,

ThemesBazar.Com

মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ জরুরী

 

রায়হান আহমেদ তপাদার ঃ

 মাদকদ্রব্য সমাজের একটি মারাত্মক ব্যাধি। যুব সমাজ ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে এ ব্যাধির ছোবলে পড়ে। আজকের তরুণরাই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ, দেশ ও জাতির কর্ণধার। এসব তরুণকে সত্য, সঠিক ও সুন্দরভাবে গড়ে তোলার মধ্যে দেশের কল্যাণ নিহিত। আর এ যুব বা তরুণ সমাজের বিপদগামিতার অর্থ দেশের অনিবার্য বিপদ। আমাদের সমাজ নানাভাবে ব্যধিগ্রস্ত। যুব সমাজ এ রোগের শিকার।যে তরুণের ঐতিহ্য রয়েছে সংগ্রামের, প্রতিবাদে, যুদ্ধজয়ের সেই যুবশক্তিকে ধ্বংস করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে আন্তর্জাতিক মাফিয়া চক্র।তাই এই চক্রের বিরুদ্ধে জোরালো পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্যভাবে বলতে গেলে বলতে হয়, ভালো মন্দকে বিভেদ করার জন্য আছে দেশীও আইন, সামাজিক নিয়ম এবং সর্বোপরি মানুষের বিবেক।অনেক ভালোমন্দকে বিবেক দিয়ে ই বিবেচনা করতে হয়।সেক্ষেত্রে মন্দকে গ্রহণ না করার ব্যাপারই বিবেক সিদ্ধান্ত দেয়। এমনি একটি মন্দ জিনিস হলো মাদক। এই মাদক সমাজের তরুণের থেকে শুরু করে ছড়িয়ে পড়েছে কিশোরদের মাঝে। কিশোররা যখন তরুণ হচ্ছে,তখন পরবর্তি কিশোররাও তাদের দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে। ফেনসিডিল, গাঁজা, ইয়াবা সহ এমনকি কুকুর মারার ইনজেকশন সেবন করছে আমাদের দেশের মাদকসেবীরা। এছাড়া তারা টিকটিকির লেজের, গাছের আটার পিছনেও ছুটছে তারা, কারণ সেগুলো মাদকসেবীদের কাছে মাদকের মর্যাদা লাভ করেছে। সুতরাং নিরীহ ক্ষুদ্র টিকটিকিও রক্ষা পায়নি তাদের হাত থেকে। আসলে বর্তমানে দেশে মাদকের ব্যবহার বেড়েই চলছে ব্যাপক হারে। শহর থেকে অজপাড়াগাঁও পর্যন্ত এমন কোন স্থান পাওয়া যাবে না,যেখানে মাদকের বিস্তৃতি ঘটেনি। অপরদিকে মাদকের পাশাপাশি মহামারী রূপ নিয়েছে ক্রেজি ড্রাগ’ইয়াবা। শহরের অলিগলি থেকে শুরু করে গ্রামের আনাচে কানাচে পর্যন্ত বিস্তার ঘটেছে নীরব এই ঘাতক ইয়াবা ট্যাবলেটের। ইয়াবায় সম্পৃক্ততা মিলছে জঙ্গিদেরও। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রী, তরুণ-তরুণী, ব্যবসায়ী,চাকরিজীবীদের অনেকেই এখন ইয়াবায় আসক্ত। তবে এদের মধ্যে ছাত্র-ছাত্রী তরুণ-তরুণীর সংখ্যাই বেশি। ইয়াবার ভয়াবহ ধোঁয়া আগামী প্রজন্মকে আজ ধ্বংসের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।এ অবস্থায় আগামীতে দেশ মেধাশূন্য হয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ইয়াবার ভয়াবহ আগ্রাসন নিয়ে সরকার যেমন উদ্বিগ্ন,চিন্তিত অভিভাবক মহলও। দেশের সর্বত্র মহামারীরূপে ছড়িয়ে পড়ছে সর্বনাশা মাদক ইয়াবা। ইয়াবাসেবীর সংখ্যা ক্রমে ক্রমে বেড়ে চলেছে। প্রতিদিন দেশের এক প্রান্ত টেননাফ থেকে বিভিন্ন উপায় ও কৌশলে ইয়াবা ছড়িয়ে পড়ছে দেশের আরেক প্রান্ত তেতুলিয়া পর্যন্ত। রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে, গ্রামগঞ্জে এখন ইয়াবার জমজমাট ব্যবসা প্রসারিত মিয়ানমারের ৬০ টাকার এই ট্যাবলেট পাচার হয়ে দেশের প্রত্যান্ত অঞ্চলে বিক্রি হচ্ছে ৪শ থেকে ৫শ টাকায়।এটি ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। আর এ কারণে পেশা পরিবর্তন করে মাদক ব্যবসায় ঝুঁকছে অনেক মানুষ।সমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গ, এমপি, রাজনৈতিক নেতা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী কাহিনীর কতিপয় সদস্যর সমন্বয়ে গঠিত শক্তিশালী সিন্ডিকেট ইয়াবা ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছে। এ কারণেই কোনভাবেই এর আগ্রাসন রোধ করা যাচ্ছে না,ঠেকানো যাচ্ছে না ইয়াবার ব্যবসা। মাদক চিকিৎসার সাথে জড়িত ব্যক্তিরা বলেছেন,এখন চিকিৎসা নিতে আসা মাদকসেবীদের অধিকাংশই ইয়াবা আসক্ত। মাদকসেবীরা ধোঁয়ায় উড়িয়ে দিচ্ছে বিপুল অংকের টাকা। ইয়াবার সর্বনাশা থাবায় লাখো পবিরারের সন্তানদের জীবন এখন বিপন্ন। প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম ধ্বংস করে মাদক ব্যবসার এই সিন্ডিকেট হাতিয়ে নিচ্ছে হাজার কোটি টাকা। এসব ব্যাপারে এখনই ব্যবস্থা না নিতে পারলে ভবিষ্যতে আরও বয়াবহ অবস্থা হবে বলে অভিজ্ঞ মহলের ধারণা। উল্লেখ্য মাদকের প্রলোভনে ঝুঁকে পড়েছে উঠতি বয়সি তরুণ কিশোররা এবং বেকার তরুণরা। কারণ এখন অনেক অভিভাবক এখনো অন্ধকারে পড়ে আছে তাদের ছেলে-মেয়েদের প্রতি তারা দেখাচ্ছে উদাসিনতা সমাজের দু-চার জন সচেতন ব্যক্তি ঐ সব উদাসিন অভিভাবককে কিছু বলতে গেলে বরং তাদেরকে বিভিন্ন ধরনের বিপত্তি, হুমকি এবং এমনকি প্রাণ নাশের হুমকির মধ্যে পড়তে হচ্ছে। সুতরাং সমাজের অনেক সচেতন ব্যক্তির ইচ্ছা থাকলেও বিপত্তির ভয়ে পরের সন্তানের ব্যাপারে আর আগ্রহী হয় না। তারা ভাবে ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি’ বা ভিক্ষা চাইনা, কুত্তা সামলাও।এর পিছনে সবচেয়ে উল্লেখ করার মত যে কারণ তাহলো চরম দারিদ্রতা।পিতা মাতা যখন সন্তানদের ভরন পোষণে ব্যর্থ হচ্ছে তখন তাদের তরুণ বা কিশোর সন্তানেরা অন্যের বাগানের শাক সবজি, অন্যের গাছের সুপারি অথবা শহরে ছিচকে চুরির মাধ্যমে টাকা উপার্জন করে টাকা নিয়ে এসে অভিভাকদের হাতে দিচ্ছে, তখন অভিভাবকরা ওই প্রদত্ত টাকার উৎস খোঁজে না। তাছাড়া অন্য যে কোন কিছুতেই শাসন করছে না, তাদের সন্তানদেরকে। তাছাড়া বেকারত্বের অভিশাপে ছেলেমেয়েরা বেশী বেশী মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়ছে।গ্রামাঞ্চলে কিছু অনুশাসন বা নিয়ন্ত্রণের কারণে শুধুমাত্র উঠতি বয়সি ছেলেরাই মাদকের আগ্রহী হয়ে উঠছে। কিন্তু শহরাঞ্চলে ছেলে ও মেয়ে উভয়ে সমভাবে মাদকের দিকে আগ্রহী হয়ে পড়ছে।বিশেষ করে শহর অঞ্চলে কেউ কারো খোঁজ নেওয়ার মতো কোন সময় নেই। সুতরাং শহরের ছেলে মেয়েরা স্কুল, কলেজ ক্যাম্পাসে, পার্ক, নির্জন এলাকায়, গলি পথে, দোকানে মাদক গ্রহণ করছে। যেখানে জনসমাবেশ সেখানে তারা প্রকাশ্যে বিড়ি,সিগারেট গ্রহণ করছে।এই বিড়ি, সিগারেট অবশ্যই উৎসাহিত করছে পরবর্তিতে আরো বড় ধরনের মাদক গ্রহণ করতে। এসব মাদক ক্রয় করার জন্য তাদের টাকা উপার্জন করতে হয়। যেহেতু তাদের মাদকের টাকা উপার্জনে তেমন কোন ক্ষেত্রে পরিবেশ নেই তখন তারা ঝুঁকে পড়ে অন্ধকার পথে। শুরু করে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই,জমিদখল, চাঁদাবাজি ইত্যাদি। পরবর্তিতে উক্ত অপকর্ম গুলোর কুফল হিসাবে অনেকে মৃত্যু বরন করতে হয়েছে। তাছাড়া মাদক সেবনে শারীরিক ক্ষতি সাধিত হয়।এবং শারীরিক মাদকাসক্ত ব্যক্তির রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস পায়,স্নায়ুবিক দুর্বলতা,ফুসফুসের ক্যান্সার,লিভার সিরোসিস,ব্রোঙ্কাইটিস,আলসার, যৌন অক্ষমতা ও যৌন আগ্রহ হ্রাস পাওয়া,সন্তান জন্মদানে অক্ষমতা, রক্তশূন্যতা ইত্যাদি শারীরিক সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে।এছাড়া সিরিঞ্জের মাধ্যমে মাদক বা ড্রাগ নিলে এইচআইভি এইডস হেপাটাইটিস সি ও বি’সহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।যেমন:মানসিক ক্ষতি- আসক্তদের মেজাজের বিস্ফোরণ ঘটতে পারে, ডিপ্রেশন কিংবা ম্যানিয়া রোগে আক্রান্ত হতে পারে, অ্যাংজাইটি নিউরোসিসে আক্রান্ত হতে পারে, প্রত্যক্ষণ ও চিন্তানেস গোলোযোগের কারণে গুরুত্ব মানসিক রোগ সিজোফ্রেনিয়াও হতে পারে, আসক্তদের ব্যক্তিত্বের ক্ষেত্রে পরিবর্তন ঘটে এবং আত্মহত্যার প্রবণতাও বেড়ে যায়।তাছাড়া সামাজিক ক্ষতির মধ্যে পড়ে,আসক্তদের কর্মোদ্যোগ হ্রাস পায়,পরিবারকে চরম অশান্তিতে ভরিয়ে তোলে,বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে থাকে,অপরাধ পূর্ণ আচরণ করার প্রবণতা বেড়ে যায়।আর্থিক ক্ষতি,নিজে সর্বস্বান্ত হওয়া ও পরিবারকে আর্থিক অনটনে ফেলা,ধার করা,চুরি,ডাকাতি অপহরণ প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। মাতাল হওয়ার কারণে চাকরিচ্যুত হয়।মাদকাসক্তির চিকিৎসা ও প্রতিরোধে দৈহিক, মানসিক ও সামাজিক সব ক্ষেত্রের সমন্বয় প্রয়োজন।মাদকাসক্ত নিরাময়ে ডিটক্সিফিকেশন, কাউন্সেলিং, সামাজিক ও পেশাগত পুনর্বাসন, পুনরাসক্ত না হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ ইত্যাদি দীর্ঘমেয়াদি পথ অতিক্রম করে মাদকাসক্তির চিকিৎসা করা প্রয়োজন হয়ে পড়ে আর তাতে আর্থিক সঙ্কট দেখা দিতে পারে।সুতরাং এ থেকে রেহাই পাওয়ার একমাত্র উপায় আমাদের সচেতনতা। অন্যদিকে মাদকাসক্ত ব্যক্তি,তরুণ ও কিশোররা নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হয়।এসব মাদকাসক্তরা হারায় স্মৃতিশক্তি এমনকি বোধ শক্তিও। মাদকাসক্তরা সব সময়েই এক সিরিঞ্জ ব্যবহার করার ফলে এইচআইভি ভাইরাসে আক্রান্ত হতে পারে। ফলে তাদের সকল আশা আকাঙ্খা নিমিষেই ধুলিস্যত হয়ে যায়। ফলে তার মৃত্যুতে উক্ত পরিবারের ও মানুষিক মৃত্যুও ডেকে নিয়ে আসে, অশান্ত করে সমাজ ও রাষ্ট্রকে। মাদকের অর্থ সংগ্রহ করতে পরিবারের সদস্যদের সাথে মাদকাসক্তের দূরত্ব বাড়তে থাকে। দ্বন্দ্বে খুন হয় ভাই, বোন, পিতা মাতার মতো স্বজনরাও?উদাহরণ স্বরূপ, ঢাকায় মিরপুরে পুলিশ কর্মকর্তা ও তার স্ত্রী নিহত হয় তাদের মাদকাসক্ত কন্যা ঐশি দ্বারা। কারণ হিসাবে দেখা গেছে অঢেল অর্থ, ছেলেমেয়েদের প্রতি উদাসিনতা এবং মাদকাসক্ত বন্ধুদের সঙ্গদোষে পাল্লায় পড়ে জন্মদাতা পিতামাতাকে নেশাজাতীয় পানীয় পান করিয়ে অচেতন অবস্থায় তাদেরকে কুপিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে। শুধু তাই নয় অনেক অজানা খুন, ধর্ষণ, চুরি, ডাকাতি,পারিবারিক নির্যাতন সবকিছু মিলে ছোট বড় অনেক অপরাধ বাড়ছে এ মাদকের জন্যই।অবশ্য আশার বাণী এই যে, উক্ত জাতীয় সমস্যাকে চিহ্নিত করে শহরে-গ্রামে মাঝে মাঝে আলোচনা, সেমিনার, সভা, সিম্পোজিয়াম নিয়মিত অনুষ্ঠিত হচ্ছে। যাতে মানুষের মাঝে মাদকের ক্রিয়া সম্পর্কে সচেতন হন এবং জীবন বিনাশী এ মাদককে না বলে। এ ক্ষেত্রে সরকার বেসরকারী সংস্থা, উন্নয়ন সংস্থা গুলো এ ব্যাপারে বিপুল অর্থ ব্যয় করেন। তবে এসব অনুষ্ঠানের মাধ্যমে অনেকে মানুষের মাঝে অনেক সচেতনতার দাবী করেন। কাজের কাজ হচ্ছে কি? কী করেই বা হবে? আমরা আসলে গোড়া উৎপাদন না করতে পারলে এসব সভা, সমাবেশ, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম কোন কাজ হবে না। পরিশেষে বলব,যারা মাদক উৎপাদক,পাচার বহন ও সরবরাহ করে তাদের দিকে আগে দৃষ্টি দিয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। সর্বোপরি সবাইকে যার যার অবস্থান থেকে উন্নত নৈতিকতার অধিকারী হতে হবে।এবং খেয়াল রাখতে হবে প্রতিবেশী দেশ গুলো বাংলাদেশকে মাদকের একটি নিরাপদ বাজার তৈরী করতে না পারে।উল্লেখ্য দেশের অনেক রাঘোব বোয়াল আছেন যারা মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থেকে আমাদের তরুণ সমাজকে মাদক সমাজে পরিণত করছেন।তাদেরকে গ্রেফতারের মাধ্যমে আইনের আওতায় আনতে পারলে মাদক ব্যবসার পরিমাণ ও ব্যবসায়ীর সংখ্যা নিঃ সন্দেহে কমে আসবে। যারা বিরাজমান আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল নন, যারা দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে লঙ্ঘন করে অবিরত তারা নিঃ সন্দেহে অন্যায় করে।আর অন্যায় কারীরা চিরদিনই মানুষিক ভাবে দূর্বল হয়।মাদকের সঙ্গেঁ যারা জড়িত তারা এই অন্যায় কাজটিই করছেন। একটি সুন্দর, সুখী, সুস্থ ও স্বাস্থ্যবান জাতি গঠনে চাই মাদকমুক্ত সমাজ। তাই আমাদের দেশকে উন্নতির পথে নিতে হলে এবং আগামী প্রজন্মকে মাদকমুক্ত রাখতে হলে মাদকের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে,ভেঙ্গে দিতে হবে মাদকের কালোহাত।

 

ThemesBazar.Com

     More News Of This Category