Category: উপ-সম্পাকীয়

নিজ দেশে পরবাসী

রোহিঙ্গারা নিজ দেশে পরবাসী

রায়হান আহমেদ তপাদার

পৃথিবীর খুব কম জাতির মধ্যেই দেখা যায়। আরাকানের বর্মী সৈন্যদের দখলদারিত্বের টানাপড়েনেই বাংলা-বার্মার মধ্যে দু’বার সামরিক সংঘাতের সূচনা হয়। সুদীর্ঘ ৩৫০ বছর পর্যন্ত আরাকান রোহিঙ্গা মুসলমান কর্তৃক শাসিত হওয়ার পর ১৭৮৪ সালে বার্মার রাজা ভোদাপায়া আরাকান দখল করে পূর্বের সব চুক্তি অস্বীকার করে আরাকানকে বার্মার অংশে পরিণত করেন। ভাগ্যের নির্মম, নির্দয়, নিষ্ঠুর পরিহাস, ক্ষমতালোভী সামন্তদের অনুপ্রেরণায় আরাকানীরা বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে পরম আনন্দে বর্মী সৈন্যদের স্বাগত জানালেও এই আনন্দ এক মাসও স্থায়ী হয়নি। অতি অল্প দিনের মধ্যেই আরাকানীরা দেখতে পেল বর্মী সৈন্যদের বর্বর ও পাশবিক চরিত্র হাহাকার আর চিৎকারে প্রকম্পিত মিয়ানমার। কেউ মা হারিয়ে দিশাহারা, কেউ বাবা হারিয়ে আবার কেউবা আদরের সন্তানের লাশ দেখে নির্বাক। যখন ছোট্ট শিশু মা-বাবার নিথর দেহ ধরে বলে,আম্মু, আব্বু ওঠো! কথা বলো আম্মু প্লিজ কথা বলো।কেমন লাগবে আপনার কাছে তখন? নিজেকে ধিক্কার দেওয়ার ভাষা আমার জানা নেই। কী বলব? কীভাবে সান্ত¡না দেব, কিছুই আমার জানা নেই। নিজেকে শুধুই স্বার্থপরই মনে হয়। আজ তাদের জন্য আমরা কিছুই করতে পারছি না। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে ফের রোহিঙ্গা মুসলমান নিধন শুরু হয়েছে। দেশটির সেনাবাহিনী, সীমান্তরক্ষী বাহিনী, পুলিশ এবং মগ দস্যুরা একাট্টা হয়ে এই নিধনযজ্ঞ চালাচ্ছে। সম্প্রতি ২৪টি নিরাপত্তা চেকপোস্টে হামলার যে ঘটনা ঘটে তারই অজুহাতে নিরীহ-নিরপরাধ রোহিঙ্গা মুসলমানদের নির্বিচারে হত্যা করা হচ্ছে। এবং রোহিঙ্গাদের ওপর আবারো নেমে এসেছে মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস।

অন্যদিকে বর্বরতার সীমা ছাড়িয়ে সেনাবাহিনী, পুলিশ ও বার্মা সন্ত্রাসীরা ভয়ঙ্কর বর্বরতায় মেতে উঠেছে। হত্যা, ধর্ষণসহ ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এর নিন্দা জানানোর ভাষাও যেন বিশ্ববাসী হারিয়ে ফেলেছে।একটি সমৃদ্ধ ইতিহাস থাকা সত্ত্বেও আজ রোহিঙ্গারা নিজ দেশে পরবাসী। রোহিঙ্গা শব্দটি রৌহিঙ্গা বা রোহিঙ্গিয়া শব্দ থেকে এসেছে, যা ইন্দো-ইউরোপিয়ান ভাষা। আর এই ভাষার সঙ্গে চট্টগ্রাম অঞ্চলের ভাষার রয়েছে অবিশ্বাস্য মিল এবং বাংলার সঙ্গে কিছুটা। অন্য মতে, রোহিঙ্গা শব্দটি রাহমা শব্দ থেকে এসেছে। অষ্টম শতাব্দীতে আরব বণিকদের জাহাজ রামরি দ্বীপে এসে পৌঁছালে তৎকালীন আরাকানের রাজা তাদের আশ্রয় দেন। তবে এই দয়ার কারণে বণিকরা আরাকানের অধিবাসীদের রাহমা বলে ডাকতেন (রাহমা অর্থ দয়াবান)। মতান্তরে ম্রৌহাঙ্গ শব্দ থেকে রোহিঙ্গা শব্দটির আগমন।ম্রৌহাঙ্গ ছিলেন আরাকানের পুরাতন রাজা।এ পৃথিবীতে প্রত্যেক জাতির একটি উত্থানকাল আছে। আমার মনে হয়, কোনো জাতির উত্থানকালীন সময়ের আচরণই সে জাতির বৈশিষ্ট্যের প্রতিনিধিত্ব করে। অধিকাংশ জাতির উত্থান পর্বের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এসব সবল জাতিসমূহ পার্শ্ববর্তী দুর্বল জাতির স্বাধীনতা হরণ করেছে, সম্পদ লুণ্ঠন করেছে ও তাদের অধিকার হরণ করেছে। কিন্তু বাংলার মুসলিম শাসকরা সে পথে অগ্রসর হননি। তারা পার্শ্ববর্তী ও ক্ষুদ্র রাষ্ট্রসমূহের অধিকার ও স্বাধীনতা রক্ষায় গুরুত্বপর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।গত ১১ আগস্ট হঠাৎই রোহিঙ্গা অধ্যুষিত গ্রামগুলোতে সেনাবাহিনী ও পুলিশ প্রবেশ করে। তখনই আশঙ্কা করা হয়।

রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর আরেকটি জুলুম-নির্যাতনের তান্ডব আসন্ন। সেনা ও পুলিশ সদস্যরা গ্রামগুলো অবরুদ্ধ করে টহল শুরু করে। এতে হাজার হাজার রোহিঙ্গা মুসলমান খাদ্য-পানিসহ নানরকম সঙ্কটে পতিত হয়। তারপরই ওই নিরাপত্তা চেকপোস্টে হামলার ঘটনা ঘটে। আর তাকে উসিলা করেই শুরু হয়েছে গণহত্যা, গণনির্যাতন ও গণবিতাড়ন। ঘটনা প্রবাহ থেকে সহজেই প্রতীয়মাণ হয়, এই গণহত্যা, গণনির্যাতন ও গণবিতাড়ন পূর্ব পরিকল্পিত। কথিত হামলার ঘটনা তাকে দ্রুতায়িত করেছে মাত্র। স্মরণ করা যেতে পারে, গত বছর ৯ অক্টোবর এ রকমই একটি হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাখাইনে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী, সীমান্তরক্ষী বাহিনী, পুলিশ ও মগ দস্যুরা ব্যাপক গণহত্যা চালায়। শত শত রোহিঙ্গা মুসলমান নিহত হয়। নিপীড়ন-নির্যাতন লুণ্ঠন, ধর্ষণ সীমা ছাড়িয়ে যায়। হাজার হাজার অসহায়-নিরাশ্রয় রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ-শিশু বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। এবারও সেসব ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটছে।গেল বছরের গণহত্যা, গণনির্যাতন ও গণ বিতাড়নের ঘটনায় বিশ্বব্যাপী নিন্দার ঝড় ওঠে। জাতিসংঘ ছাড়াও বিভিন্ন দেশ এর প্রতিবাদ জানায়। মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে হত্যা-নির্যাতন বন্ধ করতে। রোহিঙ্গা মুসলমানদের নিরাপত্তা ও নাগরিক অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার প্রশ্নে বিশ্বজনমত একই সমতলে এসে দাঁড়ায়। এ ব্যাপারে জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনানের নেতৃত্বে একটি কমিশন ঘটিত হয়। ক’দিন আগে কমিশন তার রিপোর্ট ও সুপারিশ পেশ করেছে। ওই রিপোর্টে রোহিঙ্গা সমস্যা নিরসনে ৮৮টি সুপারিশ করা হয়েছে, যার মধ্যে রোহিঙ্গা মুসলমানদের চলাফেরার ওপর বিধিনিষেধ প্রত্যাহার ও তাদের নাগরিক অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক কমিশনের এই রিপোর্ট ও সুপারিশ রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে যখন ইতিবাচক একটি পরিস্থিতি সৃষ্টির সম্ভাবনা জাগ্রত করে, ঠিক সেই সময়ে নতুন করে রোহিঙ্গা হত্যা-নির্যাতনের আরেকটি অধ্যায় সূচিত হয়েছে। এর শেষ কীভাবে, কোথায় গিয়ে হবে-তা এখনই বলার উপায় নেই। অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে বলতে হচ্ছে, মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গা হত্যা-নির্যাতনের কথা কখনই স্বীকার করে না। গত বছরের ঘটনা তদন্তে সরকারিভাবে গঠিত কমিটির রিপোর্টে নির্লজ্জভাবে দাবি করা হয়েছে, কোনো হত্যা-নির্যাতনের ঘটনা ঘটেনি। বড়ই পরিতাপের বিষয়,গণতন্ত্রপন্থী নেত্রী বলে পরিচিত অং সান সূচি নিরাপত্তা বাহিনী ও পুলিশ সদস্যদের হত্যা-নির্যাতন ও বর্বরতার প্রশংসা করেছেন। বলেছেন,আমি নিরাপত্তাবাহিনীর ও পুলিশ সদস্যদের প্রশংসা করতে চাই যারা অসীম সাহসের সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছেন।’ আশঙ্কা করা হচ্ছে, অং সান সূচির এই মনোভাবের প্রেক্ষাপটে চলমান পরিস্থিতির আরো অবনতি ঘটতে পারে।রাখাইনে রোহিঙ্গা হত্যা-নির্যাতনের ঘটনা ঘটলেই বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি বেকায়দায় পড়ে যায়। অসহায়-নিরাশ্রয় রোহিঙ্গা মুসলমানরা বাংলাদেশের দিকেই ছুটে আসে। এভাবে আসা কয়েক লাখ রোহিঙ্গা মুসলমান এখন বাংলাদেশে অবস্থান করছে। গত বছর এসেছে প্রায় এক লাখ। মানবিক কারণেই বাংলাদেশ তাদের আশ্রয় দিতে বাধ্য হয়। এবারো ইতোমধ্যে কয়েকশ রোহিঙ্গা মুসলমান প্রবেশ করেছে। এদের মধ্যে গুলিবিদ্ধ দু’জনের একজন হাসপাতালে মারা গেছে। মিয়ানমার রোহিঙ্গা মুসলমানদের বাঙালি বলে প্রচার করে, যদিও তারা শত শত বছর ধরে মিয়ানমারে বসবাস করছে।অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর লোকের মতো তারাও সেখানকার ভূমিপুত্র। বাঙালি বলে অভিহিত করে মিয়ানমার তাদের বাংলাদেশে ঠেলে দিতে চায়।

মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীর হত্যা, নৃশংসতা ও বর্বরতার অবসান হবে না। এজন্য কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে। গোটা একটি জাতিগোষ্ঠী নির্মূল করে দেওয়া হবে, এটা হতে পারে না। এ কথা সবারই জানা, রোহিঙ্গা মুসলমানদের নিরাপত্তা ও নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করার মাধ্যমেই এ সমস্যার সমাধান হতে পারে। এ ব্যাপারে মিয়ানমারকে বাধ্য করতে হবে। চীন এক্ষেত্রে সবচেয়ে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। আমরা আশা করতে চাই, হত্যা-নির্যাতন-বিতাড়নের মতো মানবাধিকার লঙ্ঘনের অপরাধ প্রতিরোধে চীন কার্যকর উদ্যোগ নেবে। এ মুহূর্ত গণহত্যা বন্ধ করা জরুরি। বাংলাদেশ-চীনসহ প্রতিবেশী রাষ্ট্রসমূহ এবং জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থা ও সম্প্রদায়ক একযোগে সোচ্চার হয়ে বলতে হবে-গণহত্যা বন্ধ করা হোক। বন্ধ করা হোক গণনির্যাতন ও গণবিতাড়ন। পরিশেষে এটাই বলব, তারাও তো আমাদের ভাই। এক দেহের একই প্রাণ। এক অঙ্গে ব্যথা পেলে সারা দেহে ছড়িয়ে পড়ে, তেমনি মিয়ানমারের ভাই-বোনদের ব্যথায় আমাদের ব্যথিত হওয়া উচিত। তবে সে ব্যথা শুধুই মুখে প্রকাশ নয়, কঠোর আন্দোলন দিয়ে তা প্রকাশ করতে হবে। প্রয়োজনে এ অন্যায়ের বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। দাঁড়াতে হবে তাদের পাশে।রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে বর্তমানে বিশ্ব সমাজ চুপ করে বসে নেই, বিক্ষোভ মিছিল ও নিন্দা জানাচ্ছে। তিব্বতের ধর্মীয় নেতা দালাইনামাসহ অনেকে গণতান্ত্রিক নেত্রী ও শান্তিতে নোবেল বিজয়ী অং সান সুচির নীরবতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। সাগরের বুকে ভেসে থাকা অসহায় বৃদ্ধ, বিপন্ন মা, ক্রন্দনরত শিশু আর ভীত সন্ত্রস্ত গৃহবধূর প্রকাশিত নিদারুণ ছবিগুলো বিশ্ববিবেককে প্রতিমুহূর্তে কষ্ট দিচ্ছে।তাই দীর্ঘদিনের জটিল এবং স্পর্শকাতর এই ইস্যুর স্থায়ী সমাধান না হয়ে বর্তমান পরিস্থিতিকে বিশ্ববাসী মনে করছে রোহিঙ্গাদের জন্য ডাঙ্গায় বাঘ, জলে কুমির আর আকাশে শকুন।আর তাই তারা আজ নিজ দেশে পরবাসী।

                                    লেখক ও কলামিস্ট

ঈদুল আজহায় আমাদের করণীয় ও বর্জনীয় মাওলানা এ এইচ এম আবুল কালাম আযাদ

 

ঈদুল আজহার দিনটি অত্যন্ত গুরুত্ব ও তাৎপর্যপূর্ণ দিন। এই দিনে সবচেয়ে বড় ইবাদত হল কুরবানী। হজরত আয়েশা রা. হতে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ স. বলেছেনÑ আদম সন্তান (মানুষ) কুরবানীর দিন রক্ত প্রবাহিত করা (কুরবানী করা) অপেক্ষা আল্লাহর নিকটে অধিক প্রিয় কাজ করে না। নিশ্চয়ই কিয়ামতের দিন (কুরবানী দাতার পাল্লায়) কুরবানীর পশু, এর শিং, এর লোম ও এর খুরসহ এসে হাজির হবে এবং কুরবানীর পশুর রক্ত মাটিতে পতিত হওয়ার পূর্বেই আল্লাহ তায়ালার নিকট সম্মানিত স্থানে পৌঁছে যায়। সূতরাং তোমরা কুরবানী করে সন্তুষ্ট চিত্তে থাকো। (তিরমিযী, ইবনে মাজাহ)
ঈদুল আজহা ত্যাগের মহিমায় ভাস্বর মুসলিম বিশ্বের অন্যতম ধর্মীয় উৎসব। পবিত্র এ দিনটিতে আল্লাহর প্রিয় জিনিস হিসেবে পশু উৎসর্গ করা হয়। কুরবানীর ভেতর দিয়ে মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভের দিকে অগ্রসর হয় মুসলমান সম্প্রদায়। কুরবানীর অর্থ হচ্ছে উৎসর্গ করা। পশু কুরবানী হচ্ছে তার মাধ্যম। ত্যাগের মহিমার এক প্রতীকী আচার এ কুরবানী যে সত্য, সুন্দর ও কল্যাণ মূর্ত হয় মানুষের জীবনে, তার জন্য চরম ত্যাগ স্বীকারের প্রতীক কুরবানী। ঈদুল আজহার প্রকৃত উদ্দেশ্য নিজের অহমিকা ও উচ্চাভিলাষ উৎসর্গ করা। পশু কুরবানীর মধ্য দিয়ে মানুষের ভেতরের পশুশক্তি, কাম-ক্রোধ, লোভ, মোহ, পরনিন্দা, পরশ্রীকাতরতা ইত্যাদি রিপুকে কুরবানী দিতে হয়।

ঈদুল আজহায় করণীয় দিকসমূহ
ইসলামের এ দুটি উৎসবের দিন শুধু আনন্দ-ফুর্তির দিনই নয়। বরং এ দিন দুটোকে আনন্দ-উৎসব এর সাথে সাথে জগৎসমূহের প্রতিপালকের ইবাদত-বন্দেগী দ্বারা সুসজ্জিত করা। যিনি জীবন দান করেছেন, দান করেছেন সুন্দর আকৃতি, সুস্থ শরীর, ধন-সম্পদ, সন্তান-সন্তুতি, পরিবার-পরিজন, যার জন্য জীবন ও মরণ তাকে এ আনন্দের দিনে ভূলে থাকা হবে আর সব কিছু ঠিকঠাক মত চলবে এটা কীভাবে মেনে নেয়া যায়? তাই ইসলাম আনন্দ-উৎসবের এ দিনটাকে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের ইবাদত-বন্দেগী, তার প্রতি শুকরিয়া-কৃতজ্ঞতা প্রকাশ দ্বারা সু-সজ্জিত করেছে। তাই ঈদুল আজহায় যে সমস্ত বিষয় আমাদের করণীয় রয়েছে তা নিচে আলোচনা করা হল
গোসল করা : ঈদের সালাতের পূর্বে গোসল করা সুন্নাত। আব্দুল্লাহ ইবনে উমার (রা.) হতে বর্ণিত আছে, রাসুল স. ঈদের নামাযে যাওয়ার পূর্বে গোসল করতেন। (মুয়াত্তা ইমাম মালিক)।
উত্তম পোষাক পরিধানঃ ঈদের দিন রাসূল সা. ভাল পোষাক পরিধান করতেন। হাদীসে আছে রাসূল সা. এর লাল ও সবুজ ডোরার একটি চাদর ছিল, তিনি তা দুই ঈদ এবং জুমুয়ার দিন পরিধান করতেন। অপর দিকে রাসূল সা. তার সকল দাসীকে ঈদের দিনে হাতে পায়ে মেহদী লাগানোর নির্দেশ দিতেন। বিধায় সামর্থ অনুযায়ী নতুন পোষাক ক্রয় করা অথবা পুরাতন পোষাকটাকে পরিষ্কার করে ইস্ত্রি দিয়ে ব্যবহার করা। পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের পোষাকের ব্যবস্থা করা। প্রতিবেশী শিশুদের জন্য সামর্থ অনুযায়ী পোষাকের ব্যবস্থা করে দেওয়া।
সুগন্ধি ব্যবহারঃ সুগন্ধি ব্যবহার সুন্নাত। আর ঈদের দিনে রাসূল সা. বিশেষ ভাবে সুগন্ধি ব্যবহার করতেন। রাসূল সা. এর তিনটি পছন্দনীয় জিনিসের মাঝে একটি হলো সুগন্ধি। তাই ঈদের দিনের পোষাক পরিধানের পর সুগন্ধি ব্যবহার করা। সুগন্ধি মানে এলকোহল মিশ্রিত ভ্যাপসা গন্ধ সম্পন্ন স্প্রে নয়, বরং দেহনাল উদ বা আতর ব্যবহার করা।
ঈদের দিনে খাওয়া : কুরবানীর দিনে ঈদের নামাজের আগে কোন কিছু না খাওয়া মুস্তাহাব। পক্ষান্তরে ঈদুল ফিতরের দিনে নামাজের আগে কিছু খাওয়া মুস্তাহাব। হযরত বুরাইদাহ আসলামী রা. হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঈদুল ফিতরের দিন নামাজের উদ্দেশ্যে বের হতেন না, যতক্ষণ না তিনি কিছু খেতেন। আর ঈদুল আযহার দিন কিছুই খেতেন না যে পর্যন্ত ঈদের নামাজ আদায় করতেন। (তিরমিযী, ইবনে মাজাহ, দারেমী)

ঈদগাহে যাওয়া : ঈদগাহে এক পথ দিয়ে যাওয়া ও অপর পথ দিয়ে ফেরা সুন্নাত, (সহীহুল বুখারী- ৯৮৬)। সম্ভব অনুযায়ী ঈদগাহে পায়ে হেটে যাওয়াও সুন্নাত, (ইবনু মাজাহ- ১০৭১)।
তাকবীর পাঠ করা : ঈদের দিন তাকবীর পাঠের মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালাকে বেশী বেশী স্মরণ করা। পুরুষেরা উঁচু আওয়াজে পাঠ করবে, মেয়েরা নিরবে। মূলত: এ তাকবীর যিলহজ্জ মাসের এক তারিখ হতে ১৩ তারিখ সূর্যাস্ত পর্যন্ত পাঠ করার সময়। (ফাতহুল বারী-২/৫৮৯, সহীহ ফিকহুস্ সুন্নাহ্-১/৬০৩ পৃঃ)।
ঈদের নামায আদায়ঃ ঈদের নামায শুরু হয় ১ম হিজরীতে। নবী সা. ঈদের নামায নিয়মিত আদায় করেছেন এবং মুসলামানদের ঈদের জামায়াতে হাজিরের নির্দেশ দিয়েছেন। ঈদের নামায সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ। ঈদের নামায সকল নফল সালাতের মাঝে ফজিলতপূর্ণ। ঈদের নামাযের পূর্বে এবং ফজরের নামাযের পরে কোন নামায নেই। ঈদের নামাযের কোন আযান এবং একামাতও নেই।
খুতবা শ্রবণ করা : প্রথমে ঈদের সালাত অতঃপর খুতবা। সালাতের আগে খুতবা দেয়া নিষিদ্ধ। খতিব সাহেব খুতবার সময় উপযোগী বিষয়ে মুসলিম উম্মাহর করণীয়-বর্জনীয় এবং প্রেরণা মূলক বক্তব্য রাখবেন। মহিলারা উপস্থিত হলে তাদের বিষয়েও বক্তব্য রাখা।
শুভেচ্ছা বিনিময়ঃ ঈদের দিনে ছোট বড় সকলের সাথে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করা। ঈদের দিনে সাহাবায়ে কিরামদের সম্ভাষণ ছিল-(আল্লাহুম্মা তাক্বাব্বাল মিন্না ওয়া মিনকা)। বিধায় আমাদেরও সাহাবায়ে কিরামদের সম্ভাষণ ব্যবহারে অভ্যস্ত হওয়া প্রয়োজন।
দোয়া ও ইস্তেগফার করা : ঈদের দিনে আল্লাহ তায়ালা অনেক বান্দাহকে ক্ষমা করে দেন। মুয়ারিরক আলইজলী রহ. বলেন, ঈদের এই দিনে আল্লাহ তায়ালা একদল লোককে এভাবে ক্ষমা করে দিবেন, যেমনি তাদের মা তাদের নিষ্পাপ জন্ম দিয়েছিল। নবী কারীম স. এরশাদ করেন, ‘তারা যেন এই দিনে মুসলিমদের জামায়াতে দোয়ায় অংশগ্রহণ করে।’ (লাতাইফুল মায়ারিফ)
কুরবানী করা: ঈদুল আজহার দিনে সামর্থবান ব্যক্তিদের উপর কুরবানী করা ওয়াজিব। হযরত আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী করীম স. ইরশাদ করেছেন- সামর্থ থাকা সত্বেও যে কুরবানী করবে না, সে যেন আমাদের ঈদগাহের নিকটেও না আসে। ( মুসনাদে আহমদ, ইবনে মাজাহ)। কুরবানী একটি ফজিলত পূর্ণ ইবাদত। কুরবানীর ফজিলতের ব্যাপারে কুরআন এবং হাদীসে অনেক বর্ণনা এসেছে।
হযরত যায়েদ ইবনে আরকাম রা. হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন রাসূলুল্লাহ স. এর সাহাবীগণ তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! এই কোরবানী কি? রাসুল সাঃ জওয়াবে বললেন, এটা তোমাদের পিতা হযরত ইব্রাহিম আ. এর সুন্নাত (রীতিনীতি)। তাকে আবারও জিজ্ঞাসা করা হলো, ইয়া রাসূলুল্লাহ! এতে আমাদের কি (পূণ্য রয়েছে)? রাসূল স. বললেন, (কুরবানীর জন্তুর) প্রতিটি লোমের পরিবর্তে নেকী রয়েছে। তারা আবারও বললেন, পশমওয়ালা পশুদের জন্য কি হবে? (এদের তো পশম অনেক বেশী)। রাসূল স. বলেছেন, পশমওয়ালা পশুর প্রত্যেক পশমের পরিবর্তেও একটি করে নেকী রয়েছে। (মুসনাদে আহমদ, ইবনে মাজাহ)

কুরবানীর পশু যত সুস্থ, সুন্দর ও নিখুত হবে ততো ভালো। তবে কানা, অন্ধ, লেংরা এবং অতি রুগ্ন ও দুর্বল যেন না হয়, কারণ এমন পশু কুবানীর উপযুক্ত নয়, (ইবনু মাজাহ-৩১৪৪)। অনুরূপ কান কাটা ও শিং ভাংগা মুক্ত হাওয়া ভালো। (সহীহ ফিকহুস সুন্নাহ-২/৩৭৩ পৃঃ)। মনে রাখতে হবে, এ কুরবানী তাকওয়ার পরিচয়। সুতরাং আপনার তাকওয়া কিভাবে প্রমাণ করবেন তা আপনিই ভাল জানেন।
কুরবানীর পশু যবেহ করতে দেখা ও সহযোগিতা করা: নিজের কুরবানীর জানোয়ার নিজ হাতে যবেহ করাই মুস্তাহাব। যদি নিজে যবেহ করতে না পারে, তবে অন্যের দ্বারা যবেহ করাবে, কিন্তু নিজে সামনে দাড়িয়ে থাকা ভাল। ঠিক তদ্রুপ অর্থনৈতিক অসচ্ছলতার কারণে নিজে কুরবানী করতে না পারলেও অন্যের পশু কুরবানী করতে দেখা এবং তাদেরকে সহযোগিতা করা। মেয়ে লোকদের পর্দার ব্যাঘাত না হলে কুরবানীর সময় সামনে থাকতে পারবে। তবে পর্দার ব্যাঘাত হলে কুরবানীর সময় সামনে না থাকলে কোন ক্ষতি হবে না।

হযরত আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত ফাতেমা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে লক্ষ্য করে বলেনঃ তুমি উঠো, তোমার কুরবানীর কাছে যাও এবং তা দেখ। কেননা কুরবানীর যে রক্ত প্রবাহিত হয় তার প্রতি বিন্দুর বিনিময়ে আল্লাহ তায়ালা তোমার অতীত গুনাহ মাফ করে দেবেন। হযরত ফাতেমা রাদিয়াল্লাহু আনহা বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ আপনার ও আপনার পরিবার বর্গের লোকদের জন্যই কি এই বিশেষ ব্যবস্থা, নাকি সব মুসলমানের জন্য? রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন হ্যাঁ, আমাদের এবং সব মুসলমানের জন্যই এ ব্যবস্থা। (বায্যার)

কুরবানীর গোশত বিতরণ: কুরবানীর গোশত নিজে খাবে, নিজের পরিবারবর্গকে খাওয়াবে, আত্মীয়-স্বজনকে হাদিয়া তোহফা দিবে এবং গরীব মিসকীনকে দান করবে। মুস্তাহাব তরীকা হলো কুরবানীর গোশত তিন ভাগে ভাগ করা। ১. নিজ পরিবার পরিজনের জন্য এক ভাগ। ২. আত্মীয় স্বজনের জন্য এক ভাগ। ৩. ফকীর মিসকীনদের জন্য একভাগ। আর যদি পরিবারের লোক সংখ্যা বেশী হয় তবে কুরবানীর সমস্ত গোশত খেলেও অসুবিধা নেই। তবে কেহ যদি ফকীর মিসকীনকে সামান্যও দান করে তাতেও গুনাহ হবে না। (শামী ৫/২০৮)

রক্ত, আবর্জনা ও হাড় পরিষ্কার করা: ঈদুল আজহায় কুরবানীর পশুর রক্ত, আবর্জনা ও হাড় থেকে যেন পরিবেশ দূষিত না হয় সে দিকে প্রত্যেক মুসলমানদের সতর্ক হওয়া উচিৎ। কুরবানী শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রক্ত, আবর্জনা ও হাড় নিরাপদ দূরুত্বে নির্দিষ্ট জায়গায় ফেলে দেয়া। সিটি করপোরেশন, পৌরসভা এবং এলাকার নির্ধারিত স্থানে কুরবানী করাই ভালো। নির্দিষ্ট স্থানে সম্মিলিতভাবে কুরবানী করলে অনেকাংশে পরিবেশ যেমন ভালো থাকে ঠিক তেমনি আনন্দের পরিমাণও বেশী হয়। কিন্তু নির্ধারিত স্থানে কুরবানীর অনুরোধ করা হলেও বেশির ভাগ লোকই নিজস্ব জায়গায় পশু জবাই করে। এতে করে অলিগলিতে বর্জ যেমন পড়ে তেমনি রক্ত পড়ে দূষিত হয় পরিবেশ, চলাচলের অনুপযোগী হয় রাস্তাঘাট। তাই ঈদুল আজহায় কুরবানীর পশুর রক্ত, আবর্জনা পরিষ্কারে সরকারী উদ্যেগের পাশাপাশি ব্যক্তিগত ভাবেও উদ্যোগ গ্রহণ করে পরিবেশ দূষণের হাত থেকে মুক্ত হওয়ার জন্যে কাজ করা।
গরীবদের সাহায্য করা : ইয়াতিমের খোঁজ-খবর নেয়া, তাদেরকে খাবার খাওয়ানো এবং সম্ভব হলে তাদের নতুন কাপড়ের ব্যবস্থা করে দেয়া। এটা ঈমানদারদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। আল কুরআনে বলা হয়েছে, তারা খাদ্যের প্রতি আসক্তি থাকা সত্ত্বেও মিসকীন, ইয়াত ীম ও বন্দীকে খাদ্য দান করে (সূরা আদদাহর : ৮)
কুরবানীর ঈদ প্রসঙ্গে স্বভাবতই একটি প্রশ্ন এসে যায়। আমরা কি শুধু কুরবানীর সময়েই গরীব-দুঃখী মানুষ আহার করানোর কথা চিন্তা করবো? আর বছরের বাকি দিনগুলো কি তাদেরকে ভুলে থাকবো? না, অবশ্যই না। কুরবানী একটি প্রতিকী ব্যাপার। আল্লাহর জন্য আত্মত্যাগের একটি দৃষ্টান্ত মাত্র। সারা বছরই আল্লাহর নৈকট্য লাভের প্রত্যাশায় নিজ সম্পদ অন্য মানুষের কল্যাণে ত্যাগ করতে হবে। এই ত্যাগের মনোভাব যদি গড়ে ওঠে তবে বুঝতে হবে, কুরবানীর ঈদ স্বার্থক হয়েছে, কুরবানী স্বার্থক হয়েছে। নইলে এটি নামমাত্র একটি ভোগবাদী অনুষ্ঠানই থেকে যাবে চিরকাল। আল-কুরআনে আল্লাহ বারবার ত্যাগের নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ বলেন, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা তোমাদের উপার্জিত হালাল মালের কিছু অংশ এবং আমি যা তোমাদের জন্য যমীন হতে বের করেছি তার অংশ ব্যয় কর’ (বাক্বারাহ ২৬৭)।

ঈদুল আজহায় বর্জনীয় দিকসমূহ
ঈদ হল মুসলমানদের শান-শওকত প্রদর্শন, তাদের আত্মার পরিশুদ্ধতা, তাদের ঐক্য সংহতি ও আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের প্রতি আনুগত্য ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের উৎসব। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে বহু মুসলিম এ দিনটাকে যথার্থ মূল্যায়ন করতে জানে না। তারা এ দিনে বিভিন্ন অনৈইসলামীক কাজ-কর্মে মশগুল হয়ে পড়ে। এ ধরনের কিছু কাজ-কর্মের আলোচনা নি¤েœ করা হল :
ঈদের দিনে রোজা: ঈদের দিনে রোজা রাখা হারাম। ‘রাসূলুল্লাহ স. ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার দিনে রোজা রাখতে নিষেধ করেছেন। (সহীহ বুখারি ও মুসলিম)
ঈদের দিনকে কবর যিয়ারতের জন্য নির্দিষ্ট করা : ঈদের দিন কবর যিয়ারতের বিশেষ দিন মনে করে যিয়ারত করা বিদআত (সহীহ্ ফিকহুস সুন্নাহ- ১/৬৬৯) তবে পূর্ব নির্ধারিত রুটিন ছাড়া হঠাৎ সুযোগ হয়ে গেলে একাকী কেউ যিয়ারত করলে দোষনীয় নয়।
ঈদের সালাত আদায় না করে কেবল আনন্দ ফুর্তি করা : অনেকে ঈদের আনন্দে মশগুল হয়ে নতুন জামা-কাপড় পরিধান, সেমাই, ফিরনী ইত্যাদি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, ঈদের সালাত আদায় করার কথা ভুলে যায়। অথচ এই দিনে ঈদের সালাত ও কুরবানী করাই হচ্ছে মুসলমানদের মূল কাজ।
মুসাফাহা মুআনাকা এই দিনে করতে হবেই এটা মনে করা: ঈদগাহে বা ঈদের দিন সাক্ষাত হলে মুসাফাহা ও মুআনাকা করতেই হবে এমন বিশ্বাস ও আমল করা বিদআত। তবে এমন বিশ্বাস না করে সালাম ও মুসাফাহার পর মু‘য়ানাকা (গলায় গলা মিলানো) করায় কোন অসুবিধা নেই। কারণ মুসাফাহা ও মুআনাকা করার মাধ্যমে পারস্পরিক সম্পর্ক বৃদ্ধি হয়। আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, ‘একদা হাসান ইবনে আলী রা. নবী কারীম স. এর নিকট আসলেন, তিনি তখন তাকে জড়িয়ে ধরলেন এবং মুআনাকা (কোলাকুলি) করলেন।’
যে সব পশু কুরবানী করা জায়েয নয়: হযরত বারা ইবনে আযেব রা. হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার রাসূলূল্লাহ স.- কে জিজ্ঞাসা করা হলো যে, কুরবানীর ব্যাপারে কোন ধরনের জন্তু হতে বেঁচে থাকতে হবে? রাসূল স. হাতের দ্বারা (অর্থাৎ চার আঙ্গুল দেখিয়ে) বললেন, চার রকমের পশু হতে- (১) খোঁড়া- যার খোঁড়ামি স্পষ্ট, (২) কানা- যার অন্ধত্ব স্পষ্ট, (৩) রোগা- যার রোগ স্পষ্ট এবং (৪) দুর্বল- যার হাড়ে মজ্জা নেই। (মালেক, আহমদ, তিরমিযী, আবূ দাউদ, নাসায়ী, ইবনে মাজাহ ও দারেমী)

দুর্বল, জীর্ণ, শীর্ণ, এক পা খোড়া (যে পায়ে একেবারেই শক্তি প্রয়োগ করতে পারে না), গোড়া থেকে শিং ভাঙ্গা, কান ও লেজ অধিকাংশ কাটা, অন্ধ ইত্যাদি ত্রুটিযুক্ত পশু দ্বারা কুরবানী জায়েয নহে। (দুররুল মুখতার ৫/২২৭)

ছাগলের দুধের যদি একটা বাট না থাকে এবং গাভী অথবা উটের দু’টি বাট না থাকে তবে কুরবানী জায়েয হবে না। (হিন্দিয়া ৬/২৯৪, শামী ৫/২০৬)

কুরবানীর কোন কিছু বিক্রি করা: কুরবানীর গোশত, চামড়া কোন কিছুই বিক্রয় করা যাবে না। অর্থাৎ বিক্রয় করে নিজে উপকৃত হওয়া যাবে না। এমনকি কসাইকে পারিশ্রমিক স্বরূপ গোশত দেয়াও নিষিদ্ধ, (সহীহুল বুখারী- ১৭১৭, সহীহ্ মুসলিম- ১৩১৭)। তবে সাধারণ ভাবে তাকে খেতে দেওয়াতে অসুবিধা নেই।
গান-বাজনা করা, অশ্লীল সিনেমা ও নাটক দেখা: ঈদের দিন উপলক্ষে ঈদমেলা যেখানে গান-বাজনা, অবাধে নারী-পুরুষ বিচরণ ইত্যাদির আয়োজন থাকে এমন মেলা আয়োজন করা, অংশগ্রহণ ও সহযোগীতা দেয়া সম্পূর্ণ হারাম। অনুরূপ ঈদ উপলক্ষে বাড়ী-ঘরে গান-বাজনার বিশেষ আয়োজন, নারী-পুরুষের বিশেষ সাক্ষাত ও অবাধে যেখানে সেখানে ঘুরাফেরা, এসবই অমুসলিমদের কালচার। মুসলিমদের জন্য সম্পূর্ণ হারাম, (সূরা আলে ইমরান-১৪৯, সূরা লুকমান-৬,৭)/ বরং মুসলিম সমাজের কর্তব্য হল আল্লাহর আনুগত্যের মধ্য দিয়ে ঈদ পালন করে তাঁকে আরো খুশি করা।
ঈদের দিনে মহিলা-পুরুষের বেপরোয়া দেখা-সাক্ষাৎ : মেয়েরাও ঈদগাহে যাবে কিন্তু খুবই শালীনতা ও সংযমতার সাথে। বে-পর্দা ও অশালীন ভাবে নয়। অপর পুরুষের সাথে গল্প গুজব ও সৌন্দর্য প্রদর্শন করে নয় ফলে সাওয়াবের পরিবর্তে আরো গুনাহগার হবে। দেখা যায় অন্যান্য সময়ের চেয়ে এই গুনাহের কাজটা ঈদের দিনে বেশি করা হয়। নিকট আত্মীয়দের মাঝে যাদের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ শরিয়ত অনুমোদিত নয়, তাদের সাথে অবাধে দেখা-সাক্ষাৎ করা হয়।
পুরুষ কর্তৃক মহিলার বেশ ধারণ ও মহিলা কর্তৃক পুরুষের বেশ ধারণ: পোশাক-পরিচ্ছদ, চাল-চলন ও সাজ-সজ্জার ক্ষেত্রে পুরুষের মহিলার বেশ ধারণ ও মহিলার পুরুষের বেশ ধারণ করা হারাম। ঈদের দিনে এ কাজটি অন্যান্য দিনের চেয়ে বেশি পরিলক্ষিত হয়। হাদীসে এসেছে, ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলে করীম স. ঐ সকল মহিলাকে অভিসম্পাত করেছেন যারা পুরুষের বেশ ধারণ করে এবং ঐ সকল পুরুষকে অভিসম্পাত করেছেন যারা মহিলার বেশ ধারণ করে। (সহীহ আল-জামে- ৪৫৮৪ )
উপসংহার: জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায় বলতে হয়, ‘তোরা ভোগের পাত্র ফেলরে ছুঁড়ে, ত্যাগের তরে হৃদয় বাঁধ’। মানুষ আল্লাহর জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করবে, এই শিক্ষাই ইবরাহীম (আঃ) আমাদের জন্য রেখে গেছেন। মহানবী মুহাম্মাদ (ছাঃ) আমাদের জন্য ঐ ত্যাগের আনুষ্ঠানিক অনুসরণকে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছেন। আর ঈদুল আজহার মূল আহবান হল সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর প্রতি একনিষ্ঠ আনুগত্য প্রকাশ করা। সকল দিক হতে মুখ ফিরিয়ে এক আল্লাহর দিকে রুজু হওয়া। সম্পদের মোহ, ভোগ-বিলাসের আকর্ষণ, সন্তানের স্নেহ, স্ত্রীর মুহাববত সবকিছুর ঊর্ধ্বে আল্লাহর সন্তুষ্টি প্রতি আত্মসমর্পণ করে দেওয়াই হল ঈদুল আজহার মূল শিক্ষা।
লেখক:
সভাপতি- বাংলাদেশ জাতীয় মুফাসসির পরিষদ, টাঙ্গাইল জেলা।
ঊসধরষ- ধুধফ৯১নফ@মসধরষ.পড়স

মানবাধিকারের ধ্বজাধারীরা কোথায় ?

এখন পর্যন্ত সংখ্যায় ওরা পাঁচশতাধিক । ওপাঁড়ায় মানুষ হত্যার উৎসব চলছে ! এ সংখ্যক মানুষের সিঁকি ভাগও যদি বিশ্বের কোথায় দুর্ঘটনায়, বন্যায়, ভূমিকম্পে কিংবা যুদ্ধে নিহত হত তবে গোটা বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি হত । শুধু মানুষ বলছি কেন, এতো সংখ্যক জন্তু-জানোয়ারও যদি একসঙ্গে হত্যা করা হত কিংবা দৈব কারনে প্রাণ হারাত তবে তা নিয়ে হৈ চৈ এর শেষ থাকত না । অথচ প্রকাশ্যে মানুষকে পশু-পাখির মত হত্যা করা হচ্ছে জেনেও বিশ্ব মোড়লরা নিশ্চুপ, মানবাধিকার নিয়ে হই-হুল্লোরে মেতে থাকা জোচ্চোররা টুঁ-শব্দটি পর্যন্ত করছে না । এ বর্বরোচিত কর্মকান্ড প্রকাশ পাওয়ার পরেও জাতিসংঘ এযাবৎ নিন্দা জ্ঞাপনের দায়িত্বটুকুও পালন করে নি । দুনিয়ার নরকখানায় জ্বলে-পুড়ে জীবন হারাচ্ছে অসহায় রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ-শিশু । মানুষরুপী শকুনিদের অত্যাচারে অবশিষ্ট আছে কেবল ছাই-ভস্ম । মড়ক খাদক শকুনগুলোও ও পাঁড়ায় নামতে ঘৃণা পাচ্ছে ।

অবশ্য রোহিঙ্গাদের জন্মসূত্রেই ওরা দু’টো বড় অপরাধ সঙ্গে করে এনেছে । প্রথমতঃ ওরা সেই জাতিভূক্ত তথা ইসলাম ধর্ম পরিবারে যাদেরকে বর্তমান বিশ্বের প্রায় সকল ধর্মগোষ্ঠীর অনুসারীরা কিংবা ধর্মহীনরা একত্রিত হয়ে শত্রু বিবেচনা করছে । দ্বিতীয়তঃ এরা এমন এক ভূ-ভাগে জন্মগ্রহন ও বসবাস করছে যা স্বার্থবাদী বিশ্বমোড়লদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয় । কেননা রোহিঙ্গাদের স্বার্থ রক্ষা করতে কেউ এগিয়ে এলে এখানে তাদের স্বার্থ হাসিলের সম্ভাবনা কম । কাজেই ওদেরকে হত্যা করলে মানবাধিকারের ধ্বজাধারীরা উৎসব করবে-এটাই তো স্বাভাবিক । ওদের পিষে দিলেও বিশ্ব বিবেকদের কিছু যায়-আসে না ! শান্তিতে নোবলেল পাওয়া অং সাং সূচির এনএলডি ক্ষমতাশীল এবং সূচি প্রধানমন্ত্রী থাকা অবস্থায় মায়ানমারের আরকানে এমন বর্বোরোচিত হত্যাকান্ড শান্তির বার্তবাহীদের অবস্থান এবং অহিংস হিসেবে পরিচিত বৌদ্ধদের ধর্মীয় মূল্যবোধ ব্যাপারে যৌক্তিক প্রশ্ন তুলছে ।

বিগত বছরগুলোতে এবং চলতি বছরের শুরুর দিকে আরাকানের রোহিঙ্গাদের ওপর দীর্ঘদিন হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়েছে । সে সময়কার বর্বোচিত হত্যাযজ্ঞের ব্যাপার মায়ানমার সরকার বরাবর অস্বীকার করে আসছে । তবুও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় রোহিঙ্গাদের ওপর চালানো  অমানবিক হত্যাকান্ডের কিছু সংবাদ প্রকাশ পাওয়ায় জাতিসংঘের তরফ থেকে জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনানকে প্রধান করে তদন্ত পরিচালনা করে । যদিও এ তদন্ত দলকে আরাকানে প্রবেশের অনুমতি নিয়ে মায়ানমার টালবাহানা করে । অবশেষে কফি আনানের নেতৃত্বে গঠিত তদন্ত দল তাদের তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের মাত্র দু’দিনে মাথায় অজ্ঞাতদের দ্বারা পাহারাচৌকি ও বেশ কয়েকটি স্থানে অতর্কিত হামলার পর আবারও রোহিঙ্গা মুসলমানদেরকে হত্যার উৎসব চলছে । সার্বিক পরিস্থিতি বলছে, সমগ্র মায়ানমারের কোথাও যদি নৈতিবাচক কিছু ঘটে তার জন্য অঘোষিতভাবে রোহিঙ্গারাই দায়ী এবং তাদের এজন্য শাস্তি কেবল হত্যা !

বৈশ্বিক কণ্ঠস্বর নিরবতা পালন করায় রোহিঙ্গাদের মুক্তির জন্য এখন তাদের সামনে মাত্র দু’টো পথ খোলা আছে । তাদের হয় স্বদেশী শত্রুদের দ্বারা হত্যার শিকার হতে হবে নয়ত নিজেদের জন্য আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়ে ‍মুক্তির পথ নিশ্চিত করতে হবে ! যে রাষ্ট্রের সরকার সন্ত্রাসীদের মদদদাতা সেখানে রোহিঙ্গাদের আশ্রয়ের আর কোন নিরাপদ স্থান অবশিষ্ট থাকে না ।  রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশের ব্যাপারে বাংলাদেশ বরাবর শক্ত অবস্থানে ছিল । তারপরেও লক্ষাধিক রোহিঙ্গা বাংলাদেশের শরণার্থী হিসেবে আশ্রিত রয়েছে । জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা রোহিঙ্গাদের স্বদেশে ফিরিয়ে দিতে কিংবা অন্যকোন দেশে পূর্নবাসন করতে কোন সন্তোষজনক উদ্যোগ গ্রহন করে নি । এমনিতেই অতিরিক্ত জনসংখ্যার বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের বাড়তি চাপ ও ব্যয় বহনের সক্ষমতা কোনভাবেই বাংলাদেশের নাই । মানবিকতার দৃষ্টিতে রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশের ব্যাপারটিকে বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষের অমানবিক সিন্ধান্ত বলা চলে কিন্তু বাস্তবতা বিবেচনা করলে এ সিদ্ধান্ত একেবারে অযৌক্তিক-তা বলা চলে না ।রোহিঙ্গা মুসলমানদের ভয়াবহ বিপদের মধ্যেও মুসলমানদের সুরক্ষার জন্য গঠিত সংগঠন ‘ওআইসি’ মৌন দর্শকের ভূমিকা পালন করছে । বর্তমান বিশ্বের মুসলিমদের অভিভাবক দাবীদার সৌদি রাজ পরিবার ট্রাম্পের নির্দেশিত শুকর পালনে ব্যস্ত । অতীতের বিভিন্ন সংকটে মুসলমানদের সুরক্ষায় দায়িত্বশীল ভূমিকা নেয়া তুর্কি প্রেসিন্ডেটের কাছ থেকে এখন অবধি কোন দিকনির্দেশনা না পাওয়াটাও দুঃখজনক । মুসলমানদের ওপর যদি এমন বর্বোচিত অত্যাচার ও হত্যাকান্ড অব্যাহত থাকে তবে মুসলিমদের রক্ত কতদিন শান্তির কথা বলবে তাও ব্যাখ্যা সাপেক্ষ । কেননা পিঠ যখন দেয়ালে ঠেকে যায় তখন বাঁচার জন্য দুর্বলেরাও শেষবারের মত চেষ্টা চালায় । রোহিঙ্গা ইস্যূ নিয়ে মায়ানমার মানবতার ওপর যে ধ্বংসলীলা চালাচ্ছে তার জন্য তাদেরকে শাস্তির কাঠগোঁড়ায় দাঁড়াতেই হবে । মুখে মুখে যারা অহিংসার বাণী ছাড়ায় তাদের দ্বারা যে ধরণের মর্মান্তিক সহিংস কার্যকলাপ চলছে তাতে তাদের ধর্মতত্ত্বের শিক্ষার শুদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন তুললে তা অতিরঞ্জিত হবে না । শান্তির পক্ষে থাকা বৌদ্ধ ধর্মমত পালনকারীদের অবিলম্বে সে সকল উগ্রপন্থীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেয়া আবশ্যক, যারা আরাকানে সন্ত্রাসী কর্মকান্ড পরিচালনা করে মানুষ হত্যা করছে কিংবা হত্যায় মদদ দিচ্ছে । নয়তো বিশ্বকে ধর্মকেন্দ্রিক সংঘাতে লিপ্ত হয়ে আরেকদফা বিপর্যয়ের দিকে অগ্রসর হতে দেখলেও তাতে অবাক হওয়ার খুব বেশি রসদ থাকবে না বলেই বিশ্বাস ।

রাজু আহমেদ । কলামিষ্ট ।

fb.com/rajucolumnist/

 

জেলা কমিটি কর্তৃক যাচাইকৃত প্রাথমিক বিদ্যালয় সমূহ দ্রুত জাতীয় করণ প্রসঙ্গে

 

বর্তমান সরকার প্রাথমিক শিক্ষা বান্ধব সরকার। বাংলাদেশের মত উন্নয়নশীল দেশে প্রাথমিক শিক্ষা হচ্ছে দেশ ও জাতী গঠনের প্রথম সোপান। প্রাথমিক শিক্ষায় বিনিয়োগ ভবিষ্যত প্রজন্মকে মেধাবি ও আদর্শ জাতী গঠনে সহায়ক ভূমিকা রাখবে এই চেতনা বোধ বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা দূরদর্শীতায় প্রতিয়মান। ২০১৩ সালে ৯ জানুয়ারী দেশে ২৬ হাজার ১৯৩টি বে-সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় কয়েকটি ধাপে জাতীয় করণ করেন মাননীয় প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনা। যুদ্ধ বিধস্থ দেশে সাহসিকতার সহিত ১৯৭৩ সালের পহেলা জুলাই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রাথমিক শিক্ষা জাতীয় করণ করেন। অথচ বিএনপি সরকার প্রতিশ্রুতি দিয়ে কথা রাখেনি, কথা রেখেছে আওয়ামীলীগ সরকার। ১৯৯৭ সালের শেষ দিকে ঢাকার ওসমানী জাতীয় উদ্যানে বেগম খালেদাজিয়া শিক্ষকদের চাকুরী জাতীয় করণে ১ দফা দাবীর প্রতি একত্বতা প্রকাশ করে বলেছিলেন- নির্বাচনে জয়ী হলে বে-সরকারী শিক্ষকদের চাকুরী জাতীয় করণ করা হবে। তারপর ২০০০ সালের ১০ই সেপ্টেম্বর তিনি বলেছিলেন আপনারা (শিক্ষকগণ) ডাইরীতে দিন, ক্ষন, তারিখ, মিনিট, ঘন্টা লিখে রাখুন আমি খালেদাজিয়া যা বলি তা করি, ইনশাল্লাহ আপনাদের দাবী পূরন হয়ে গেছে। ওই শিক্ষক মহা সমাবেশে বেগম জিয়া ছাড়াও শরিক জোট নেতা এইচ এম এরশাদ, গোলাম আজম, আল্লামা শায়খুল হাদিস শিক্ষকদের দাবী পূরনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে সমস্বরে বলেছিলেন, আমরা ক্ষমতায় গেলে আপনাদের দাবী পূরন করব। আওয়ামীলীগ সরকারের সাথে কোন আলোচনা করবেন না, কারন আওয়ামীলীগ সরকার বাস্তবায়ন করতে পারবে না। আওয়ামীলীগ সরকারের কথার ক্ষপ্পরে পড়বেন না। একই মঞ্চে এইচ এম এরশাদ বলেন শিক্ষকদের সাথে বিশ্বাস ঘাতগতা করা আর নিজের আতœার বে-ঈমানী করা একই কথা অথচ পরবর্তীতে বিএনপি জোট সরকার ক্ষমতায় এসেছে কিন্তু কথা রাখেনি। মানুষ গড়ার কারীগর মহান পেশায় নিয়োজিত হাজার হাজার শিক্ষক পরিবারের নিকট বেগম জিয়ার প্রতিশ্রুতি মিথ্যা আশ্বাসে পরিনত হয়েছে। ভাগ্যহত বে-সরকারী প্রাথমিক শিক্ষকদের মর্যাদার আসনে সমাজে আসিন করতে সক্ষম হয়েছেন এবং শত ভাগ উপবৃত্তি প্রদান ও বছরের শুরুতেই শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন পাঠ্য বই সেট তুলে দিচ্ছেন বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা। জাতীয় করণের ১ম ধাপ স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় শুরু হয়েছিল কিন্তু এখন অবশিষ্ট ধাপ গুলো যথেষ্ট প্রশ্ন বিদ্ধ। জেলা ও উপজেলা যাচাই বাছাই কমিটি কর্তৃক সুপারীশকৃত ৩য় পর্যায়ে অবশিষ্ট প্রাথমিক বিদ্যালয় বিক্ষিপ্ত ভাবে জাতীয় করণ নিয়ে বর্তমানে যে হ য ব র ল বিরাজ করছে তা নিরসনে মাননীয় প্রধান মন্ত্রীর আশু হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। প্রাথমিক গণশিক্ষা মন্ত্রানালয় বাংলাদেশ সচিবালয় ঢাকা পত্র নং ৩৮.০০৭.০১৫.০০০.০১.০০.২০১১, তাং ১৭ই জানু ২০১৩ইং প্রকাশিত প্রজ্ঞাপন যা ২০ জানু ২০১৩ইং বাংলাদেশ গেজেট (অতিরিক্ত সংখ্যায় প্রকাশিত হয়) অনুযায়ী বে-সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় সমূহ ৩য় ধাপে জাতীয় করণের লক্ষে জেলা যাচাই বাছাই কমিটি ও বে-সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয় করণ সংক্রান্ত কেন্দ্রিয় টাস্কফোর্সে এর সুপারিশের আলোকে বিদ্যালয় সমূহকে ৩ ধাপে জাতীয় করণের অংশ হিসেবে বে-সপ্রা বিদ্যালয় বিধিমালায় বর্ণিত সূচক অনুযায়ী বিদ্যালয় গুলোর বাস্তব অবস্থা যাচাই এর জন্য উপজেলা যাচাই বাছাই কমিটির নিকট প্রেরিত হয়। প্রেক্ষিতে উপজেলা যাচাই বাছাই কমিটি কর্তৃক বিদ্যালয় সমূহের সম্পদ অবকাঠামোগত অবস্থা, পাঠদান পদ্ধতি, শিক্ষকদের যোগ্যতা ও নিয়োগ পদ্ধতি ইত্যাদি বাস্তবতা যাচাইয়ের মাধ্যমে শুধুমাত্র জাতীয় করণের উপযুক্ত বিদ্যালয় সমূহের বিষয়ে সুপারিশ সহ প্রতিবেদন জেলা কমিটিতে পাঠায়। এর পর জেলা কমিটি বিদ্যালয় জাতীয় করন যাচাই বাছাই কমিটির আহব্বায়ক ও সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসক মহোদয় উপজেলা কমিটির সুপারীশকৃত বিদ্যালয় সমূহের রেকর্ড পত্র, দলিল, খারিজ, খতিয়ান, ছবি, শিক্ষকদের তথ্যাবলী, সম্পত্তি দায়দেনা, ছাত্র/ছাত্রী তথ্য পরীক্ষা নিরিক্ষা করে সঠিক পাওয়া গিয়াছে মর্মে ৩য় ধাপে জাতীয় করণের জন্য প্রাথমিক গণশিক্ষা মন্ত্রনালয়ে সুপারিশ সহ প্রেরণ করেন। যেহেতু প্রাথমিক গণ শিক্ষা মন্ত্রনালয় কর্তৃক দপ্তর আদেশে বলা হয়েছে বে-সপ্রা বিদ্যালয়ের জাতীয় করনের জন্য সরে জমিনে বাস্তব অবস্থার পরিদর্শন প্রতিবেদন আবশ্যক। প্রজ্ঞাপন অনুসারে মন্ত্রানালয়ে তথ্য প্রেরণ করা হলেও ৩য় ধাপে জাতীয় করনের আওত্বায় আনা হয়নি এ সব বিদ্যালয় । বাস্তবায়নের ধাপ অনুসারে জাতীয় করণের যোগ্য বিবেচিত ৩য় ধাপের তালিকা ভুক্ত বিদ্যালয় গুলো ২০১৪ইং সালের ১লা জানু থেকে জাতীয় করনের আওত্বায় আসার কথা। সুপারীশকৃত বিদ্যালয় সমূহকে বাদ দিয়ে চলতি বছরের ২৩ মার্চ কিছু সংখ্যক বিদ্যালয় জাতীয় করণ গেজেট প্রকাশ হয়েছে। মন্ত্রনালয়ের এক শ্রেণীর অসাধু কর্মকর্তা জাতীয় করন বাণিজ্যের নামে দেশের প্রত্যান্ত অঞ্চলের সেচ্ছা শ্রমী শিক্ষকদের হয়রানীর সুযোগ নিয়ে বিক্ষিপ্ত ভাবে জাতীয় করণ প্রক্রিয়া চলমান রাখায় নানা জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। মাননীয় প্রধান মন্ত্রী ঘোষিত তারিখের পর কিছু সুযোগ সন্ধানী চক্র নতুন দলিল সম্পাদন করে রাতারাতি সাইন বোর্ড সর্বস্ব বিদ্যালয় স্থাপনের মাধ্যমে সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করছে। অপর পক্ষে ২০১৩ইং সালের পূর্বে অর্থাৎ ২০০০ হতে ২০১২ ইং সাল পর্যন্ত যে সমস্ত শিক্ষানুরাগী ব্যক্তি প্রাথমিক শিক্ষা সম্প্রসারনের লক্ষে প্রয়োজনীয় জমি দান করে খাজনা খারিজ হালফিল সহ বিদ্যালয় চলমান রেখেছে এমন প্রতিষ্ঠান সমূহকে চিহ্নিত করে জাতীয় করণ করলেই প্রকৃত ও উপযুক্ত বিদ্যালয় সমূহ অগ্রাধীকার পাবে। রাজনৈতিক বিবেচনায় নয় উপযুক্ত বিদ্যালয় জাতীয় করণ করলেই প্রাথমিক শিক্ষা বিস্তারে আরো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। একই ধাপের বিদ্যালয় বিভিন্ন সময় খন্ড খন্ড করে বিক্ষিপ্ত ভাবে এলাকা ভিত্তিক গ্রেজেট প্রকাশ রোধ করার মাধ্যমে তদবির বাণিজ্য বন্ধ করা সম্ভব।

লেখক-
খন্দকার এইচ আর হাবিব
প্রধান শিক্ষক ও সাবেক গণ মাধ্যম কর্মী
মধ্যপাড়া কঠিন শিলা প্রকল্প, দিনাজপুর।
ই-মেইল শযৎ.যধনরন২@মসধরষ.পড়স

জিলহজের প্রথম দশ দিনের ফজিলত ও মুস্তাহাব আমল

 

মাওলানা এ এইচ এম আবুল কালাম আযাদ
আল্লাহ তা‘আলা দয়ালু। তাই তিনি আপন বান্দাদের তওবার সুযোগ দিতে ভালোবাসেন। তিনি চান বান্দারা ইবাদতের মাধ্যমে তাঁর নৈকট্য লাভ করুক। এ উদ্দেশ্যে তিনি আমাদের জন্য বছরে কিছু বরকতময় ও কল্যাণবাহী দিন রেখেছেন- যাতে আমলের সওয়াব বহুগুণে বৃদ্ধি করা হয়। আমরা পরীক্ষার দিনগুলোতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাই সবচেয়ে ভালো ফলাফল অর্জন করার জন্য। তবে কেন আখেরাতের জন্য এসব পরীক্ষার দিনগুলোতেও সর্বাধিক প্রচেস্টা ব্যয় করব না? এ দিন গুলোতে আমল করা তো বছরের অন্যান্য দিনের তুলনায় অনেক বেশি নেকী ও কল্যাণ বয়ে আনে। এমন দিন গুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য যিলহজ মাসের এই প্রথম দশদিন। এ দিনগুলো এমন রাসূলুল্লাহ স. যেগুলোকে দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ দিন বলে আখ্যায়িত করেছেন। তাতে আমলের প্রতি তিনি সবিশেষ উদ্বুদ্ধ করেছেন। এ দিন গুলোর শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণে শুধু এতটুকুই যথেষ্ট যে আল্লাহ তা‘আলা এর কসম করেছেন।
জিলহজের প্রথম দশ দিনের ফজিলত : আল্লাহ তায়ালার অনুগ্রহ যে, তিনি নেক বান্দাদেরকে এমন কিছু মৌসুম দিয়েছেন যেগুলোতে তারা বেশি বেশি নেকীর কাজ করতে পারে। এই মৌসুমগুলোর অন্যতম হল, যিলহজ্জ মাসের প্রথম দশ দিন। এ দিনগুলোর ফজিলতের ব্যাপারে কুরআন-সুন্নায় অনেক দলীল রয়েছে:
১. আল্লাহ তায়ালা বলেন: “শপথ ফজরের। শপথ দশ রাতের। (সূরা ফজর: ১ ও ২) ইবনে কাসীর রাহ. বলেছেন: “এর দ্বারা উদ্দেশ্য হল, যিলহজ্জ মাসের প্রথম দশ দিন।” এই মত ব্যক্ত করেন ইবনে আব্বাস, ইবনুয যুবাইর, মুজাহিদ প্রমুখ। (সহীহ বুখারী)
২. আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল স. বলেছেন: “যিলহজ্জের প্রথম দশকের চেয়ে উত্তম এমন কোন দিন নেই, যে দিনগুলোর সৎ আমল আল্লাহ্‌র নিকট অধিক পছন্দনীয়।” সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করলেন: আল্লাহ্‌র পথে জিহাদও নয় হে রাসূলুল্লাহ্‌ স. তিনি বললেন: “আল্লাহ্‌র পথে জিহাদও নয়। অবশ্য সেই মুজাহিদের কথা ভিন্ন, যে জান-মাল নিয়ে জিহাদে বেরিয়ে পড়ে, কিন্তু আর কোন কিছুই নিয়ে ফিরে আসে না (অর্থাৎ আল্লাহর পথে শহীদ হয়ে যায়)।” (বুখারী)
৩. আল্লাহ তায়ালা বলেন: “তারা যেন নির্দিষ্ট দিন সমূহে আল্লাহর নাম স্মরণ করে। (সূরা হজ্জ: ২৮) ইবনে আব্বাস রা. বলেছেন: “(নির্দিষ্ট দিন সমূহ হল) যিলহজ্জ মাসের প্রথম দশ দিন।” (তাফসীর ইবনে কাসীর)
৪. ইবনে ওমর রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ স. বলেছেন, “এ দশ দিনের তুলনায় অন্য কোন সময় আল্লাহর নিকট এতটা মর্যাদা পূর্ণ নয় বা তাতে আমল করা এতটা পছন্দনীয় নয়। সুতরাং এ দিনগুলোতে তোমরা অধিক পরিমাণ তাহলীল (লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ), তাকবীর (আল্লাহু আকবার) ও তাহমীদ (আল হামদুলিল্লাহ) পাঠ কর।” (মুসনাদ আহমদ)
৫. সাঈদ ইবনে জুবাইর (যিনি পূর্বোক্ত ইবনে আব্বাস রা. এর হাদীস বর্ণনাকারী) জিলহজ্জের দশ দিন শুরু হলে ইবাদত-বন্দেগীতে এত বেশী পরিশ্রম করতেন যে, অন্য কারো জন্য এত ইবাদত করা প্রায় অসম্ভব হয়ে যেত। (দারেমী)
৬) ইবনে হাজার রহ. ফাতহুল বারীতে বলেন: “এই দশ দিন বিশেষ বৈশিষ্ট্য মন্ডিত হওয়ার কারণ হিসেবে আমার নিকট এটাই প্রতিভাত হচ্ছে যে, এ দিনগুলোতে সালাত, সিয়াম, দান-সদকা, হজ্জ ইত্যাদি মৌলিক ইবাদতগুলোর সমাবেশ ঘটেছে। এ ছাড়া অন্য কখনো এগুলো একসাথে পাওয়া যায় না।
এ হাদীসগুলোর মর্ম হল, বছরে যতগুলো মর্যাদাপূর্ণ দিন আছে তার মধ্যে এ দশ দিনের প্রতিটি দিনই সর্বোত্তম। রাসূলুল্লাহ স. এ দিনসমূহে নেক আমল করার জন্য তাঁর উম্মতকে উৎসাহিত করেছেন। তাঁর এ উৎসাহ প্রদান এ সময়টার ফযীলত প্রমাণ করে। রাসূলুল্লাহ স. এ দিনগুলোতে বেশি বেশি করে তাহলীল ও তাকবীর পাঠ করতে নির্দেশ দিয়েছেন। যেমন ওপরে ইবন উমর রা. বর্ণিত হাদীসে উল্লেখ হয়েছে।
ইবন রজব রহিমাহুল্লাহ বলেন, উপরোক্ত হাদীসগুলো থেকে বুঝা যায়, নেক আমলের মৌসুম হিসেবে যিলহজ মাসের প্রথম দশক হল সর্বোত্তম, এ দিবসগুলোয় সম্পাদিত নেক আমল আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয়। হাদীসের কোনো কোনো বর্ণনায় (‘আহাব্বু’ তথা সর্বাধিক প্রিয়) শব্দ এসেছে আবার কোনো কোনো বর্ণনায় (‘আফযালু’ তথা সর্বোত্তম) শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। অতএব এ সময়ে নেক আমল করা বছরের অন্য যে কোনো সময়ে নেক আমল করার থেকে বেশি মর্যাদা ও ফযীলতপূর্ণ। এজন্য উম্মতের অগ্রবর্তী পুণ্যবান মুসলিমগণ এ সময়গুলোতে অধিকহারে ইবাদতে মনোনিবেশ করতেন। যেমন আবূ ছিমান নাহদী বলেন,‘তাঁরা তথা পূর্বসূরীগণ তিনটি দশককে অনেক বেশি মর্যাদাবান জ্ঞান করতেন : রমযানের শেষ দশক, যিলহজের প্রথম দশক এবং মুহাররমের প্রথম দশক।’

জিলহজের প্রথম দশ দিন বছরের শ্রেষ্ঠ দশ দিন হওয়ার কারণ:
১. আল্লাহ তা‌‘আলা এর কসম করেছেন : আল্লাহ তা‌‘আলা যখন কোনো কিছুর কসম করেন তা কেবল তার শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদাই প্রমাণ করে। কারণ, মহা সত্তা শুধু মহা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েরই কসম করেন। আল্লাহ তা‌‘আলা বলেন, ‘কসম ভোরবেলার। কসম দশ রাতের।’ (সূরা আল-ফাজর: ১-২) আয়াতে ‘কসম দশ রাতের’ বলে যিলহজের দশকের প্রতিই ইঙ্গিত করা হয়েছে। এটিই সকল মুফাসসিরের মত। ইবনে কাসীর রাহিমাহুল্লাহ বলেন, এ মতটিই সঠিক।
২ এসবই সেই দিন আল্লাহ যাতে তাঁর জিকিরের প্রবর্তন করেছেন : আল্লাহ তা‌‘য়ালা বলেন, ‘যেন তারা নিজদের কল্যাণের স্থানসমূহে হাযির হতে পারে এবং তিনি তাদেরকে চতুষ্পদ জন্তু থেকে যে রিজিক দিয়েছেন তার ওপর নির্দিষ্ট দিনসমূহে আল্লাহর নাম স্মরণ করতে পারে।’ (সূরা আল-হজ: ২৮) জমহুর উলামার মতে, আয়াতে নির্দিষ্ট দিনসমূহ বলে যিলহজ মাসের প্রথম দশ দিনকে বুঝানো হয়েছে। এটিই ইবন উমর ও ইবন আব্বাস রাদিআল্লাহু আনহুমার মত।
৩. রাসূলুল্লাহ স. দিনগুলোকে শ্রেষ্ঠ দিন বলে আখ্যায়িত করেছেন: যিলহজের এই দিনগুলোকে রাসূলুল্লাহ স. দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ দিন বলে আখ্যায়িত করেছেন। যেমন জাবির রা. থেকে বর্ণিত, ‘পৃথিবীর দিনগুলোর মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ দিনগুলো হলো দশকের দিনসমূহ। অর্থাৎ যিলহজের (প্রথম) দশদিন। জিজ্ঞেস করা হলো, আল্লাহর পথে জিহাদেও কি এর চেয়ে উত্তম দিন নেই? তিনি বললেন, আল্লাহর পথে জিহাদেও এর চেয়ে উত্তম দিন নেই। হ্যা, কেবল সেই যে (জিহাদে) তার চেহারাকে মাটিতে মিশিয়ে দিয়েছে।’ (মুসনাদ বাযযার : ১১২৮; মুসনাদ আবী ই‘আলা : ২০৯০)
৪. এই দিনগুলোর মধ্যে রয়েছে আরাফার দিন: আরাফার দিন হলো বড় হজের দিন। এটি ক্ষমা ও মাগফিরাতের দিন। জাহান্নাম থেকে মুক্তি ও নাজাতের দিন। যিলহজের এই দশকে যদি ফযীলতের আর কিছু না থাকত তবে এ দিবসটিই তার মর্যাদার জন্য যথেষ্ট হত। এ দিনের ফযীলত সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ স. বলেন, ‘আরাফা দিবসই হজ’। (তিরমিযী : ৮৯৩; নাসায়ী : ৩০১৬)
৫. এতে রয়েছে কুরবানীর দিন: কোনো কোনো আলিমের মতে কুরবানীর দিনটি বছরের সর্বশ্রেষ্ঠ দিন। রাসূলুল্লাহ স. ইরশাদ করেন, ‘আল্লাহর কাছে সর্বাধিক মর্যাদাপূর্ণ দিন হলো কুরবানীর দিন অতপর স্থিরতার দিন’। (অর্থাৎ কুরবানীর পরবর্তী দিন। কারণ, যেদিন মানুষ কুরবানী ইত্যাদির দায়িত্ব পালন শেষ করে সুস্থির হয়।) (নাসায়ী: ১০৫১২; ইবন খুযাইমা, সহীহ : ২৮৬)
৬. এ দিনগুলোতে মৌলিক ইবাদতগুলোর সমাবেশ ঘটে: হাফেয ইবন হাজর রহিমাহুল্লাহ তদীয় ফাতহুল বারী গ্রন্থে বলেন, ‘যিলহজের দশকের বৈশিষ্ট্যের কারণ প্রতিয়মান হয় তা হলো, এতে সকল মৌলিক ইবাদতের সন্নিবেশ ঘটে। যথা : সালাত, সিয়াম, সাদাকা, হজ ইত্যাদি। অন্য কোনো দিন এতগুলো ইবাদতের সমাবেশ ঘটে না।’ (ফাতহুল বারী : ২/৪৬০)

জিলহজের প্রথম দশ দিনের মুস্তাহাব আমল:
প্রতিটি মুসলিমের উচিৎ ইবাদতের মৌসুমগুলোকে সুন্দর প্রস্তুতির মাধ্যমে স্বাগত জানানো। যিলহজ মাসকে আমরা স্বাগত জানাতে পারি নিচের কাজগুলোর মধ্য দিয়ে: এ দশ দিন যে আমলগুলো বেশি বেশি করা উচিৎঃ
১. এই দশটি দিন কাজে লাগাতে দৃঢ় সংকল্প গ্রহণ করা: শুরুতেই যা করা সবার উচিৎ তা হল, এই দিনগুলোকে পুণ্যময় কাজ ও কথায় সুশোভিত করার দৃঢ় প্রত্যয় গ্রহণ করা। যে ব্যক্তি কোনো কাজের সংকল্প করে আল্লাহ তাকে সাহায্য করেন। তার জন্য সাহায্যকারী উপায় ও উপকরণ প্রস্তুত করে দেন। যে আল্লাহর সঙ্গে সত্যবাদিতা দেখায় আল্লাহ তাকে সততা ও সফলতায় ভূষিত করেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘আর যারা আমার পথে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালায়, তাদেরকে আমি অবশ্যই আমার পথে পরিচালিত করব। আর নিশ্চয় আল্লাহ সৎকর্মশীলদের সাথেই আছেন।’ (সূরা আল-আ‘নকাবূত: ৬৯)
২. সালাত: ফরয সালাতগুলো যথাসময়ে সম্পাদন করার পাশাপাশি প্রচুর নফল সালাত আদায় করা। কারণ, সালাতই হল আল্লাহর নৈকট্য লাভের অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপায়। সাওবান রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: আমি রাসূলুল্লাহ স. কে বলতে শুনেছি: “তুমি আল্লাহর উদ্দেশ্যে অধিক পরিমাণ সেজদা কর (নফল সালাত আদায় কর), কারণ যখনই তুমি সেজদা কর বিনিময় আল্লাহ তোমার মর্যাদা বৃদ্ধি করেন এবং গুনাহ মোচন করেন।” (মুসলিম) এটি কেবল যিলহজ্জ মাস নয় বরং অন্য সকল সময়ের জন্য প্রযোজ্য।
৩.সিয়াম: রোজা রাখা অন্যতম একটি নেক কাজ। তাই এ দিনগুলোতে নফল রোজা রাখা খুবই ফযীলতের। হুনাইদা বিন খালেদ তার স্ত্রী থেকে, তিনি রাসূলুল্লাহ স. এর জনৈক স্ত্রী থেকে বর্ণনা করেন: “রাসূলুল্লাহ স. যিলহজ্জ মাসের নয় তারিখ, আশুরার দিন ও প্রত্যেক মাসের তিন দিন রোজা পালন করতেন।” (আহমদ, আবু দাউদ ও নাসায়ী) ইমাম নববী যিলহজ্জ মাসের শেষ দশ দিনে রোযা রাখার ব্যাপারে বলেছেন, এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ মুস্তাহাব ।
৪. আরাফার দিন রোজা: আরাফার দিন রোজা রাখা খুব গুরুত্বপূর্ণ। যেহেতু রাসূলুল্লাহ স. থেকে প্রমাণিত, তিনি আরাফার দিনের রোজার ব্যাপারে বলেছেন: “আমি আল্লাহর কাছে আশাবাদী, এটি পূর্ববর্তী এক বছর ও পরবর্তী এক বছরের গুনাহের কাফফারা হবে।” (মুসলিম) তবে আরাফায় অবস্থানকারী হাজীদের জন্য রোযা রাখা মুস্তাহাব নয়। কারণ, নবী স. আরাফায় অবস্থান করেছিলেন রোজা বিহীন অবস্থায়।

৫. হজ ও উমরা সম্পাদন করা: হজ ও উমরা এ দুটি হলো এ দশকের সর্বশ্রেষ্ঠ আমল। যারা এ দিনগুলোতে হজ আদায়ের সুযোগ পেয়েছেন তারা যে অনেক ভাগ্যবান তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আল্লাহ যাকে তাঁর নির্দেশিত এবং রাসূলুল্লাহ স. প্রদর্শিত পন্থায় হজ বা উমরা করার তাওফীক দান করেন তার পুরস্কার শুধুই জান্নাত। কারণ, আবূ হুরায়রা রাদিআল্লাহু আনহু কর্তৃক বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ স. বলেন, ‘এক উমরা থেকে আরেক উমরা এতদুভয়ের মাঝের গুনাহগুলোর কাফফারা এবং মাবরূর হজের প্রতিদান কেবলই জান্নাত।’ (বুখারী: ১৭৭৩; মুসলিম: ৩৩৫৫) আর মাবরূর হজ সেটি যা পরিপূর্ণভাবে সম্পাদিত হয় রাসূলুল্লাহ স. প্রদর্শিত পন্থায়। যাতে কোনো রিয়া বা লোক দেখানো কিংবা সুনাম বা মানুষের প্রশংসা কুড়ানোর মানসিকতা নেই। নেই কোনো অশ্লীলতা বা পাপাচারের স্পর্শ। যাকে বেষ্টন করে থাকে নেক কাজ ও পুণ্যময় আমল।
৬. দান-সাদাকা করা: এ দিনগুলোতে যে আমলগুলো বেশি বেশি দরকার তার মধ্যে অন্যতম হলো সাদাকা। আল্লাহ তা‘আলা মানুষকে সাদাকা দিতে উদ্বুদ্ধ করেছেন। ইরশাদ হয়েছে: ‘হে মুমিনগণ, আমি তোমাদেরকে যে রিযক দিয়েছি তা হতে ব্যয় কর, সে দিন আসার পূর্বে, যে দিন থাকবে না কোনো বেচাকেনা, না কোনো বন্ধুত্ব এবং না কোনো সুপারিশ। আর কাফিররাই যালিম।’ (সূরা আল-বাকারা: ২৫৪)
আবূ হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ স. বলেন, ‘সাদাকা সম্পদকে কমায় না, ক্ষমার মাধ্যমে আল্লাহ বান্দার মর্যাদা বৃদ্ধি করেন এবং কেউ আল্লাহর জন্য বিনয়ী হলে আল্লাহ তাকে উঁচু করেন।’ (মুসলিম: ৬৭৫৭)
৭. তাকবীর, তাহমীদ ও তাসবীহ পড়া: এসব দিনে তাকবীর (আল্লাহু আকবার), তাহমীদ (আলহামদু লিল্লাহ), তাহলীল (লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ) ও তাসবীহ (সুবহানল্লাহ) পড়া সুন্নত। এ দিনগুলোয় যিকর-আযকারের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে, হাদীসে এসেছে, আবদুল্লাহ ইবন উমর রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ স. বলেন, ‘এ দশ দিনে নেক আমল করার চেয়ে আল্লাহর কাছে বেশি প্রিয় ও মহান কোনো আমল নেই। তাই তোমরা এ সময়ে তাহলীল (লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ), তাকবীর (আল্লাহু আকবার) ও তাহমীদ (আল-হামদুলিল্লাহ) বেশি বেশি করে পড়।’ (বায়হাকী, শুআবুল ঈমান: ৩৪৭৪; মুসনাদ আবী আওয়ানা: ৩০২৪)
তাকবীরের শব্দগুলো নিম্নরূপ : (আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার লা ইলাহা ইল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার ওয়া লিল্লাহিল হামদ।) উল্লেখ্য, বর্তমানে তাকবীর হয়ে পড়েছে একটি পরিত্যাক্ত ও বিলুপ্তপ্রায় সুন্নত। আমাদের সকলের কর্তব্য এ সুন্নতের পুনর্জীবনের লক্ষ্যে এ সংক্রান্ত ব্যাপক প্রচারণা চালানো। হাদীসে উল্লিখিত হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি আমার সুন্নতসমূহ থেকে একটি সুন্নত পুনর্জীবিত করল, যা আমার পর বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে, তাকে সে পরিমাণ সওয়াব দেওয়া হবে, যে পরিমাণ তার ওপর (সে সুন্নতের ওপর) আমল করা হয়েছে। এতে (আমলকারীদের) সওয়াব হতে বিন্দুমাত্র কমানো হবে না।’ (তিরমিযী: ৬৭৭)
যিলহজ মাসের সূচনা থেকে আইয়ামে তাশরীক শেষ না হওয়া পর্যন্ত এ তাকবীর পাঠ করা সকলের জন্য ব্যাপকভাবে মুস্তাহাব। তবে বিশেষভাবে আরাফা দিবসের ফজরের পর থেকে মিনার দিনগুলোর শেষ পর্যন্ত অর্থাৎ যেদিন মিনায় পাথর নিক্ষেপ শেষ করবে সেদিন আসর পর্যন্ত প্রত্যেক সালাতের পর এ তাকবীর পাঠ করার জন্য বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। আবদুল্লাহ ইবন মাসঊদ ও আলী রাদিআল্লাহু আনহুমা থেকে এ মতটি বর্ণিত। ইবন তাইমিয়া রহ. একে সবচেয়ে বিশুদ্ধ মত বলেছেন। উল্লেখ্য, যদি কোনো ব্যক্তি ইহরাম বাঁধে, তবে সে তালবিয়ার সাথে মাঝে মাঝে তকবীরও পাঠ করবে। হাদীস দ্বারা এ বিষয়টি প্রমাণিত। (ইবন তাইমিয়াহ, মজমু‘ ফাতাওয়া : ২৪/২২০)
৮. পশু কুরবানী করা: এ দিনগুলোর দশম দিন সামর্থ্যবান ব্যক্তির জন্য কুরবানী করা সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁর নবীকে কুরবানী করতে নির্দেশ দিয়েছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘আপনি আপনার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে সালাত আদায় করুন ও কুরবানী করুন।’ (সূরা আল-কাউসার: ০২)
এই দশদিনের অন্যতম সেরা প্রিয় আমল হলো কুরবানী। কুরবানীর পশু জবাই ও গরিবদের মধ্যে এর গোশত বিতরণের মাধ্যমে আল্লাহর বিশেষ নৈকট্য লাভ হয়। এর দ্বারা গরিবদের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ পায় এবং তাদের কল্যাণ সাধন হয়।
৯. গুনাহ থেকে দূরত্ব অবলম্বন করা: সৎ কর্মের মাধ্যমে যেমন আল্লাহর নৈকট্য অর্জিত হয়, গুনাহের কাজের মাধ্যমে তেমন আল্লাহ থেকে আল্লাহর রহমত ও করুণা থেকে দূরত্ব সৃষ্টি হয়। মানুষ তার নিজের করা অপরাধের কারণে কখনো আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত হয়। তাই আমরা যদি অপরাধ মার্জনা এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তির প্রত্যাশী হই, তাহলে এ দিনগুলোতে এবং এর শিক্ষা কাজে লাগিয়ে বছরের অন্য দিনগুলোতে গুনাহ পরিত্যাগ করতে হবে। কেউ যখন জানতে পারেন কী বড় অর্জনই না তার জন্য অপেক্ষা করছে, তার জন্য কিন্তু যে কোনো কষ্ট সহ্য করা সহজ হয়ে যায়।
১০. একনিষ্ঠ মনে তওবা করা: তওবার অর্থ প্রত্যাবর্তন করা বা ফিরে আসা। যে সব কথা ও কাজ আল্লাহ রাব্বুল আলামীন অপছন্দ করেন তা বর্জন করে যেসব কথা ও কাজ তিনি পছন্দ করেন তার দিকে ফিরে আসা। সাথে সাথে অতীতে এ ধরনের কাজে লিপ্ত হওয়ার কারণে অন্তর থেকে অনুতাপ ও অনুশোচনা ব্যক্ত করা। যিলহজের শুভাগমনের আগে সবচে বেশি গুরুত্ব দেওয়া দরকার এ তওবা তথা সকল গুনাহ থেকে ফিরে আসার প্রতি। স্বার্থক তওবা সেটি যার মধ্যে তিনটি বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান। যথা- প্রথম. গুনাহটি সম্পূর্ণভাবে বর্জন করা। দ্বিতীয়. গুনাহের জন্য অনুতপ্ত হওয়া। এবং তৃতীয়. এই গুনাহটি ভবিষ্যতে না করার সংকল্প করা।
“বাস্তবেই এটি তওবার সুবর্ণ সময়। দয়াময় খোদা এ সময় বেশি বেশি তওবার তাওফীক দেন এবং অধিক পরিমাণে বান্দার তওবা কবুল করেন। তিনি ইরশাদ করেন, ‘তবে যে তাওবা করেছিল, ঈমান এনেছিল এবং সৎকর্ম করেছিল, আশা করা যায় সে সাফল্য অর্জনকারীদের অন্তর্ভুক্ত হবে।’ (কাসাস: ৬৭)
“তিনি আরও ইরশাদ করেন, ‘বল, হে আমার বান্দাগণ! যারা নিজদের উপর বাড়াবাড়ি করেছ তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। অবশ্যই আল্লাহ সকল পাপ ক্ষমা করে দেবেন। নিশ্চয় তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (যুমার : ৫)
উপসংহার: প্রিয় মুসলিম ভাই ও বোন, এই সকল অমূল্য সুযোগগুলো ফুরিয়ে যাওয়ার পূর্বেই তা গ্রহণ করুন। কারণ, সময় পার হয়ে গেলে তখন আফসোস করে লাভ হবে না। মহান আল্লাহর নিকট দোয়া করি, তিনি যেন আমাকে ও আপনাকে এই কল্যাণের মৌসুমগুলোকে অমূল্য সম্পদ হিসেবে গ্রহণ করার তাওফীক দান করেন এবং তাতে ভালোভাবে তাঁর ইবাদত-বন্দেগী সম্পাদনে সাহায্য করেন। আমীন।।
লেখক:
সভাপতি- বাংলাদেশ জাতীয় মুফাসসির পরিষদ, টাঙ্গাইল জেলা।
ঊসধরষ- ধুধফ৯১নফ@মসধরষ.পড়স

কোরবানি নিয়ে বুজরুকি বনাম বন্যার্তদের আহাজারি…!

…পৃথিবীতে যতগুলো মানবতাবাদী মতবাদ বিদ্যমান আছে সেগুলোর মধ্যে ধর্মীয় মানবতাবাদ নিঃসন্দেহে শ্রেষ্ঠত্বের সম্মানে শীর্ষে অবস্থান করে । প্র্রতিষ্ঠিত ধর্মগুলোর মধ্যে আবার ইসলামিক মানবতাবাদ সকল মানবাদী মতবাদের প্রতিনিধিত্ব করে । ইসলামের কোথাও বলা হয়নি প্রতিবেশীকে ভূখা রেখে তোমরা আহার করো । জ্ঞাতিকে বঞ্চিত রেখে তোমরা ভোগ করো কিংবা অন্যের কষ্ট দেখে তোমরা উল্লাস করো । বরং ইসলাম তার অনুসারীদের কঠোরভাবে নির্দেশ প্রদান করেছে, ধর্মীয় হুকুম-আহকাম পালনের সাথে সাথে মানুষের মঙ্গলের জন্য নিবেদিত হতে । মানবতার মুক্তির দিশারী তার শ্রেষ্ঠ ভাষনে পবিত্র জবানে বলেছেন, এক মুসলমান আরেক মুসলমানের ভাই । কাজেই বিশ্বের যে প্রান্তেই হোক কোন মানুষ যদি কষ্ট পায়, আক্রান্ত হয় কিংবা নির্যাতিত হয় তবে সেটা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য ঈমানের দাবীতে নিঃসন্দেহে কষ্টকর । এজন্যই ইসলামকে শুধুমাত্র মুসলিমদের ধর্ম হিসেবে এককভাবে দাবী করা হয়নি বরং বলা হয়েছে এটা সকল মানুষের জন্য কল্যানের । যারা এর ছায়াতলে আসবে তারা শ্রেষ্ঠ মানুষের স্বীকৃতি পাবে । সাম্য-ভ্রাতৃত্ব আর সৌহার্দ্যের বার্তা নিয়েই ইসলাম ধূলার পৃথিবীতে আগমন করেছে ।

আমরা অনেক ভারাক্রান্ত হয়ে লক্ষ করেছি, দেশের প্রায় অর্ধেকভূমি ভারত থেকে নেমে আসার বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়েছে । বন্যায় প্রাণহানি ঘটেছে শতাধিক মানুষের । যারা জীবনে বেঁচে আছেন তারাও খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির অভাবে ধুঁকছে । বন্যাকবলিত অঞ্চলের সর্বত্র পানি আর পানি । মানুষের বিশ্রামের জায়গাটুকু পর্যন্ত অবশিষ্ট নাই । যে যেদিকে পারছে আশ্রয় নিচ্ছে । সামগ্রিক বন্যা পরিস্থিতি সামলাতে সরকার হিমশিম খাচ্ছে । বন্যাকবলিত কোন অঞ্চলেই সরকার পর্যান্ত সাহায্যের বন্দোবাস্ত করতে পারেনি । সত্যিকারার্থে এতোবড় দুর্যোগ মোকাবালের সামর্থ্য এককভাবে সরকারের নাই । সরকার এবং জনগণের সম্মিলিত প্রয়াসেই বন্যাকবলিত মানুষগুলোর জন্য দু’বেলা আহারের সংস্থান এবং একটু আশ্রয়স্থল নির্মান করা সম্ভব । দেশের মধ্যে যারা মানবতাবাদী এবং বিত্তবান তারা তাদের সামর্থ্যানুযায়ী বন্যাকবলিত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে । দেশের ছাত্র-শিক্ষক থেকে শুরু করে যে যার অবস্থান থেকে এককভাবে হোক কিংবা যৌথভাবে, শ্রমের মাধ্যমে হোক কিংবা আর্থিকভাবে, মানুষ মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছে । বিগত দেড়যুগের অধিকালের মধ্যে চলমান বন্যা পরিস্থিতিতে মারাত্মক মানবিক বিপর্যয় নেমে এসেছে । বন্যায় ক্ষতিগ্রস্থদের পাশে যখন দেশের মানুষ ঐক্যবদ্ধভাবে দাঁড়াচ্ছে বা দাঁড়ানোর জন্য আম্তপ্রতিশ্রুতিবদ্ধ হচ্ছে তখন এক শ্রেণীর ধর্মবিদ্বেষীর ঘোষণায় গোটা দেশের ধর্মপ্রাণ মুসলিমকূল ক্ষোভে ফুঁসে উঠেছে ।

কোরবানি প্রদান থেকে বিরত থেকে সে অর্থে বন্যার্তদের সহায়তাদানের ঘোষণা যারা দিয়েছে সে সব কুলাঙ্গারের মুখোশ উম্মোচন হওয়া আবশ্যক । মানবতার প্রশ্নে মুসলমানদের দায়িত্ব মুসলামনের চেয়ে অধিক সচেতন কোন জাতিগোষ্ঠীর অস্তিত্ব পৃথিবীতে আছে কিনা অন্তত আমরা জানা নাই । ইসলামের অন্যতম নির্দেশনা তথা পশু কুরবানী থেকে বিরত থেকে সে অর্থ বন্যার্তদের কল্যানে যারা ব্যয় করার আহ্বান জানিয়েছেন তারা নিঃসন্দেহে ইসলামের জঘন্যতম শত্রু । অতীতকালে যারা প্রাণীর প্রতি দরদ দেখাতে গিয়ে মানুষের মৃত্যু নিয়ে হাসাহাসি করেছে সেই শ্রেণীর বদদের এবার ইসলামিক নির্দেশনার প্রতি ভিন্ন ষড়যন্ত্ররূপেই এ ঘোষণা । দেশের মানুষ যে যেভাবে পারছে সে সেভাবে দুর্যোগগ্রস্থদের পাশে দাঁড়াচ্ছে কিন্তু কোরবানীর মত একটি আবশ্যকীয় নির্দেশণা পালন থেকে বিরত থেকে যারা ভিন্ন কিছু করার জন্য এবং ইসলাম ও মুসলামনদের বিরুদ্ধে তাদের দীর্ঘমেয়াদী ষড়যন্ত্র ভিন্ন কৌশলে বাস্তবায়নের নিমিত্তে এটা তাদের আরেক ছল । নিঃসন্দেহে এরা ভিন্ন দেশ এবং ভিন্ন মতবাদের এদেশীয় এজেন্ট ।

দৈনন্দিন খরচের বিভিন্নখাত থেকে অর্থ সাশ্রয় করে বানবাসী মানুষের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান তারা করতে পারতেন । সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একদিনের বেতন তারা বন্যার্তদের জন্য দাবী করতে পারতেন । বিভিন্ন মোবাইল অপারেটরের সেবা ব্যবহারকারী থেকে এক-দুই টাকা বাধ্যতামুলক কেটে নেয়ার রাষ্ট্রীয় সিন্দান্তের জন্য তারা পরামর্শ দিতে পারতেন । আসন্ন ঈদ ও পুজার উদযাপনের জন্য নতুন পোশাক ক্রয়ের বাজেট থেকে কিছু টাকা তারা বন্যাকবলিতদের জন্য দাবী করতে পারতেন । এছাড়াও আরও বহুখাত থেকে তারা কোটি কোটি টাকার সাহায্য নিশ্চিত করার পরামর্শ তারা সরকার এবং এদেশের মানুষকে দিতে পারতেন । কিন্তু এসব কু-শীল(!)’রা এসবের ব্যাপারে কোন কথা না বলে সরাসরি কোরবানি না দিয়ে সে টাকা বন্যায় ক্ষতিগ্রস্থদের সাহায্যার্থে প্রদান করার কথা তারা কি জন্য বললেন ?  এ শ্রেণীর অতীতেকৃত কার্যকলাপ এবং বর্তমান সময়ে কোরবানী সংক্রান্ত ঘোষণার দ্বারাই ইসলাম ও মুসলামনদের ব্যাপারে এদের মানসিকতা ও কামনার স্বচ্ছ প্রকাশ ঘটেছে । প্রায় ৯২% মুসলিম অধ্যুষিত বাংলাদেশে যারা মুসলিমদেরকে কোরবানী বন্ধ রাখার জন্য বলে এদের সাথে মুসলিমদের ব্যবহার কেমন হবে সেটা নিশ্চয়ই সময় নির্দেশ করবে । এরা সেই ভদ্রবেশি মুখোশ যারা রাষ্ট্রের  হাজার কোটি টাকা পাচার হওয়ার পরেও মুখ খোলে না, রাষ্ট্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতির বিষবাষ্প ছড়ানোর পরেও যাদের ভাবান্তর হয়না । বরং এরা সর্বদা দালালি করে এবং দেশের সার্থকে কিভাবে বিদেশী প্রভূদের চরণে উৎসর্গ করে তাদের অনুকম্পা পাওয়া যায় এবং আয়েশী জীবন-যাপন করা যায় তার ধান্ধায় মাতোয়ারা ।

কোন নায়ক আর নায়িকা এ বছর কোরবানী না দিয়ে সে টাকা বন্যার্তদের দিল সেটা দেখার দায়িত্ব প্রকৃত মুসলিমদের নয় । মুসলমানদের আদর্শ তো তারাই হবে যারা আল্লাহ ও তার রাসূলের নির্দেশিত পথে জীবন ও জীবিকা পরিচালিত করে । এদেশের প্রত্যেক মুসলমান তার সামর্থ্য অনুযায়ী মুক্তহাতে বানবাসী মানুষের মঙ্গলার্থে সাহায্য করবেন । আসন্ন ঈদকে সামনে রেখে যাদের ব্যাপক পরিকল্পন ছিল সেখান থেকে কিছুট কর্তন করে বানবাসী মানুষের পাশে দাঁড়ানো আমাদের প্রত্যেকের নৈতিক কর্তব্যে পরিণত হয়েছে । এক ঈদের নতুন পোশাক না পড়লে তাতে ঈদের সৌন্দর্য কমে যাবে না । মাঠে গিয়ে খেলার উল্লাসে মত্ত না হয়ে, দু’দিন সিনেমা না দেখে, দূরে কোথাও ভ্রমনে না গিয়ে, বন্ধুদের সাথে আড্ডায় না জড়িয়ে সে অর্থ বন্যার্তদের দিন । যাদের ওপর কোরবানী ওয়াজিব তারা কোনভাবেই কোরবানী বন্ধ রেখে সে অর্থ যদি অন্যকোন ক্ষেত্রে ব্যয় করে তাদেরকে নিঃসন্দেহে ইসলামের শিক্ষা থেকে বিচ্যূত হয়েই সেটা করতে হবে । সেসব ইসলামবিদ্বেষীদের চিন্তা-চেতনা ও সহচর্য থেকে বেঁচে থাকুন যারা স্বার্থবাদী এবং লুটেপুটে খাওয়াদের সাহায্যকারী । যাদের কাছে বিদেশী প্রভূদের সন্তুষ্টি দেশের স্বার্থের চেয়েও বেশি প্রাধান্য পায় তাদেরকে রুখে দিন । সবশেষ নিবেদন, যাতে ভুলে না যাই, মানুষ মানুষের জন্য…..।

রাজু আহমেদ । কলামিষ্ট ।

raju69mathbaria@gmai.com

নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের এক অনুপম শিক্ষা ঈদুল আজহা

রায়হান আহমেদ তপাদার

কোরবানির ঈদ (ঈদুল আজহা) মুসলিম জাতির অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব। ঈদুল আজহাকে কোরবানির ঈদও বলা হয়। আরবি কোরবান শব্দ হতে এর উৎপত্তি। যার অর্থ ত্যাগের মাধ্যমে নৈকট্য লাভ। প্রতিবছর ১০ জিলহজ ঈদুল আজহা বিশ্বের মুসলমানদের কাছে হাজির হয় আনন্দ সওগাত ও ত্যাগের উজ্জ্বল মহিমা নিয়ে।ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদ পালনের সঙ্গে একটি অনন্য পরীক্ষার ঘটনা বিজড়িত। আজ থেকে প্রায় পাঁচ হাজার বছর পূর্বে মুসলিম জাতির পিতা ইব্রাহিম (আ:)এর মাধ্যমে এ ধর্মীয় অনুষ্ঠান শুরু হয়। হজরত ইব্রাহিম (আ:)এর জানমাল ছিল আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভে নিবেদিত। হজরত ইব্রাহিম (আ:) সর্বাপেক্ষা প্রিয় বস্তু কোরবানি করার জন্য আল্লাহ কর্তৃক আদিষ্ট হন। এটি ছিল হজরত ইব্রাহিম (আ:)এর জীবনের কঠোরতম অগ্নিপরীক্ষা। নতশিরে এ নির্দেশ মেনে নিয়ে প্রিয়তম সন্তান ইসমাইলকে কোরবানি করতে উদ্যত হলেন তিনি। আল্লাহপাক হজরত ইব্রাহিম (আ:)এর কোরবানি কবুল করলেন। ইসমাইল জবেহ হলেন না,ইসমাইলের স্থলে দুম্বা জবেহ হলো।আর সেখান থেকেই শুরু হল মুসলমানদের কোরবানি।এ বিষয়ে আমাদের ভেবে দেখার যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে।ধর্মের নামে নরবলি দেয়ার প্রথা বহু আগ থেকে চলে আসছিল। আল্লাহ্ তাআলা রক্ত-পিপাসু নন যে তাঁর প্রিয় সৃষ্টির রক্তে তিনি তুষ্ট হবেন।হযরত ইবরাহীম (আ:)স্বপ্নের নিজ ব্যাখ্যানুযায়ী সন্তান কুরবানী করতে উদ্যত হয়েছিলেন। আল্লাহ্ তাআলা নরবলি প্রথাকে চিরতরে রহিত করার জন্য এ জবাই হতে দিলেন না। পরে ইবরাহীম (আ:) আল্লাহ্‌র আদেশে পশু জবাই করলেন।

সুতরাং হযরত ইবরাহীম (আ:)এর এ কোরবানীর আত্মা এবং শক্তি নিজেদের মাঝে সৃষ্টি করার লক্ষ্যে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলায়হে ওয়া সাল্লাম তাঁর উম্মতকে পশু কুরবানীর আদেশ দিলেন। তাই বিশ্বের প্রতিটি সামর্থ্যবান মুসলমান প্রত্যেক বছর ১০ই যিলহাজ্জ তারিখে কোরবানী করে থাকে। হযরত ইসমাঈল (আ:)যেভাবে পিতার ছুরির নিচে মাথা পেতে দিয়েছিলেন,কোরবানীর পশু যেভাবে ছুরির নিচে মাথা পেতে দেয় তেমনই প্রত্যেক মুসলমানের এ প্রতিজ্ঞা হওয়া আবশ্যক যেন ধর্মের খাতিরে ইসলামের পথে তারা নিজেদের এ ভাবে কোরবানী করে দিতে পারে।
ইবরাহীম (আ.)এর সুন্নত অনুযায়ী নবী করীম (স:)এর নির্দেশে কোরবানী পালনের মাধ্যমে প্রতি বছর মুসলিম নিজের মাঝে তাক্ওয়াকে আর একবার ঝালিয়ে নেন যেন প্রয়োজনের দিনে আল্লাহ্‌র পথে কোরবানীর পশুর ন্যায় নিজেকে সমর্পণ করতে পারেন।প্রসঙ্গত কোরবানীর শিক্ষা ও তাৎপর্য না বুঝার কারণে কেউ কেউ কটূক্তি করে থাকেন। তাদের দৃষ্টিতে কোরবানী একদিকে যেমন অপচয় অর্থাৎ একদিনে সারা বিশ্বে লক্ষ লক্ষ পশু জবাই করে প্রচুর পরিমাণে প্রোটিনের ঘাটতি সৃষ্টি করা হচ্ছে অন্যদিকে একটা অবোধ পশুকে আল্লাহ্‌র নামে নৃশংসভাবে হত্যা করার ফলে আর একজনের পুণ্যের হাড়ি ভরতি হচ্ছে আপাত দৃষ্টিতে উপরোক্ত উক্তি সঠিক বলে মনে হলেও গভীর দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করলে এটা বোকার উক্তি বলে প্রতীয়মান হবে। আমাদের মনে রাখা দরকার, আল্লাহ্ তাআলা যেসব বস্তু হালাল (বৈধ) করেছেন এর মাঝে যথেষ্ট পরিমাণে বরকত ও প্রবৃদ্ধি রেখে দিয়েছেন। আমরা লক্ষ্য করলে দেখতে পাই গরু ছাগল প্রভৃতির বাচ্চা উৎপাদনের হার কুকুর শূকর ইত্যদির চেয়ে কম-বারেও আর সংখ্যায়ও।

প্রকৃতির দিকে দৃষ্টি দিলে আমরা দেখতে পাই বড়’র বাঁচার জন্যে ছোট সব সময় প্রাণ দিচ্ছে। ছোট মাছ বড় মাছের জন্যে জীবন দিচ্ছে। বাঘ, সিংহ প্রভৃতি পশু ছোট ছোট নীরিহ প্রাণী খেয়ে বেঁচে আছে। যারা অতি দরদ দেখিয়ে গুরু ছাগল জবাই করার ব্যাপারে কটূক্তি করেন তাদের যদি জিজ্ঞেস করা হয়, জীব হত্যা করতে পারবেন না, একথা পালন করলে তারা কি বাঁচবেন? বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে, গাছ লতা-পাতা এদের সবার প্রাণ আছে। এদের ওপর আমরা সবাই নির্ভরশীল। তাদের সাথে অসংখ্য জীবাণু আত্মবলি দিচ্ছে। এ কি তাদের জানা আছে। প্রকৃত কথা এই,ক্ষুদ্রের আত্ম ত্যাগের মাধ্যমেই বৃহৎ’-এর জীবন আর এর মাঝেই ক্ষুদ্রের জীবনের সার্থকতা রেখে দিয়েছেন আল্লাহ্ তাআলা।কিন্তু মানুষ সৃষ্টির সেরা। তাই তার সেবায় জীব-জন্তু বৃক্ষ তরুলতা থেকে আরম্ভ করে সব কিছু নিয়োজিত এদের কুরবানীতে মানব জীবন বাঁচে এবং এদের জীবন হয় সার্থক। এ উদ্দেশ্যেই আল্লাহ্ এদের সৃষ্টি করেছেন। তবে এদের প্রতি আমাদের যে কর্তব্য রয়েছে আমরা তা যেন ভুলে না যাই। অতএব প্রকৃতির মাঝে কুরবানী ও ত্যাগের মহিমাই যে প্রতিনিয়ত কাজ করে যাচ্ছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এ ভাবেই আল্লাহ্ প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষার ব্যবস্থা করেছেন।কুরআন হাদীস এবং বুযুর্গানে দীনের ভাষ্য থেকে যতটুকু জানা যায় কুরবানীর পেছনে যে উদ্দেশ্যটি কাজ করা আবশ্যক তা হলো তাক্ওয়া বা খোদার সন্তুষ্টি। হযরত ইবরাহীম (আ:)তাঁর একমাত্র পুত্র হযরত ইসমাঈল (আ:)কে খোদার সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে জবাই করতে উদ্যত হয়েছিলেন। যে কুরবানীর পেছনে এ উদ্দেশ্য ও আত্মা কাজ করে না সে কুরবানী, কুরবানীর আওতায় পড়ে না।

ঈদুল আজহা মুসলমানদের জাতীয় জীবনে আল্লাহর প্রতি আনুগত্য প্রকাশের এক গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। লোভ-লালসায় জর্জরিত এ মায়াময় পৃথিবীতে ত্যাগের সুমহান আদর্শে উজ্জীবিত হতে না পারলে কেউ আল্লাহর নৈকট্য লাভ করতে পারবে না। কোরবানির মহান স্মৃতি মানুষের মনে ত্যাগের মহান স্পৃহাকে নবরূপে জাগ্রত করে তোলে। প্রকৃতপক্ষে কোরবানির শিক্ষা এবং তাৎপর্য ও ত্যাগ মানুষের মন থেকে পশু প্রবৃত্তির বিনাশ সাধন করে এবং বৃহত্তর মানব প্রেমের শিক্ষা দেয়। ঈদুল আজহার তাৎপর্য ও কোরবানির মাহাত্ম্যের প্রতি গুরুত্ব আরোপ করে মহানবী (স:) বলেন,যে ব্যক্তি সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কোরবানি করে না,সে যেন ঈদগাহের কাছে না আসে।(ইবনে মাজা: ৩১২৩ )।ঈদুল আজহার কোরবানির মাধ্যমে মানুষের মনের পরীক্ষা হয়, কোরবানির রক্ত-গোশত কখনই আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না। শুধু দেখা হয়, মানুষের হৃদয়কে। ঈদের মধ্যে আছে সাম্যের বাণী সহানুভূতি শীল হৃদয়ের পরিচয়। পরোপকারের ও ত্যাগের মহান আদর্শে অনুপ্রাণিত হয় মানুষের মন।পবিত্র কোরআনে মহান রাব্বুল আলামিন বলেন,কোরবানির জীবের রক্ত-গোশত কোনোটাই আল্লাহর কাছে পৌঁছে না,বরং পৌঁছে তোমাদের খোদাভীতি ও আন্তরিকতা। (সুরা হজ:৩৭)।সুতরাং কোরবানি করার ক্ষমতাসম্পন্ন প্রত্যেক মুসলমান নর-নারীর উচিত কেবল আল্লাহ্ তায়ালাকে সন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্যেই ঈদুল আজহায় নিখুঁতভাবে কোরবানি আদায় করতে যত্নবান হওয়া।মহামহিম রাব্বুল আলামিন আমাদের সবাইকে ঈদুল আজহার আত্মত্যাগ ও কোরবানির মহান আদর্শে উদ্বুদ্ধ করে মানব এবং সৃষ্টির সেবায় নিয়োজিত হওয়ার শিক্ষা গ্রহণের তাওফিক দান করুন।

ট্রাম্পের নতুন ট্রাভেল ভ্যান

  প্রফেসর রায়হান আহমেদ তপাদার

  মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কিছু মুসলিম-প্রধান দেশের নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ নিষিদ্ধ করে নতুন একটি নির্দেশনা জারি করেছেন।এ ব্যাপারে আগের জারি করা নিষেধাজ্ঞা আদালতে খারিজ হয়ে যাওয়ার পর নতুন আরেকটি নির্বাহী আদেশ দেওয়া হলো।নতুন নির্দেশনায় নিষেধাজ্ঞার তালিকা থেকে ইরাকের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। তবে এবারও আগের তালিকার বাকি ছয়টি দেশকে রাখা হয়েছে-ইরান, সিরিয়া, ইয়েমেন, সুদান, লিবিয়া এবং সোমলিয়া।প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রশাসনের যুক্তি হচ্ছে এই নিষেধাজ্ঞা আমেরিকাকে সন্ত্রাসবাদের হাত থেকে নিরাপদ রাখার জন্য দরকার।প্রথম আদেশে ইরাক, ইরান, সিরিয়া, ইয়েমেন, সুদান লিবিয়া এবং সোমালিয়ার নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্রে ঢোকা নিষিদ্ধ করা হয়েছিল।ট্রাম্পের একজন সহযোগী কেলিয়ান কনওয়ে বলেছেন, নতুন এই আদেশে ইরাককে বাদ দেওয়া হলেও অন্য দেশগুলোর ওপর ৯০ দিনের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকবে।অবশ্য এসোসিয়েটেড প্রেসের এক খবরে বলা হয়েছে, কংগ্রেসের এমন একটি দলিল তারা দেখেছে যাতে বলা হয়েছে যে যাদের বৈধ ভিসা আছে তাদের ক্ষেত্রে এই নিষেধাজ্ঞা প্রযোজ্য হবে না।এছাড়া যারা গ্রীনকার্ড বা যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসের স্থায়ী অনুমোদনপ্রাপ্ত, তারাও ওই নতুন নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়বেন না। মার্কিন বাহিনীর অনুবাদক হামিদ দারভিশের মত ইরাকিরা এবার নিষেধাজ্ঞা থেকে বাদ পড়লেন।মার্কিন বাহিনীর অনুবাদক হামিদ দারভিশের মত ইরাকিরা এবার নিষেধাজ্ঞা থেকে বাদ পড়লেন।বার্তা সংস্থা রয়টার্স বলছে,নতুন আদেশে শরণার্থীদের ক্ষেত্রে ১২০ দিনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে ঢোকা নিষিদ্ধ করা হয়েছে।পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসন বলেছেন,‘কট্টর ইসলামপন্থী সন্ত্রাসীদের ধ্বংসাত্মক পরিকল্পনা নির্মূল করার লক্ষ্যেই এই আদেশ জারি করা হয়েছে।আগামী ১৬  মার্চ থেকে এই নতুন আদেশ কার্যকর হবে।ফলে ১০ দিনের এই আগাম নোটিশের কারণে হয়তো যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবন্দর গুলোতে এর আগেরবার যে বিশৃঙ্খল অবস্থা সৃষ্টি হয়েছিল তা এড়ানো সম্ভব হবে।কারণ আগের আদেশটি দেওয়া হয়েছিল কোন পূর্ব সতর্কতা ছাড়াই।   মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সাত মুসলিম-প্রধান দেশের নাগরিকদের ওপর স্থগিত হয়ে যাওয়া নিষেধাজ্ঞা সংশোধন করে নতুন ‘মুসলিম নিষেধাজ্ঞা’জারি করেছেন।তবে আগের নিষেধাজ্ঞায় যেসব বিষয় নিয়ে বিতর্কের মুখে পড়ে ট্রাম্প প্রশাসন,এবার তাতে কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে।নতুন নিষেধাজ্ঞা প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষরের পরপরই কার্যকর হচ্ছে না। ১০ দিন পর ১৬ মার্চ থেকে তা কার্যকর হবে। এর আগে ২৭ জানুয়ারির নিষেধাজ্ঞা ট্রাম্পের স্বাক্ষরের পরপরই কার্যকর হয়েছিল। এর ফলে ভিসা থাকা সত্ত্বেও হাজার হাজার মানুষ যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে পারেননি। ওই সাত দেশের অনেক নাগরিককে বিমানবন্দর থেকে, এমনকি বিমান থেকেও নেমে আসতে হয়। যারা যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেছিলেন, তাদের আটক করা হয়।আর তখনই ওই নিষেধাজ্ঞা নিয়ে প্রশ্ন উঠে বিভিন্ন মহল থেকে।মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেট (আইএস)-এর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম সহযোগী ইরাক। মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে সহযোগিতার জন্য এবারের নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকেনি ইরাক।সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসন জানান, ইরাকে স্ক্রিনিং কার্যক্রম জোরদার করার জন্যই দেশটিকে এবারের নিষেধাজ্ঞার অন্তর্ভূক্ত করা হয়নি। তিনি আরও বলেন,ইরাক আমাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে। আমরা চাই,ওই অঞ্চলের অন্যান্য দেশও এভাবে এগিয়ে আসুক।আগের নিষেধাজ্ঞায় নিষেধাজ্ঞায় বলা হয়েছিল, সাত দেশের ওপর ৯০ দিনের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা ও শরণার্থীদের ক্ষেত্রে ১২০ দিনের নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। তবে সিরীয় শরণার্থীদের গ্রহণের ক্ষেত্রে এই নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ ছিল অনির্ধারিত। তবে এবারের নিষেধাজ্ঞায় ছয়টি দেশের ওপরই ৯০ দিনের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।আগের নিষেধাজ্ঞায় বলা হয়,সিরীয় নাগরিকদের শরণার্থী হিসেবে গ্রহণ করাটা মার্কিন স্বার্থ ক্ষুণ্ন করবে।উল্লেখ্য,পূর্ববর্তী ওবামা প্রশাসন ২০১৬ সালে ১০ হাজার সিরীয় শরণার্থীকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের সুযোগ দিয়েছিল।  নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা নতুন ছয় মুসলিম-প্রধান দেশের নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাসের বৈধ কাগজপত্র থাকলে তারা নিষেধাজ্ঞায় অন্তর্ভুক্ত হবেন না। যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাসের বৈধ কাগজপত্র ‘গ্রিন কার্ড’ নামে পরিচিত।আগের নিষেধাজ্ঞায় ভিসা, গ্রিন কার্ড, বা দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকা হাজার হাজার মানুষও যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশাধিকার হারিয়েছিলেন।এবারের নিষেধাজ্ঞায় ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বিষয়ে আলাদা করে কিছু বলা হয়নি। ২৭ জানুয়ারির নিষেধাজ্ঞায় বলা হয়েছিল, নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত সাত মুসলিম-প্রধান দেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় চাইতে পারবে। এবার নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত দেশগুলোর খ্রিস্টান বা অন্য ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা কোনও ছাড় পাচ্ছেন না। ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা অবশ্য এজন্য এই নিষেধাজ্ঞাকে মুসলিম নিষেধাজ্ঞা বলতে নারাজ। এবারের নিষেধাজ্ঞায় আগেরবারের মতোই মার্কিন শরণার্থী কার্যক্রম ১২০ দিনের জন্য বন্ধ রাখা হয়েছে।এর আগে ১৬ ফেব্রুয়ারি ট্রাম্প জানিয়েছিলেন, ‘নতুন নিষেধাজ্ঞায় আদালতে তোলা প্রশ্নগুলোর মীমাংসা করা হবে। কেননা, ফেডারেল আপিল আদালতের আদেশে তার আগের নির্বাহী আদেশটি স্থগিত হয়ে গেছে।তিনি তখন আরও বলেছিলেন, ‘নতুন আদেশটি অনেক নিখুঁত হবে। আমরা এমন নির্বাহী আদেশ জারি করব, যা আমাদের দেশকে ব্যাপকভাবে সুরক্ষা দেবে।উল্লেখ্য,হোয়াইট হাউসে আয়োজিত এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশ অনুসারে নতুন ‘মুসলিম নিষেধাজ্ঞা’র ঘোষণা দেওয়া হয়। ওই সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন মার্কিন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেলি, পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসন ও আইনমন্ত্রী জেফ সেশনস।নতুন জারি করা নিষেধাজ্ঞায় আগের তালিকায় থাকা ইরাককে বাদ দেওয়া হয়েছে। তবে অপর ছয়টি দেশের নাগরিকদের জন্য নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখা হয়েছে।  ট্রাম্পের জারি করা নতুন এ নিষেধাজ্ঞায় বলা হয়েছে, ইরান, লিবিয়া, সোমালিয়া, সুদান, সিরিয়া ও ইয়েমেনের যেসব নাগরিকদের বৈধ ভিসা নেই তারা আগামী ৯০দিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে পারবেন না। ১৬ মার্চ থেকে নিষেধাজ্ঞাটি কার্যকর হবে।প্রসঙ্গত, ক্ষমতা গ্রহণের পরই ২৭ জানুয়ারি এক নির্বাহী আদেশে সাত মুসলিম-প্রধান দেশের নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্র সফরে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। পরে সিয়াটলের একজন বিচারক ট্রাম্পের ওই নিষেধাজ্ঞা স্থগিতের আদেশ দেন। ট্রাম্প প্রশাসন ওই আদেশের বিরুদ্ধে আপিল করলেও সান-ফ্রান্সিসকোভিত্তিক তিন বিচারকের প্যানেল তা খারিজ করেন।কিন্তু প্রায় সব ধরনের অভিবাসনের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ওই নির্বাহী আদেশ মূলত অবৈধ। কেননা এখন থেকে ৫০ বছর আগে জাতিগত পরিচয়ের ওপর ভিত্তি করে অভিবাসীদের বিরুদ্ধে এমন বৈষম্য বেআইনি বলে ঘোষণা করেছিল যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস। জাতিগত পরিচয়ের কারণে অভিবাসীদের যুক্তরাষ্ট্রে ঢুকতে না দেয়ার একটা দীর্ঘ ও লজ্জাকর ইতিহাস দেশটিতে ছিল। আর এ লজ্জা থেকে বাঁচতে এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছিল কংগ্রেস। এ ইতিহাস শুরু হয়েছিল ১৯ শতকের শেষের দিকে। আইন করে প্রথমে চীনের সব নাগরিকের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল। এরপর প্রায় সব জাপানিই এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়ে। তারপর তথাকথিত এশিয়াটিক ব্যারড জোন অর্থাৎ এশীয় নিষিদ্ধ অঞ্চল নামে সব এশীয়কেই নিষিদ্ধ করা হয়। অবশেষে ১৯২৪ সালে পশ্চিম ইউরোপীয়দের সুবিধা দিতে এবং অধিকাংশ পূর্ব ইউরোপীয় এশীয় ও আফ্রিকার অধিবাসীদের বাদ দিতে অভিবাসন কোটা বিকৃত করে ‘ন্যাশনাল-অরিজিন সিস্টেম’ তৈরি করে কংগ্রেস।নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে এক নতুন ধরনের এশিয়াটিক ব্যারড জোন বা এশীয় নিষিদ্ধ অঞ্চল পুনরায় চালু করলেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।   কিন্তু এক্ষেত্রে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সামনে কেবল একটি সমস্যা আর তা হল; ১৯৬৫ সালের ‘দ্য ইমিগ্রেশন অ্যান্ড ন্যাশনালিটি অ্যাক্ট’ বা অভিবাসন ও জাতীয়তা আইন জাতিগত পরিচয়ের ওপর ভিত্তি করে সব অভিবাসীর বিরুদ্ধে সব ধরনের বৈষম্য বাতিল করেছিল। এ আইন পুরনো ব্যবস্থা বদলিয়ে অভিবাসন কোটার ক্ষেত্রে প্রত্যেক দেশকে সমান সুবিধা দিয়েছিল। নতুন ওই আইনে স্বাক্ষর করে প্রেসিডেন্ট লিনডন বি. জনসন বলেছিলেন, “এই আইনের মাধ্যমে জাতিগত পরিচয়ে অভিবাসন কোটা ব্যবস্থায় যে ‘কঠিন অন্যায়’ চলছিল তার বিলোপ হল।” তা সত্ত্বেও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জোর দিয়ে বলছেন, বৈষম্য করার ক্ষমতা তার আছে। তিনি এটা বলছেন ১৯৫২ সালের একটি আইনের ওপর ভিত্তি করে। ওই আইন বলে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের জন্য ক্ষতিকর বিবেচনায় ‘যে কোনো শ্রেণীর অভিবাসীর যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ বাতিল করার ক্ষমতা প্রেসিডেন্টের রয়েছে। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ১৯৬৫ সালের অভিবাসন অ্যাক্টে এ ক্ষমতা যে কংগ্রেস রহিত করেছিল সে সত্যকে অগ্রাহ্য করছেন। ১৯৬৫ সালের ওই অভিবাসন আইনে পরিষ্কারভাবে বলা আছে, ব্যক্তির জাতি, লিঙ্গ, জাতীয়তা, জন্মস্থানের কারণে কোনো অভিবাসীর ভিসা ইস্যুর বিরুদ্ধে কোনো ধরনের বৈষম্য করা যাবে না।’ ১৯৬৫ সালে কংগ্রেস যখন ওই আইন পাস করেছিল, এটা শুধু অন্য দেশের অভিবাসীদের রক্ষা করতে চায়নি, বরং মার্কিন নাগরিকদেরকেও রক্ষা করতে চেয়েছিল। ওই আইন বলে মার্কিন নাগরিকদের তাদের পরিবারের সদস্যদের পৃষ্ঠপোষকতা দেয়া বা কোনো ধরনের বৈষম্য ছাড়াই বিদেশী কোনো নাগরিককে বিয়ে করার অধিকার রয়েছে।যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসী প্রবেশ ও ভিসা ইস্যু করার মধ্যে একটা পার্থক্য নির্দিষ্ট করে জাতিগত পরিচয়ের ওপর ভিত্তি করে কোনো বৈষম্য প্রচলন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প চাইতে পারেন। তবে সেটা নির্বোধের মতো একটা কাজ হবে।এখন দেখার বিষয় আগের আদেশটির মতো নতুন আদেশটিও আইনি চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয় কি না।                                              কলাম লেখক                                     raihan567@yahoo.com

Sent from Yahoo Mail on Android

 

প্রবাসে ঈদ আনন্দ

  রায়হান আহমেদ তপাদার

আরব দেশের পশ্চিমাকাশে শাওয়ালের চাঁদ ভেসে উঠার পরই চোখে ভেসে আসছে চিরচেনা সেই গান ‘ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে এল খুশির ঈদ‘।সৌদি আরবে শাওয়াল মাসের চাঁদ দেখা গেছে। মধ্যপ্রাচ্যর সাথে সংগতি রেখে ইউরোপ,আমেরিকাসহ পশ্চিমাপ্রায় সকল দেশেই উৎযাপিত হয় পবিত্র ঈদ উল ফিতর।পৃথিবীর প্রায় প্রত্যক দেশে ঈদ উদযাপনের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে কয়েকদিন আগে থেকেই।লন্ডনসহ ব্রিটেনজুড়ে যথাযোগ্য ধর্মীয় ভাব-গাম্ভীর্য ও উৎসাহ উদ্দীপনায় ঈদ উদযাপন সম্পন্ন হয়েছে।এক মাস সিয়াম সাধনার পর পবিত্র ঈদুল ফিতর সবার জীবনে বয়ে আনুক অনাবিল সুখ,শান্তি ও সমৃদ্ধি।সিয়াম সাধনার মাস রমজান ব্যক্তি জীবনকে সুন্দর,পরিশুদ্ধ ও সংযমি করে। মুমিন মুসলমানগণ মাসব্যাপী সিয়াম সাধনার পর অনাবিল আনন্দের বার্তা নিয়ে আসে ঈদুল ফিতর।আর ঈদুল ফিতরের উৎসবে সমাজের সকল মতভেদ ও সীমানা অতিক্রম করে মানুষে মানুষে মহামিলন ঘটায় ও সৃষ্টি করে পরষ্পরের প্রতি আন্তরিক মমতাবোধ ও শ্রদ্ধাবোধ।মাহে রমজান আসতে না আসতেই খুব দ্রুত চলে যায়। খুশির র্বাতা নিয়ে উদিত হয়- ঈদের ‘বাঁকা চাঁদ’।ঈদের চাঁদ উঠলেই হঠাৎ করে প্রবাসীদের চোখের পাতা ভিজে ওঠে।ঈদে প্রবাসীরা মা-বাবার পা ধরে ‘কদমবুছি’ করতে পারে না। মা-বাবার কবর জেয়ারতও করতে পারে না। সন্তানদের আদর করতে পারে না। সন্তানদের নানা রকম বায়না ধরার হাসি-কান্না উপভোগ করতে পারে না। ঈদের মার্কটিং নিয়ে গিন্নির মান-অভিমান দেখতে পারে না। ছোট বাচ্চাদের ‘ঈদ সেলামী’দিয়ে তাঁদের ‘তৃপ্তির হাসি’ দেখতে পারে না। এই দুঃখ বেশির ভাগ অভাগা প্রবাসীদের।আরবের ঘরে ঘরে আনন্দ। রাস্তায় রাস্তায় খুশির জোয়ার। শপিংমলে কেনা কাটা শেষে এখন অনেকটাই ফাঁকা। লাখো মানুষের পদচারণায় পিষ্ট এই শপিংমলকে ঝাড়ু দিয়ে পরিস্কার করতে করতে চোখ জলে টলমল করে উঠে আবুল মিয়ার।গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়া চোখের জল মিশে যায় তীব্র গরমে গা থেকে বেরিয়া আসা দুর্গন্ধময় ঘামের সঙ্গে। প্রবাসীদের মনে কেবল একটাই যাতনা এত কষ্টের পরও ছেলেমেয়েদের ঈদের কাপড় কিনেই টাকা শেষ।তিন ঈদ চলে গেলও মায়ের জন্য কিনতে পারেনি কিছুই।ঠিক এমন সময় দেশ থেকে ফোন আসে।ফোনে ওপার থেকে মা জিজ্ঞেস করেন,বাজান কি কর? চোখ মুছতে মুছতে আবেগ সামলে রফিক মিয়া বলেন মা,সব বন্ধু বান্ধব মিলা সেমাই খাই।এটাই হলো মধ্যপ্রাচ্যে বাঙ্গালিদের ঈদ।ব্যতিক্রম যে নাই তা নয়। যারা একটু পুরাতন, বাড়িতে টাকার চাপ যাদের একটু কম, যাদের কপাল একটু ভাল তারা অনেকে ঈদে বেশ মজাও করেন। রান্না করেন সেমাই পোলাও উটের গোস্ত। গায়ে জড়ান নতুন জামা। আরবদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ঈদগাহে ঈদের নামাজও আদায় করে থাকেন।তবে মিশরে বাংলাদেশিদের অবস্থা কিছুটা ব্যতিক্রম। এখানে সাধারণত দুই শ্রেণির বাংলাদেশি আছেন। ছাত্র এবং গার্মেন্টস কর্মী। ছাত্রদের হাতে টাকা পয়সা কম থাকলেও তারা মোটামুটিভাবে ভালই ঈদ উৎযাপন করে থাকেন।যারা হোস্টেলে থাকেন তারা বিভিন্ন দেশের বন্ধুদের সঙ্গে নামাজ আদায় করেন। খাওয়া দাওয়া সব শেয়ার করেন। নতুন জামাকাপড় পরেন। আর যারা বাসা ভাড়া করে থাকেন তারা অনেকে আগের রাতেই কিছু রান্না করে রাখেন। ভোরে নামাজ আদায় করে এসে কিছু খেয়ে ঘুম দেন। দুপুরে উঠে বন্ধু বান্ধবদের সঙ্গে দেখা করে আড্ডা দেন। সন্ধ্যায় ছাত্র সংগঠনের অনুষ্ঠানে যোগ দেন তারপর রাতভর আড্ডা অথবা নীলনদের পাড়ে ঘুরতে যান। অপরদিকে গার্মেন্টস কর্মীরা ঈদে তিন চারদিন ছুটি পান। তারা সাধারণত এক সঙ্গে অনেকজন থাকেন। কাজেই তাদের ঈদ আনন্দটা একটু বেশিই। খাবার আয়োজনেও তারা বেশ মনযোগী। পাঁচ সাত জন মিলে মিলে রান্না করেন। দুপুরে বিভিন্ন জাগায় ঘুরতে যান। সন্ধ্যায় অনেক সময় অনুষ্ঠানের আয়োজন করে থাকেন। একসঙ্গে গান গান ও মজা করেন। রাতে শুরু হয় দেশে ফোন করার প্রতিযোগিতা। কারণ পরের দিন বাংলাদেশে ঈদ। সারাদিন যতই উৎফুল্ল থাকুক রাতে দেশে কথা বলতে গিয়ে সবাই আবেগী হয়ে ওঠেন। পাওয়া না পাওয়া হিসেব মিলাতে না পেরে সবাই প্রায় একই মুখস্ত উত্তর দেয়, অনেক কিছু খাইছি অনেক মজা করছি আমি ভাল আছি আমাকে নিয়ে চিন্তা করো না। প্রবাসে যান্ত্রিক জীবনের মাঝে ঈদের মহা আনন্দকে বরণ করে নিতে হয়। যার একমাত্র যৌক্তিক কারণ দেশ নয় বিদেশ। ঈদ মানেই তো হাসি, আনন্দ ও উল্লাস। তবু আনন্দের মাঝে কোনো কোনো কাল নিরানন্দ থাকে। একটি বছর কত চড়াই উৎরাই পার করতে হয় মানব জীবনে। কিন্তু বছরের দুইটি দিন এলে দুঃখ, বিরহ-বেদনা, ক্লেশ সব দূর হয়ে যায়। ঈদের পূরবর্তী বার্তার আগমনে। ক্ষণিকের জন্য হলেও ঈদের খুশিতে সব রাগ-রাগিনীর অবসান টানে।পবিত্র ঈদুল ফিতরের একটি তাৎপর্য এবং ঈদুল আযহার আরেকটি তাৎপর্য। তাই দুটো খুশির দিন ভিন্ন মাত্রার আনন্দ বয়ে আনে আমাদের জীবনে। হাসি, খুশির মাঝে আছে নীরব কান্না। মুখ আছে, বুলিও আছে। কিন্তু বুঝাবার যেন সাধ্য নেই। দেশে বিদেশে ঈদের আনন্দ সম্পূর্ণ আলাদা।প্রবাসে আমাদের ঈদ। সকালে উঠেই কর্মময় জীবনের প্রথম অধ্যায় শুরু হয়। একজন মুসলিম হিসেবে ফজর নামাজ আদায় করে রুটিন অনুযায়ী কাজে যোগ দিতে যাত্রা শুরু করতে হয়। এরপর কর্মস্থলে একটি ব্যস্ত সময় কাটে। সকালের সূর্য পূর্বদিকে উদিত হয়ে পশ্চিম দিকে অস্ত যাওয়া পর্যন্ত জীবন পরিবর্তনের আশায় প্রবাসে কর্মময় রশি টানতে হয়। বিরতিহীন চলতে থাকে কর্মশালা।হয়তো জীবন উন্নয়নের ভাগ্য পরিবর্তন হওয়ার পূর্ব মুহূর্তে পর্যন্ত প্রবাসের এ ব্যস্ততা চালিয়ে যেতে হবে। এর মাঝে পার হবে আরো কত ঈদ। আমার কাছে অধরা হয়ে থাকবে ঈদের খুশি। তবু প্রবাসের যান্ত্রিক জীবন নিয়ে বেশি একটা খারাপ নেই। মাঝে মাঝে একটুতো খারাপ লাগবেই। কারণ বাংলাদেশ আমার মাতৃভূমি। যার কৃষ্টি, সংস্কৃতিতে জীবনের প্রথম পথচলা। তাই ইচ্ছে করলেই এই শিকড় থেকে নিজেকে বেশি দূরে রাখা সম্ভব নয়। বেশি খারাপ লাগে ঈদ এলেই।তাই হয়তো একটু বেশি আবেগে আপ্লুত হই।মায়াবী মায়ার টান বাড়ে স্বদেশে রেখে আসা মা, বাবা,আত্মীয়,পরিবার পরিজনসহ আরও আপনজনদের জন্য। স্বদেশে ঈদের এক, দুই সপ্তাহ আগেই চারিদিক আনন্দে জোয়ার বইতে শুরু করে। ঈদুল ফিতরে রমজানের বাহারি ইফতার আর ঈদুল আযহার সময় কোরবানি করার ধুম।এই ভিন্ন ভিন্ন আনন্দ মনকে উতলা করে তুলে। বেদনাসিক্ত মন থাকলেও এই মহাখুশির দিনে সব ধেয়ে যায় অজানা ঠিকানায়। প্রবাসে একজন অন্যজনের দাওয়াতী মেহমান হিসেবে বাসায় আসে। ঘরোয়া পরিবেশে কতইনা মজা হয়। যা এক সময়ে স্মৃতির ফ্রেমে বন্দী হয়ে রয়। এই আনন্দময় সময় গল্প, গুজব প্রবাসে আধুনিকায়নের যুগে সব থাকা সত্ত্বেও পাওয়া যায় না। তাই চিরস্মরণীয় এই দিনে বিলেত থেকে মনে পড়ে সবাইকে।প্রবাসে সবই আছে। নেই লাল সবুজের সুজলা,সুফলা শস্য, শ্যামলের বাংলাদেশ। ঈদ আছে। নেই ঈদের আনন্দ।প্রতিবেশীও আছে।নেই মনের মতন প্রতিবেশী।এই খন্ড খন্ড হৃদয়ের চাওয়াগুলো প্রবাসের এতো চাকচিক্যের মাঝে মন ভরে না। ফিরে যেতে মন চায় মাটির টানে স্বদেশের আঙিনায়িং।মানুষ যেখানে যায় সেখানে দুটো শক্তি যায় তার সাথে। এক- বিশ্বাস। দুই-সংস্কৃতি। বিদেশে এই সময়ে যে লাখ লাখ বাঙালি তাদের স্থায়ী নিবাস করে নিয়েছেন- তারাও মূলত এই শক্তিতে বলীয়ান। ধর্ম, বিশ্বাসের একটি স্তর। অভিবাসীদের আনন্দের একটি অন্যতম দিন হলো-ঈদ।ঈদ এলেই অভিবাসী বাঙালির মনের ক্যানভাসে যে চিত্রটি ফুটে ওঠে, তা হলো স্বদেশের মুখ। কেমন আছেন স্বজন? কেমন আছে জন্মমাটি? প্রবাসে ঈদের আনন্দ মানেই হচ্ছে এক ধরনের তীব্র শূন্যতা। কথাটি সব প্রবাসীই স্বীকার করবেন একবাক্যে। তার কারণ হচ্ছে, ঈদের দিনটি এলেই এক ধরনের নস্টালজিয়া মনটাকে ভারি করে তোলে। ফেলে আসা সেই শহর কিংবা গ্রাম, সেই আড্ডা, সেই মধুর স্মৃতি, মা-মাতৃভূমির টান বুকের পাঁজরে দোল খেয়ে যায়। আহা! সোনার আলোয় ভরা সেই দিনগুলো…।প্রবাসে ঈদের অভিজ্ঞতা আমার তিন দশকের বেশি সময়ের। বিদেশের বিভিন্ন দেশে ঈদ করতে গিয়ে যে সত্যটি খুব একান্তভাবে প্রত্যক্ষ করেছি তা হচ্ছে, প্রবাসে একজন বাঙালিই অপর বাঙালির ঘনিষ্ঠ স্বজন। তা পরিচিত হোক অথবা অপরিচিত। মুসলিম অধ্যুষিত দেশগুলোতে ঈদের আনন্দই আলাদা। পবিত্র রমজান মাস এলেই রোজার আমেজে সিক্ত হয়ে ওঠে পুরো নগরী। ধর্মপ্রাণ মানুষের উপাসনা, ইফতারির বাহারি আয়োজন সৃষ্টি করে একটি ভাবগম্ভীর পরিবেশের। ঢাকা, দুবাই কিংবা দোহা’র মতো শহরগুলোতে রমজানের বিকেলের প্রতিটি দিনই যেন হয়ে ওঠে উৎসবের দিন। তারপর আসে ঈদ,পরম উৎসবের দিন। আনন্দের সেই প্রতীক্ষিত দিন। তার আগে আছে ঈদের বাজার।ইউরোপ-আমেরিকায় সেই আবহের ভিন্নতা স্পষ্ট। তার কারণ হচ্ছে, এখানে ঈদ একটি সম্প্রদায়ের উৎসব, যে সম্প্রদায়ের লোকসংখ্যা পুরো রাষ্ট্রের জনসংখ্যার সামান্য অংশ মাত্র। আমেরিকায় ঈদ করতে গিয়ে সেই শূন্যতা আরও তীব্রভাবে অনুভব করেছি। সপরিবারে নিউইয়র্কে স্থায়ী নিবাস গড়ার পর এই নগরীটি হয়ে উঠেছে আমাদের দ্বিতীয় নিবাস। নিউইয়র্কে ক্রমবর্ধমান বাঙালি অভিবাসনের সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে ধর্মীয় কালচারও। সিলেটের জিন্দাবাজার কিংবা ঢাকার নবাবপুর রোডের স্টাইলে এখানে এখন তৈরি হচ্ছে ইফতারি। ভারতীয়-বাংলাদেশী বিপণি বিতানগুলো ঈদ উপলক্ষে সজ্জিত হচ্ছে আলোকসজ্জায়। রীতিমতো জমজমাট ঈদের বাজার। নিউইয়র্কের বাঙালি পোশাক বিক্রেতারা পণ্য ক্রয়ের উদ্দেশ্যে ছুটে যাচ্ছেন মুম্বাইয়ে। দশ হাজার ডলারের লেহেঙ্গার সংবাদ নিয়েও সংবাদ শিরোনাম হচ্ছে বাংলা সাপ্তাহিকের পাতায়। নিউইয়র্কের স্কুল-কলেজগুলোতে এখন হাজার হাজার বাঙালি অভিবাসী শিক্ষার্থী লেখাপড়া করছে। দুই ঈদে সরকারি ছুটি মঞ্জুর করা হয়েছে নিউইয়র্কে।ঈদ মানে খুশি, ঈদ মানে আনন্দ। এ কথা সত্য হলেও সবার জন্য সমান সত্য নয়। কারণ দেশে আত্মীয়-পরিজন নিয়ে মহাআনন্দে ঈদ উদযাপন করলেও প্রবাসীদের জীবনে এর বাস্তবতা খুঁজে পাওয়া যায় না। আর তাই ঈদে তাদের আনন্দটা অতটা গাঢ় রঙ ধারণ করে না। প্রবাসে অনেকেই আছেন যাদের জন্য ঈদের দিনটা অত্যন্ত কষ্টের। এই কষ্টকে বুকে নিয়েই যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি প্রবাসীরা ঈদ উদযাপন করে থাকেন।প্রবাসীদের ঈদ উদযাপনের খোঁজ-খবর নিতে গিয়ে তেমনটাই আঁচ করা গেলো।প্রবাসীরা বিভিন্ন মাধ্যমে জানিয়েছেন, বাংলাদেশসহ মুসলিম বিশ্বের মতো এখানেও ঈদকে নিয়ে আশা-আকাঙ্ক্ষা আর প্রস্তুতির কমতি থাকে না।কিন্তু প্রিয়জনদের হাজার মাইল দূরে রেখে ঈদ আনন্দ পাথর-চাপা কষ্টে পরিণত হয়।আত্মীয়-স্বজন রেখে দূর দেশে ঈদ করাটা সত্যিই বেদনার।                                     লেখক ও কলামিস্ট,যুক্তরাজ্য                                     raihan567@yahoo.com

লাশের বুকে ফিনকে কাঁদে বন্ধুত্বের দান

বাংলাদেশের জন্মের সাথে ভারতের বন্ধুত্ব জড়িয়ে । বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্থপতির জীবদ্দশায় ভারতের সাথে বাংলাদেশের যতোটা মধুর ও গভীর সম্পর্ক ছিল তার চেয়ে বর্তমান সময়ে বাংলাদেশ সরকারের সাথে ভারতের সম্পর্ক বেশি গভীর-মধুর । তবে নানাবিধ কারনে বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের সাথে ভারত সরকার ও সাধারণ মানুষের বন্ধুত্বের ভাবনায় ফাটল সৃষ্টি হচ্ছে । প্রায় প্রত্যহ, ভারতের সীমান্তরক্ষীদের নির্বিচার গুলিতে বাংলাদেশী নাগরিকদের হতাহতের ঘটনাই দূরত্বের মাত্রা নিয়ত তীব্র করছে । অথচ বাংলাদেশী সীমান্তরক্ষীদের গুলিতে বিগত দশ বছরেও কোন ভারতীয় নাগরিক নিহত হয়েছে এমন সংবাদ গণমাধ্যমে আসেনি । তারপরেও, ভারতের প্রতি রাষ্ট্রীয় উচ্চপর্যায়ের নতজানুভাব দেশপ্রেম তথা এদেশের মানুষের স্বার্থরক্ষা ও নিরাপত্তা প্রদানের প্র্রশ্নে দায়িত্বশীলদের ভূমিকাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে । প্রতিবেশী হিসেবে বাংলাদেশ ভারতের তুলনায় বহুগুন দূর্বল, আকৃতিতে ক্ষুদ্র এবং ভৌগলিক ও রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলসহ বিভিন্ন দিকের বিবেচনায় বাংলাদেশের কতিপয় রথী-মহারথী ভারতমুখী । তবে এই দুর্বলতার সুযোগে যখন ভারতের সরকারি বাহিনী কর্তৃক সীমান্তহত্যা লাঘামহীন চলছে তখন দু’দেশের বন্ধুত্বের মধুরতার কপালে তিলক এঁকে দেয় ! প্রতিবেশীর সাথে ভারতের আচরনের শিষ্টাচারের মাত্রা নিয়ে প্রশ্ন তোলে ।

উৎপত্তিগতভাবেই ভারত বাংলাদেশের নিকটতম প্রতিবেশী এবং বাংলাদেশের সীমান্ত এলাকার সিংহভাগ ভারতের সীমান্তের সাথে যুক্ত । প্রতিবেশী হিসেবে বন্ধুত্বপূর্ণ যে সুসম্পর্ক দু’দেশের সীমানায় বিরাজমান থাকা উচিত ছিল তা বারবার বিএসএফ সদস্যদের বাড়াবাড়ির দ্বারা লঙ্গিত হয়েছে । বিএসএফের আগ্রাসনের কারনে বাংলাদেশীদের বর্ষপঞ্জি থেকে এমন কোন পক্ষকাল কিংবা মাস অতিবাহিত হয়না যে সময়টাতে ভারতীয় সীমান্তরক্ষীদের গুলিতে বাংলাদেশী নাগরিক হতাহত না হয় । আসন্ন ঈদের আগে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী আবারও বাংলাদেশীদের উপহার দিল দু’টো হত্যার সংবাদ । দুর্ভাগ্য এটাই, এখন অবধি নিথর দেহ দু’টোও তাদের স্বজনরা পায়নি বরং তা বিএসএফ সদস্যরা টেনে হিঁচড়ে নিয়ে গেছে । এ বন্ধুত্বের ধারাবাহিকতায় চলতে থাকা বন্ধুত্বের বন্ধসূলভ বিনিময় ! এ প্রতিদানের ভার বইতে বইতে বাংলাদেশীদের হৃদয় আজ ভারাক্রান্ত, চোখের পানি শুষ্ক, অসহায় দৃষ্টিও ক্লান্ত ! অথচ বিজিবি কর্তৃক ভারতের দিকে বিগত কয়েক বছরে ছোঁড়া গুলিতে কেউ হতাহত হওয়া তো দূরের কথা বরং অস্ত্র ওদিকে তাক করে বিস্ফোরিত পর্যন্ত হয়নি । লাশের মিছিলে বাংলাদেশীরা এককভাবে দিয়ে যাচ্ছে বন্ধুত্বের খেসারত ! এমন বন্ধুত্বের শ্রী বিশ্ব মানচিত্রের অন্য কোথাও দুর্লভ !

সীমান্ত হত্যার সংখ্যার ধারাবাহিকতায় ভারত-বাংলাদেশের সীমান্ত হত্যা একপেশে ভারতের ধারা ক্রমশ লাঘামহীন হচ্ছে । বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে জঘণ্য ও কুখ্যাত সীমান্ত হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র এবং মেক্সিকোর মধ্যকার সনেরো লাইন ।  বিশ্ব ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি মানুষ এ লাইন অতিক্রম করার সময় পুলিশের গুলিতে নিহত হয় । তবে এদের বেশিরভাগ যুক্তরাষ্ট্রের কিংবা মেক্সিকোর নাগরিক নয় বরং মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ থেকে পাড়ি দেওয়া অভিবাসী ।  অন্যান্য দেশের মধ্যকার সীমান্ত লাইনগুলোর মধ্যে ভারত-পাকিস্তানের র‌্যাডক্লিফ, আফগানিস্তান-পাকিস্তানের ডুরান্ড, রাশিয়া-ফিনল্যান্ডের ম্যানারহেম,  লেবানন-ইসরাইল ব্লু, সিরিয়া-ইস্রাইলের পার্পল, যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা ৪৯ ডিগ্রি অক্ষরেখা, উত্তর ও দক্ষিন কোরিয়ার মধ্যকার ৩৮ ডিগ্রি অক্ষরেখা প্রভৃতি সীমান্ত লাইনগুলোতে মঝে বিবাদমান দেশগুলোর মধ্যে সংঘর্ষ হয় বটে কিন্তু তাতে এককভাবে কোন দেশের নাগরিক হতাহত হয়না বরং কোন দেশের দু’জন হতাহত হলে অন্য দেশের অন্তত একজন কিংবা একাধিক হতাহত হয় । হত্যার সমীকরণেও সেখানে সাম্যতা আছে ! অথচ বাংলাদেশের সাথে ভারতের সীমান্ত সংঘর্ষ একেবারেই ভিন্নরূপের বর্ণনা দেয় ।  এখানে একচেটিয়াভাবে হত্যা করা হচ্ছে হচ্ছে বাংলাদেশের নাগরিকদের । আমরা নীরিহ মানুষকে হত্যা সমর্থন করিনা হোক সে বাংলাদেশের, ভারতের কিংবা অন্যকোন দেশের । আমরা শুধু শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ও সমাধান চাই । অথচ আমাদের দেশের কর্তৃপক্ষের দুর্বলতা ও বিজিবির সদস্যদের আচরণ দেখে মনে হচ্ছে, ভারতীয় বাংলাদেশ সীমান্ত যাই করুক, ওদিকে গুলি ছোঁড়া তো দূরের কথা ফাঁকা আওয়াজ করার অনুমতিও বোধহয় নাই । কাজেই বর্ষপঞ্জি পাড়ি দেয়ার ফাঁক-ফোঁকড়ে দু’চারটে ফেলানীর নিথর দেহে ভারত কর্তৃক বাংলাদেশকে দেয়া বন্ধুত্বের উপহার ! মনে রাখতে হবে, শক্তের ধর্মই এমন, এ কেবল দুর্বলকে পিষে যায় । ইতিহাস সাক্ষী দেয়, অত্যাচারীর সামনে যে যত দুর্বলতা দেখাবে তার প্রতি অত্যাচারের স্টীম রোলার তত বেশিবার চালানো হবে  । ভারতের আচরণ দেখে মনে হচ্ছে, তারা এ নীতিই অনুসরণ করছে ।

ভারতীয়রা আজ আমাদের বন্ধুত্বের সংজ্ঞা, প্রকারভেদ ও প্রকৃতির পাঠ দিচ্ছে ! আমাদের দাবী ও ন্যায্য অধিকারের কোনটাই পূরনে তাদের সম্মতিটুকুও আদায় করা যাচ্ছে না । অথচ তাদের দাবীর সবগুলোই এখান থেকে হাসিমুখে দিল্লীতে পৌঁছে দেয়া হচ্ছে । আমরা তিস্তা-গঙ্গার ন্যায্য পানি পাচ্ছি না অথচ আমাদের ক্ষতি হবে জেনেও তারা বিভিন্ন সময় পানির প্লাবন ছেড়ে আমাদের ফসল নষ্ট করে দিচ্ছে, মাসের পর মাস বন্যার স্রোত বইছে এদেশের জেলায় জেলায় । তাদের ক্রিয়ায় কখনো কখনো নদী আর স্থলভূমিতে পার্থক্য করা যাচ্ছে না । অথচ আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী যে তিস্তা ও গঙ্গার পানিতে আমাদের ন্যায্য অধিকার তা অবৈধভাবে আটকে রাখায় আমাদের দেশের সমগ্র উত্তরাঞ্চল রবি মওসূমে বিরাণ মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে বছরের পর বছর । সেসব অঞ্চলের দারিদ্র্যক্লিষ্ট মানুষগুলো পেয়েছে মঙ্গাপীড়িত এলাকার অধিবাসীর উপমা । এসব কিছুই ভারতের বন্ধুত্বের বিনিময় ! কালের যাত্রায় ক্ষতিটুকু সব আমরা গ্রহন করছি আর ভালোটুকু পৌঁছে দিচ্ছি কথিত বন্ধুদের থলে ।

বিভিন্ন পর্যায়ের বৈঠকে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ কর্তৃক্ষ সীমান্ত হত্যা বন্ধের আশ্বাস বহুবার এসেছে অথচ বন্ধের বিপরীতে সীমান্ত হত্যা ক্রমাগত বেড়ে চলেছে । এই যদি হয় বন্ধুপ্রতীম দেশের আচরণ তবে শত্রুদের আচরণের অভিধা কেমন হবে ? যারা তিরস্কার করে বলেছিল,  ভারত যাদের বন্ধু তাদের আর শত্রুর দরকার পড়েনা । আজ সে উক্তিতে নিহিত সত্য দেশবাসী খুব ভালোভাবেই উপলব্ধি করছে । নয়তো ভারতের দ্বারা এভাবে সীমান্তে বাংলাদেশী হত্যার নিষ্ঠুর ও অমানবিক আচরণ চির শত্রুতাভাবাপন্ন কোন দেশের বাহিনী দ্বারা সংঘটিত হওয়ার যৌক্তিক ভিত্তি থাকতে পারেনা । অথচ ভারতীয় বাহিনী দ্বারা নারকীয় এমন হত্যাযঞ্জের ঘটনার বারবার পূনরাবৃত্তি হচ্ছে, সকালে-বিকালে হচ্ছে । প্রিয় রাষ্ট্র, তোমার নীরিহ সন্তানদেরকে এভাবে যারা হত্যা করছে তাদের বিরুদ্ধে পাল্টা ব্যবস্থার সামর্থ্য তোমার না থাকলেও অন্তত এসব অনাচার-অবিচার বন্ধে জোড়ালো প্রতিবাদ ও নিন্দা জানানোর শক্তিটুকু তো স্বাধীন ও সার্বভৌম সত্ত্বা হিসেবে তোমার অবশিষ্ট থাকা আবশ্যক ।


সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি: এ্যাডভোকেট শেখ মোঃ আব্দুল্লাহ
সম্পাদক-প্রকাশক : শেখ মোঃ তৈয়াবুর রহমান॥

যুগ্ম সম্পাদক: এস এম শাহিদুল আলম॥ সহযোগী সম্পাদক: শেখ মোঃ আরিফ আল আরাফাত
সহ-সম্পাদক: (প্রশাসন) হাজী হাবিবুর রহমান শাহেদ: সহ সম্পাদক: আজমাল মাহমুদ
সম্পাদক কর্তৃক বাড়ী বাড়ী নং- ৫৩/২, ৪র্থ তলা, রাজ-নারায়ন-ধর রোড, কিল্লার মোড় বাজার, লালবাগ, ঢাকা-১২১১
ফোন: ০১৯১৮-২০১৬২৬, ফোন: ০১৭১৫-৯৩৩১৬৮
ই-মেইল- notunvor.news@gmail.com
Designed By Hostlightbd.com
| Cyberboss.org