,

ThemesBazar.Com

ট্রাম্পের নতুন ট্রাভেল ভ্যান

  প্রফেসর রায়হান আহমেদ তপাদার

  মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কিছু মুসলিম-প্রধান দেশের নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ নিষিদ্ধ করে নতুন একটি নির্দেশনা জারি করেছেন।এ ব্যাপারে আগের জারি করা নিষেধাজ্ঞা আদালতে খারিজ হয়ে যাওয়ার পর নতুন আরেকটি নির্বাহী আদেশ দেওয়া হলো।নতুন নির্দেশনায় নিষেধাজ্ঞার তালিকা থেকে ইরাকের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। তবে এবারও আগের তালিকার বাকি ছয়টি দেশকে রাখা হয়েছে-ইরান, সিরিয়া, ইয়েমেন, সুদান, লিবিয়া এবং সোমলিয়া।প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রশাসনের যুক্তি হচ্ছে এই নিষেধাজ্ঞা আমেরিকাকে সন্ত্রাসবাদের হাত থেকে নিরাপদ রাখার জন্য দরকার।প্রথম আদেশে ইরাক, ইরান, সিরিয়া, ইয়েমেন, সুদান লিবিয়া এবং সোমালিয়ার নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্রে ঢোকা নিষিদ্ধ করা হয়েছিল।ট্রাম্পের একজন সহযোগী কেলিয়ান কনওয়ে বলেছেন, নতুন এই আদেশে ইরাককে বাদ দেওয়া হলেও অন্য দেশগুলোর ওপর ৯০ দিনের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকবে।অবশ্য এসোসিয়েটেড প্রেসের এক খবরে বলা হয়েছে, কংগ্রেসের এমন একটি দলিল তারা দেখেছে যাতে বলা হয়েছে যে যাদের বৈধ ভিসা আছে তাদের ক্ষেত্রে এই নিষেধাজ্ঞা প্রযোজ্য হবে না।এছাড়া যারা গ্রীনকার্ড বা যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসের স্থায়ী অনুমোদনপ্রাপ্ত, তারাও ওই নতুন নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়বেন না। মার্কিন বাহিনীর অনুবাদক হামিদ দারভিশের মত ইরাকিরা এবার নিষেধাজ্ঞা থেকে বাদ পড়লেন।মার্কিন বাহিনীর অনুবাদক হামিদ দারভিশের মত ইরাকিরা এবার নিষেধাজ্ঞা থেকে বাদ পড়লেন।বার্তা সংস্থা রয়টার্স বলছে,নতুন আদেশে শরণার্থীদের ক্ষেত্রে ১২০ দিনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে ঢোকা নিষিদ্ধ করা হয়েছে।পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসন বলেছেন,‘কট্টর ইসলামপন্থী সন্ত্রাসীদের ধ্বংসাত্মক পরিকল্পনা নির্মূল করার লক্ষ্যেই এই আদেশ জারি করা হয়েছে।আগামী ১৬  মার্চ থেকে এই নতুন আদেশ কার্যকর হবে।ফলে ১০ দিনের এই আগাম নোটিশের কারণে হয়তো যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবন্দর গুলোতে এর আগেরবার যে বিশৃঙ্খল অবস্থা সৃষ্টি হয়েছিল তা এড়ানো সম্ভব হবে।কারণ আগের আদেশটি দেওয়া হয়েছিল কোন পূর্ব সতর্কতা ছাড়াই।   মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সাত মুসলিম-প্রধান দেশের নাগরিকদের ওপর স্থগিত হয়ে যাওয়া নিষেধাজ্ঞা সংশোধন করে নতুন ‘মুসলিম নিষেধাজ্ঞা’জারি করেছেন।তবে আগের নিষেধাজ্ঞায় যেসব বিষয় নিয়ে বিতর্কের মুখে পড়ে ট্রাম্প প্রশাসন,এবার তাতে কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে।নতুন নিষেধাজ্ঞা প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষরের পরপরই কার্যকর হচ্ছে না। ১০ দিন পর ১৬ মার্চ থেকে তা কার্যকর হবে। এর আগে ২৭ জানুয়ারির নিষেধাজ্ঞা ট্রাম্পের স্বাক্ষরের পরপরই কার্যকর হয়েছিল। এর ফলে ভিসা থাকা সত্ত্বেও হাজার হাজার মানুষ যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে পারেননি। ওই সাত দেশের অনেক নাগরিককে বিমানবন্দর থেকে, এমনকি বিমান থেকেও নেমে আসতে হয়। যারা যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেছিলেন, তাদের আটক করা হয়।আর তখনই ওই নিষেধাজ্ঞা নিয়ে প্রশ্ন উঠে বিভিন্ন মহল থেকে।মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেট (আইএস)-এর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম সহযোগী ইরাক। মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে সহযোগিতার জন্য এবারের নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকেনি ইরাক।সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসন জানান, ইরাকে স্ক্রিনিং কার্যক্রম জোরদার করার জন্যই দেশটিকে এবারের নিষেধাজ্ঞার অন্তর্ভূক্ত করা হয়নি। তিনি আরও বলেন,ইরাক আমাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে। আমরা চাই,ওই অঞ্চলের অন্যান্য দেশও এভাবে এগিয়ে আসুক।আগের নিষেধাজ্ঞায় নিষেধাজ্ঞায় বলা হয়েছিল, সাত দেশের ওপর ৯০ দিনের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা ও শরণার্থীদের ক্ষেত্রে ১২০ দিনের নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। তবে সিরীয় শরণার্থীদের গ্রহণের ক্ষেত্রে এই নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ ছিল অনির্ধারিত। তবে এবারের নিষেধাজ্ঞায় ছয়টি দেশের ওপরই ৯০ দিনের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।আগের নিষেধাজ্ঞায় বলা হয়,সিরীয় নাগরিকদের শরণার্থী হিসেবে গ্রহণ করাটা মার্কিন স্বার্থ ক্ষুণ্ন করবে।উল্লেখ্য,পূর্ববর্তী ওবামা প্রশাসন ২০১৬ সালে ১০ হাজার সিরীয় শরণার্থীকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের সুযোগ দিয়েছিল।  নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা নতুন ছয় মুসলিম-প্রধান দেশের নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাসের বৈধ কাগজপত্র থাকলে তারা নিষেধাজ্ঞায় অন্তর্ভুক্ত হবেন না। যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাসের বৈধ কাগজপত্র ‘গ্রিন কার্ড’ নামে পরিচিত।আগের নিষেধাজ্ঞায় ভিসা, গ্রিন কার্ড, বা দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকা হাজার হাজার মানুষও যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশাধিকার হারিয়েছিলেন।এবারের নিষেধাজ্ঞায় ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বিষয়ে আলাদা করে কিছু বলা হয়নি। ২৭ জানুয়ারির নিষেধাজ্ঞায় বলা হয়েছিল, নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত সাত মুসলিম-প্রধান দেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় চাইতে পারবে। এবার নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত দেশগুলোর খ্রিস্টান বা অন্য ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা কোনও ছাড় পাচ্ছেন না। ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা অবশ্য এজন্য এই নিষেধাজ্ঞাকে মুসলিম নিষেধাজ্ঞা বলতে নারাজ। এবারের নিষেধাজ্ঞায় আগেরবারের মতোই মার্কিন শরণার্থী কার্যক্রম ১২০ দিনের জন্য বন্ধ রাখা হয়েছে।এর আগে ১৬ ফেব্রুয়ারি ট্রাম্প জানিয়েছিলেন, ‘নতুন নিষেধাজ্ঞায় আদালতে তোলা প্রশ্নগুলোর মীমাংসা করা হবে। কেননা, ফেডারেল আপিল আদালতের আদেশে তার আগের নির্বাহী আদেশটি স্থগিত হয়ে গেছে।তিনি তখন আরও বলেছিলেন, ‘নতুন আদেশটি অনেক নিখুঁত হবে। আমরা এমন নির্বাহী আদেশ জারি করব, যা আমাদের দেশকে ব্যাপকভাবে সুরক্ষা দেবে।উল্লেখ্য,হোয়াইট হাউসে আয়োজিত এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশ অনুসারে নতুন ‘মুসলিম নিষেধাজ্ঞা’র ঘোষণা দেওয়া হয়। ওই সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন মার্কিন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেলি, পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসন ও আইনমন্ত্রী জেফ সেশনস।নতুন জারি করা নিষেধাজ্ঞায় আগের তালিকায় থাকা ইরাককে বাদ দেওয়া হয়েছে। তবে অপর ছয়টি দেশের নাগরিকদের জন্য নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখা হয়েছে।  ট্রাম্পের জারি করা নতুন এ নিষেধাজ্ঞায় বলা হয়েছে, ইরান, লিবিয়া, সোমালিয়া, সুদান, সিরিয়া ও ইয়েমেনের যেসব নাগরিকদের বৈধ ভিসা নেই তারা আগামী ৯০দিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে পারবেন না। ১৬ মার্চ থেকে নিষেধাজ্ঞাটি কার্যকর হবে।প্রসঙ্গত, ক্ষমতা গ্রহণের পরই ২৭ জানুয়ারি এক নির্বাহী আদেশে সাত মুসলিম-প্রধান দেশের নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্র সফরে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। পরে সিয়াটলের একজন বিচারক ট্রাম্পের ওই নিষেধাজ্ঞা স্থগিতের আদেশ দেন। ট্রাম্প প্রশাসন ওই আদেশের বিরুদ্ধে আপিল করলেও সান-ফ্রান্সিসকোভিত্তিক তিন বিচারকের প্যানেল তা খারিজ করেন।কিন্তু প্রায় সব ধরনের অভিবাসনের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ওই নির্বাহী আদেশ মূলত অবৈধ। কেননা এখন থেকে ৫০ বছর আগে জাতিগত পরিচয়ের ওপর ভিত্তি করে অভিবাসীদের বিরুদ্ধে এমন বৈষম্য বেআইনি বলে ঘোষণা করেছিল যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস। জাতিগত পরিচয়ের কারণে অভিবাসীদের যুক্তরাষ্ট্রে ঢুকতে না দেয়ার একটা দীর্ঘ ও লজ্জাকর ইতিহাস দেশটিতে ছিল। আর এ লজ্জা থেকে বাঁচতে এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছিল কংগ্রেস। এ ইতিহাস শুরু হয়েছিল ১৯ শতকের শেষের দিকে। আইন করে প্রথমে চীনের সব নাগরিকের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল। এরপর প্রায় সব জাপানিই এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়ে। তারপর তথাকথিত এশিয়াটিক ব্যারড জোন অর্থাৎ এশীয় নিষিদ্ধ অঞ্চল নামে সব এশীয়কেই নিষিদ্ধ করা হয়। অবশেষে ১৯২৪ সালে পশ্চিম ইউরোপীয়দের সুবিধা দিতে এবং অধিকাংশ পূর্ব ইউরোপীয় এশীয় ও আফ্রিকার অধিবাসীদের বাদ দিতে অভিবাসন কোটা বিকৃত করে ‘ন্যাশনাল-অরিজিন সিস্টেম’ তৈরি করে কংগ্রেস।নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে এক নতুন ধরনের এশিয়াটিক ব্যারড জোন বা এশীয় নিষিদ্ধ অঞ্চল পুনরায় চালু করলেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।   কিন্তু এক্ষেত্রে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সামনে কেবল একটি সমস্যা আর তা হল; ১৯৬৫ সালের ‘দ্য ইমিগ্রেশন অ্যান্ড ন্যাশনালিটি অ্যাক্ট’ বা অভিবাসন ও জাতীয়তা আইন জাতিগত পরিচয়ের ওপর ভিত্তি করে সব অভিবাসীর বিরুদ্ধে সব ধরনের বৈষম্য বাতিল করেছিল। এ আইন পুরনো ব্যবস্থা বদলিয়ে অভিবাসন কোটার ক্ষেত্রে প্রত্যেক দেশকে সমান সুবিধা দিয়েছিল। নতুন ওই আইনে স্বাক্ষর করে প্রেসিডেন্ট লিনডন বি. জনসন বলেছিলেন, “এই আইনের মাধ্যমে জাতিগত পরিচয়ে অভিবাসন কোটা ব্যবস্থায় যে ‘কঠিন অন্যায়’ চলছিল তার বিলোপ হল।” তা সত্ত্বেও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জোর দিয়ে বলছেন, বৈষম্য করার ক্ষমতা তার আছে। তিনি এটা বলছেন ১৯৫২ সালের একটি আইনের ওপর ভিত্তি করে। ওই আইন বলে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের জন্য ক্ষতিকর বিবেচনায় ‘যে কোনো শ্রেণীর অভিবাসীর যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ বাতিল করার ক্ষমতা প্রেসিডেন্টের রয়েছে। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ১৯৬৫ সালের অভিবাসন অ্যাক্টে এ ক্ষমতা যে কংগ্রেস রহিত করেছিল সে সত্যকে অগ্রাহ্য করছেন। ১৯৬৫ সালের ওই অভিবাসন আইনে পরিষ্কারভাবে বলা আছে, ব্যক্তির জাতি, লিঙ্গ, জাতীয়তা, জন্মস্থানের কারণে কোনো অভিবাসীর ভিসা ইস্যুর বিরুদ্ধে কোনো ধরনের বৈষম্য করা যাবে না।’ ১৯৬৫ সালে কংগ্রেস যখন ওই আইন পাস করেছিল, এটা শুধু অন্য দেশের অভিবাসীদের রক্ষা করতে চায়নি, বরং মার্কিন নাগরিকদেরকেও রক্ষা করতে চেয়েছিল। ওই আইন বলে মার্কিন নাগরিকদের তাদের পরিবারের সদস্যদের পৃষ্ঠপোষকতা দেয়া বা কোনো ধরনের বৈষম্য ছাড়াই বিদেশী কোনো নাগরিককে বিয়ে করার অধিকার রয়েছে।যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসী প্রবেশ ও ভিসা ইস্যু করার মধ্যে একটা পার্থক্য নির্দিষ্ট করে জাতিগত পরিচয়ের ওপর ভিত্তি করে কোনো বৈষম্য প্রচলন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প চাইতে পারেন। তবে সেটা নির্বোধের মতো একটা কাজ হবে।এখন দেখার বিষয় আগের আদেশটির মতো নতুন আদেশটিও আইনি চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয় কি না।                                              কলাম লেখক                                     raihan567@yahoo.com

Sent from Yahoo Mail on Android

 

ThemesBazar.Com

     More News Of This Category