মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে আমাদের নিজে বাঁচার স্বপ্নে বিভোর নির্যাতিত রোহিঙ্গারা


ইমরান জাহেদ, কক্সবাজার ॥
একদিন পর কোরবানের ঈদ। ত্যাগের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টির লক্ষ্যে পশুত্বকে জলাঞ্জলি দিয়ে মনুষ্যত্বকে বিকশিত করার শিক্ষায় হলো কোরবান। মিয়ানমারের আরাকান রাখাইন রাজ্যে এবার জলাঞ্জলি দিয়েছে স্ত্রী তার স্বামীকে, বোন তার ভাইকে, বাবা তার মেয়েকে। এমন পরিস্থিতিতে নিজে বাঁচার স্বপ্নে বিভোর নির্যাতিত রোহিঙ্গারা। টেকনাফের নাফ নদীতে রোহিঙ্গাবাহী নৌকাডুবির ঘটনায় আরও ১৬ জনের মৃতদেহ উদ্ধার করেছে এ নিয়ে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২০ জনে। মিয়ানমারে ফিরে গুলির মুখে পড়তে চান না স্বজনকে গুলির মুখে ফেলে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা। তারা ঢুকতে চান উখিয়া-টেকনাফর রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্পে। উখিয়ার কুতুপালং ক্যাম্প এবং নতুন গড়ে ওঠা বালুখালী বস্তিতে জায়গা পেতে প্রহর গুনছে হাজার হাজার রোহিঙ্গা নারী ও শিশু। ক্যাম্পের বাইরে দিনের পর দিন জড়ো হচ্ছেন তারা। একদিকে প্রশাসন, অন্যদিকে ক্যাম্পে পুরনো বসবাসকারীদের বাধার মুখে নতুনরা। গত শনিবার থেকে সব ধরণের বাধা, প্রতিরোধ উপেক্ষা করে সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে ঢুকে পড়ছে অসংখ্য রোহিঙ্গা। তবে অনেকেই এরই মধ্যে স্বজনদের সহায়তায় ক্যাম্পে ঢুকে পড়েছে। বাকিরা খোলা আকাশের নিচে রাস্তার পাশে ও ক্যাম্পের চারপাশে অবস্থান নিয়েছে। নতুন গড়ে ওঠা বালুখালী রোহিঙ্গা বস্তির নেতা লালু মাঝি বলেন, গত চার দিনে আট শতাধিক পরিবার প্রবেশ করেছে বালুখালী বস্তিতে। তাদের কোনো পরিসংখ্যান নেই। স্বজনদের মাধ্যমে তারা ওখানে আশ্রয় নিয়েছে। অনেকেই নতুন ঝুঁপড়ি ঘর তৈরির চেষ্টা করছে। তবে পুরনো রোহিঙ্গাদের বাধার মুখে কোনো নতুন ঘর তৈরি করতে পারছে না তারা। সে ক্ষেত্রে স্থানীয় যারা ক্যাম্প নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে আছেন তাদের ম্যানেজ করে বিভিন্ন শরণার্থী ক্যাম্পে আশ্রয় নেন। বৃহস্পতিবারের সংঘর্ষের পরও একইভাবে স্রোতের বেগে সীমান্তে আসছে নির্যাতিত রোহিঙ্গারা। গতকাল বৃহস্পতিবার উখিয়া কুতুপালং ইউএনএইচসিআর অফিস থেকে পুলিশ, আনসার ব্যারাক পেরিয়ে কমিউনিটি সেন্টার ও এমএসএফ হাসপাতাল পর্যন্ত সড়কযোগে হাজার হাজার রোহিঙ্গার জটলা দেখা গেছে। তারা সবাই গত সোমবার ভোর থেকে অবস্থান করছে। অন্যদিকে অনিবন্ধিত কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও বালুখালী রোহিঙ্গা বস্তিতে প্রতিনিয়ত চর্তুদিক দিয়ে রোহিঙ্গা প্রবেশ করতে দেখা গেছে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে কুতুপালং রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্পে নিবন্ধিত অনিবন্ধিত মিলে প্রায় দেড় লক্ষাধিক ও বালুখালী নতুন রোহিঙ্গা বস্তিতে প্রায় ৩৫ হাজার রোহিঙ্গা রয়েছে। কুতুপালং ও বালুখালী ক্যাম্পে গত ১০ মাস আগে পালিয়ে আসা প্রায় ১৯ হাজার পরিবার অবস্থান করছে। এখন প্রতিটি ঘরে নতুন প্রবেশকারী রোহিঙ্গা আশ্রয় নিচ্ছে বলে জানা গেছে। মিয়ানমারের সীমান্ত সংলগ্ন গ্রাম ঢেকিবনিয়া, চাকমাকাটা, ফকিরাপাড়া, তুমব্র“ মেদায়, কুমিরখালী, বলিবাজার, টং বাজার, ধুমবাইপাড়া, ফকিরাবাজার, সাহেববাজার, মংপ্রিচং, রেইখ্যাপাড়া, ছেংখোলা, কোনারপাড়াসহ বিভিন্ন গ্রাম থেকে এই রোহিঙ্গারা প্রবেশ করে জড়ো হয়েছে। উখিয়ার সীমান্ত এলাকার পাহাড়ী জনপদ রেজু আমতলী, ফাত্রাঝিরি হয়ে ডেইলপাড়া, করইবনিয়া, ডিগলিয়া, হাতিমোরা, দরগাবিল, ঘুমধুমের বড়বিল, জলপাইতলী, আজুখাইয়া সড়ক পথে টমটম ও অটোরিকসা যোগে কুতুপালং ও বালুখালী রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আসছে তারা। ক্যাম্পের বাইরে অবস্থান করা রোহিঙ্গা নারী ও শিশুদের মধ্যে এনজিওর মাধ্যমে পুষ্টিসমৃদ্ধ বিস্কুট বিতরণ করতে দেখা গেছে। এনজিও মুক্তির এপিসি আবদুল্লাহ আল মামুন শাহীন জানান, নিবন্ধিত শিবিরের তথ্য নেই। তবে কুতুপালং এ অনিবন্ধিত ১৬ টি ব্লকে প্রায় হাজারের অধিক রোহিঙ্গা পরিবার আম্রয় নিয়েছে বলে জানতে পেরেছি। এদিকে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের জিরো পয়েন্টে গত সাত দিন ধরে অবস্থান করছে হাজার হাজার রোহিঙ্গা। তারা পলিথিনের ছাউনি তৈরি করে ওখানে অবস্থান করছে। তবে মঙ্গলবার থেকে পলিথিন দিয়ে তৈরি করা অস্থায়ী ছাউনি তুলে কাটাঁতারের দিকে রোহিঙ্গাদের যেতে দেখা গেছে। নারী-পুরুষ, শিশু সবাই আতঙ্কিত অবস্থায় চলে যাচ্ছেন সেই লাইন বরাবর, যার ওপারেই তাদের জন্য অপেক্ষা করছে ভয়ংকর মিয়ানমার সেনাবাহিনী। পালিয়ে আসা যুবক আবদুর রহমান বলেন, আমার বাবা আব্দস সালাম ও বড় ভাই রাহাত আলমকে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী গুলি করে হত্যা করেছে। জান বাঁচাতে আমরা এখানে এসেছি। এখন আমাদের আবার ঠেলে দেওয়া হচ্ছে মৃত্যুর দিকে। সেখানে গুলি করার পর জবাই করে মৃত্যু নিশ্চিত করছে সেনাবাহিনী। প্রতিদিন একর পর এক ঘর-বাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এখন কাটাতারের বেড়ায় থাকতে ভয় হচ্ছে। ওরা হেলিকপ্টার দিয়ে গুলি করতে পারে আমার আরো অনেক আতœীয় স্বজন ওখানে রয়ে গেছে। এভাবেই আশঙ্কা প্রকাশ করে রোহিঙ্গা যুবক আব্দুর রহমান। অভিযানের নামে আগস্ট মাসের শুরুতে রাখাইনে সেনা মোতায়েন করে মিয়ানমার সরকার। এরই মধ্যে গ্রামের পর গ্রাম রোহিঙ্গাদের অবরুদ্ধ করে রাখা হয়। গত বছরের অক্টোবরে রোহিঙ্গাদের ওপর চালানো মিয়ানমার সেনাদের এমনই এক হত্যাকান্ডের ঘটনায় জাতিসংঘের সাবেক প্রধান কফি আনানের নেতৃত্বে গঠিত কমিশন বৃহস্পতিবার তাদের প্রতিবেদন প্রকাশ করে। কমিশন রোহিঙ্গাদের ওপর থেকে বিধি নিষেধ প্রত্যাহার এবং তাদের নাগরিকত্ব প্রদানের আহবান জানায়। প্রতিবেদন প্রকাশের কয়েক ঘন্টার মধ্যেই নতুন করে হামলা ও হত্যাকান্ড শুরু করে মিয়ানমার। মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রায় ২৭০ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে। এসব এলাকায় বাংলাদেশ সীমান্ত বাহিনী বিজিবির কড়া নজরদারি থাকা সত্ত্বেও তারা রাতে প্রবেশ করার চেষ্টা করছে। এছাড়া নোম্যনস ল্যান্ডে অবস্থান করে মানবেতর জীবনযাপন করছেন হাজার হাজার রোহিঙ্গা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি: এ্যাডভোকেট শেখ মোঃ আব্দুল্লাহ
সম্পাদক-প্রকাশক : শেখ মোঃ তৈয়াবুর রহমান॥

যুগ্ম সম্পাদক: এস এম শাহিদুল আলম॥ সহযোগী সম্পাদক: শেখ মোঃ আরিফ আল আরাফাত
সহ-সম্পাদক: (প্রশাসন) হাজী হাবিবুর রহমান শাহেদ: সহ সম্পাদক: আজমাল মাহমুদ
সম্পাদক কর্তৃক বাড়ী বাড়ী নং- ৫৩/২, ৪র্থ তলা, রাজ-নারায়ন-ধর রোড, কিল্লার মোড় বাজার, লালবাগ, ঢাকা-১২১১
ফোন: ০১৯১৮-২০১৬২৬, ফোন: ০১৭১৫-৯৩৩১৬৮
ই-মেইল- notunvor.news@gmail.com
Designed By Hostlightbd.com
| Cyberboss.org