,

ThemesBazar.Com

ট্রাম্প অযোগ্য ও অদুরদর্শী এর প্রেসিডেন্ট

‘আমরা নেতৃত্বহীন। আমেরিকার কোনো প্রেসিডেন্ট নেই। একজন পদ দখল করে আছেন আর একদিন প্রকৃত কোনো প্রেসিডেন্ট এসে তার জায়গায় বসবেন সেই অপেক্ষায় আছে গোটা আমেরিকা’। নিউ ইয়র্ক টাইমসের নিয়মিত কলামিস্ট চার্লস এম ব্লো চলতি সপ্তাহে তার কলামের শুরুটা করেছেন এভাবেই। শুধু চার্লস নয়, সাম্প্রতিক সময় ডোনাল্ড ট্রাম্পের সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রের বেশির ভাগ বিশেষজ্ঞের একই মত। কেউ কেউ তো আরো কড়া ভাষায় সমালোচনা করছেন ট্রাম্পের। এরই মধ্যে আফগান যুদ্ধ নিয়ে নতুন নীতি ঘোষণা করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তবে কাগজে-কলমে কিংবা বক্তৃতা-বিবৃতিতে ‘নতুন আফগান নীতি’ বলা হলেও যা ঘোষণা করা হয়েছে তা আসলে তার পূর্বসূরিদের রেখে যাওয়া ফর্মুলাই। আগের দুই প্রেসিডেন্টের মতো একই পথে হাঁটতে শুরু করেছেন ট্রাম্প, যদিও তার নির্বাচনী অঙ্গীকারের মধ্যে অন্যতম ছিল বিদেশে যুদ্ধে না জড়ানো। কিন্তু ক্ষমতা গ্রহণের সাত মাসের মধ্যেই সেই ওয়াদা থেকে সরে আসতে বাধ্য হলেন ট্রাম্প। শুরু থেকেই উল্টো পথে হাঁটতে অভ্যস্ত ট্রাম্প অন্তত এই একটি ক্ষেত্রে উল্টো পথে হাঁটলে সেটি বিশ্বের জন্য ইতিবাচক হতো নিঃসন্দেহে। ট্রাম্পের এমন সিদ্ধান্তের পেছনে কী আছে সেটি স্পষ্ট নয়। তবে প্রশাসনে সাবেক জেনারেলদের প্রভাব ও হোয়াইট হাউজের অস্থির পরিবেশ এর পেছনে কাজ করছে বলে মনে করা হচ্ছে।

আফগান যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের সবচেয়ে দীর্ঘ যুদ্ধ। ১৬ বছরের এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র কিংবা বিশ্বের লাভ কী হয়েছে, আদৌ কিছু হয়েছে কি না তা এখন আর আলোচনার বিষয় নয়। এটি যে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য পুরোপুরিই একটি ‘লস প্রজেক্ট’ সে ব্যাপারে কারো দ্বিমত থাকার কথা নয়। আর বিশ্ব ব্যবস্থা কিংবা আফগান জাতির জীবনেও এটি একটি বিভীষিকা হয়ে এসেছে। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে সন্ত্রাসী হামলার মাত্র ২৮ দিনের মাথায় আফগানিস্তানে হামলা চালায় বুশ প্রশাসন।

‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’ হিসেবে এই যুদ্ধকে উপস্থাপন করে তারা। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে দেশটির তালেবান সরকারের পতন হলেও যুক্তরাষ্ট্র এখনো এক প্রকার দখল করেই আছে আফগানিস্তান। তালেবানের পতনের পর যুক্তরাষ্ট্রের আশীর্বাদপুষ্ট সরকার ও তাদের বাহিনীকে প্রশিক্ষণের অজুহাতে সেনাবাহিনী রাখার সিদ্ধান্ত নেন তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ। উদারপন্থী হিসেবে পরিচিত বারাক ওবামা প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর ইরাক ও আফগানিস্তান যুদ্ধ শেষ করার অঙ্গীকার করলেও তিনি তা পারেননি। বরং পর্যায়ক্রমে বাড়তে থাকে সৈন্যসংখ্যা একপর্যায়ে যা পৌঁছে যায় লাখের ওপরে। ক্ষমতার শেষ দিকে এসে ‘যুদ্ধ শেষ’ দাবি করে সৈন্য কমাতে থাকেন ওবামা। সাড়ে ১২ হাজার বিদেশী সৈন্য রাখার সিদ্ধান্ত হয় দেশটিতে, যাদের মধ্যে ৯ হাজার ৮০০ মার্কিন সৈন্য।

সন্ত্রাস দমনের অজুহাতে একটি দেশে ১৬ বছরেরও বেশি সময় অবস্থান করছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ তাদের মিত্র দেশগুলোর বাহিনী। স্থিতিশীলতার পরিবর্তে প্রতিদিন আরো খারাপ হচ্ছে আফগানিস্তানের পরিস্থিতি। যুক্তরাষ্ট্র না পেরেছে দেশটিতে শান্তি আনতে, না পেরেছে গৃহযুদ্ধ বন্ধ করতে। যথাযথ কোনো হিসাব না থাকলেও ৩০ হাজারের বেশি বেসামরিক লোক নিহত হয়েছে এই যুদ্ধে। গত কয়েক মাস ধরে আরো বেড়েছে তালেবান ও আল কায়দার কর্মকাণ্ড। দেশটির প্রায় অর্ধেক এলাকার ওপর এখন সরকারের নিয়ন্ত্রণ নেই। তার ওপর নতুন করে উৎপাত শুরু করেছে চরমপন্থী গ্রুপ আইএস। শুধু চলতি বছর জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত নিহত হয়েছে ১৬৬২ জন বেসামরিক নাগরিক। এমন পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের আরো সেনা পাঠানোর খবর এ গোষ্ঠীগুলোকে আরো আক্রমণাত্মক করে তুলতে পারে। তালেবান ইতোমধ্যেই হুমকি দিয়েছে আফগানিস্তানকে মার্কিন বাহিনীর কবরস্থানে পরিণত করবে বলে। ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর অনেকেই আশা করেছিলেন যুক্তরাষ্ট্র হয়তো বিদেশের যুদ্ধ থেকে হাত গুটিয়ে নেবে। বিশেষ করে ট্রাম্পের অঙ্গীকারও যখন ছিল এমন। কিন্তু ট্রাম্প পারলেন না পূর্বসূরিদের দেখানো পথের ব্যতিক্রম করতে।

বুশ, ওবামার যুদ্ধকে এখন ‘ট্রাম্পের যুদ্ধে’ রূপান্তর করতে চলেছেন তিনি। বিবিসির কূটনৈতিক প্রতিনিধি ও বিশ্লেষক জনাথন মার্কাস তার এক কলামে বলেছেন, ‘আফগানিস্তান এখন ট্রাম্পের যুদ্ধে পরিণত হলো। পূর্বসূরিরা যে প্রতিকূল পরিস্থিতির মোকাবেলা করেছে তাকেও তার মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে’। বারাক ওবামা তবু সৈন্য কমানোর একটি প্রক্রিয়া শুরু করেছিলেন, ট্রাম্প উল্টো আরো তিন হাজার ৯০০ সৈন্য পাঠানোর অনুমোদন দিয়েছে। অথচ সেনাবাহিনীর জীবন ও সময়ের মূল্যের গুরুত্বের কথাও তিনি বলেছিলেন ইতঃপূর্বে। এই দীর্ঘ যুদ্ধে নিহত হয়েছে ২৩০০-র বেশি মার্কিন সেনা। খরচ হয়েছে ৮০ হাজার কোটি মার্কিন ডলার। ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি নিয়ে দেশ শাসন শুরু করা ট্রাম্প আর কিছু না হোক অন্তত খরচের কথা চিন্তা করলেও আফগান যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে যাওয়াটাই ছিল স্বাভাবিক।

কিন্তু তা না করে নিজ দেশের আরো সৈন্যকে মৃত্যুকূপে পাঠাতে চলছেন তিনি। সেই সাথে অনিশ্চয়তার চাদরে ঢেকে দিচ্ছেন আফগানিস্তানের ভবিষ্যৎকে। ট্রাম্পের আফগান নীতি প্রসঙ্গে ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ান বলেছে, ‘এর মাধ্যমে মূলত সব দিক থেকে ঝুঁকিতে পরল যুক্তরাষ্ট্র। এই সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের এমন একটি যুদ্ধের মধ্যে আবারো টেনে আনছে যার কোনো স্পষ্ট সংজ্ঞা দেয়া যায় না এবং (বের হওয়ার পরিবর্তে) ভয়াবহ একটি সঙ্ঘাতের মাঝপথে আটকে রাখছে তাদের।’ সাম্প্রতিক সময় রাশিয়া ও চীনের অংশগ্রহণে আফগানিস্তানে একটি নিয়মতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরির যে চেষ্টা শুরু হয়েছিল তা হয়তো শেষ হয়ে যাচ্ছে ট্রাম্পের এই পদক্ষেপে। ন্যাটো জোটের সাথেও ট্রাম্পের সম্পর্ক শুরু থেকেই খারাপ, তারা আফগান যুদ্ধে আরো সেনা পাঠাতে রাজি হবে কী না সেটিও বড় প্রশ্ন।

ট্রাম্প কেন এমন একটি বাজে সিদ্ধান্ত নিলেন সে প্রশ্নের একক কোনো উত্তর নেই। তবে ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই তার যে টালমাটাল অবস্থান তাতে অবশ্য কিছুটা যুক্তি খুঁজে পাওয়া যায়। শুরু থেকেই একের পর এক অশান্তি বিরাজ করছে ট্রাম্পের প্রশাসনে। যে ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তাদের নিয়ে তিনি দেশ শাসনের প্রক্রিয়া শুরু করেছিলেন, তাদের প্রায় সবাই একে একে বিদায় নিয়েছেন। সর্বশেষ গত সপ্তাহে চাকরি গেল হোয়াইট হাউজের চিফ স্ট্র্যাটেজিস্ট স্টিভ ব্যাননের। শুরু হয়েছে শ্বেতাঙ্গ কট্টরপন্থীদের অপতৎপরতা। ট্রাম্প ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্রে উগ্র শ্বেতাঙ্গদের কর্মকাণ্ড ডালপালা মেলতে শুরু করে, ঠিক যেমনটা ভারতে হয়েছে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর। কাজেই এত অস্থিরতার মধ্যে ট্রাম্পের পক্ষে গঠনমূলক সিদ্ধান্ত নেয়া সহজ হবে না সেটাই স্বাভাবিক। এমন পরিস্থিতিতে ট্রাম্প যে দেশ চালাচ্ছেন সেটিই অনেকের কাছে আশ্চর্য লাগছে। ওয়াশিংটন পোস্টের কলামিস্ট জনাথন কেপহার্ট এক লেখায় তো স্পষ্টই বলেছেন, ‘ট্রাম্প প্রেসিডেন্সির যে ক্ষতি করেছেন তা সন্দেহাতীত। জাতির যে ক্ষতি হয়েছে তাও ধারণাতীত। তিনি ক্ষমতায় থাকার অযোগ্য।’

ট্রাম্প প্রশাসনের এখন প্রধান দুই নীতিনির্ধারক হচ্ছেন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এইচ আর ম্যাকমাস্টার ও হোয়াইট হাউজের চিফ অব স্টাফ জন কেলি। দু’জনই আবার সামরিক বাহিনীর সাবেক জেনারেল এবং পরস্পরের বন্ধু। এই দুই কর্মকর্তার কারণেই ট্রাম্প আফগান যুদ্ধ অব্যাহত রাখার পথে পা বাড়িয়েছেন বলে মনে করেন বোস্টন ইউনিভার্সিটির লেকচারার ও মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক বিশ্লেষক গ্রেগরি আফটান্ডিলিয়ন। বিশেষ করে ম্যাকমাস্টার বরাবরই চাইতেন আফগাস্তিানে আরো সেনা পাঠাতে। এ বিষয়ে ট্রাম্পের সাথে তার দ্বিমত থাকলেও তিনিই যে ‘জয়ী’ হলেন তা তো দেখাই যাচ্ছে। ম্যাকমাস্টার ও কেলি উভয় স্টিভ ব্যানন বিরোধী বলে মনে করা হয়। আর হয়তো সে কারণেই ব্যাননকে হারাতে হয়েছে হোয়াইট হাউজের চাকরি। উত্তর কোরিয়া ইস্যুতেও ট্রাম্পের বিরোধী ছিলেন ব্যানন। সব কিছু মিলে যে চিত্র পাওয়া যায় তা হলো, ট্রাম্পের ওপর সাবেক সেনা কর্মকর্তাদের প্রভাব, প্রশাসনে অস্থিরতা আর তার ইমেজ সঙ্কটই তাকে পরিচালিত করছে যুদ্ধের পথে।

ThemesBazar.Com

     More News Of This Category