বিশ্ব ক্রিকেট তারকাদের অভিনন্দনে বাংলাদেশ 

রায়হান আহমেদ তপাদার :: শরতের আকাশে ছিল রোদের খেলা। তবুও কেমন যেন নিষ্প্রাণ মিরপুর। কারণ দুই অসি ব্যাটসম্যান ডেভিড ওয়ার্নার ও স্টিভেন স্মিথ। কিন্তু হঠাৎ করেই জ্বলে উঠলেন সাকিব-তাইজুল-মিরাজরা।এ তিনজনের হাত ধরে ১১ বছর আগে ফতুল্লায় হারের প্রতিশোধ নিল বাংলাদেশ। আর মিরপুরে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশ পেল ২০ রানের ঐতিহাসিক জয়।মিরপুরে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ঐতিহাসিক টেস্ট জয়ে বাংলাদেশ বন্দনায় মেতে উঠেছে বিশ্ব ক্রিকেটের রথী-মহারথীরা। শচীন টেন্ডুলকার,বিরেন্দ্র শেবাগ, মাহেলা জয়াবর্ধনে, আকাশ চোপড়াসহ অনেকে।ক্রিকেটের কুলীন শক্তি অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশের ২০ রানের জয় টাইগারদের মনকেও ছুঁয়ে গেছে। ভারতের ক্রিকেট ইশ্বরখ্যাত শচীন টেন্ডুলকার টুইটারে বলেছেন,দুটি আপসেট হল দুদিনে। টাইগারদের অনুপ্রেরণাদায়ী পারফরমেন্স। টেস্ট ক্রিকেটের উন্নতি চলছেই।মাহেলা জয়াবর্ধনে বলেন, ঐতিহাসিক টেস্টে দারুণ খেলেছে টাইগাররা। দুর্দান্ত টেস্ট ম্যাচ। একসময় বাংলাদেশের ক্রিকেট নিয়ে খোটা দেয়া বিরেন্দ্র শেবাগও মিরপুর টেস্টে মেনে নিয়েছে টাইগারদের শ্রেষ্ঠত্ব।তিনি বলেন,খুব ভালো বাংলাদেশ। অস্ট্রেলিয়াকে হারানো সত্যিই বিশেষ কিছু।বাংলাদেশের ভক্ত ভারতীয় ধারাভাষ্যকার আকাশ চোপড়া লেখেন, চারদিনে ৯৪২ রান। ৪০ উইকেট। জয়-পরাজয়ের ব্যবধান মাত্র ২০। খুব ভালো বাংলাদেশ। ইতিহাস রচিত হলো।অস্ট্রেলিয়ার সাবেক অধিনায়ক মাইকেল ক্লার্ক অজিদের হারে কষ্ট পেলেও ঠিকই অভিনন্দন জানিয়েছেন টাইগারদের। তিনি টুইটারে লেখেন, অভিনন্দন বাংলাদেশ। আমি কখেনো ভাবিনি এমন টুইট লিখতে হবে। তবে যাদের প্রশংসা প্রাপ্য তাদের তো প্রশংসা করতেই হয়। ক্রিকেট বিশ্বে বাংলাদেশ যে শক্তিধর দল তা আবারও প্রমাণ করল টাইগাররা। এমনকি, বলার অপেক্ষা রাখে না যে, টেস্ট ক্রিকেটে বড় দলের বিপক্ষে জয় পাওয়াও বাংলাদেশের জন্য এখন আর অসম্ভব কিছু নয়। গতকাল দুপুরে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষের টেস্ট জয়, আর শুধু জয়ই নয়, এটি ছিল অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম টেস্ট জয়! এই জয় নিসন্দেহেই ঐতিহাসিক। কেননা এক সময়ের প্রবল পরাক্রমশালী অস্ট্রেলিয়া, টেস্টের জগতের সেই অভিজাত অস্ট্রেলিয়া, ১১ বছর পর বাংলাদেশের বিপক্ষে টেস্ট খেলা, আর এই খেলায় অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে দিল বাংলাদেশ। ২০ রানের রোমাঞ্চকর ও মহাকাব্যিক জয়ে স্মরণীয় হয়ে রইল মিরপুর টেস্ট। আমরা আমাদের প্রাণের ভেতর থেকে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলকে অভিবাদন জানাই।বলার অপেক্ষা রাখে না, এই জয়ের মধ্য দিয়ে আরেকটি অনন্য অর্জন যোগ হলো সাকিবের। টেস্টে তৃতীয় দিন শেষে অস্ট্রেলিয়াই এগিয়ে, হাতে ৮ উইকেট নিয়ে জয় থেকে ১৫৬ রান দূরে ছিল তারা। কিন্তু গতকাল সকালে সাকিব আল হাসানের স্পিনে ঘুরে গেল ম্যাচের মোড়। সকালের সেশনে তার ৩ উইকেটে ম্যাচে ফেরে বাংলাদেশ। এরপর লাঞ্চ শেষে প্রথম বলেই বিপজ্জনক গ্লেন ম্যাক্সওয়েলকেও ফেরান বিশ্বসেরা এই অলরাউন্ডার। ক্যারিয়ারে দ্বিতীয়বারের মতো ১০ উইকেটও পেলেন সাকিব আল হাসান। নিউজিল্যান্ডের কিংবদন্তি ক্রিকেটার স্যার রিচার্ড হ্যাডলির পর দ্বিতীয় ক্রিকেটার হিসেবে এক টেস্টে ১০ উইকেট ও নূ্যনতম ৫০ রান করার কীর্তিটা নিজের করে নিলেন। ব্যক্তিগত সেই অর্জন ছাপিয়ে এই জয় দুর্দান্ত এক দলগত অর্জন বাংলাদেশের।  এ ছাড়া জাদুকরী পারফরম্যান্সে সাকিব রাঙালেন নিজের ৫০তম টেস্ট। আর তার পাশাপাশি তামিমেরও এটি ছিল ৫০তম টেস্ট। মুশফিকুর রহিম টেস্টের আগে বলেছিলেন, এই দুই নায়কের জন্যই খেলবে বাংলাদেশ। সতীর্থদের উপহার দিলেন তারা দুজনই, উপহার দিলেন দেশকে এক ঐতিহাসিক জয়। সাকিবের অসাধারণ অলরাউন্ড পারফরম্যান্স, ব্যাটিং দুরূহ উইকেটে তামিমের ৭১ ও ৭৮! বলার অপেক্ষা রাখে না, গত বছর এই শের-ই-বাংলা স্টেডিয়ামেই ইংল্যান্ডকে ১০৮ রানে হারিয়েছিল বাংলাদেশ। এরপর গত মার্চে শ্রীলঙ্কায় হারিয়েছিল শ্রীলঙ্কাকে। টেস্টে এগিয়ে যাওয়ার পালায় যোগ হলো আরও একটি অর্জন।আমরা বলতে চাই, দলগত যে কোনো খেলারই সাফল্য নির্ভর করে টিম স্পিরিট এবং সঠিক সমন্বয়ের ওপর। ক্রিকেটেও বিষয়টা তাই। ব্যাটিং,বোলিং, ফিল্ডিং-এ তিন ক্ষেত্রে ভালো করতে পারলেই সাফল্য হাতের মুঠোয় ধরা দেয়। বর্তমানে টাইগারদের মধ্যে এ সমন্বয় এবং এগিয়ে যাওয়ার যে অদম্যতা লক্ষণীয় তা আশাব্যঞ্জক। তবে আমরা মনে করি, এ ক্ষেত্রে ধারাবাহিকতা বাজয় রাখতে হলে নিজেদের আরও বেশি গড়ে তুলতে সামগ্রিক প্রচেষ্টা অব্যহত রাখতে হবে। পাশপাশি সংশ্লিস্টদেরও যথাযথ উদ্যোগ জারি রাখার বিকল্প নেই। এমনও লক্ষ করা গেছে, কোনো টেস্টের প্রথম ইনিংসে খুব ভালো পারফরম্যান্স দেখিয়েও দ্বিতীয় ইনিংসে খারাপ করেছে। স্বাভাবিকভাবেই এর ফলে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন বা জয়ের কাছাকাছি এসেও ব্যর্থ হতে হয়েছে। ফলে আমরা মনে করি,বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের দুর্বল জায়গাগুলো সঠিকভাবে চিহ্নিত করে তা কাটিয়ে উঠতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ অব্যাহত রাখা অপরিহার্য।  সর্বোপরি বলতে চাই, বাংলাদেশের মানুষের ক্রিকেট প্রীতি প্রবল। আর টাইগাররাও বার বার বিশ্বের সামনে একেকটি জয় অর্জর্নের মধ্য দিয়ে দেশের নাম আরও উজ্জ্বল করেছে। ফলে আমরা চাই, এই জয়ের ধারা অব্যাহত থাকুক। টাইগারদের যে কোনো দুর্বলতা থাকলে তা কাটিয়ে ওঠার মধ্য দিয়ে তারা আরও এগিয়ে যাবে এবং আরও জয় উপহার দেবে আমাদের, এমনটি প্রত্যাশা। তাছাড়া নিজেদের ৫০তম টেস্টে জ্বলে উঠলেন সাকিব আল হাসান ও তামিম ইকবাল। মাইলফলকে পৌঁছানোর ম্যাচে দু’জনের দারুণ নৈপুণ্যে ইতিহাস গড়েছে বাংলাদেশ। অর্ধশতক ও ১০ উইকেট নিয়েছেন সাকিব। দুই ইনিংসেই অর্ধশতক পেয়েছেন তামিম। মিরপুরে সিরিজের প্রথম টেস্টে রোমাঞ্চকর লড়াইয়ে অস্ট্রেলিয়াকে ২০ রানে হারিয়েছে বাংলাদেশ প্রায় শতভাগ মুসলমানের এদেশে আর মাত্র একদিন বাদেই সর্বোচ্চ ধর্মীয় উৎসব প্রবিত্র ঈদুল আজহা। এই জয়ে ঈদের আগে বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষকে ঈদের সবচেয়ে সুন্দর উপহারই দিল সাকিব-তামিমরা। অস্ট্রেলিয়া বিপক্ষে পাঁচ টেস্টে এটাই বাংলাদেশের প্রথম জয়। সেই সঙ্গে টেস্টে বাংলাদেশের জয় পৌঁছাল দুই অঙ্কে-১০১ টেস্টে ১০টি। জিম্বাবুয়ে, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, ইংল্যান্ড, শ্রীলঙ্কার পর টেস্টে অস্ট্রেলিয়াকে হারাল বাংলাদেশ। চার দিনে শেষ হওয়া ঢাকা টেস্টের সারাংশ এটিই। সিরিজের ২য় টেস্ট আগামী ৪ সেপ্টেম্বর শুরু হবে চট্টগ্রামের জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে।অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে এই টেস্ট সিরিজের জন্য আসলেই ছিল দীর্ঘ প্রতীক্ষা। নির্দিষ্ট করে বললে ১১ বছরেরও বেশি। সেই ২০০৬ সালের এপ্রিলে রিকি পন্টিংয়ের অস্ট্রেলিয়া দুটি টেস্ট খেলে যাওয়ার পর অস্ট্রেলিয়া আবার এলো স্টিভেন স্মিথের দল। এই দীর্ঘ সময়ে বদলে গেছে কত কিছু। দুটি দলের মধ্যেই প্রজন্মের ব্যবধান ঘটে গেছে।  অন্যদিকে টি-টোয়েন্টি নামের সংকরায়িত ক্রিকেটের উন্মাদনায় সারা বিশ্বই উথালপাথাল। অস্ট্রেলিয়া বাংলাদেশে আর টেস্ট খেলতে আসেনি। বাংলাদেশকেও তারা টেস্ট খেলতে ডাকেনি নিজের দেশে।২০১১ সালে তিন ম্যাচের একটি ওয়ানডে সিরিজ অবশ্য খেলে গেছে, সে ছিল সান্তনা। বাংলাদেশকে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া আক্ষরিক অর্থে তখন সান্তনাই দিয়েছিল এই বলে যে, আপাতত তিনটি ওয়ানডেই হোক,পরে সময়-সুযোগ বুঝে দুটি টেস্ট খেলে যাওয়া যাবে। তাছাড়া দ্বিপক্ষীয় অনেক যোগাযোগ-প্রক্রিয়া শেষে অস্ট্রেলিয়া বাংলাদেশে সেই দুটি টেস্ট খেলতে রাজি হলো ২০১৫ সালের অক্টোবর-নভেম্বরে। সবকিছু ঠিকঠাক, সারা বাংলাদেশ অস্ট্রেলিয়া দলের আগমনের প্রতীক্ষায় সময় গুনছে। ঠিক তখনই নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কাকে কারণ দেখিয়ে সফর বাতিল করে দিল ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া। বাংলাদেশ সরকার সর্বোচ্চ নিরাপত্তা দেওয়ার আশ্বাস দিলেও মন গলেনি অস্ট্রেলিয়ার। কদিন পরই অবশ্য শ্রীলঙ্কা ক্রিকেট দল বাংলাদেশ সফর করে গেছে। বাংলাদেশ সফলভাবে আয়োজন করেছে অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ ক্রিকেট, কোনো ক্রিকেট দলই নিরাপত্তা নিয়ে কোনো অনুযোগ তোলেনি। শুধু অস্ট্রেলিয়াই বাংলাদেশের নিরাপত্তা নিয়ে সন্তুষ্ট হতে পারেনি। সে কারণে অস্ট্রেলিয়া অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপেও তাদের দল পাঠায়নি।২০১৫ টেস্ট সফর বাতিল করার পর অস্ট্রেলিয়া অবশ্য বলেছিল,এ সফরটি তারা পরে সুবিধামতো এক সময়ে করবে। সেই সুবিধামতো সময়টা’ অবশেষে এল। ইংল্যান্ডের নির্বিঘ্নে বাংলাদেশ সফর নিশ্চয়ই ভূমিকা রেখেছে এখানে। ইংল্যান্ড দুটি টেস্ট ও তিনটি ওয়ানডে খেলে গেছে গত বছরের অক্টোবরে ইংল্যান্ড দলকে দেওয়া সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে অস্ট্রেলিয়া দলকেও।  বাংলাদেশ আর আগের দল নেই,সেটি ভালোই জানে অস্ট্রেলিয়াও। এদেশে এসে হেরে যাবার ভয়ের পেছনে নিরাপত্তার যে মিথ্যা অজুহাত দাঁড় করিয়েছিল অজিরা,সেটি ভালোই বোঝা গেল। দুঃখের সাথে বলতে হচ্ছে চার দিনে এই টেস্ট হেরে আজ র‌্যাঙ্কিংয়ের পাঁচে নেমে গেছে অস্ট্রেলিয়া। সিরিজ শুরুর আগে চারে ছিল বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা।এক পরাজয়ে তিনটি মহামূল্য রেটিং পয়েন্ট হারিয়ে তাদের পয়েন্ট এখন হয়ে গেল ৯৭। নেমে গেল পাঁচে। আর বাংলাদেশের এই এক জয়ে ৪ রেটিং পয়েন্ট বাড়ল। কাল ইংল্যান্ডের বিপক্ষে অমন অবিশ্বাস্য জয় না পেলে ওয়েস্ট ইন্ডিজের সঙ্গে বাংলাদেশের পয়েন্ট ব্যবধান তখন নেমে আসত ভগ্নাংশে।অস্ট্রেলিয়া এখন সিরিজের শেষ টেস্ট জিতলেও পাঁচ থেকে চারে উঠে আসতে পারবে না। তবে বাংলাদেশের সামনে আটে উঠে আসার সম্ভাবনা থাকল। বাংলাদেশ যদি ২-০-তে সিরিজ জেতে, আর ওদিকে ওয়েস্ট ইন্ডিজ যদি ২-১-এ সিরিজ হারে, তাহলে বাংলাদেশ অস্ট্রেলিয়ার মাত্র দুই ধাপ পরে নিজেদের আবিষ্কার করতে পারবে। অস্ট্রেলিয়া যে তখন নেমে আসবে ছয়ে! এই ভয়টাও কি তাদের মনে খেলে গেছিল সিরিজ বিলম্বে।ভাবতে ভালোই লাগছে সারা বিশ্ব চেয়ে চেয়ে দেখল টাইগারদের বিজয়।

লেখক ও কলামিস্ট

raihan567@yahoo.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি: এ্যাডভোকেট শেখ মোঃ আব্দুল্লাহ
সম্পাদক-প্রকাশক : শেখ মোঃ তৈয়াবুর রহমান॥

যুগ্ম সম্পাদক: এস এম শাহিদুল আলম॥ সহযোগী সম্পাদক: শেখ মোঃ আরিফ আল আরাফাত
সহ-সম্পাদক: (প্রশাসন) হাজী হাবিবুর রহমান শাহেদ: সহ সম্পাদক: আজমাল মাহমুদ
সম্পাদক কর্তৃক বাড়ী বাড়ী নং- ৫৩/২, ৪র্থ তলা, রাজ-নারায়ন-ধর রোড, কিল্লার মোড় বাজার, লালবাগ, ঢাকা-১২১১
ফোন: ০১৯১৮-২০১৬২৬, ফোন: ০১৭১৫-৯৩৩১৬৮
ই-মেইল- notunvor.news@gmail.com
Designed By Hostlightbd.com
| Cyberboss.org