মিয়ানমারে অনুষ্ঠেয় এশিয়া ও ইউরোপের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠক (আসেম) সামনে রেখে রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে মিয়ানমারের সীমান্তসংলগ্ন চারটি প্রতিবেশী দেশের সহায়তা চেয়েছে বাংলাদেশ।

ভারত, চীন, থাইল্যান্ড ও লাওস এ চারটি দেশের রাষ্ট্রদূতের মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের নিজের দেশে ফেরাতে এ সহযোগিতা চান পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী।

গতকাল দুপুরে রাজধানীর রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে চার রাষ্ট্রদূতকে রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে গৃহীত দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় উদ্যোগের বিস্তারিত অবহিত করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

তিনি বলেন, ১০ লাখেরও বেশি মিয়ানমার নাগরিকের অস্থায়ী আশ্রয় গ্রহণে বাংলাদেশ গভীর সংকটে পড়েছে। বৈঠকে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ শাহরিয়ার আলমও উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো এ তথ্য জানিয়েছেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানান, আসন্ন এশিয়া-ইউরোপ মিটিং (আসেম) সম্মেলনকে রোহিঙ্গা সংকট নিরসনের লক্ষ্যে গুরুত্বপূর্ণ এক প্লাটফরম বলে বিবেচনা করা হচ্ছে। এ সম্মেলনের সাইডলাইনে অং সান সু চির সঙ্গেও বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আলোচনা হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এ সম্মেলনে এশিয়া ও ইউরোপের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরাও যোগ দিচ্ছেন বলে আশা করা হচ্ছে। এর আগে চীন, জাপান, জার্মানি ও সুইডেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা রোহিঙ্গা পরিস্থিতি জানতে বাংলাদেশ সফর করেছেন। অন্যদিকে ১৫ নভেম্বর কয়েক ঘণ্টার জন্য মিয়ানমার সফরে যাচ্ছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসন।

২০ ও ২১ নভেম্বর মিয়ানমারের রাজধানী নেপিদোয় আসেম পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে যোগ দিতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাহমুদ আলীকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সেলর অং সান সু চি। মাহমুদ আলী ১৯ নভেম্বর মিয়ানমার যাচ্ছেন।

সূত্র জানান, মিয়ানমারের সীমান্তসংলগ্ন ওই চার দেশের রাষ্ট্রদূত বৈঠকে রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে গতকাল বাংলাদেশের এ সহযোগিতা চাওয়ার কথা তাদের স্ব দেশের সরকারের কেন্দ্রীয় পর্যায়ে (হেডকোয়ার্টারে) জানাবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

বৈঠকে ভারতীয় হাইকমিশনার হর্ষবর্ধন শ্রিংলা, চীনের রাষ্ট্রদূত মা মিং কিয়াং, থাইল্যান্ডের রাষ্ট্রদূত প্যানপিমন সোয়াননাপোন্গসে, দিল্লিতে লাওসের রাষ্ট্রদূত (বাংলাদেশেরও দায়িত্বপ্রাপ্ত) সাওদাম সাকোনিনহোসহ উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তি : চার দেশের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠক প্রসঙ্গে গতকাল সন্ধ্যায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ১৬ ও ১৭ নভেম্বর পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলীকে মিয়ানমার সরকারের পক্ষ থেকে সে দেশ সফরের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল।

তবে, ১৮ ও ১৯ নভেম্বর চীন, জাপান, জার্মানি ও সুইডেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা বাংলাদেশ সফরে আসছেন। তাদের সফরকালে তাকে (মাহমুদ আলী) ঢাকায় থাকতে হবে।

এজন্য তিনি দুই দিন পর ২০-২১ নভেম্বর অনুষ্ঠেয় আসেম সম্মেলনকালে মিয়ানমার সফরের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তবে আসেম সম্মেলনের পরও দুই দেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার লক্ষ্যে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাহমুদ আলী আরও দুই দিন মিয়ানমারে অবস্থান করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন।

জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারীর পরিচয়পত্র পেশ : জাতিসংঘের নবনিযুক্ত আবাসিক সমন্বয়কারী মিয়া সেপ্পো গতকাল রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাহমুদ আলীর কাছে পরিচয়পত্র পেশ করেন।

মিয়া সেপ্পো তার নিয়োগসংক্রান্ত জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেসের একটি চিঠি হস্তান্তর করেন। তিনি রবার্ট ওয়াটকিনসের স্থলাভিষিক্ত হলেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ সময় রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে জাতিসংঘের বিভিন্ন বিভাগের সহায়তার ভূয়সী প্রশংসা করেন।

 

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ব্রিটেনের রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ

পানামা পেপার্স কেলেঙ্কারির বছর না ঘুরতেই বিশ্বের শীর্ষ ধনীদের আরেকটি আর্থিক কেলেঙ্কারির তথ্য ফাঁস হলো। রোববার প্যারাডাইস পেপার্স নাম দিয়ে ফাঁস হওয়া ১ কোটি ৩৪ লাখ গোপন নথিতে নাম এসেছে ব্রিটেনের রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর সরকারের ঘনিষ্ঠজনের।

গতবারের মতোই এবারও এই আর্থিক কেলেঙ্কারির তথ্য ফাঁস করেছে জার্মান দৈনিক সুইডয়চে সাইটং। ফাঁস হওয়া নথির অধিকাংশই বারমুডাভিত্তিক আইনি সহায়তাদাতা প্রতিষ্ঠান অ্যাপলবি থেকে পাওয়া গেছে। অফশোর ইন্ডাস্ট্রির শীর্ষ পর্যায়ের সেবাদাতা এই প্রতিষ্ঠান গ্রাহকদের কর ফাঁকির পথ দেখিয়ে দেয়।

কর ফাঁকির ১ কোটি ৩৪ লাখ ইন্টারন্যাশনাল কনসোর্টিয়াম অফ ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্টসকে (আইসিআইজে) দিয়েছে সুইডয়চে সাইটং। ৬৭টি দেশের ৩৮০ জন সাংবাদিক এখন এসব নথি বিশ্লেষণ করছে। প্রাথমিকভাবে নথিতে ১৮০টি দেশের নাগরিক ও প্রতিষ্ঠানের নাম এসেছে।

নথিতে দেখা গেছে, ব্রিটেনের রানি এলিজাবেথের ব্যক্তিগত অর্থের মধ্যে ১ কোটি পাউন্ড বিনিয়োগ করা হয়েছে অফশোর কোম্পানিতে। ডাচি অব ল্যাঙ্কাস্টার নামে একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এসব অর্থ কেমান আইল্যান্ডস ও বারমুডায় গেছে। ওই প্রতিষ্ঠানটি রানির ব্যক্তিগত সম্পদের ৫০ কোটি পাউন্ড বিনিয়োগ দেখভাল করে এবং তাকে মুনাফা প্রদান করে। বিবিসি অবশ্য জানিয়েছে, এই বিনিয়োগে অবৈধ কিছু নেই এবং রানি কর দিচ্ছেন না বলেও এটা ইঙ্গিত করছে না। তবে রাজপরিবার অফশোর কোম্পানিতে বিনিয়োগ করা উচিৎ কি না সেই প্রশ্নটি তোলা যেতে পারে।

গরীব ঠকানোর অভিযোগে অভিযুক্ত ব্রিটিশ কোম্পানি ব্রাইট হাউজেও রানির বিনিয়োগ রয়েছে। যুক্তরাজ্যজুড়ে কিস্তিতে ইলেকট্রনিক, গৃহস্থালি পণ্য ও আসবাব সরবরাহ করে ব্রাইট হাউজ। এই প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে ১ কোটি ৭৫ লাখ পাউন্ড কর ফাঁকির অভিযোগ রয়েছে।

কর ফাঁকির এই নথিতে নাম এসেছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাণিজ্যমন্ত্রী উইলবার রসের। নব্বইয়ের দশকে ট্রাম্পকে দেউলিয়া হওয়া থেকে রক্ষা করেছিলেন রস। প্রেসিডেন্ট হয়ে তাকে বাণিজ্যমন্ত্রী করেন ট্রাম্প।

ফাঁস হওয়া নথিতে দেখা গেছে, রস একটি শিপিং কোম্পানি থেকে লাভের অর্থ নেন। এই প্রতিষ্ঠানটি প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের জামাতা ও যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞায় থাকা রাশিয়ার দুই ব্যক্তির মালিকানাধীন জ্বালানি কোম্পানিকে তেল ও গ্যাস সরবরাহ করে বছরে কয়েক মিলিয়ন ডলার আয় করছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্পের প্রচারণা শিবিরের রুশ সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তদন্ত করছে গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই। এ নিয়ে ইতিমধ্যে অস্বস্তিকর অবস্থায় রয়েছে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তার বাণিজ্যমন্ত্রীর এই রুশ সংশ্রবের নতুন অভিযোগ সেই অস্বস্তিকে আরো বাড়িয়ে দিবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।

কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর ঘনিষ্ঠজন স্টিফেন ব্রনফম্যানের অফশোর কোম্পানিতে লেনদেনে সম্পৃক্ততার তথ্য উঠে এসেছে। ব্রনফম্যান ট্রুডোর দল লিবারেল পার্টির প্রধান তহবিল সংগ্রাহক। এ ঘটনা কর ফাঁকি ঠেকাতে সোচ্চার ট্রুডোকে অস্বস্তিতর পরিস্থিতিতে ফেলবে।

এছাড়া যুক্তরাজ্যের ক্ষমতাসীন দল কনজারভেটিভ পার্টির সাবেক ডেপুটি চেয়ারম্যান ও অন্যতম অর্থদাতা লর্ড অ্যাশক্রফটের অফশোর বিনিয়োগের তথ্য বেরিয়ে এসেছে। এতে দেখা গেছে, ২০০ সালে বারমুডার পুন্টা কোরডা ট্রাস্টে কয়েক কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করেছিলেন অ্যাশক্রফট।

রাখাইনের আকাশে এখন ঘন ঘন চক্কর দেয় না সামরিক হেলিকপ্টার। সেনারা যত্রতত্র গুলিবর্ষণ করছে না।রোহিঙ্গা বসতি লক্ষ্য করে ছুড়ছে না রকেট লঞ্চার ও বোমা। রোহিঙ্গাদের দেখলে আগে যেমন সেনারা হামলে পড়ত, সে রকম ভয়ংকর দৃশ্যও নেই। নির্যাতন-নিপীড়নের ধরন পাল্টে গেছে। সেনারা এখন দৃশ্যমান নির্যাতনের পথ পরিহার করে নীরব নির্যাতন চালাচ্ছে। ২৫ আগস্টের পর রোহিঙ্গা বসতিতে ঘরে ঘরে গিয়ে সেনারা নারীদের গণধর্ষণ করত। এখন সেনা ক্যাম্পেই সুন্দরী নারীদের সরবরাহ করতে অলিখিত ফরমান জারি করা হয়েছে। আদেশ অমান্য করলে পরিণতির জন্য রোহিঙ্গাদের প্রস্তুত থাকতে বলার পর থেকেই আবারও সীমান্তে রোহিঙ্গার ঢল নেমেছে। গতকাল মঙ্গলবার সীমান্ত এলাকা ঘুরে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে আলাপে জানা গেছে এসব।

রাখাইনের বুচিদং টাউনশিপের কুয়াইনডাইং রোয়াজি নামের গ্রামের বাসিন্দা আবদুস সালাম (৪৪) ও তাঁর স্ত্রী রোকেয়া বেগম (৪০) দম্পতি তাঁদের আট সন্তান নিয়ে গতকাল মঙ্গলবার সকালে উখিয়ার পালংখালী এসে পৌঁছেন।

উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়নের গয়ালমারা এলাকায় কক্সবাজার-টেকনাফ মহাসড়কের পাশের একটি গাছের ছায়ায় আরো বেশ কিছু দেশত্যাগী রোহিঙ্গার সঙ্গে বসে ছিলেন এই দম্পতি। সবেমাত্র নাফ নদের আঞ্জুমান প্যারা ঘাট এলাকা থেকে হেঁটে মহাসড়কে উঠেছেন। চোখে-মুখে ক্লান্তির ছাপ। কালের কণ্ঠ’র প্রতিবেদক যখন রোহিঙ্গা পরিবারটির সঙ্গে আলাপ করছিলেন তখনই একজন সেনা সদস্য এগিয়ে এসে নাম-পরিচয় জেনে নিচ্ছিলেন। সেনা সদস্য দেখে রোহিঙ্গা পরিবারের সদস্যরা প্রথমে হতবিহ্বল হলেও পরে বুঝতে পারে বাংলাদেশের সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের সেবায় নিয়োজিত।

এত দিন ধরে জ্বালাও-পোড়াও চলেছে, কিন্তু তখন আসা হয়নি। আর এখন রাখাইনে এক ধরনের শান্ত পরিস্থিতি বিরাজ করছে, এখন কেন এলেন? এমন প্রশ্ন শুনেই রোহিঙ্গা আবদুস সালামের স্ত্রী রোকেয়া জানান—‘বদ্দারে, এই মাইয়াগুন যদি ন থাইত তইলে আঁই মরি গেইলও এডে ন আইতাম। মাইয়াগুনর ইজ্জত বাঁচাইবাল্লাই এডে আস্যিদে। ’ অর্থাৎ ‘বড় ভাইরে, আমার এসব মেয়ে যদি না থাকত তাহলে আমি মারা গেলেও এখানে আসতাম না। মেয়েদের ইজ্জত বাঁচাতেই এখানে আসা। ’ সালাম-রোকেয়া দম্পতির আট সন্তানের মধ্যে সাতজনই মেয়ে। বড় মেয়ের বয়স ২২ বছর এবং কনিষ্ঠ যমজ এক মেয়ে ও এক ছেলের বয়স মাত্র ১১ মাস। ১৯৯১ সালে প্রথমবার পালিয়ে আসার পর ১৯৯৪ সালে ঘুমধুম ২ নম্বর রোহিঙ্গা শিবিরে দুজন বিয়েবন্ধনে আবদ্ধ হন। ১৯৯৬ সালে ফিরে যান। বিয়ের ২৩ বছরের মাথায় এই দম্পতি আটটি সন্তান নিয়ে গতকাল আবারও এসেছেন বাংলাদেশে।

রোকেয়া বলেন, ‘আমাদের পার্শ্ববর্তী আর্মি টেরাং  (সেনা ক্যাম্প) থেকে নতুন ফরমান জারি করা হয়েছে। তারা বলেছে, প্রতি পাড়া থেকেই ৫০ জন করে সুন্দরী নারী ক্যাম্পে সরবরাহ করতে হবে। গ্রামের চেয়ারম্যান (ওকাট্টা) রফিউল কাদেরকে সেনা ক্যাম্পে ডাকা হয়েছিল। সেনা ক্যাম্প থেকে চেয়ারম্যানকে এমন ফরমান জারি করা হয়। চেয়ারম্যান ক্যাম্প থেকে ফিরে গ্রামের যে ঘরে তরুণী মেয়ে রয়েছে তাদের গৃহকর্তাকে গোপনে ডেকে সেনা ক্যাম্পের ফরমানের কথাটি জানিয়ে দেন। গত ২ অক্টোবর রাতে চেয়ারম্যান সেনা ক্যাম্পের ফরমানের গোপন কথাটি জানানোর পরের দিন ভোরেই সালাম-রোকেয়া দম্পতি বাংলাদেশের দিকে রওনা হন। রোকেয়া বেগম বলেন, ‘এমন খবর শুনে রাতে আর ঘুমাতে পারিনি। ’ তিনি জানান, কমপক্ষে সাত-আট দিন রাস্তায় থাকতে হবে অনুমান করে এমনভাবেই খাবারদাবারের ব্যবস্থা করছিলেন সারা রাত ধরে।

ভাত রান্না করে সেসব যাতে গন্ধ না হয় সে জন্য তেলে ভেজে নেন তিনি। কোরবানির যে গরুর মাংস ছিল সেসব কালো ভুনা করে নেওয়া হয়। প্রচুর পরিমাণ স্যালাইন নেওয়া হয় সঙ্গে। দুগ্ধপোষ্য যমজ সন্তানদের জন্যও দুধের বিকল্প নেওয়া হয়। নাশতাও নেওয়া হয় প্রচুর। রোকেয়া বলেন, তিনি অত্যন্ত পরিকল্পনামাফিক বের  হয়েছিলেন ঘর থেকে। টানা সাত দিনের হাঁটাপথের সীমানা নাফ নদের তীরে এসে পৌঁঁছার সঙ্গে সঙ্গে খাবারও শেষ হয়ে যায়, বলেন রোকেয়া।

মিয়ানমার সেনাদের নীরব নির্যাতনের কাহিনি জানাতে গিয়ে রোকেয়া বলেন, তাঁর স্বামীর এক বড় ভাইয়ের শিশুসন্তান ডায়রিয়ায় আক্রান্ত। তার জন্য ওষুধ আনা হচ্ছিল বাজার থেকে। পথে তল্লাশি করতে গিয়ে সিরাপের বোতল পেয়ে সেনারা বোতলটি বুটের তলায় পিষ্ট করে, আর বলে ওষুধ সেবনের কোনো দরকার নেই। এখন দরকার মৃত্যু। রোকেয়া জানান, মিয়ানমারের সেনারা প্রতিনিয়ত রোহিঙ্গাদের মৃত্যু কামনা করে থাকে।

রাখাইনের মংডুর বালুখালী থেকে পালিয়ে এসেছেন মোস্তফা খাতুন ও সোনা মিয়া দম্পতি। তাঁদের তিন কন্যা। সোমবার রাতে নাফ নদ পাড়ি দেন তাঁরা। নিজেদের মৃত্যুর ভয় অনেক আগেই কেটে গেছে। এসেছেন কেবল তাঁদের তিন কন্যার ইজ্জত বাঁচাতে। তাঁদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সেনা ক্যাম্পে রোহিঙ্গা নারী সরবরাহের ফরমানটি রাখাইনে নতুন করে আতঙ্ক ছড়ায়। এত দিন যারা সাহসের সঙ্গে রাখাইনের ঘরদুয়ারে বা বন-জঙ্গলে লুকিয়ে ছিল তারা খবরটি শোনার পর পালিয়ে আসতে শুরু করেছে।

সেনাদের ভয়ে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের মধ্যে আরো আছেন বুচিদং লইংচং গ্রামের নবদম্পতি জিয়াউর রহমান (১৮) ও আয়েশা বেগম (১৫)। তাঁরা ১০ দিন ধরে দুর্গম পাহাড়ের ফাতেহার ঢালা নামের একটি গহিন জঙ্গলে অবস্থান নিয়েছিলেন। নিরাপত্তা বাড়াতে পরে একসঙ্গে কয়েক হাজার রোহিঙ্গা একত্র হয়ে বাংলাদেশ সীমান্তে আসে। নতুন আসা রোহিঙ্গারা জানায়, পথে পথে তারা অনেক স্থানে সেনা সদস্যদের মুখে পড়েছে কিন্তু কেউ তাদের তেমন উচ্চবাচ্য করেনি। উল্টো অনেকেই নাকি আবার জানতে চেয়েছে, তোমাদের তো কিছু করা হচ্ছে না—কেন পালিয়ে যাচ্ছ? রোহিঙ্গারা জানিয়েছে, এখনো অনেক রোহিঙ্গা বাংলাদেশের পথে রয়েছে।

ডেস্ক: পাকিস্তান ও ভারতকে সংলাপের মাধ্যমে কাশ্মির সংকট সমাধান করার আহ্বান জানিয়েছেন মার্কিন সিনেটর ম্যাককেইন। এ ছাড়া, পাকিস্তানে সহায়তা ছাড়া আফগানিস্তান সংকট সমাধান করা সম্ভব নয় বলেও জানান তিনি।পাকিস্তান সফরকারী মার্কিন  কংগ্রেস প্রতিনিধি দলের নেতা এবং সিনেটের আর্মড সার্ভিস কমিটির চেয়ারম্যান সিনেটর ম্যাককেইন আরো বলেন, আফগানিস্তানে শান্তি ও স্থিতিশীলতা স্থাপনে পাকিস্তানের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন পিটিভি’র সঙ্গে আলোচনার সময়ে এ সব কথা বলেন তিনি।কাশ্মির প্রসঙ্গে মার্কিন নীতির কোনো পরিবর্তন হয়নি উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন, ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরে সহিংসতার অবসান চায় ওয়াশিংটন।মার্কিন কংগ্রেসের প্রতিনিধি দলটি পাক প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা সারতাজ আজিজের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন পাক পররাষ্ট্র সচিব তেহমিনা জানজুয়া। বৈঠকে আমেরিকার সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, সন্ত্রাসবাদ, ভারত ও আফগানিস্তানের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক এবং আঞ্চলিক বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। এ বৈঠকের পরই পিটিভির সঙ্গে কথা বলেন ম্যাককেইন।

‘আমরা নেতৃত্বহীন। আমেরিকার কোনো প্রেসিডেন্ট নেই। একজন পদ দখল করে আছেন আর একদিন প্রকৃত কোনো প্রেসিডেন্ট এসে তার জায়গায় বসবেন সেই অপেক্ষায় আছে গোটা আমেরিকা’। নিউ ইয়র্ক টাইমসের নিয়মিত কলামিস্ট চার্লস এম ব্লো চলতি সপ্তাহে তার কলামের শুরুটা করেছেন এভাবেই। শুধু চার্লস নয়, সাম্প্রতিক সময় ডোনাল্ড ট্রাম্পের সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রের বেশির ভাগ বিশেষজ্ঞের একই মত। কেউ কেউ তো আরো কড়া ভাষায় সমালোচনা করছেন ট্রাম্পের। এরই মধ্যে আফগান যুদ্ধ নিয়ে নতুন নীতি ঘোষণা করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তবে কাগজে-কলমে কিংবা বক্তৃতা-বিবৃতিতে ‘নতুন আফগান নীতি’ বলা হলেও যা ঘোষণা করা হয়েছে তা আসলে তার পূর্বসূরিদের রেখে যাওয়া ফর্মুলাই। আগের দুই প্রেসিডেন্টের মতো একই পথে হাঁটতে শুরু করেছেন ট্রাম্প, যদিও তার নির্বাচনী অঙ্গীকারের মধ্যে অন্যতম ছিল বিদেশে যুদ্ধে না জড়ানো। কিন্তু ক্ষমতা গ্রহণের সাত মাসের মধ্যেই সেই ওয়াদা থেকে সরে আসতে বাধ্য হলেন ট্রাম্প। শুরু থেকেই উল্টো পথে হাঁটতে অভ্যস্ত ট্রাম্প অন্তত এই একটি ক্ষেত্রে উল্টো পথে হাঁটলে সেটি বিশ্বের জন্য ইতিবাচক হতো নিঃসন্দেহে। ট্রাম্পের এমন সিদ্ধান্তের পেছনে কী আছে সেটি স্পষ্ট নয়। তবে প্রশাসনে সাবেক জেনারেলদের প্রভাব ও হোয়াইট হাউজের অস্থির পরিবেশ এর পেছনে কাজ করছে বলে মনে করা হচ্ছে।

আফগান যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের সবচেয়ে দীর্ঘ যুদ্ধ। ১৬ বছরের এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র কিংবা বিশ্বের লাভ কী হয়েছে, আদৌ কিছু হয়েছে কি না তা এখন আর আলোচনার বিষয় নয়। এটি যে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য পুরোপুরিই একটি ‘লস প্রজেক্ট’ সে ব্যাপারে কারো দ্বিমত থাকার কথা নয়। আর বিশ্ব ব্যবস্থা কিংবা আফগান জাতির জীবনেও এটি একটি বিভীষিকা হয়ে এসেছে। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে সন্ত্রাসী হামলার মাত্র ২৮ দিনের মাথায় আফগানিস্তানে হামলা চালায় বুশ প্রশাসন।

‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’ হিসেবে এই যুদ্ধকে উপস্থাপন করে তারা। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে দেশটির তালেবান সরকারের পতন হলেও যুক্তরাষ্ট্র এখনো এক প্রকার দখল করেই আছে আফগানিস্তান। তালেবানের পতনের পর যুক্তরাষ্ট্রের আশীর্বাদপুষ্ট সরকার ও তাদের বাহিনীকে প্রশিক্ষণের অজুহাতে সেনাবাহিনী রাখার সিদ্ধান্ত নেন তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ। উদারপন্থী হিসেবে পরিচিত বারাক ওবামা প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর ইরাক ও আফগানিস্তান যুদ্ধ শেষ করার অঙ্গীকার করলেও তিনি তা পারেননি। বরং পর্যায়ক্রমে বাড়তে থাকে সৈন্যসংখ্যা একপর্যায়ে যা পৌঁছে যায় লাখের ওপরে। ক্ষমতার শেষ দিকে এসে ‘যুদ্ধ শেষ’ দাবি করে সৈন্য কমাতে থাকেন ওবামা। সাড়ে ১২ হাজার বিদেশী সৈন্য রাখার সিদ্ধান্ত হয় দেশটিতে, যাদের মধ্যে ৯ হাজার ৮০০ মার্কিন সৈন্য।

সন্ত্রাস দমনের অজুহাতে একটি দেশে ১৬ বছরেরও বেশি সময় অবস্থান করছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ তাদের মিত্র দেশগুলোর বাহিনী। স্থিতিশীলতার পরিবর্তে প্রতিদিন আরো খারাপ হচ্ছে আফগানিস্তানের পরিস্থিতি। যুক্তরাষ্ট্র না পেরেছে দেশটিতে শান্তি আনতে, না পেরেছে গৃহযুদ্ধ বন্ধ করতে। যথাযথ কোনো হিসাব না থাকলেও ৩০ হাজারের বেশি বেসামরিক লোক নিহত হয়েছে এই যুদ্ধে। গত কয়েক মাস ধরে আরো বেড়েছে তালেবান ও আল কায়দার কর্মকাণ্ড। দেশটির প্রায় অর্ধেক এলাকার ওপর এখন সরকারের নিয়ন্ত্রণ নেই। তার ওপর নতুন করে উৎপাত শুরু করেছে চরমপন্থী গ্রুপ আইএস। শুধু চলতি বছর জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত নিহত হয়েছে ১৬৬২ জন বেসামরিক নাগরিক। এমন পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের আরো সেনা পাঠানোর খবর এ গোষ্ঠীগুলোকে আরো আক্রমণাত্মক করে তুলতে পারে। তালেবান ইতোমধ্যেই হুমকি দিয়েছে আফগানিস্তানকে মার্কিন বাহিনীর কবরস্থানে পরিণত করবে বলে। ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর অনেকেই আশা করেছিলেন যুক্তরাষ্ট্র হয়তো বিদেশের যুদ্ধ থেকে হাত গুটিয়ে নেবে। বিশেষ করে ট্রাম্পের অঙ্গীকারও যখন ছিল এমন। কিন্তু ট্রাম্প পারলেন না পূর্বসূরিদের দেখানো পথের ব্যতিক্রম করতে।

বুশ, ওবামার যুদ্ধকে এখন ‘ট্রাম্পের যুদ্ধে’ রূপান্তর করতে চলেছেন তিনি। বিবিসির কূটনৈতিক প্রতিনিধি ও বিশ্লেষক জনাথন মার্কাস তার এক কলামে বলেছেন, ‘আফগানিস্তান এখন ট্রাম্পের যুদ্ধে পরিণত হলো। পূর্বসূরিরা যে প্রতিকূল পরিস্থিতির মোকাবেলা করেছে তাকেও তার মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে’। বারাক ওবামা তবু সৈন্য কমানোর একটি প্রক্রিয়া শুরু করেছিলেন, ট্রাম্প উল্টো আরো তিন হাজার ৯০০ সৈন্য পাঠানোর অনুমোদন দিয়েছে। অথচ সেনাবাহিনীর জীবন ও সময়ের মূল্যের গুরুত্বের কথাও তিনি বলেছিলেন ইতঃপূর্বে। এই দীর্ঘ যুদ্ধে নিহত হয়েছে ২৩০০-র বেশি মার্কিন সেনা। খরচ হয়েছে ৮০ হাজার কোটি মার্কিন ডলার। ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি নিয়ে দেশ শাসন শুরু করা ট্রাম্প আর কিছু না হোক অন্তত খরচের কথা চিন্তা করলেও আফগান যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে যাওয়াটাই ছিল স্বাভাবিক।

কিন্তু তা না করে নিজ দেশের আরো সৈন্যকে মৃত্যুকূপে পাঠাতে চলছেন তিনি। সেই সাথে অনিশ্চয়তার চাদরে ঢেকে দিচ্ছেন আফগানিস্তানের ভবিষ্যৎকে। ট্রাম্পের আফগান নীতি প্রসঙ্গে ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ান বলেছে, ‘এর মাধ্যমে মূলত সব দিক থেকে ঝুঁকিতে পরল যুক্তরাষ্ট্র। এই সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের এমন একটি যুদ্ধের মধ্যে আবারো টেনে আনছে যার কোনো স্পষ্ট সংজ্ঞা দেয়া যায় না এবং (বের হওয়ার পরিবর্তে) ভয়াবহ একটি সঙ্ঘাতের মাঝপথে আটকে রাখছে তাদের।’ সাম্প্রতিক সময় রাশিয়া ও চীনের অংশগ্রহণে আফগানিস্তানে একটি নিয়মতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরির যে চেষ্টা শুরু হয়েছিল তা হয়তো শেষ হয়ে যাচ্ছে ট্রাম্পের এই পদক্ষেপে। ন্যাটো জোটের সাথেও ট্রাম্পের সম্পর্ক শুরু থেকেই খারাপ, তারা আফগান যুদ্ধে আরো সেনা পাঠাতে রাজি হবে কী না সেটিও বড় প্রশ্ন।

ট্রাম্প কেন এমন একটি বাজে সিদ্ধান্ত নিলেন সে প্রশ্নের একক কোনো উত্তর নেই। তবে ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই তার যে টালমাটাল অবস্থান তাতে অবশ্য কিছুটা যুক্তি খুঁজে পাওয়া যায়। শুরু থেকেই একের পর এক অশান্তি বিরাজ করছে ট্রাম্পের প্রশাসনে। যে ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তাদের নিয়ে তিনি দেশ শাসনের প্রক্রিয়া শুরু করেছিলেন, তাদের প্রায় সবাই একে একে বিদায় নিয়েছেন। সর্বশেষ গত সপ্তাহে চাকরি গেল হোয়াইট হাউজের চিফ স্ট্র্যাটেজিস্ট স্টিভ ব্যাননের। শুরু হয়েছে শ্বেতাঙ্গ কট্টরপন্থীদের অপতৎপরতা। ট্রাম্প ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্রে উগ্র শ্বেতাঙ্গদের কর্মকাণ্ড ডালপালা মেলতে শুরু করে, ঠিক যেমনটা ভারতে হয়েছে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর। কাজেই এত অস্থিরতার মধ্যে ট্রাম্পের পক্ষে গঠনমূলক সিদ্ধান্ত নেয়া সহজ হবে না সেটাই স্বাভাবিক। এমন পরিস্থিতিতে ট্রাম্প যে দেশ চালাচ্ছেন সেটিই অনেকের কাছে আশ্চর্য লাগছে। ওয়াশিংটন পোস্টের কলামিস্ট জনাথন কেপহার্ট এক লেখায় তো স্পষ্টই বলেছেন, ‘ট্রাম্প প্রেসিডেন্সির যে ক্ষতি করেছেন তা সন্দেহাতীত। জাতির যে ক্ষতি হয়েছে তাও ধারণাতীত। তিনি ক্ষমতায় থাকার অযোগ্য।’

ট্রাম্প প্রশাসনের এখন প্রধান দুই নীতিনির্ধারক হচ্ছেন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এইচ আর ম্যাকমাস্টার ও হোয়াইট হাউজের চিফ অব স্টাফ জন কেলি। দু’জনই আবার সামরিক বাহিনীর সাবেক জেনারেল এবং পরস্পরের বন্ধু। এই দুই কর্মকর্তার কারণেই ট্রাম্প আফগান যুদ্ধ অব্যাহত রাখার পথে পা বাড়িয়েছেন বলে মনে করেন বোস্টন ইউনিভার্সিটির লেকচারার ও মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক বিশ্লেষক গ্রেগরি আফটান্ডিলিয়ন। বিশেষ করে ম্যাকমাস্টার বরাবরই চাইতেন আফগাস্তিানে আরো সেনা পাঠাতে। এ বিষয়ে ট্রাম্পের সাথে তার দ্বিমত থাকলেও তিনিই যে ‘জয়ী’ হলেন তা তো দেখাই যাচ্ছে। ম্যাকমাস্টার ও কেলি উভয় স্টিভ ব্যানন বিরোধী বলে মনে করা হয়। আর হয়তো সে কারণেই ব্যাননকে হারাতে হয়েছে হোয়াইট হাউজের চাকরি। উত্তর কোরিয়া ইস্যুতেও ট্রাম্পের বিরোধী ছিলেন ব্যানন। সব কিছু মিলে যে চিত্র পাওয়া যায় তা হলো, ট্রাম্পের ওপর সাবেক সেনা কর্মকর্তাদের প্রভাব, প্রশাসনে অস্থিরতা আর তার ইমেজ সঙ্কটই তাকে পরিচালিত করছে যুদ্ধের পথে।

ইরাকী বাহিনী মঙ্গলবার আইএস গ্রুপের ঘাঁটি তাল আফরের তিনটি জেলা পুনরায় দখল করেছে।এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী জিম মার্টিস বাগদাদে ইরাকী প্রধানমন্ত্রী হায়দার আল আবাদীর সাথে সাক্ষাৎ করে সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছেন। খবর বার্তা সংস্থা এএফপি’র।বাগদাদে আবাদীর সাথে সাক্ষাতের পর জিম মার্টিস বলেন, ‘জঙ্গিরা পালাচ্ছে। নাগরিকরা এখন আইএস (ইসলামিক স্টেট) থেকে মুক্ত।’ইরাকী বাহিনী যুক্তরাষ্ট্রের সেনাদের সহযোগিতায় গত দুই দিনে তাল আফরের তিনটি জেলার দখল ফিরে পেয়েছে।সেনা, পুলিশ ও আধা সামরিক জোট হাসেদ আল সাব্বি গ্রুপের সদস্যরা আইএস নিয়ন্ত্রিত তিনটি জেলা আল কিফাহ, আল নূর ও আল আসকারীর নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে।হাসেদ গ্রুপের মুখপাত্র আহমদ আল আসাদী সাংবাদিকদের বলেন, ‘তুমুল লড়াইয়ের পর ইরাকী বাহিনী তিন জেলার নিয়ন্ত্রণ নিতে সক্ষম হয়েছে।’

ইয়েমেনের রাজধানীতে বুধবার বিমান হামলায় বেসামরিকসহ ৩০ জন নিহত হয়েছে। স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সহায়তা সংস্থা এএফপিকে একথা জানায়।ইয়েমেনের রেড ক্রিসেন্টের সানা শাখার প্রধান হোসেন আল-তাওইল জানান, সানার উত্তরাঞ্চলের শহরতলীতে ওই হামলায় কমপক্ষে ৩৫ জন নিহত হয়েছে।আন্তর্জাতিক সহায়তা সংস্থার পাশাপাশি এক সরকারি কর্মকর্তা এএফপিকে দেশটির সরকার বিরোধী হুথি বিদ্রোহী অধ্যুষিত সানায় এক সিরিজ হামলায় কমপক্ষে ৩০জন নিহতের বিষয়টি নিশ্চিত করে। তবে এ হামলায় আহত আরো কমপক্ষে ১৩ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

নিউইয়র্ক, ২০ জুন ২০১৭:
পররাষ্ট্র সচিব মো. শহীদুল হক ১৯ জুন সোমবার জাতিসংঘ সদর দফতরে জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেজের সাথে সাক্ষাৎ করেন।সাক্ষাতে জাতিসংঘ মহাসচিব বাংলাদেশের অসামান্য অগ্রগতি বিশেষ করে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, দুর্যোগ প্রতিরোধ সক্ষমতা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি সবসময় বাংলাদেশকে জলবায়ু পরিবর্তনের হুমকি মোকাবিলার লড়াইয়ে প্রথম সারিতে দেখতে চান। তিনি এসডিজি বাস্তবায়নের অগ্রগতিতেও বাংলাদেশকে সামনের কাতারে আশা করেন।
শান্তিরক্ষা ও শান্তিনির্মাণে ভূমিকা রাখার জন্য তিনি বাংলাদেশের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কাযর্ক্রমে অন্যতম বৃহৎ সেনা ও পুলিশ সদস্য প্রেরণকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আসন্ন সাধারণ পরিষদের সময় অনুষ্ঠিতব্য ‘সার্কেল অভ্ লিডার’ বৈঠকে আমন্ত্রণ জানানো হবে বলে মহাসচিব উল্লেখ করেন।
পররাষ্ট্র সচিব জাতিসংঘের মূল্যবোধ ও নীতিমালার প্রতি বাংলাদেশের অবিচল অঙ্গীকারের কথা উল্লেখ করে বলেন, উন্নয়নশীল দেশগুলোর স্বার্থ রক্ষায় বাংলাদেশ জাতিসংঘ মহাসচিবের নেতৃত্বের প্রতি আস্থাশীল। তিনি আন্তর্জাতিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় মহাসচিবের অগ্রাধিকার প্রদানের প্রশংসা করেন। বিগত ৮ বছরে বাংলাদেশ আর্থসামাজিক উন্নয়নে যে অগ্রগতি সাধন করেছে পররাষ্ট্র সচিব সে বিষয়ে মহাসচিবকে অবহিত করেন।এর আগে, পররাষ্ট্র সচিব জাতিসংঘ সদর দফতরে ‘ট্রান্সন্যাশনাল অর্গানাইজড্ ক্রাইম’ এর ওপর একটি হাই লেভেলে ডিবেটে বক্তব্য রাখেন। ইতালির স্থায়ী মিশন এবং জাতিসংঘের ড্রাগস অ্যান্ড ক্রাইম অফিসের (ইউএনওডিসি) সহযোগিতায় জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি এ ইভেন্টের আয়োজন করেন।
পররাষ্ট্র সচিব তার বক্তৃতায় বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিক-নিদের্শনায় ‘ট্রান্সন্যাশনাল অর্গানাইজড্ ক্রাইম’ মোকাবিলায় বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সাথে কাজ করে যাচ্ছে। এ জাতীয় অপরাধ দমনে গত কয়েক বছরে বাংলাদেশে একটি শক্তিশালী আইনি ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে। অধিকতর নজরদারি ও কার্যকর বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অবৈধ অভিগমন ও মানব পাচার এবং চোরাচালানের প্রবণতা অনেকাংশে হ্রাস পেয়েছে। জাতিসংঘে নিযুক্ত বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত মাসুদ বিন মোমেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক (জাতিসংঘ) সাদিয়া ফয়জুন্নেছা এবং বাংলাদেশ মিশনের উপ-স্থায়ী প্রতিনিধি তারেক মো. আরিফুল ইসলাম এসময় উপস্থিত ছিলেন।

মোহম্মদ আলী রাশেদ, সৌদিআরব থেকে :
গত বুধবার ১৪ জুন পবিত্র মাহে রমযান উপলক্ষে ইফতার ও দুআ মাহফিল করেছে মদিনা সাংবাদিক পরিষদ। মসজিদে নববীর পার্শ্বস্থ বাঙ্গালী মার্কেটে এশিয়া হোটেল মিলনায়তনে এ অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়।প্রবাসের বিভিন্ন শ্রেণীর রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, শিক্ষাবিদ, আলেম-ওলামা, লেখক, গবেষক, ব্যবসায়ী ও বাংলাদেশ কমিউনিটির সম্মানে এ মাহফিলের আয়োজন করেছে মদিনা সাংবাদিক পরিষদ।সংগঠনের সভাপতি আরটিভি মদিনা প্রতিনিধি সাংবাদিক মুছা আব্দুল জলীলের সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক এনটিভি মদিনা প্রতিনিধি সাংবাদিক মোহাম্মাদ আলী রাশেদের সঞ্চালনায় এ দুআ ও ইফতার মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়।অনুষ্ঠানের শুরুতে পবিত্র কুরআন থেকে তেলাওয়াত করেন মুহাম্মাদুল্লাহ মাহদি। প্রধান অতিথি ছিলেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার তথ্য উপদেষ্টা জনাব ইকবাল সোবহান চৌধুরী।অনুষ্ঠানের প্রধান আলোচক ছিলেন সাবেক জজ ও বিশিষ্ট কলামিস্ট জনাব ইকতেদার আহমেদ।বিশেষ অতিথি ছিলেন নিরাপদ নিউজের প্রধান সম্পাদক, বিশিষ্ট মিডিয়া ব্যক্তিত্ব জনাব ইলিয়াস কাঞ্চন।বিশেষ আলোচক ছিলেন মদীনা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ও বিচার ব্যবস্থা এবং ইসলামী রাষ্ট্র বিজ্ঞানের এমফিল গবেষক, দৈনিক প্রবাসীকাল ডটকম এর সম্পাদক ও মদিনা সাংবাদিক পরিষদের সহসভাপতি যাকারিয়্যা মাহমূদ।
তিনি “পবিত্র মাহে রামাদান ও আল কুরআন” শীর্ষক গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা পেশ করেন।উদ্বোধনী বক্তব্য রাখেন সংগঠনের সিনিয়র সহসভাপতি মাইটিভির সাংবাদিক ফ ই ম ফরহাদ, শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন যুগ্ন সম্পাদক বাংলাভিশনের সাংবাদিক আবুল খায়ের আশিক, অর্থ সম্পাদক আজকের সময় ডটকমের সাংবাদিক দেলওয়ার হোসেন সুমন এবং প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক এমকে টিভির সাংবাদিক জাবেদ ইকবাল।এ ছাড়াও বক্তব্য রাখেন বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, ব্যাবসায়ী ও বাংলাদেশ কমিউনিটির নেতৃবৃন্দ।মাননীয় তথ্য উপদেষ্টা প্রধান অতিথির বক্তব্যে বলেন, প্রবাসী বাংলাদেশি সাংবাদিকরা অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে প্রবাসের মাটিতে নিজেদের কাজের পাশাপাশি তারা দেশের গণমাধ্যমের সঙ্গে যুক্ত আছেন এবং প্রবাসীদের সুখ-দুঃখের কথা তুলে ধরছেন। এটি সত্যিই প্রশংসার দাবিদার।সাবেক জজ প্রধান আলোচকের বক্তব্যে বলেন বাংলাদেশী অর্থনীতির প্রাণ হলো প্রবাসী কর্মরত শ্রমীক। প্রবাসী শ্রমিকদের প্রেরীত অর্থের কারনে আজ বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার ভান্ডার অত্যন্ত সমরিদ্ধ, প্রবাসের শ্রমিকরা প্রবাসে অত্যন্ত কায়ক্লাসে জীবন জাপন করে তাদের উপার্জিত অর্থের সিংহভাগ দেশে পাঠিয়ে দেন কিন্তু এটি আজ অত্যন্ত দুঃখ ও পরিতাপের বিষয় বাংলাদেশের এক শ্রেণীর সুবিধা ভুগী বিগত ১৩ বছরে বাংলাদেশ হতে ৬ লক্ষ হাজার কুটি টাকার অধিক অর্থ বিদেশে পাচার করেছে। এই ভাবে আপনাদের কষ্ট আর্জিত প্রেরিত অর্তে বিদেশে পাচার হয়ে গেলে দেশের কাংখিত উন্নতি  ও অগ্রগতি ব্যহত হবে। মদিনা সাংবাদিক পরিষদেরে এ ইফতার ও দুআ মাহফিলে মদিনা আওয়ামীলীগ, বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী ঐক্য জোট, হেফাজতে ইসলামসহ সকল রাজনৈতিক, অরাজনৈতিক সংগঠন সমূহের নেতৃবৃন্দ উপস্থিথ ছিলেন। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন, ডাক্তার, শিক্ষক, ব্যবসায়ী, চাকুরী জীবী, পেশাজীবী, সামাজিক, সাংস্কৃতিক নেতৃবৃন্দসহ বাংলাদেশী কমিউনিটির অন্যান্য লোকজন।
ইফতারের আগ মুহূর্তে দেশ, জাতি ও মুসলিম উম্মাহের সুখ-শান্তি সমৃদ্ধি ও কল্যাণ এবং প্রবাসীদের মঙ্গল কামনা করে বিশেষ মুনাজাত পরিচালনা করেন মাওলানা রফিকুল ইসলাম মাদানী।

 

রায়হান আহমেদ তপাদার   এক সময় ব্রিটিশ যুদ্ধবাজ প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচার বেশ দম্ভক্তির সূরে বলেছিলেন,ইউরোপের মাটিতে কখনো মুসলিম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হতে দেয়া যায় না।তার এ বক্তব্যের পর পরই সার্ব সেনারা হায়েনার মত বসনিয়া নীরিহ মুসলমানদের রক্ত নিয়ে হোলি খেলায় মেতে ওঠে।দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের পর বিশ্বে মুসলিম দেশগুলো চরম ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।বসনিয়ায় সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম সম্প্রদায় একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশের স্বপ্ন দেখার পরপরই পশ্চিমা মদদপুষ্ট সার্ব বাহিনীর নৃশংসতা দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের ভয়াবহতাকে হার মানিয়েছে।শেষতক মুখ রক্ষার্থে তখন পশ্চিমা মদদপুষ্ট ও মেরুদণ্ডহীন জাতিসংঘ এবং জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ নামক দুইটি সংস্থার উদ্যোগে বসনিয়ায় যুদ্ধ বিরতি কার্যকর হলেও নির্যাতিত মুসলমানরা সার্ব বাহিনীর নৃশংসতার কোন প্রতিকার পায়নি।ফিলিস্তিনিদের বাঁচা মরার অধিকারকে সমর্থনের অপরাধে মিশর ও সিরিয়াকে নিয়ে নতুন ষড়যন্ত্র শুরু হয় সত্তরের দশক থেকে।মিশরের প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাতকে উচিত শিক্ষা দেয়ার লক্ষ্যে ১৯৬৭ সালে আগ্রাসন চালায় পশ্চিমাদের আশির্বাদপুষ্ট ইহুদিবাদি ইসরাইল।এরসময় মিশরের সেনাবাহিনী ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হবার পাশাপাশি সিরিয়া ও মিশরের বিস্তীর্ণ এলাকা দখলে নেয় ইসরাইল।শেষতক ক্যাম্প-ডেভিড চুক্তির সুবাদে মিশর হারানো ভূখণ্ড ফিরে পেলেও গোলান মালভূমি এখনো ইসরাইলি বাহিনীর কব্জায় রয়েছে।১৪০০ হিজরীর প্রথম দিন ফজরের নামাজের পূর্বে আচমকা পবিত্র মক্কা শরীফ দখলে নেয় একটি সশস্ত্র অস্ত্রধারী গোষ্ঠী।ঘটনার পর পরই সৌদি সেনাবাহিনীর সাড়াঁশী অভিযানে অস্ত্রধারীরা পরাভূত হয়।পরে আটককৃত অস্ত্রধারীদের পরিচয় জানা যায়,তারা ওতাইবা গোত্রের লোক।কিন্তু এরা অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্র কোথায় পেল কিংবা মহান আল্লাহর ঘর দখল করার উদ্দেশ্য কী ছিল-তা অজানা থেকে গেছে।  সিরিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট হাফেজ আল আসাদ ছিলেন কট্টর ইসরাইল বিরোধী।আরব লীগের অনুরোধে তিনি ৩০ হাজার সিরীয় সেনাকে চরম ঝুঁকির মধ্যে বেকা উপত্যাকায় মোতায়েন করেন। দীর্ঘ ত্রিশ বছর বেকা উপত্যাকায় মোতায়েতকৃত সিরীয় সেনাবাহিনীর সাথে ইসরাইলি সেনাদের বেশ কয়েকটি ভয়াবহ যুদ্ধ সংগঠিত হয়। পরে অবশ্য ইসরাইলের সাথে মধ্যপ্রাচ্যের কতিপয় মুসলিম দেশের সখ্যতা গড়ে উঠলে সিরিয় সরকার বেকা উপত্যাকা থেকে তার বাহিনী প্রত্যাহার করে নেয়। বলে রাখা প্রয়োজন যে, সিরীয় প্রেসিডেন্ট হাফেজ আল আসাদকে অপসারণের লক্ষ্যে বেশ কয়েকটি ষড়যন্ত্র শক্তিশালী সিরীয় সেনাবাহিনী বানচাল করে দেয়। হাফেজ আল আসাদের মৃত্যুর পর তার পুত্র ও বর্তমান প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করে ইসরাইল বিরোধী অবস্থান গ্রহণের ফলে আজ সিরিয়ার পরিণতি বিশ্ববাসী প্রত্যক্ষ করছে।আফগানিস্তান, ইরাক, লিবিয়া, সিরিয়া ও ইয়েমেন পরিস্থিতিও একই সূতোয় গাঁথা। প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন ও কর্নেল মুয়াম্মার আল গাদ্দাফী তাদের শেষ সময় পর্যন্ত অযাচিতভাবে পশ্চিমাদের দিকে ঝুঁকে পড়ে। উদ্দেশ্য ছিল, পশ্চিমাদের সাথে বন্ধুত্ব করলে আজীবন ক্ষমতায় থাকা যাবে। কিন্তু স্বার্থপর মিত্ররা দুই শাসককে নির্মমভাবে ক্ষমতাচ্যুত করে দেশ দু’টিকে বিরান ভূমিতে পরিণত করার ষড়যন্ত্রের ছক কষতে থাকে। কিন্তু দুর্ভাগ্য যে, সাদ্দাম ও গাদ্দাফী পশ্চিমাদের ষড়যন্ত্র মোটেই আঁচ করতে পারেনি উপরন্তু সাদ্দামের মাধ্যমে ইরানের সাথে দীর্ঘ আট বছর যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে ইরাক। যুদ্ধে ফলাফল ছিল চরম আত্মঘাতী। এতে উভয় দেশের লক্ষাধিক সেনা ও নীরিহ মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। ফলে সামরিক শক্তিতে উভয় দেশ উর্বল হয়ে পড়ে। পরবর্তীতে সাদ্দামকে প্রলুব্ধ করে কুয়েত দখল নাটক মঞ্চস্থ করে পশ্চিমা শক্তি। শেষতক বহুজাতিক বাহিনীর ব্যানারে সাদ্দামকে পাকড়াও করে সমৃদ্ধশালী ইরাককে দোজখে পরিণত করা হয়।   লিবিয়ার গাদ্দাফীকেও একই পরিণতি ভোগ করতে হয়েছে। বর্তমানে এ দু’টি দেশে নৈরাজ্যকর বিরাজ করছে। লিবিয়ায় কে আসল সরকার আর কে নকল সরকার সেটা বুঝার উপায় নেই।আফগান জাতিও একই পরিণতি ভোগ করছে। আফগানিস্তান কব্জা করতে পশ্চিমা বাহিনী সীমাহীন ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। দীর্ঘ দুই দশকের যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশটিতে কয়েক লক্ষাধিক নীরিহ মানুষ হতাহত হওয়া ছাড়াও অবকাঠামো পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। আফগান, ইরাক ও লিবীয় জনগণের রক্তের দাগ কাটতে না কাটতে সিরিয়া মিশন শুরু করে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদি শক্তি। পশ্চিমারা সিরিয়া যুদ্ধে সুবিধা করতে না পেরে অবশেষে সৌদি আরবকে দিয়ে ইয়েমেনি জাতির বিরুদ্ধে একতরফা যুদ্ধ বাঁধিয়ে দেয়। রাশিয়া ও ইরান কর্তৃক কঠোর পদক্ষেপের ফলে এ রিপোর্ট লিখা পর্যন্ত সিরিয়া ও ইয়েমেন যুদ্ধে মার্কিন মিত্ররা পরাজয়ের দ্বারপ্রান্তে রয়েছে। সিরিয়া যুদ্ধে অর্ধ কোটি মানুষ আজ পরবাসী। দেশটির ৭৫ শতাংশ অবকাঠামো ধ্বংস করা হয়েছে। সিরিয়া যুদ্ধে তুরস্ককেও জড়িয়ে ফেলা হয়েছে। তুরস্ক একমাত্র মুসলিম দেশ যারা কিনা ন্যাটো সামরিক জোটের অন্যতম সদস্য। কিন্তু তাতে কি? তারাও মুসলমান। সুতরাং যা হবার এখন তাই ঘটছে তুরস্কে। অপরদিকে তুরস্ককে এখন রাশিয়ার প্রতিপক্ষ করে ফেলা হয়েছে। সিরীয় যুদ্ধে তুরস্কের ভূমি ব্যবহার করে বিদ্রোহীরা অনেক দূর এগিয়েছিল। কিন্তু রাশিয়ার তীব্র অভিযানের মুখে এরা এখন কোনঠাসা।অপরদিকে তুরস্ক এখন সন্ত্রাসের শিকার। যুদ্ধ কিংবা বোমা বিস্ফোরণে প্রতিনিয়ত মানুষ মরছে তুরস্কে।উল্লেখ্য, মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র পরিবর্তনের মাধ্যমে এতদ্বঞ্চলের মুসলিম দেশগুলোকে খণ্ড বিখণ্ড করে দুর্বল করে ফেলা এবং পশ্চিমাদের ‘সোনার ডিম’ বলে পরিচিত ইসরাইলকে সম্পূর্ণরূপে নিরাপদ রাখার উদ্দেশ্য নিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মধ্যপ্রাচ্যকে টার্গেট করা হয়। কিন্তু ক্ষমতালোভী স্বৈরশাসক ও রাজা বাদশাদের অযোগ্যতা ও সীমাহীন ব্যর্থতার চরম খেসারত দিতে হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকে।  আফগান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে পাকিস্তানের মাটি ব্যবহার করে হাজার হাজার অস্ত্রধারী সৃষ্টি করে আমেরিকা। সে সময় পাকিস্তান থেকে প্রশিক্ষিত বিদ্রোহীরা সোভিয়েত সেনাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে। যুদ্ধের নেপথ্যে আমেরিকা তথা পশ্চিমা বিশ্ব সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে। আফগানিস্তান থেকে সোভিয়েত সেনা প্রত্যাহারের পর আফগান উপজাতি, গোত্র এমনকি প্রতিটি অঞ্চলে সংঘাত সৃষ্টি হয়। অপরদিকে আফগান অভিযানের সময় পাকিস্তানের মাটিতে অসংখ্য সন্ত্রাসীগোষ্ঠী সৃষ্টি হয়। আজ যার খেসারত দিতে হচ্ছে পাকিস্তানের নীরিহ জনগণকে। পাকিস্তানের বর্তমান পরিস্থিতির জন্য পশ্চিমারাই দায়ী। এটা খোদ পাকিস্তানের রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ একবাক্যে স্বীকার করেছেন।আলজেরিয়া ও তিউনিশিয়ায় বেশ কয়েকটি সন্ত্রাসী ঘটনার খবর পাওয়া গেছে। ঘটনায় যাদেরকে দায়ী করা হচ্ছে-তারাই পশ্চিমা মদদপুষ্ট অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী গোষ্ঠী। মিশর সরকার প্রতিনিয়ত সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে লড়াই করছে। হতাহত হচ্ছে প্রতি ঘন্টায়। মিশরের সিনাই উপত্যাকায় সন্ত্রাসীদের দুর্ভেদ্য ঘাঁটি রয়েছে। এটা পশ্চিমারা দীর্ঘদিন থেকে অবহিত ছিল। কিন্তু মিশরের সার্বভৌমত্ব যখন হুমকির সম্মুখীন তখন মিশরীয় সেনাবাহিনী সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করে।আফ্রিকার মুসলিম অধ্যুষিত নাইজেরিয়াও একই পরিস্থিতির শিকার। ক্যামেরুন, ঘানা, সেনেগাল ও কেনিয়ায় সন্ত্রাসী হামলা পরিচালিত হচ্ছে। মোদ্দা কথা, বিশ্বের সকল মুসলিম দেশকে অস্থিতিশীল রাখার মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়িত হতে চলেছে। মুসলমানদের মধ্যে সীমাহীন অনৈক, গোত্রে গোত্রে এমনকি মাজহাব নিয়ে দ্বন্ধ সৃষ্টি, বিনা অজুহাতে এক দেশ অপর দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া, এক মুসলিম দেশকে শায়েস্তা করতে পশ্চিমাদের দারস্থ হওয়া নিত্যকার ব্যাপার। আর এসব অভ্যন্তরীণ সংকটকে কাজে লাগিয়ে উকৌশলে মুসলিম দেশগুলোকে দুর্বল করে ফেলা হচ্ছে। এতে করে মুসলমানদের দুঃখ-দুর্দশা আরো চরম আকার ধারণ করছে।ইরাক ও লিবিয়ায় কথিত রাসায়নিক ও জীবানু অস্ত্রের অজুহাতে দেশ দু’টি ধ্বংস করা হয়েছে।   পশ্চিমাদের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছে উত্তর কোরিয়া। দেশটি এক প্রকার ঢাকঢোল পিটিয়ে পারমানবিক ও হাইড্রোজেন বোমার পরীক্ষা সম্পন্ন করেছে। অর্থাৎ উত্তর কোরিয়া তার অস্ত্র ভাণ্ডার সমৃদ্ধ করছে। পশ্চিমারা উত্তর কোরিয়ার ধারেকাছে পৌছতে সাহস করছে না। কিন্তু উত্তর কোরিয়ার স্থলে আজ যদি কোন্ মুসলিম দেশ একাজ করতো-তাহলে পরিস্থিতি কি হতো? এটাই হচ্ছে মুসলিম দেশগুলোর বিরুদ্ধে প্রকৃত ষড়যন্ত্র।ইরান নিয়ে ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে তিন দশক পূর্বে। ভাগ্য সুপ্রসন্ন বলতে হবে ইরানি জাতিকে। তারা নিজেদের মধ্যে সীসাঢালা ঐক্য স্থাপন করে শত্রুপক্ষকে দেখিয়ে দিয়েছে যে, শত্রুর বিরুদ্ধে আমরা কঠোর ঐক্যবদ্ধ। তা না হলে অনেক আগেই ইরানকে কব্জা করে ফেলত পশ্চিমারা। লেবাননকে সন্দেহের চোখে দেখছে আমেরিকা। কারণ দেশটির অখণ্ডতা রক্ষায় বিশ্বের শ্রেষ্ঠ জিহাদি সংগঠন ‘হিজবুল্লাহ’ অপশক্তিকে কোনো ছাড় দিতে নারাজ। আর সে জন্যই হিজবুল্লাহকে কালো তালিকাভূক্ত করাসহ লেবানন সরকারকে সাহায্য প্রদান বন্ধ করেছে কয়েকটি দেশ। অবশ্য এর নেপথ্যে কাজ করছে সৌদি আরব। তিউনিশিয়ার প্রেসিডেন্ট সম্প্রতি হিজবুল্লাহর প্রশংসা করে যে বিবৃতি দিয়েছে তাতে আমার সন্দেহ ঘনীভূত হচ্ছে যে, কবে আবার তিউনিশিয়াকে টার্গেট করা হয়।মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে সমঝোতা কিংবা ভ্রাতৃত্ববোধ প্রতিষ্ঠার কোন আলামত আমি দেখছি না। কয়েক মাস পূর্বে সৌদি আরব হঠাৎ করে কয়েকটি দেশের সমন্বয়ে মুসলিম সামরিক জোট গঠন করে। কিন্তু অতীত ইতিহাস পর্যালোচনা করলে বিষয়টি পরিস্কার হবে যে, সৌদিসহ উপসাগরীয় রাজা-বাদশাদের ওপর আস্থা রাখা যায় না। আমেরিকার নেতৃত্বে পশ্চিমা শক্তি এবং ইসরাইলের সাথে এদের সুসম্পর্ক রয়েছে।সুতরাং আমেরিকা ইসরাইলকে সন্তুষ্ট রেখে এরা আজীবন ক্ষমতায় থাকার স্বপ্ন দেখছে।ওহাবী,তাকফিরি, সালাফীসহ বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠী সৃষ্টি মাধ্যমে এরা একদিকে যেমন মুসলমানের বিতর্কিত জাতি হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করছে অপরদিকে মাজহাব নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টির মাধ্যমে ফায়দা লোটার অপচেষ্টায় লিপ্ত।ইরাক, লিবিয়া ও সিরিয়ায় বিদ্রোহী গোষ্ঠী হিসেবে যারা যুদ্ধ করছে-তারা উপসাগরীয় কয়েকটি দেশ,আমেরিকা সহ পশ্চিমা বিশ্ব ও ইসরাইল থেকে অস্ত্রশস্ত্র ও প্রশিক্ষণ লাভ করছে।এসব ঘটনার প্রেক্ষিতে অর্থনৈতিক ভাবে দুর্বল মুসলিম দেশগুলো নিরাপত্তাহীনতায় ভূগছে।                                      লেখক ও কলামিস্ট,যুক্তরাজ্য                                      raihan567@yahoo.com