সীমান্তে বাড়ছে নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের সংখ্যা রাখাইনে রাজ্যে আগুনে জ্বলছে গ্রামের পর গ্রাম

ইমরান জাহেদ, কক্সবাজার ॥
মিয়ানমারের সরকারি বাহিনী দেশটির রাখাইন রাজ্যে সংখ্যালঘু মুসলিম নারী ও কিশোরী মেয়েদের ধর্ষণ করেছে। তাদের ওপর অন্যান্য যৌন সহিংসতা চালিয়েছে। পুরুষদের গুলি ও জবাই করে হত্যা করা হচ্ছে। গত ২৫ আগষ্ট থেকে মুসলিম অধ্যুষিত মংডুর রাখাইন রাজ্যে সেনাবাহিনীর তান্ডব অব্যাহত রয়েছে। গতকাল বুধবারও গ্রামের পর গ্রাম আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। গ্রামগুলো থেকে ধোঁয়াও দেখা গেছে। গত ৬ দিন ধরে চলমান মিয়ানমার সেনাদের অত্যাচার, নিপীড়নে ভারী গোলার শব্দ পাওয়া গেছে। এদিকে প্রতিদিনই বাংলাদেশ সীমান্তে বাড়ছে নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের সংখ্যা। তাদের কান্না ও আর্তচিৎকারে ভারী হচ্ছে আকাশ বাতাস। আহতদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করলেও বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি রোহিঙ্গাদের ফের নিজ দেশে ফেরৎ পাঠানোর ব্যবস্থা করছে।
সীমান্ত পাড়ি দিয়ে এপারে আসা মাংদাও, বাথিডাং গ্রামের বাসিন্দা নবী হোসেন, ছব্বির আহমদ, ফকিরা বাজার চর পাড়া গ্রামের দিল মোহাম্মদ, মোহাম্মদ তৈয়ব, মিজ্জিরীপাড়া খুরশেদ আলম, হাছান আলী, ইউসুপ ও এজাহার হোসেন জানায়, গত ৬ দিন ধরে মগ সেনারা বাড়িঘরে হামলা, ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া ও পুরুষদের গুলি ও জবাই করে হত্যা এবং নারীদের গণধর্ষণ করছে। গত ২০১৬ সালের ৯ অক্টোবরে রাখাইনে সরকারি বাহিনীর অভিযান কালে এসব অপরাধ সংঘটিত হয়। ফের চলতি বছরের ২৫ আগষ্ট থেকে মুসলিম অধ্যুষিত মংডু রাখাইন রাজ্যে সে দেশের সেনাবাহিনীর নিপীড়ন, নির্যাতনের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে।
গতকাল বুধবার উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়নের ধামনখালী, রহমতের বিল ও টেকনাফের নাফনদী এলাকায় সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, পেরাংপুড়ো এলাকা, জুলা পাড়া, বালূখালী, দারোগা পাড়া, হাচ্ছুরতা, উদং, বাজারপাড়া, চারকুম্ভ, খুইন্যাপাড়া, হাচ্ছরা, চামবন্যা, টাঙ্গাপাড়া, মেরুন্ন্যাপাড়া, খাইন্যাপাড়া, পাতংজা পাড়া, মন্নিপাড়া, সিকদারপাড়া, গাউচার বিল, খাওয়ার বিল, জামবুনিয়া এলাকাসহ মিয়ানমারে অসংখ্যা বাড়ীঘর বেলা ১২ টা থেকে বিকাল ৫ টা পর্যন্ত ৪৫ কিলোমিটার সীমান্ত এলাকাজুড়ে আগুনের লেলিহান শিখা ও ধোঁয়া নাফনদীর এপার থেকে ওপারে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।
মংডু পেরাংপুড়ো এলাকার মোঃ হামিদ হোসনের ছেলে মোঃ হোছন (২৫) ও নলবনিয়া এলাকার মোঃ আয়াজ (২২), আলী হোছনের ছেলে আমীর আহম্মদ (২৫) এ প্রতিবেদককে জানান, তারা সীমান্ত পার হয়ে এপারে চলে আসলেও তাদের মা ও বোনদের আনতে পারেনি। তাই তারা চিন্তিত। এপার থেকে তাদের গ্রাম জ্বলতে দেখে বোনের সাথে মোবাইলে কথা হলে তার বোন সেতারা বেগম (২০) ভাইকে জানান, তাদের গ্রাম সেনারা আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছে। তারা অন্য একটি গ্রামে আশ্রয় নিয়েছিল, সে গ্রামটিও পুড়িয়ে দেওয়ায় তারা বিষণ নিরাপত্তাহীনতায় আতংকের মধ্যে রয়েছে। ওই গ্রামগুলোর ওপর দিয়ে সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টারও উড়ে যেতে দেখেছেন স্থানীয়রা।
সীমান্তের ওপারে ফায়ারিংয়ের (গোলাগুলির) শব্দ ও আগুন দেওয়ার বিষয়টিও নিশ্চিত করেছেন বিজিবি’র মহাপরিচালক (ডিজি) আবুল হোসেন। তিনি জানান, দেশটির ভেতরে হেলিকপ্টার দিয়ে ফায়ারিং করতে দেখা গেছে। মিয়ানমারের বর্তমান পরিস্থিতিতে সীমান্তে জড়ো হয়েছে অসংখ্য নির্যাতিত মুসলিম রোহিঙ্গা। তাদের বিষয়ে এ মুহুর্তে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)’র অবস্থান কী সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে বিজিবি প্রধান বলেন, একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশে অবৈধ ভাবে অন্য কেউ প্রবেশ করতে পারে না। এজন্য বিজিবি সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে। গত ২৭ আগষ্ট উখিয়া ও তুমব্রু সীমান্ত এলাকা পরির্দশন শেষে তুমব্রু বিজিবি ক্যাম্পে প্রেস ব্রিফিংকালে সাংবাদিকদের তিনি এসব কথা বলেন।
বিজিবি’র মহাপরিচালক আরো বলেন, রোহিঙ্গা প্রবেশ ঠেকাতে সীমান্তে সম্মিলিত প্রয়াস নেয়া হচ্ছে। এজন্য পুলিশ প্রশাসন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সহায়তা চাওয়া হয়েছে। নাফনদীর জলসীমা ও সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট অতিক্রম করে বাংলাদেশে প্রবেশের সময় ৫ শতাধিক রোহিঙ্গা নারী ও পুরুষদের নিজ দেশে ফেরত পাঠিয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশে (বিজিবি)। তাদের মধ্যে শিশু বৃদ্ধরা রয়েছে। এদিকে তুমব্রু সীমান্তের জিরো পয়েন্টে কয়েকশ নির্যাতিত রোহিঙ্গা নারী পুরুষ আশ্রয় নিতে দেখা গেছে।
গত সোমবার সকালে তাদের পুশব্যাক করতে গেলে মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিপি গুলি ছোড়ে। এতে সীমান্তের বাংলাদেশ অংশের বাসিন্দাদের মধ্যে আতংক দেখা দেয়। স্থানীয়রা অন্তত ৫টি বিকট শব্দ শোনার কথা জানান। ঘুমধুম ইউপি সদস্য মোঃ কামাল উদ্দিন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, তুমব্রু সীমান্তের কলাবাগান এলাকায় কয়েকশ রোহিঙ্গা আশ্রয় নেয়। আমি তাদের মানবিক সহায়তা দিয়েছি। বিজিবি তাদের সীমান্তের ওপারে পুশব্যাক করতে গেলে মিয়ানমার থেকে গুলি ছোড়া হয়। সঙ্গে সঙ্গে বিজিবি সর্তক অবস্থান নেয়। সীমান্তের নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
বিজিবি’র স্থানীয় এক কর্মকর্তা ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া সীমান্ত পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, উখিয়া উপজেলার পালংখালী ইউনিয়নের রহমতের বিল, ধামনখালী সীমান্ত ও নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম সীমান্ত এবং টেকনাফের নাফনদীর এপার থেকে ওপারের আকাশে দেখা গেছে কালো ধোঁয়া। রাখাইন রাজ্য থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা বলছেন, সেদেশের সেনাবাহিনী গণহারে তরুণদের আটক করে নিয়ে যাচ্ছে। যাদের ধরতে পারছে না তাদের গুলি করা হচ্ছে।
রাখাইন রাজ্যের মিজ্জিশং পাড়া এলাকার বশির আহমদের ছেলে নুরুল হক (২৫) বলেন, তার পায়ে গুলি লেগেছে। বন্ধুদের সহায়তা আমতলী সীমান্ত পাড়ি দিয়ে এদেশে প্রবেশ করলেও হতবাগা যুবক টাকার অভাবে চিকিৎসা নিতে পারছে না বলে জানান। গতকাল বুধবার নাচ্ছিডং এলাকার ২০ বছরের ইয়াছমিন মিজ্জিরীপাড়ার জুলেখা (২৫) ও সাজেদা বেগম (২৮) এ প্রতিবেদককে জানান, তারা আমতলী সীমান্ত পার হয়ে এদেশে প্রবেশ করেছে। তাদের মা-বাবাকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। এছাড়া সেনাবাহিনী তাদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিয়েছে। মা-বাবা হারা এ তিন নারী বাংলাদেশে ইজ্জত ও প্রাণ রক্ষার্থে পালিয়ে এসেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি: এ্যাডভোকেট শেখ মোঃ আব্দুল্লাহ
সম্পাদক-প্রকাশক : শেখ মোঃ তৈয়াবুর রহমান॥

যুগ্ম সম্পাদক: এস এম শাহিদুল আলম॥ সহযোগী সম্পাদক: শেখ মোঃ আরিফ আল আরাফাত
সহ-সম্পাদক: (প্রশাসন) হাজী হাবিবুর রহমান শাহেদ: সহ সম্পাদক: আজমাল মাহমুদ
সম্পাদক কর্তৃক বাড়ী বাড়ী নং- ৫৩/২, ৪র্থ তলা, রাজ-নারায়ন-ধর রোড, কিল্লার মোড় বাজার, লালবাগ, ঢাকা-১২১১
ফোন: ০১৯১৮-২০১৬২৬, ফোন: ০১৭১৫-৯৩৩১৬৮
ই-মেইল- notunvor.news@gmail.com
Designed By Hostlightbd.com
| Cyberboss.org