামের জবাব দিয়ে একে একে সবার সাথে করমর্দন করতে করতে এগিয়ে গেলেন পিকনিক প্যান্ডেলের দিকে। ওখানে গিয়ে আমাদের পরিবারের সদস্যদেও প্রত্যেকে সালাম দিয়ে কুশল বিনিময় করলেন হাসি মুখে। ছোট্ট সোনামনিরাও বাদ যায়নি। হাসি মাখা মিষ্টি কথায় ছোট্ট সোনামনিদেরও মুহূর্তে আপন করে নিলেন তিনি।
যখন ত্রিখন্ডিত গাজীপুর প্রেসক্লাব ও সাংবাদিক-স্রোতকে তিনি ঐক্যবদ্ধ করার গুরু দায়িত্ব কাঁধে নিলেন। বড় কথাÑ জেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সভাপতি আ.ক.ম মোজাম্মেল হক (বর্তমান মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী) আহ্সান উল্লাহ মাস্টারকে আন্তরিভাবে এ ব্যাপারে সহযোগিতা করেন। তদানিন্তন সংসদ সদস্য আহ্সান উল্লাহ মাস্টার সবাইকে মূল স্রোতে নিয়ে আসার আপ্রাণ প্রচেষ্টা চালান। সাবির্ক কল্যাণ বিবেচনায় ঐক্যবদ্ধ সাংবাদিক সমাজকে দেখতে চেয়েছিলেন তিনি।
কেবল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শ মনে প্রাণে গ্রহণ-ধারণ ও লালন-পালন করার শিক্ষাই গড়ে তুলতে পারে তাঁর মত একজন উদারনৈতিক খাঁটি রাজনীতিবিদকে।
ইতিহাস বলছে, বঙ্গবন্ধুও সাংবাদিকদের সঙ্গে গভীর সু-সম্পর্ক রেখে এগিয়েছেন। সাংবাদিক বিশেষগণও একইভাবে দেশ গড়তে বঙ্গবন্ধুর পাশে দাঁড়িয়েছেন।
ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার দ্বারাই ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধে বাঙালির সফল বিজয় গোটা বিশ্ব দেখেছে ‘বিস্মিত-চোখে’। এর মর্ম উপলব্ধি করেই এমপি আহ্সান উল্লাহ মাস্টার দেশ, মাটি ও মানুষকে অকৃত্তিমভাবে ভালবাসতে শিখেছিলেন। সেই ভালবাসা থেকেই ২০০০ সালে খুব সম্ভব মার্চ-এপ্রিলের কোন একদিন গাজীপুর সাকির্ট হাউজে এক বৈঠক করেন তিনি। বিষয়ঃ সাংবাদিকদের ঐক্যবদ্ধ করা। এই বৈঠকে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আ.ক.ম মোজাম্মেল হক -সহ গাজীপুর জেলা প্রশাসনের অন্যান্য কর্মকর্তা ও মূলধারার স্থানীয় সাংবাদিকবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
আহ্সান উল্লাহ মাস্টার সিংহভাগ স্থানীয় সাংবাদিককে এক প্লাটফর্মে দাঁড় করানোর ঐকান্তিক প্রচেষ্টা চালান। ফলে প্রতিবছর গাজীপুর প্রেসক্লাবের শান্তিপূর্ণ নিবার্চন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচিত কমিটি গঠনতন্ত্র অনুযায়ী সংগঠনের কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকেন।
‘আহসান উল্লাহ মাস্টার’। যিনি অল্প সময়ে গাজীপুরবাসীর মনের মনি কোঠায় অন্যরকম ভালবাসার স্থানটি দখল করে নিয়েছিলেন নিজ কর্মগুনের দ্বারা। সাংবাদিকদের দুর্দিনে পাশে থাকার চেষ্টা করেছেন। তিনি সত্যিকার অর্থেই সাংবাদিকদের বড় ভালোবাসতেন। ব্যক্তিগতভাবে প্রায় সব সাংবাদিককেই নামে চিনতেন। সুখে-দুঃখে খোঁজ খবর নিতেন। তাঁর শূন্যতা আজ বড় করুণ সুরে বুকের ভেতর কান্না হয়ে বাজছে।

আমি টঙ্গীস্থ নোয়াগাঁও এম এ মজিদ মিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র থাকাকালীন সময় থেকে সাংবাদিকতা জীবনেও দেখেছি মানুষকে তিনি কিভাবে ভালোবাসতেন।
শহীদ আহসান উল্র¬াহ মাস্টারের অর্থ-বিত্ত ছিল না। সঞ্চয় শুধু মানুষের ভালোবাসা। সন্ত্রাসীদের ব্রাশফায়ারে শহীদ হলেন আহসান উল্লাহ মাস্টার এমপি। মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে, সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে, অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে আপোস করেননি যে ব্যক্তিটি, যিনি মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো একজন মানুষ ও রাজনীতিবিদ। সেই ব্যক্তি প্রাণ হারালেন ঘাতকচক্রের হাতে। সেবা দিয়ে ও মহৎ কর্মের মাধ্যমে আলোর প্রদীপ হাতে নিয়ে যে মানুষটি অবদান রেখেছিলেন সংগ্রাম-আন্দোলনে, সে মানুষটি আজ চিরনিন্দ্রায় শায়িত। শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার প্রমাণ করেছেন মানুষকে ভালোবাসলে, তাদের জন্য কাজ করলে ও জীবন উৎসর্গ করলে মানুষ ভালোবাসায় তার প্রতিদান দেয়।
১৯৫০ সালের ৯ নভেম্বর তৎকালীন ঢাকা জেলার (বর্তমানে গাজীপুর জেলা) পূবাইল ইউনিয়নের হায়দরাবাদ গ্রামে আহসান উল্ল¬াহ মাস্টার জন্মগ্রহণ করেন। আহসান উল্ল¬াহ মাস্টারের শিক্ষাজীবন শুরু হয় নিজ গ্রামের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। প্রাইমারি শিক্ষা শেষ করে টঙ্গী হাইস্কুলে ভর্তি হন। ১৯৬৫ সালে টঙ্গী হাইস্কুল থেকে এসএসসি (মাধ্যমিক) পাস করে তৎকালীন ঢাকার কায়েদে আজম কলেজে একাদশ শ্রেণীতে ভর্তি হন। পরবর্তীতে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৭০ সালে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন ও টঙ্গীর নোয়াগাঁও এম এ মজিদ মিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করে আমৃত্যু ওই স্কুলের প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন। আমি নোয়াগাঁও এম এ মজিদ মিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত কালে দেখেছি আমার স্যার (শিক্ষক) আহসান উল্লাহ মাস্টার তার পেশাপরিচয় ও শিক্ষকতার আদর্শই তার সমগ্র জীবনাচরণের অঙ্কুর ও শেকড়কে ধারণ করেছিল। তার সকল মানবিক গুণ, ধ্যান-পবিত্রতা, কর্তব্যপরায়ণতা, দৃষ্টিভঙ্গির উদারতা, সাহসিকতা ও ন্যায়ের পাশে দাঁড়ানোর সমুদয় সত্যনিষ্ঠায় যথার্থই হয়ে উঠেছিল তার
পরিচয় এবং সম্মানসূচক বিশেষণ। শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টারের ব্যক্তিসত্তার মধ্যে একজন সমাজদরদী মহান মানুষের চরিত্র খুঁজে পাওয়া যায়। শিক্ষকতা জীবনের প্রথম দিকে তরুণ আহসান উল্লাহ মাস্টার শুধু যে শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন, তা নয় তাকে আমজনতার দরদী নেতার ভূমিকা পালন করতেও দেখা গেছে। শ্রমিকদের অভাব-অভিযোগ নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে দেনদরবার করা এবং তাদের স্বার্থ উদ্ধারের প্রচেষ্টায় কোনোদিনই তাকে পিছপা হতে দেখা যায়নি। ধীরে ধীরে মেহনতি মানুষ তাদের এই দরদী নেতার এমন অন্ধ অনুসারী হয়ে দাঁড়িয়েছিল যে, তার আহ্বানে দুতিন ঘণ্টার মধ্যে হাজার হাজার লোকের সমাবেশ হওয়ার বিচিত্র দৃশ্য অবাক-বিস্ময়ে ঢাকা-টঙ্গী-গাজীপুরের সবাই বার বার প্রত্যক্ষ করেছে। শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার তার অন্তরের দরদ দিয়ে সমাজের সর্বস্তরের মানুষের ভালো-মন্দ খোঁজখবর নিতেন এবং তাদের নিয়ে ভাবতেন বলেই তার কথায় মানুষ সাড়া না দিয়ে পারতেন না। আর এভাবেই তিনি শ্রমিক ও জনতার দরদী নেতারূপে স্বীকৃতি লাভ করেছিলেন। সমাজের সকল স্তরের মানুষের সঙ্গেই সমভাবে তিনি মিশতে পারতেন। গরিব-দুখিদেরই একজন হয়ে সাধারণ মানুষের সমাজেও তিনি অকৃত্রিমভাবে মেলামেশা করতে পারতেন। তাকে সবাই ‘স্যার’ বলে সম্বোধন করতেন।
বিপন্ন অভাবগ্রস্ত মানুষের জন্য তার অন্তরে সঞ্চিত ছিল সীমাহীন সহানুভূতি ও দরদ; আন্দোলনে শ্রমিকদের বিরুদ্ধে মামলা হলে, সেই মামলার আইনি লড়াইয়ের জন্য আইনজীবী নিয়োগ ও মামলা পরিচালনার জন্য তহবিল গঠনসহ বহুবিধ কর্মযজ্ঞের সঙ্গে শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার সর্বদাই কর্মব্যস্ত থাকতেন। ঢাকা, টঙ্গী, গাজীপুর নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম, খুলনাসহ বিভিন্ন স্থানে নির্যাতিত ও ভোগান্তির শিকার শ্রমিকদের জন্য মামলা বিষয়ক আইনি লড়াইয়ের জন্য ছুটে যেতেন।
অসাধারণ বন্ধুপ্রীতি ও অনুগত জনের প্রতি গভীর সৌহার্দ্য ও অকৃত্রিম ভালোবাসা ছিল শহীদ আহসান উল্ল¬াহ মাস্টারের অন্যতম গুণ। যাকে একবার তিনি বন্ধু বলে গ্রহণ করেছেন, তার জন্য যে কোনো ত্যাগ স্বীকারে তিনি সর্বক্ষণ প্রস্তুত ছিলেন, যাদের তিনি অনুগত প্রিয়জন বলে মনে করতেন, তাদের কল্যাণ সাধনের জন্য তার আগ্রহের অন্ত ছিল না। অন্যদিকে জনসাধারণ হতে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে যারা নেতৃত্ব করতে চাইতেন, শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার সেই দলের ছিলেন না। তিনি ছিলেন জনসাধারণের একান্ত আপনার লোক। বিশ্বস্ত বন্ধু এবং দরদী নেতা। আত্মিক অনুভূতির সাহায্যে মেহনতি শ্রমজীবী মানুষের হাসি-কান্না, সুখ-দুঃখ, চাওয়া-পাওয়া ও আশা-আকাক্সক্ষার কথা তিনি নিখুঁতভাবে অনুধাবন করতে পারতেন। তাই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও আদর্শ বাস্তবায়নের জন্য দেশের আপামর জনসাধারণের মধ্যে রাজনৈতিক চিন্তাধারার জীবন জোয়ার সৃষ্টি এবং সেই সঙ্গে চেতনা আর্দশকে সুসংহত করে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ার পথে তিনি ছিলেন একজন সৎ, আদর্শবান রাজনীতিক দক্ষ কর্মী। তিনি ছিলেন একজন দেশভক্ত প্রেমিক এবং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সোনার বাংলা বিনির্মাণ ছিল তার একমাত্র লক্ষ্য। আজকের এই দিনে শহীদ আহসান উল্ল¬াহ মাস্টারের সৎ আদর্শিক সংগ্রামী চিন্তা-চেতনা কর্মময় জীবন আদর্শলিপি হয়ে আপামর শ্রমিক জনতার দিনবদলের দিকে আহ্বান করছে। আমি এদিনে আমার স্যার শ্রমিকনেতা শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টারের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি।
লেখক পরিচিতি: নাসির উদ্দীন বুলবুল, সহ-সম্পাদক ভোরের কাগজ, সম্পাদক ভোরের বাণী ডটকম’, প্রকাশনা সচিব জাতীয় সাংবাদিক সোসাইটি কেন্দ্রীয় কমিটি, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন ও সাবেক সদস্য কার্য নির্বাহী কমিটি ঢাকা সাব-এডিটরস কাউন্সিল।ঊ-সধরষ: হঁনঁষনঁষ@মসধরষ.পড়স

ইসলামের শ্রমনীতিই শ্রেষ্ঠ শ্রমনীতি

রাজু আহমেদ ঃ শহরের সুউচ্চ ভবন, আমাদের মসৃণ পথচলার আয়োজনের পরতে পরতে মিশে আছে শ্রমিকের অবদান। সকালের শহরে ভদ্রভাবে হেঁটে চলার পরিবেশ বিরাজ করতো না যদি শহরের এক কোণে অবহেলায় বসবাসরত শ্রমিকেরা সূর্য উদয়ের পূর্বে স্তূপীকৃত ময়লা-আবর্জনার জঞ্জাট সরিয়ে না দিত। যে খাদ্য খেয়ে মানুষ জীবন ধারণ করছে সেই খাদ্যের এক কণাও উৎপাদিত হতো না যদি শ্রমিকের দল সূর্যের তীব্র তাপ এবং বর্ষার অবিরাম বর্ষণ সহ্য করার জন্য তাদের শরীরকে উন্মুক্ত করে না দিতেন। আজকের পৃথিবীতে যারা ধনের বাহাদুরি করে তাদের একটি পয়সাও অর্জন সম্ভব ছিল না শ্রমিকদের শ্রম ছাড়া। যারা তাদের সুন্দর-সুশৃঙ্খল জীবনের বাহাদুরি দেখায় তাদের এক সেকেন্ড সামনে গড়াতো না যদি শ্রমিকেরা তাদের রক্ত, ঘামের বিনিময় অন্যের জীবনকে সাজিয়ে দেয়ার দায়িত্ব না নিত। পৃথিবীর যে উন্নতি, সভ্যতার যে উৎকর্ষতার আলোকচ্ছটা আমরা দেখাচ্ছি তার অবদান শ্রমিকের। শ্রমিকরাই হাড়ভাঙ্গা, হৃদয়ভাঙ্গা প্ররিশ্রমে সজ্জিত করে দিয়েছে আমাদের সভ্যতা। শ্রমিক যদি শ্রম না দিত তবে কালের চাকা থেমে যেত, সভ্যতা থমকে দাঁড়াত এবং পৃথিবী তার বাসযোগ্যতা হারিয়ে ফেলত। তাইতো শ্রমিকের শ্রমকে মানব সভ্যতার জনক বলা হয়। কোনভাবে বেঁচে থাকার তাগিদে যাদের অধীনে শ্রমিকরা যুগের পর যুগ কাজ করে গেল, সেই প্রভুরা শ্রমিকের শ্রমকে পুঁজি করে বিলাসী জীবনযাপন করলেও শ্রমিকরা বেঁচে আছে হাড়ক্লিষ্ট দেহে। পরিবার-পরিজন নিয়ে দু’বেলায় আধাপেট খাওয়ার নিশ্চয়তা তারা আজও পায়নি। মানব সৃষ্ট শ্রমনীতি শ্রমিকদের শোষণ করেছে মাত্র কিন্তু কল্যাণ আনতে পারেনি মোটে। সেই দাস প্রথার যুগের মতো না হলেও আজও বিশ্বের নানা দেশের শ্রমিকরা ভাগ্য বিরম্বনার শিকার। অন্যায়, অবিচার আর শোষণের যাঁতাকলে বারবার পিষ্ঠ হয়েছে শ্রমিকের ভাগ্য, তবে তার বিনিময়ে ভাগ্যের উন্নতি হয়েছে কতটুকু তা আজকের পৃথিবীর শ্রমিকদের বাস্তব অবস্থান দেখলে সহজে অনুমান করা যায়। কিছু প্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তি শ্রমিকদের কল্যাণ নিশ্চিত করলেও বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠান শ্রমিকদের শুঁষে-ফুলে-ফেঁপে বেড়েছে চারদিক। মালিকপক্ষ অর্থবিত্তের সাম্রাজ্য গড়ে তুললেও শ্রমিকদের হাড় জিরজিরে অভুক্ত, অপুষ্ট ও মলিন চেহারা বদলায়নি মোটে। শ্রমিকরা তাদের সর্বশক্তি বিনিয়োগ করে কাজ করলেও বেশিরভাগ সময়েই তারা মালিকপক্ষের সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারেনি। যে কারণে মালিকদের দ্বারা শ্রমিকদের ওপর নেমে এসেছে অবর্ণনীয় অত্যাচার-অবিচার। মালিকপক্ষের দৃষ্টি লুকিয়ে কালেভদ্রে শ্রমিকরাও সকল অন্যায়-অনাচারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে এবং তাদের দাবি আদায়ে কিছুটা সাফল্যও পেয়েছে। তবে তারা শুধু মানবাধিকারের একাংশ ফিরে পেতে শ্রমিকদের বুকের রক্ত গড়িয়েছে পিচঢালা রাস্তায়। উৎসর্গ করতে হয়েছে অগণন জীবন।

সভ্যতার ঊষালগ্নে আমরা বর্তমান সময়ের শ্রমিকদের প্রতি অমানবিক আচরণ দেখে আঁৎকে উঠি। কিন্তু মাত্র দেড় শতাব্দীকাল পূর্বে বর্তমানের তথাকথিত আধুনিক বিশ্বের রাষ্ট্র ও মালিকপক্ষ শ্রমিকদের সাথে যে আচরণ করত তা বর্বরতম আচরণের যুগকেও হার মানাত। প্রতিবছরের পহেলা মে সারা বিশ্বের শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিতকরণ ও তাদের পেশার প্রতি সম্মান-শ্রদ্ধা জানিয়ে পালিত হয় ‘মহান মে দিবস’ তথা আন্তর্জাতিক শ্রম দিবস। মূলত শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্যই এ দিনের অবতারণা। আজকের শ্রমিকরা যতটুকু অধিকার পাচ্ছে তার অবতারণা ঘটেছিল ১৯৮৬ সালের ১ মে তারিখে আমেরিকার শিকাগো নগরীর ‘হে’ মার্কেট থেকে। সে মার্কেটের শ্রমিকরাই জীবন দিয়ে কাজের ৮ ঘণ্টা সময়সীমা নির্ধারণ করেছিল। এর পূর্বে শ্রমিকদের দীর্ঘদিনের পুঞ্জিভূত ক্ষোভ থেকে তাদের মধ্যে নানা অসন্তোষ বিরাজ করছিল। সেজন্য শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে নগরীতে এক শ্রমিক সমাবেশের আয়োজন করা হয়েছিল। পুলিশ সে সমাবেশে গুলি চালালে বিপুলসংখ্যক শ্রমিক হতাহত হয়। শ্রমিকদের ওপর গুলি বর্ষণের খবর শুনে ক্ষোভে ফেটে পরে আমেরিকা, ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশের শ্রমিকেরা। শ্রমিকদের জীবন উৎসর্গে অবশেষে ১৮৮৯ সালের ১৪ জুলাই প্যারিসে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক শ্রমিক সম্মেলনে প্রতিবছর ১ মে তারিখকে আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংহতি ও কর্মজীবী মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত হয়। সেই ধারাবাহিকতায় বর্তমান বিশ্বের ট্রেড ইউনিয়নগুলো মুক্তবাজার অর্থনীতির পাশাপাশি মুক্ত শ্রমবাজার, মুক্ত বাণিজ্য ও বিনিয়োগ প্রবাহের পাশাপাশি শ্রমিকদের অবাধ চলাচলের ন্যায় নতুন নতুন দাবি উত্থাপণ করছে। আমাদের দেশে পহেলা মে তারিখে বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ট্রেড ইউনিয়ন র‌্যালি, আলোচনাসভা, সঙ্গীতানুষ্ঠানসহ বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করে। তবে একদিনের এ আয়োজন আমাদের দেশের শ্রমিকদের ভাগ্য কতটুকু বদলিয়েছে তা আজও প্রশ্নবিদ্ধ। কেননা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে এই একবিংশ শতাব্দীতে ৮ ঘণ্টা শ্রমের নীতি মানা হয় না। কোথাও কোথাও সাপ্তাহিক ছুটির ব্যবস্থা নেই। কিছু প্রতিষ্ঠান ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের ঘোষণা কাগজ-কলমে দিয়ে রাখলেও তা গঠনের প্রতিকূলে নানাবিধ প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য আচরণ দেখিয়ে যাচ্ছে। নিয়ম লঙ্ঘন করে শ্রমিকদের ছাঁটাই করা হচ্ছে। প্রত্যেক কর্মজীবীর চাকরি হারানোর শঙ্কা তো সর্বদাই বিরাজ করছে। শুধু কাজে টিকে থাকার জন্য শ্রমিকরা মালিকের ইচ্ছার কল-কাঠিতে পরিণত হয়েছে। কেননা আমাদের লক্ষ বেকারের দেশে একবার কাজ হারালে পুনরায় কাজ পাওয়া দুঃসাধ্যের বটে।

প্রায় দেড় হাজার বছর পূর্বে মহান আল্লাহ তা’য়ালা মানবতার মুক্তির দিশারী হযরত মুহাম্মদ (স.)-এর দ্বারা যে শ্রমনীতি প্রণয়ন করিয়েছিলেন সেই শ্রমনীতি যদি বাস্তবায়ন থাকত তাহলে মালিক-শ্রমিকের মধ্যে কোনো দ্বন্দ্ব থাকত না। কিংবা শ্রমনীতি বাস্তবায়নের জন্য কাউকে প্রাণ দিতে হতো না। দুর্ভাগ্য আমাদের, আমরা সত্যের শিক্ষা থেকে বিচ্যুত হয়ে এমন সব মানব রচিত বিধানের পিছনে ছুটছি যার পুরোটাই ভুলে ভরা। মহানবী (স.) ঘোষণা করেছিলেন, ‘তোমরা শ্রমিকের মজুরি পরিশোধ করবে তাদের শরীরের ঘাম শুকিয়ে যাওয়ার পূর্বে’-আমরা শ্রমিকের কল্যাণে এ কথাগুলো না মেনে সমাজতন্ত্র, পুঁজিতন্ত্র তথা মার্কস, লেলিনের মতবাদে এমনভাবে আকৃষ্ট হয়েছি যার কারণে আমাদের সত্য দেখা এবং উপলব্ধি করার অর্গান বিকল হয়ে পড়েছে। ইসলাম শুধু শ্রমিকের স্বার্থে কথা বলেনি বরং শ্রমিক এবং মালিক উভয়ের মধ্যে বন্ধুত্বের তথা সাম্যের সম্পর্ক স্থাপনের নির্দেশ দিয়েছে। ইসলাম একদিকে যেমন মালিককে নির্দেশ দিয়েছে, তোমরা শ্রমিকদের পাওনা ঠিকমত পরিশোধ করবে, তেমনি শ্রমিককেও নির্দেশ দিয়েছে, তোমরা মালিকের কাজে ফাঁকি দেবে না। শ্রমিক মালিকের দ্বন্দ্ব নিরসনে ইসলাম যে নীতির প্রবর্তন করেছে তার চেয়ে উত্তম কোনো নীতি আকাশের নিচে আর মাটির উপরে অতীতে সৃষ্টি হয়নি এবং ভবিষ্যতে সৃষ্টি হওয়ার বিন্দুমাত্র সম্ভাবনা নেই। কোরআন-হাদিস ও ইসলামের ইতিহাস পাঠ করলে বোঝা যায়, নবী-রাসূলগণ শ্রমিকদের কত উচ্চ মর্যাদা দিয়েছেন। ইসলামের প্রায় সকল নবী মাঠে ছাগল চড়িয়ে নিজে শ্রমিক হয়ে শ্রমের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করেছেন। ইসলামে শ্রমের মর্যাদা অত্যধিক। শ্রম দ্বারা অর্জিত খাদ্যকে ইসলাম সর্বোৎকৃষ্ট খাদ্য হিসেবে আখ্যা দিয়েছে এবং জীবিকা অন্বেষণকে উত্তম ইবাদাত হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা’য়ালা বলেন, ‘তিনি তোমাদের জন্য ভূমি সুগম করে দিয়েছেন। কাজেই তোমরা এর দিক-দিগন্তে বিচরণ কর এবং তার দেয়া রিজিক থেকে আহার কর।’ (সুরা-মূলক, আয়াত-১৫)। সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব মুহাম্মদ (স.) বলেছেন, ‘ফরজ ইবাদতের পর হালাল রুজি অর্জন করা একটি ফরজ ইবাদত’ (বায়হাকী)। নবী-রাসূলগণ শুধু কথায় নয় বরং নিজে কাজ করে বাস্তবেই শ্রমের মর্যাদা নির্ধারণ করেছেন। কোনো কাজকে ক্ষুদ্র কিংবা অপমানের ভাবা উচিত নয়। শ্রমজীবী যে আল্লাহর বন্ধু তার প্রমাণ মেলে নবী-রাসূলদের পেশা দেখে। হযরত আদম (আ.) কৃষক ছিলেন। হযরত নুহ (আ.) কাঠমিস্ত্রি ছিলেন। হযরত দাউদ (আ.) কর্মকার ছিলেন। হযরত ইদ্রিস (আ.) দর্জি ছিলেন। হযরত ইব্রাহীম (আ.) রাজমিস্ত্রি ছিলেন। হযরত ইসমাঈল (আ.) রাজমিস্ত্রির যোগাড়ি ছিলেন। হযরত মূসা (আ.) ও হযরত মুহাম্মদ (স.) ছাগলের রাখাল ছিলেন। এছাড়া সাহাবীদের জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ে কর্মের প্রতি অনুরাগের বর্ণনা মেলে।

মে দিবসের চেতনা যদি শুধু পহেলা মে তারিখের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে যায় তবে এদেশের শ্রমিকদের ভাগ্য বদলাবে না কোনদিন। যে শ্রমিকদের রক্ত, ঘামকে পুঁজি করে একটি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক মেরুদ- গঠিত হয়, শিল্প প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা পায়, সে শ্রমিকদের অবহেলা করার অধিকার রাষ্ট্র কিংবা ব্যক্তির থাকা উচিত নয়। শ্রমিক ও মালিকের সম্পর্ক নিরুপনে আমাদেরকে ইসলামমুখী হতে হবে। কেবল ইসলাম পারে শ্রমিক-মালিকের দ্বন্দ্ব দূর করে একটি বৈষম্যহীন, শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে। আল হাদিসের শিক্ষানুযায়ী, শ্রমিকের ওপর ওই পরিমাণ কাজের দায়িত্ব চাপানো উচিত যা সুচারুরূপে সম্পন্ন করার শক্তি শ্রমিকের থাকে। শ্রমিকের রক্তচুষে, মেহনত চুরি করে নির্মাণকৃত সম্পদের পাহাড় টিকবে না। শ্রমিকের সাথে অমানবিক আচরণ করে যদি কিছু অর্জন করা হয় তবে তা শ্রমিকের বুকফাঁটা নিঃশ্বাসে ধ্বংস হবে নিশ্চিতভাবে।

রাজু আহমেদ।  কলামিস্ট।

মেহনতি মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হোক-এমনটাই কাম্য


-আলহাজ্ব মোঃ নূরবক্ত মিঞা-ঃ শ্রমজীবীদের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের প্রতীক মহান মে দিবস। প্রতি বছরই মহান মে দিবস বিশ্বজুড়ে মেহনতি মানুষের জন্য উৎসাহ ও উদ্দীপনার প্রতীক হয়ে হাজির হয়। এবারেও একই অবয়বে সারা বিশ্বেই দিবসটি পালিত হচ্ছে। শ্রমিক শ্রেণীর জন্য আজকের দিনটি দৃপ্ত শপথে বলীয়ান হওয়ার দিন, শোকের ও শেকল ছেঁড়ার দিন, একই সাথে উৎসবের দিনও আজ। দীর্ঘ বঞ্চণা আর শোষণ থেকে মুক্তি পেতে ১শ’ ৩০বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরস্থ ‘হে’ মার্কেটে ১০টি প্রাণের বিনিময়ে শ্রমজীবীরা সৃষ্টি করেছে এক অমর ইতিহাস।
বিশ্বের সকল দেশে উৎপাদনশীলতার চাকাকে সচল রেখেছে মেহনতি মানুষ। কাজের নিশ্চয়তা বিধান, উপযুক্ত পারিশ্রমিক প্রাপ্তি এবং কর্মক্ষেত্রে স্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও আনুষঙ্গিক সুবিধা পাওয়া তাদের ন্যায্য অধিকার। কাজেরনিশ্চয়তা প্রদান, উপযুক্ত পারিশ্রমিক প্রাপ্তি এবং কর্মক্ষেত্রে স্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও আনুসাঙ্গিক সুবিধা পাওয়া তাদের ন্যায্য অধিকার। যোগাযোগ ব্যবস্থা ও প্রযুক্তির প্রসার সত্ত্বেও শ্রমজীবীরা এখনো প্রতিকুলতা, বৈষম্য ও নৃশংসতার শিকার হয়ে মানবেতর পরিস্থিতির সম্মুখীন হচ্ছে। বঞ্চিত হচ্ছে শ্রমের বিনিময়ে প্রাপ্য মজুরি থেকে। পাখি ডাকা ভোর থেকে রাতের এক প্রহর পর্যন্ত নিষ্ঠার সাথে শ্রম দিয়েও মালিকদের মন পায় না। এমনকি তাদের সাথে মালিক পক্ষ পোকা-মাকড়ের মত আচরণ করে থাকে। শ্রমজীবীরা দিবারাত্রি পরিশ্রম করে জীবনের নূন্যতম প্রয়োজন গুলো মিটাতে পারে না, কিন্তু তাদের শ্রমের বিনিময়ে যাদের টাকার পাহাড় গড়ে উঠে তাদের গাড়ি-বাড়ি, রাজ প্রাসাদ গড়ে উঠতে বাঁধা কোথায় ? শ্রমিকদের ঘামে উপার্জিত অর্থে এসব মালিকেরা ঈদের কেনাকাটা করেন থাইল্যান্ড, ব্যাংকক, সিঙ্গাপুর-সহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে।
আমাদের দেশসহ বিশ্বে বিভিন্ন দেশে ক্ষুধা, নিরক্ষরতার অভিশাপ থেকে এখনো শ্রমজীবীদের মুক্তি মেলেনি। অনাহারে অর্ধাহারে রয়েছে শত শত শ্রমিক। বাংলাদেশের মতো বহুদেশ আন্তর্জাতিক শ্রমসংস্থা ও আই, এল, ও’র সদস্য হওয়া সত্বেও এ নীতিমালা অনায়াসে লংঘন করে বেকারত্বের সুযোগ নিয়ে শ্রমজীবীদের ন্যায্য মজুরি থেকে বঞ্চিত করে এবং মজুরি নির্ধানের ক্ষেত্রে নারী পুরুষের বৈষম্য, নারীদের অপেক্ষাকৃত কম মূল্য দিয়ে থাকে। ফলে বেতন বৈষম্য, অধিকার বঞ্চনা, কষ্টের দিনলিপি আর মানবেতর জীবনয়াপনের কাহিনীর দীর্ঘশ্বাস কেবল বেড়েই চলছে। এর সঙ্গে যোগ হচ্ছে শ্রমঘন্টা বৃদ্ধির অভিযোগ। শ্রমের উপযুক্ত মূল্য প্রাপ্তি, দৈনিক ৮ ঘন্টা কাজের দাবি এবং শ্রমিক শ্রেণীর অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে ১৮৮৬ সালের ১ থেকে ৪ মে পর্যন্ত শিকাগো শহরে ১০ শ্রমিক বুকের তাজা রক্ত ঢেলে রচনা করেছে মে দিবসের সংগ্রামী ইতিহাস। ওই সময় রক্তে ভিজে যায় ‘হে’ মার্কেট চত্বর। জানা গেছে, পুলিশের গুলিতে এক কিশোর শ্রমিক গুলিবিদ্ধ হয়ে রক্তে রঞ্জিত শার্টটি একটি কঞ্চিতে তুলে ধরে শ্লোগান দিতে দিতে দৌড়াতে থাকে। আগে শ্রমিক শ্রেণীর পতাকা সাদা থাকলেও সে দিন থেকে ঐ কিশোরের রক্তমাখা শার্টিটিকে প্রতীক হিসেবে ধরে লাল পতাকাকে বরণ করে নেয় শ্রমজীবীরা। আর যারা শহীদ হয়েছিল তাদের ৩ মে গণকবর হলে রাতে প্রচুর বৃষ্টির পানিতে সকালে দেখা যায় কবরের মাটি সরে গিয়ে মুষ্টিবদ্ধ একটি হাত বেরিয়ে এসেছে। শ্রমিকেরা মনে করলো এটি তাদেরকে সংগ্রাম না থামানোর জন্য ডাক দিয়ে যাচ্ছে। সেই থেকে শ্রমিক শ্রেণী যখন কোনো সংগ্রামী শপথ গ্রহণ করে তখন মুষ্ঠিবদ্ধ হাত উপড়ে তুলে শপথ করে। মোদ্দাকথা মে দিবসে সংগ্রাম উপহার দিয়েছে লাল পতাকা আর মুষ্ঠিবদ্ধ হাত। ১৮৮৯ সালের ১৪ জুলাই প্যারিসে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক শ্রমিক সম্মেলনে শিকএগার এ রক্তমাখা অর্জনকে স্বীকৃতি দিয়ে ১ মে ঘোষনা করা হয় ‘আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংহতি” দিবস। এ সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে ১৮৯০ সাল থেকে এ দিবস মেহনতি মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার স্মারক হিসেবে উদ্যাপিত হয়ে আসছে। ‘একতাই বল’ শ্রমজীবীদের জন্য এ কথাই অপিহার্য। মালিক কর্তৃপক্ষ সব সময় ব্যক্তি শ্রমিক অপেক্ষা শক্তিশালী। ঐক্যবদ্ধ শ্রমিক-শ্রেণী দুর্জয় শক্তির অধিকারী।
যাই হোক শ্রমিক, মালিক ও সরকারের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় দেশের কল্যাণমূখী উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে আমাদের সকলের দায়িত্ব ও কর্তব্যের বিষয়ে সজাগ থাকতে হবে। লেখকঃ সাংবাদিক।


সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি: এ্যাডভোকেট শেখ মোঃ আব্দুল্লাহ
সম্পাদক-প্রকাশক : শেখ মোঃ তৈয়াবুর রহমান॥

যুগ্ম সম্পাদক: এস এম শাহিদুল আলম॥ সহযোগী সম্পাদক: শেখ মোঃ আরিফ আল আরাফাত
সহ-সম্পাদক: (প্রশাসন) হাজী হাবিবুর রহমান শাহেদ: সহ সম্পাদক: আজমাল মাহমুদ
সম্পাদক কর্তৃক বাড়ী বাড়ী নং- ৫৩/২, ৪র্থ তলা, রাজ-নারায়ন-ধর রোড, কিল্লার মোড় বাজার, লালবাগ, ঢাকা-১২১১
ফোন: ০১৯১৮-২০১৬২৬, ফোন: ০১৭১৫-৯৩৩১৬৮
ই-মেইল- notunvor.news@gmail.com
Designed By Hostlightbd.com
| Cyberboss.org
Translate »