টেস্টে বাংলাদেশ অষ্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে অসাধারন খেলে দিন শেষে অল আউট করে লিড নিয়েছে

শুরু আর শেষটা মিলে গেল নিদারুণভাবে। টস জিতে আগে ব্যাটিংয়ের সিদ্ধান্ত বুমেরাং দিনের শুরুতেই, চার ওভারেই সাজঘরে তিন ব্যাটসম্যান। পরের সাত ব্যাটসম্যান আউট হলেন ৯৫ রানের ব্যবধানে। এরপরও মিরপুর টেস্টের প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশের ঝুলিতে ২৬০ রান, সেটা কেবলই সাকিব আল হাসান আর তামিম ইকবালের অসাধারণ ব্যাটিংয়ের কারণেই। দিন শেষে অবশ্য বাংলাদেশের ওই পূজিটাকেও ছোট বলা যাচ্ছে না, ১৮ রান তুলতেই যে ৩ উইকেট খুইয়ে বসেছে সফরকারী অস্ট্রেলিয়া। শুরু আর শেষের ব্যাটিং ব্যর্থতায় যে চাপটা চেপে বসেছিল টাইগারদের ঘারে, শেষ বিকালের দারুণ বোলিংয়ে সেই চাপটা অজিদের ঘারে চাপিয়ে দিয়েই মাঠ ছেড়েছে মুশফিকুর রহিমের দল।
অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে অস্ট্রেলিয়াকে শেষতক টেস্ট খেলার জন্য আনা গেছে বাংলাদেশে। তাই বলে মাঠের লড়াইয়ে দলটিকে কোনো ছাড় দেয়া হবে না। এমন আভাস বেশ আগে থেকেই দিয়ে আসছে টাইগাররা। কেউ কেউ তো দুই টেস্টের সিরিজটা ২-০ ব্যবধানে জিতবেন বলেও হুঙ্কার দিয়েছেন। তাদের এমন হুঙ্কারে বিস্ময় প্রকাশ করেছিলেন স্টিভেন স্মিথ। মুখে সরাসরি না বললেও জবাবটা মাঠে দেয়ার পণই হয়তো করে রেখেছেন। শেষতক সেটা দিতে পারবেন কিনা, তা নিয়ে শঙ্কা থাকছে। তবে মিরপুর শেরেবাংলায় সিরিজের প্রথম টেস্টের শুরুটা তার দল করেছিল স্বপ্নের মতো। দিন শেষে তাদের সেই স্বপ্নের সমাধি হয়ে গেছে, এমনটা বলা যাচ্ছে না এখনই। তবে রঙিন স্বপ্নটা যে কিছুটা হলেও ফিকে হয়ে গেছে,
সেটা বলে দেয়া যায় হলফ করেই।
শেরেবাংলার চার নাম্বার উইকেটটা (যে উইকেটে খেলা হচ্ছে) রীতিমতো স্পিন স্বর্গ। তবে শুরুতে সেখানে পেসাররা কিছুটা সহায়তা পাবেন, এটা জানাই ছিল। কিন্তু টস জিতে ব্যাটিংয়ে নামা বাংলাদেশের টপঅর্ডার ব্যাটসম্যানদের এভাবে পেস আগুনে পোড়াবেন প্যাট কামিন্স, সেটা হয়তো খোদ অস্ট্রেলিয়াও ভাবেনি। এই ডানহাতির গতিঝড়ে চোখের পলকে নেই হয়ে গেল ৩টি উইকেট, অথচ তখন দিনের কেবল ৪টি ওভারই খেলা হয়েছে। বাংলাদেশের ঝুলিতে জমা হয়েছে মোটে ১০ রান। এতদিন যে ২-০, ২-০ করে আসছিল টাইগাররা, সেটা বুমেরাংয়ে উল্টো হয়ে যাওয়ার শঙ্কা তখন চারদিকে। দিন শেষে আপাতত শঙ্কা কিছুটা কেটে গেলেও, টাইগারদের ব্যাটিং নিয়ে আক্ষেপ রয়েই গেছে।
সকালে সৌম্য সরকারকে মনে হয়েছে উইকেটের বাউন্স দেখে ভড়কে যাচ্ছেন। অভিজ্ঞ তামিম ইকবাল অবশ্য নিজেকে সামলে নিয়েই এগিয়েছেন সামনে। কিন্তু পারেননি সৌম্য (৮)। দ্বিতীয় ওভারের পঞ্চম বলে গালিতে ক্যাচ দিয়ে ফিরে যান তিনি। ওই কামিন্সের দ্বিতীয় ওভারের ঠিক পঞ্চম বলেই আউট ইমরুল কায়েস। বাউন্সের সামনে খাবি খেতে থাকা এই বাহাতিকে অফস্টাম্পের বাইরে সস্নো ডেলিভারি দেন কামিন্স। বল শেষ মুহূর্তে খানিকটা নিচু হয়ে যায়। ইমরুল তালগোল পাকিয়ে ব্যাট দিয়ে উইকেটের পেছনে ধরা পড়েন। ঠিক পরের বলে ওয়াইড ইয়র্কারে ওই উইকেটের পেছনে ধরা পড়েন সাবি্বর রহমান (০)। চার ওভারের ভেতর এক কামিন্সই তিন উইকেট নিয়ে নিলেন। সেখান থেকে টাইগারদের হাল ধরেন তামিম আর সাকিব আল হাসান।
টেস্ট ক্যারিয়ারের ৫০তম টেস্ট খেলতে নেমেছেন দুজন। আগেই জানিয়ে রেখেছেন, সামর্থ্যের সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন মাইলফলক ছোঁয়া টেস্টটাকে রাঙাতে। ব্যাটিং বিপর্যয়ে পড়া দলকে টেনে তুলতে সেটা তারা করেছেনও। চতুর্থ উইকেটে তাদের রেকর্ডগড়া ১৫৫ রানের জুটিতেই ঘুরে দাঁড়াতে পেরেছে বাংলাদেশ, দিন শেষে দলের পুঁজিটাও হয়েছে সম্মানজনক। সেটা আরও ভালো হতে পারত, সতীর্থ ব্যাটসম্যানরা যদি নিজেদের চাওয়ার প্রতি একটু যত্নবান হতেন। আগের দিন সংবাদ সম্মেলনে দলপতি মুশফিক জানিয়েছিলেন, এই টেস্টটা তারা সাকিব আর তামিমের জন্য খেলবেন। প্রথম ইনিংসের ব্যাটিংয়ে অন্তত তেমন কিছু দেখাতে পারেননি তারা।
হাবিবুল বাশার, মোহাম্মদ আশরাফুল আর মুশফিকের পর দেশের চতুর্থ এবং পঞ্চম ক্রিকেটার হিসেবে ৫০তম টেস্টের মাইলফলক ছোঁয়া তামিম-সাকিব এদিন ব্যাট হাতে ছিলেন দুর্দান্ত। যে লাথান লায়নকে হুমকি মনে করা হচ্ছিল, এই যুগল তাকে পাত্তাই দেয়নি। বিশেষ করে তামিম, অজি অফস্পিনারকে তো রীতিমতো কোণঠাসা করে ছেড়েছেন। ক্যারিয়ারের ২৪তম হাফসেঞ্চুরির পথে যে তিনটি ছক্কা হাঁকিয়েছেন এই বাহাতি, প্রতিটিই লায়নের বলে। শেষতক আরেক অফস্পিনার গ্লেন ম্যাক্সওয়েলের সাদামাটা এক ডেলিভারিতে কাভারে ক্যাচ দিয়ে তামিম থেমেছেন ৭১ রানে। তার ১৪৪ বলের ইনিংসে ৫টি চারের মারও ছিল।
দলীয় ১৬৫ রানে তামিম ফেরার পরই নতুন করে ব্যাটিং বিপর্যয় শুরু, এরপর আর কোনো ব্যাটসম্যানই থিতু হতে পারলেন না। কিছুটা চেষ্টা করেছিলেন দলপতি মুশফিক আর দীর্ঘ দুই বছর পর টেস্ট দলে ফেরা নাসির হোসেন। দু’জনেই আউট হয়েছেন দীর্ঘদিন পর অস্ট্রেলিয়া দলে ফেরা বাহাতি স্পিনার অ্যাশটন অ্যাগারের বলে। এলবিডবিস্নউর ফাঁদে পরার আগে ৫০ বলে ১৮ রান করেছেন মুশফিক, ৬১ বল খেলে ৩টি চারের মারে নাসির করেছেন ২৩ রান।
এছাড়া ১৮ রান এসেছে মেহেদী হাসান মিরাজের ব্যাট থেকেও। দলের পক্ষে সেরা ইনিংসটা খেলেছেন সাকিব, ম্যাচে লায়নের প্রথম শিকার হওয়ার আগে ১৩৩ বলে ১১টি চারের মারে ৮৪ রান করেছেন এই বাহাতি। তবে সাকিব-মিরাজের নৈপুণ্য ব্যাটিংয়েই শেষ হয়ে যায়নি। শেষ বিকালে বল হাতেও আলো ছড়িয়েছেন তারা। উপমহাদেশে বরাবরই ব্যর্থ অজি ওপেনার ডেভিড ওয়ার্নারকে (৮) এলবিডবিস্নউর ফাঁদে ফেলেছেন মিরাজ। এরপর নাইটওয়াচম্যান হিসেবে নামা লায়নকে ফিরিয়েছেন সাকিব। মাঝে রানআউট হয়েছেন উসমান খাজা। তাতেই ১৪ রানে ৩ উইকেট হারানো অস্ট্রেলিয়াকে ১৮ রান নিয়ে দিন শেষ করেছেন ম্যাট রেনশ, ৬ রানে অপরাজিত এই ওপেনার। ৩ রান নিয়ে তার সঙ্গী দলপতি স্টিভেন স্মিথ। বাংলাদেশের থেকে ২৪২ রানে পিছিয়ে থেকে আজ দ্বিতীয় দিনের ব্যাটিং শুরু করবেন তারা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *