,

ThemesBazar.Com

নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের এক অনুপম শিক্ষা ঈদুল আজহা

রায়হান আহমেদ তপাদার

কোরবানির ঈদ (ঈদুল আজহা) মুসলিম জাতির অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব। ঈদুল আজহাকে কোরবানির ঈদও বলা হয়। আরবি কোরবান শব্দ হতে এর উৎপত্তি। যার অর্থ ত্যাগের মাধ্যমে নৈকট্য লাভ। প্রতিবছর ১০ জিলহজ ঈদুল আজহা বিশ্বের মুসলমানদের কাছে হাজির হয় আনন্দ সওগাত ও ত্যাগের উজ্জ্বল মহিমা নিয়ে।ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদ পালনের সঙ্গে একটি অনন্য পরীক্ষার ঘটনা বিজড়িত। আজ থেকে প্রায় পাঁচ হাজার বছর পূর্বে মুসলিম জাতির পিতা ইব্রাহিম (আ:)এর মাধ্যমে এ ধর্মীয় অনুষ্ঠান শুরু হয়। হজরত ইব্রাহিম (আ:)এর জানমাল ছিল আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভে নিবেদিত। হজরত ইব্রাহিম (আ:) সর্বাপেক্ষা প্রিয় বস্তু কোরবানি করার জন্য আল্লাহ কর্তৃক আদিষ্ট হন। এটি ছিল হজরত ইব্রাহিম (আ:)এর জীবনের কঠোরতম অগ্নিপরীক্ষা। নতশিরে এ নির্দেশ মেনে নিয়ে প্রিয়তম সন্তান ইসমাইলকে কোরবানি করতে উদ্যত হলেন তিনি। আল্লাহপাক হজরত ইব্রাহিম (আ:)এর কোরবানি কবুল করলেন। ইসমাইল জবেহ হলেন না,ইসমাইলের স্থলে দুম্বা জবেহ হলো।আর সেখান থেকেই শুরু হল মুসলমানদের কোরবানি।এ বিষয়ে আমাদের ভেবে দেখার যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে।ধর্মের নামে নরবলি দেয়ার প্রথা বহু আগ থেকে চলে আসছিল। আল্লাহ্ তাআলা রক্ত-পিপাসু নন যে তাঁর প্রিয় সৃষ্টির রক্তে তিনি তুষ্ট হবেন।হযরত ইবরাহীম (আ:)স্বপ্নের নিজ ব্যাখ্যানুযায়ী সন্তান কুরবানী করতে উদ্যত হয়েছিলেন। আল্লাহ্ তাআলা নরবলি প্রথাকে চিরতরে রহিত করার জন্য এ জবাই হতে দিলেন না। পরে ইবরাহীম (আ:) আল্লাহ্‌র আদেশে পশু জবাই করলেন।

সুতরাং হযরত ইবরাহীম (আ:)এর এ কোরবানীর আত্মা এবং শক্তি নিজেদের মাঝে সৃষ্টি করার লক্ষ্যে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলায়হে ওয়া সাল্লাম তাঁর উম্মতকে পশু কুরবানীর আদেশ দিলেন। তাই বিশ্বের প্রতিটি সামর্থ্যবান মুসলমান প্রত্যেক বছর ১০ই যিলহাজ্জ তারিখে কোরবানী করে থাকে। হযরত ইসমাঈল (আ:)যেভাবে পিতার ছুরির নিচে মাথা পেতে দিয়েছিলেন,কোরবানীর পশু যেভাবে ছুরির নিচে মাথা পেতে দেয় তেমনই প্রত্যেক মুসলমানের এ প্রতিজ্ঞা হওয়া আবশ্যক যেন ধর্মের খাতিরে ইসলামের পথে তারা নিজেদের এ ভাবে কোরবানী করে দিতে পারে।
ইবরাহীম (আ.)এর সুন্নত অনুযায়ী নবী করীম (স:)এর নির্দেশে কোরবানী পালনের মাধ্যমে প্রতি বছর মুসলিম নিজের মাঝে তাক্ওয়াকে আর একবার ঝালিয়ে নেন যেন প্রয়োজনের দিনে আল্লাহ্‌র পথে কোরবানীর পশুর ন্যায় নিজেকে সমর্পণ করতে পারেন।প্রসঙ্গত কোরবানীর শিক্ষা ও তাৎপর্য না বুঝার কারণে কেউ কেউ কটূক্তি করে থাকেন। তাদের দৃষ্টিতে কোরবানী একদিকে যেমন অপচয় অর্থাৎ একদিনে সারা বিশ্বে লক্ষ লক্ষ পশু জবাই করে প্রচুর পরিমাণে প্রোটিনের ঘাটতি সৃষ্টি করা হচ্ছে অন্যদিকে একটা অবোধ পশুকে আল্লাহ্‌র নামে নৃশংসভাবে হত্যা করার ফলে আর একজনের পুণ্যের হাড়ি ভরতি হচ্ছে আপাত দৃষ্টিতে উপরোক্ত উক্তি সঠিক বলে মনে হলেও গভীর দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করলে এটা বোকার উক্তি বলে প্রতীয়মান হবে। আমাদের মনে রাখা দরকার, আল্লাহ্ তাআলা যেসব বস্তু হালাল (বৈধ) করেছেন এর মাঝে যথেষ্ট পরিমাণে বরকত ও প্রবৃদ্ধি রেখে দিয়েছেন। আমরা লক্ষ্য করলে দেখতে পাই গরু ছাগল প্রভৃতির বাচ্চা উৎপাদনের হার কুকুর শূকর ইত্যদির চেয়ে কম-বারেও আর সংখ্যায়ও।

প্রকৃতির দিকে দৃষ্টি দিলে আমরা দেখতে পাই বড়’র বাঁচার জন্যে ছোট সব সময় প্রাণ দিচ্ছে। ছোট মাছ বড় মাছের জন্যে জীবন দিচ্ছে। বাঘ, সিংহ প্রভৃতি পশু ছোট ছোট নীরিহ প্রাণী খেয়ে বেঁচে আছে। যারা অতি দরদ দেখিয়ে গুরু ছাগল জবাই করার ব্যাপারে কটূক্তি করেন তাদের যদি জিজ্ঞেস করা হয়, জীব হত্যা করতে পারবেন না, একথা পালন করলে তারা কি বাঁচবেন? বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে, গাছ লতা-পাতা এদের সবার প্রাণ আছে। এদের ওপর আমরা সবাই নির্ভরশীল। তাদের সাথে অসংখ্য জীবাণু আত্মবলি দিচ্ছে। এ কি তাদের জানা আছে। প্রকৃত কথা এই,ক্ষুদ্রের আত্ম ত্যাগের মাধ্যমেই বৃহৎ’-এর জীবন আর এর মাঝেই ক্ষুদ্রের জীবনের সার্থকতা রেখে দিয়েছেন আল্লাহ্ তাআলা।কিন্তু মানুষ সৃষ্টির সেরা। তাই তার সেবায় জীব-জন্তু বৃক্ষ তরুলতা থেকে আরম্ভ করে সব কিছু নিয়োজিত এদের কুরবানীতে মানব জীবন বাঁচে এবং এদের জীবন হয় সার্থক। এ উদ্দেশ্যেই আল্লাহ্ এদের সৃষ্টি করেছেন। তবে এদের প্রতি আমাদের যে কর্তব্য রয়েছে আমরা তা যেন ভুলে না যাই। অতএব প্রকৃতির মাঝে কুরবানী ও ত্যাগের মহিমাই যে প্রতিনিয়ত কাজ করে যাচ্ছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এ ভাবেই আল্লাহ্ প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষার ব্যবস্থা করেছেন।কুরআন হাদীস এবং বুযুর্গানে দীনের ভাষ্য থেকে যতটুকু জানা যায় কুরবানীর পেছনে যে উদ্দেশ্যটি কাজ করা আবশ্যক তা হলো তাক্ওয়া বা খোদার সন্তুষ্টি। হযরত ইবরাহীম (আ:)তাঁর একমাত্র পুত্র হযরত ইসমাঈল (আ:)কে খোদার সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে জবাই করতে উদ্যত হয়েছিলেন। যে কুরবানীর পেছনে এ উদ্দেশ্য ও আত্মা কাজ করে না সে কুরবানী, কুরবানীর আওতায় পড়ে না।

ঈদুল আজহা মুসলমানদের জাতীয় জীবনে আল্লাহর প্রতি আনুগত্য প্রকাশের এক গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। লোভ-লালসায় জর্জরিত এ মায়াময় পৃথিবীতে ত্যাগের সুমহান আদর্শে উজ্জীবিত হতে না পারলে কেউ আল্লাহর নৈকট্য লাভ করতে পারবে না। কোরবানির মহান স্মৃতি মানুষের মনে ত্যাগের মহান স্পৃহাকে নবরূপে জাগ্রত করে তোলে। প্রকৃতপক্ষে কোরবানির শিক্ষা এবং তাৎপর্য ও ত্যাগ মানুষের মন থেকে পশু প্রবৃত্তির বিনাশ সাধন করে এবং বৃহত্তর মানব প্রেমের শিক্ষা দেয়। ঈদুল আজহার তাৎপর্য ও কোরবানির মাহাত্ম্যের প্রতি গুরুত্ব আরোপ করে মহানবী (স:) বলেন,যে ব্যক্তি সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কোরবানি করে না,সে যেন ঈদগাহের কাছে না আসে।(ইবনে মাজা: ৩১২৩ )।ঈদুল আজহার কোরবানির মাধ্যমে মানুষের মনের পরীক্ষা হয়, কোরবানির রক্ত-গোশত কখনই আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না। শুধু দেখা হয়, মানুষের হৃদয়কে। ঈদের মধ্যে আছে সাম্যের বাণী সহানুভূতি শীল হৃদয়ের পরিচয়। পরোপকারের ও ত্যাগের মহান আদর্শে অনুপ্রাণিত হয় মানুষের মন।পবিত্র কোরআনে মহান রাব্বুল আলামিন বলেন,কোরবানির জীবের রক্ত-গোশত কোনোটাই আল্লাহর কাছে পৌঁছে না,বরং পৌঁছে তোমাদের খোদাভীতি ও আন্তরিকতা। (সুরা হজ:৩৭)।সুতরাং কোরবানি করার ক্ষমতাসম্পন্ন প্রত্যেক মুসলমান নর-নারীর উচিত কেবল আল্লাহ্ তায়ালাকে সন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্যেই ঈদুল আজহায় নিখুঁতভাবে কোরবানি আদায় করতে যত্নবান হওয়া।মহামহিম রাব্বুল আলামিন আমাদের সবাইকে ঈদুল আজহার আত্মত্যাগ ও কোরবানির মহান আদর্শে উদ্বুদ্ধ করে মানব এবং সৃষ্টির সেবায় নিয়োজিত হওয়ার শিক্ষা গ্রহণের তাওফিক দান করুন।

ThemesBazar.Com

     More News Of This Category