,

ThemesBazar.Com

প্রবাসে ঈদ আনন্দ

  রায়হান আহমেদ তপাদার

আরব দেশের পশ্চিমাকাশে শাওয়ালের চাঁদ ভেসে উঠার পরই চোখে ভেসে আসছে চিরচেনা সেই গান ‘ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে এল খুশির ঈদ‘।সৌদি আরবে শাওয়াল মাসের চাঁদ দেখা গেছে। মধ্যপ্রাচ্যর সাথে সংগতি রেখে ইউরোপ,আমেরিকাসহ পশ্চিমাপ্রায় সকল দেশেই উৎযাপিত হয় পবিত্র ঈদ উল ফিতর।পৃথিবীর প্রায় প্রত্যক দেশে ঈদ উদযাপনের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে কয়েকদিন আগে থেকেই।লন্ডনসহ ব্রিটেনজুড়ে যথাযোগ্য ধর্মীয় ভাব-গাম্ভীর্য ও উৎসাহ উদ্দীপনায় ঈদ উদযাপন সম্পন্ন হয়েছে।এক মাস সিয়াম সাধনার পর পবিত্র ঈদুল ফিতর সবার জীবনে বয়ে আনুক অনাবিল সুখ,শান্তি ও সমৃদ্ধি।সিয়াম সাধনার মাস রমজান ব্যক্তি জীবনকে সুন্দর,পরিশুদ্ধ ও সংযমি করে। মুমিন মুসলমানগণ মাসব্যাপী সিয়াম সাধনার পর অনাবিল আনন্দের বার্তা নিয়ে আসে ঈদুল ফিতর।আর ঈদুল ফিতরের উৎসবে সমাজের সকল মতভেদ ও সীমানা অতিক্রম করে মানুষে মানুষে মহামিলন ঘটায় ও সৃষ্টি করে পরষ্পরের প্রতি আন্তরিক মমতাবোধ ও শ্রদ্ধাবোধ।মাহে রমজান আসতে না আসতেই খুব দ্রুত চলে যায়। খুশির র্বাতা নিয়ে উদিত হয়- ঈদের ‘বাঁকা চাঁদ’।ঈদের চাঁদ উঠলেই হঠাৎ করে প্রবাসীদের চোখের পাতা ভিজে ওঠে।ঈদে প্রবাসীরা মা-বাবার পা ধরে ‘কদমবুছি’ করতে পারে না। মা-বাবার কবর জেয়ারতও করতে পারে না। সন্তানদের আদর করতে পারে না। সন্তানদের নানা রকম বায়না ধরার হাসি-কান্না উপভোগ করতে পারে না। ঈদের মার্কটিং নিয়ে গিন্নির মান-অভিমান দেখতে পারে না। ছোট বাচ্চাদের ‘ঈদ সেলামী’দিয়ে তাঁদের ‘তৃপ্তির হাসি’ দেখতে পারে না। এই দুঃখ বেশির ভাগ অভাগা প্রবাসীদের।আরবের ঘরে ঘরে আনন্দ। রাস্তায় রাস্তায় খুশির জোয়ার। শপিংমলে কেনা কাটা শেষে এখন অনেকটাই ফাঁকা। লাখো মানুষের পদচারণায় পিষ্ট এই শপিংমলকে ঝাড়ু দিয়ে পরিস্কার করতে করতে চোখ জলে টলমল করে উঠে আবুল মিয়ার।গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়া চোখের জল মিশে যায় তীব্র গরমে গা থেকে বেরিয়া আসা দুর্গন্ধময় ঘামের সঙ্গে। প্রবাসীদের মনে কেবল একটাই যাতনা এত কষ্টের পরও ছেলেমেয়েদের ঈদের কাপড় কিনেই টাকা শেষ।তিন ঈদ চলে গেলও মায়ের জন্য কিনতে পারেনি কিছুই।ঠিক এমন সময় দেশ থেকে ফোন আসে।ফোনে ওপার থেকে মা জিজ্ঞেস করেন,বাজান কি কর? চোখ মুছতে মুছতে আবেগ সামলে রফিক মিয়া বলেন মা,সব বন্ধু বান্ধব মিলা সেমাই খাই।এটাই হলো মধ্যপ্রাচ্যে বাঙ্গালিদের ঈদ।ব্যতিক্রম যে নাই তা নয়। যারা একটু পুরাতন, বাড়িতে টাকার চাপ যাদের একটু কম, যাদের কপাল একটু ভাল তারা অনেকে ঈদে বেশ মজাও করেন। রান্না করেন সেমাই পোলাও উটের গোস্ত। গায়ে জড়ান নতুন জামা। আরবদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ঈদগাহে ঈদের নামাজও আদায় করে থাকেন।তবে মিশরে বাংলাদেশিদের অবস্থা কিছুটা ব্যতিক্রম। এখানে সাধারণত দুই শ্রেণির বাংলাদেশি আছেন। ছাত্র এবং গার্মেন্টস কর্মী। ছাত্রদের হাতে টাকা পয়সা কম থাকলেও তারা মোটামুটিভাবে ভালই ঈদ উৎযাপন করে থাকেন।যারা হোস্টেলে থাকেন তারা বিভিন্ন দেশের বন্ধুদের সঙ্গে নামাজ আদায় করেন। খাওয়া দাওয়া সব শেয়ার করেন। নতুন জামাকাপড় পরেন। আর যারা বাসা ভাড়া করে থাকেন তারা অনেকে আগের রাতেই কিছু রান্না করে রাখেন। ভোরে নামাজ আদায় করে এসে কিছু খেয়ে ঘুম দেন। দুপুরে উঠে বন্ধু বান্ধবদের সঙ্গে দেখা করে আড্ডা দেন। সন্ধ্যায় ছাত্র সংগঠনের অনুষ্ঠানে যোগ দেন তারপর রাতভর আড্ডা অথবা নীলনদের পাড়ে ঘুরতে যান। অপরদিকে গার্মেন্টস কর্মীরা ঈদে তিন চারদিন ছুটি পান। তারা সাধারণত এক সঙ্গে অনেকজন থাকেন। কাজেই তাদের ঈদ আনন্দটা একটু বেশিই। খাবার আয়োজনেও তারা বেশ মনযোগী। পাঁচ সাত জন মিলে মিলে রান্না করেন। দুপুরে বিভিন্ন জাগায় ঘুরতে যান। সন্ধ্যায় অনেক সময় অনুষ্ঠানের আয়োজন করে থাকেন। একসঙ্গে গান গান ও মজা করেন। রাতে শুরু হয় দেশে ফোন করার প্রতিযোগিতা। কারণ পরের দিন বাংলাদেশে ঈদ। সারাদিন যতই উৎফুল্ল থাকুক রাতে দেশে কথা বলতে গিয়ে সবাই আবেগী হয়ে ওঠেন। পাওয়া না পাওয়া হিসেব মিলাতে না পেরে সবাই প্রায় একই মুখস্ত উত্তর দেয়, অনেক কিছু খাইছি অনেক মজা করছি আমি ভাল আছি আমাকে নিয়ে চিন্তা করো না। প্রবাসে যান্ত্রিক জীবনের মাঝে ঈদের মহা আনন্দকে বরণ করে নিতে হয়। যার একমাত্র যৌক্তিক কারণ দেশ নয় বিদেশ। ঈদ মানেই তো হাসি, আনন্দ ও উল্লাস। তবু আনন্দের মাঝে কোনো কোনো কাল নিরানন্দ থাকে। একটি বছর কত চড়াই উৎরাই পার করতে হয় মানব জীবনে। কিন্তু বছরের দুইটি দিন এলে দুঃখ, বিরহ-বেদনা, ক্লেশ সব দূর হয়ে যায়। ঈদের পূরবর্তী বার্তার আগমনে। ক্ষণিকের জন্য হলেও ঈদের খুশিতে সব রাগ-রাগিনীর অবসান টানে।পবিত্র ঈদুল ফিতরের একটি তাৎপর্য এবং ঈদুল আযহার আরেকটি তাৎপর্য। তাই দুটো খুশির দিন ভিন্ন মাত্রার আনন্দ বয়ে আনে আমাদের জীবনে। হাসি, খুশির মাঝে আছে নীরব কান্না। মুখ আছে, বুলিও আছে। কিন্তু বুঝাবার যেন সাধ্য নেই। দেশে বিদেশে ঈদের আনন্দ সম্পূর্ণ আলাদা।প্রবাসে আমাদের ঈদ। সকালে উঠেই কর্মময় জীবনের প্রথম অধ্যায় শুরু হয়। একজন মুসলিম হিসেবে ফজর নামাজ আদায় করে রুটিন অনুযায়ী কাজে যোগ দিতে যাত্রা শুরু করতে হয়। এরপর কর্মস্থলে একটি ব্যস্ত সময় কাটে। সকালের সূর্য পূর্বদিকে উদিত হয়ে পশ্চিম দিকে অস্ত যাওয়া পর্যন্ত জীবন পরিবর্তনের আশায় প্রবাসে কর্মময় রশি টানতে হয়। বিরতিহীন চলতে থাকে কর্মশালা।হয়তো জীবন উন্নয়নের ভাগ্য পরিবর্তন হওয়ার পূর্ব মুহূর্তে পর্যন্ত প্রবাসের এ ব্যস্ততা চালিয়ে যেতে হবে। এর মাঝে পার হবে আরো কত ঈদ। আমার কাছে অধরা হয়ে থাকবে ঈদের খুশি। তবু প্রবাসের যান্ত্রিক জীবন নিয়ে বেশি একটা খারাপ নেই। মাঝে মাঝে একটুতো খারাপ লাগবেই। কারণ বাংলাদেশ আমার মাতৃভূমি। যার কৃষ্টি, সংস্কৃতিতে জীবনের প্রথম পথচলা। তাই ইচ্ছে করলেই এই শিকড় থেকে নিজেকে বেশি দূরে রাখা সম্ভব নয়। বেশি খারাপ লাগে ঈদ এলেই।তাই হয়তো একটু বেশি আবেগে আপ্লুত হই।মায়াবী মায়ার টান বাড়ে স্বদেশে রেখে আসা মা, বাবা,আত্মীয়,পরিবার পরিজনসহ আরও আপনজনদের জন্য। স্বদেশে ঈদের এক, দুই সপ্তাহ আগেই চারিদিক আনন্দে জোয়ার বইতে শুরু করে। ঈদুল ফিতরে রমজানের বাহারি ইফতার আর ঈদুল আযহার সময় কোরবানি করার ধুম।এই ভিন্ন ভিন্ন আনন্দ মনকে উতলা করে তুলে। বেদনাসিক্ত মন থাকলেও এই মহাখুশির দিনে সব ধেয়ে যায় অজানা ঠিকানায়। প্রবাসে একজন অন্যজনের দাওয়াতী মেহমান হিসেবে বাসায় আসে। ঘরোয়া পরিবেশে কতইনা মজা হয়। যা এক সময়ে স্মৃতির ফ্রেমে বন্দী হয়ে রয়। এই আনন্দময় সময় গল্প, গুজব প্রবাসে আধুনিকায়নের যুগে সব থাকা সত্ত্বেও পাওয়া যায় না। তাই চিরস্মরণীয় এই দিনে বিলেত থেকে মনে পড়ে সবাইকে।প্রবাসে সবই আছে। নেই লাল সবুজের সুজলা,সুফলা শস্য, শ্যামলের বাংলাদেশ। ঈদ আছে। নেই ঈদের আনন্দ।প্রতিবেশীও আছে।নেই মনের মতন প্রতিবেশী।এই খন্ড খন্ড হৃদয়ের চাওয়াগুলো প্রবাসের এতো চাকচিক্যের মাঝে মন ভরে না। ফিরে যেতে মন চায় মাটির টানে স্বদেশের আঙিনায়িং।মানুষ যেখানে যায় সেখানে দুটো শক্তি যায় তার সাথে। এক- বিশ্বাস। দুই-সংস্কৃতি। বিদেশে এই সময়ে যে লাখ লাখ বাঙালি তাদের স্থায়ী নিবাস করে নিয়েছেন- তারাও মূলত এই শক্তিতে বলীয়ান। ধর্ম, বিশ্বাসের একটি স্তর। অভিবাসীদের আনন্দের একটি অন্যতম দিন হলো-ঈদ।ঈদ এলেই অভিবাসী বাঙালির মনের ক্যানভাসে যে চিত্রটি ফুটে ওঠে, তা হলো স্বদেশের মুখ। কেমন আছেন স্বজন? কেমন আছে জন্মমাটি? প্রবাসে ঈদের আনন্দ মানেই হচ্ছে এক ধরনের তীব্র শূন্যতা। কথাটি সব প্রবাসীই স্বীকার করবেন একবাক্যে। তার কারণ হচ্ছে, ঈদের দিনটি এলেই এক ধরনের নস্টালজিয়া মনটাকে ভারি করে তোলে। ফেলে আসা সেই শহর কিংবা গ্রাম, সেই আড্ডা, সেই মধুর স্মৃতি, মা-মাতৃভূমির টান বুকের পাঁজরে দোল খেয়ে যায়। আহা! সোনার আলোয় ভরা সেই দিনগুলো…।প্রবাসে ঈদের অভিজ্ঞতা আমার তিন দশকের বেশি সময়ের। বিদেশের বিভিন্ন দেশে ঈদ করতে গিয়ে যে সত্যটি খুব একান্তভাবে প্রত্যক্ষ করেছি তা হচ্ছে, প্রবাসে একজন বাঙালিই অপর বাঙালির ঘনিষ্ঠ স্বজন। তা পরিচিত হোক অথবা অপরিচিত। মুসলিম অধ্যুষিত দেশগুলোতে ঈদের আনন্দই আলাদা। পবিত্র রমজান মাস এলেই রোজার আমেজে সিক্ত হয়ে ওঠে পুরো নগরী। ধর্মপ্রাণ মানুষের উপাসনা, ইফতারির বাহারি আয়োজন সৃষ্টি করে একটি ভাবগম্ভীর পরিবেশের। ঢাকা, দুবাই কিংবা দোহা’র মতো শহরগুলোতে রমজানের বিকেলের প্রতিটি দিনই যেন হয়ে ওঠে উৎসবের দিন। তারপর আসে ঈদ,পরম উৎসবের দিন। আনন্দের সেই প্রতীক্ষিত দিন। তার আগে আছে ঈদের বাজার।ইউরোপ-আমেরিকায় সেই আবহের ভিন্নতা স্পষ্ট। তার কারণ হচ্ছে, এখানে ঈদ একটি সম্প্রদায়ের উৎসব, যে সম্প্রদায়ের লোকসংখ্যা পুরো রাষ্ট্রের জনসংখ্যার সামান্য অংশ মাত্র। আমেরিকায় ঈদ করতে গিয়ে সেই শূন্যতা আরও তীব্রভাবে অনুভব করেছি। সপরিবারে নিউইয়র্কে স্থায়ী নিবাস গড়ার পর এই নগরীটি হয়ে উঠেছে আমাদের দ্বিতীয় নিবাস। নিউইয়র্কে ক্রমবর্ধমান বাঙালি অভিবাসনের সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে ধর্মীয় কালচারও। সিলেটের জিন্দাবাজার কিংবা ঢাকার নবাবপুর রোডের স্টাইলে এখানে এখন তৈরি হচ্ছে ইফতারি। ভারতীয়-বাংলাদেশী বিপণি বিতানগুলো ঈদ উপলক্ষে সজ্জিত হচ্ছে আলোকসজ্জায়। রীতিমতো জমজমাট ঈদের বাজার। নিউইয়র্কের বাঙালি পোশাক বিক্রেতারা পণ্য ক্রয়ের উদ্দেশ্যে ছুটে যাচ্ছেন মুম্বাইয়ে। দশ হাজার ডলারের লেহেঙ্গার সংবাদ নিয়েও সংবাদ শিরোনাম হচ্ছে বাংলা সাপ্তাহিকের পাতায়। নিউইয়র্কের স্কুল-কলেজগুলোতে এখন হাজার হাজার বাঙালি অভিবাসী শিক্ষার্থী লেখাপড়া করছে। দুই ঈদে সরকারি ছুটি মঞ্জুর করা হয়েছে নিউইয়র্কে।ঈদ মানে খুশি, ঈদ মানে আনন্দ। এ কথা সত্য হলেও সবার জন্য সমান সত্য নয়। কারণ দেশে আত্মীয়-পরিজন নিয়ে মহাআনন্দে ঈদ উদযাপন করলেও প্রবাসীদের জীবনে এর বাস্তবতা খুঁজে পাওয়া যায় না। আর তাই ঈদে তাদের আনন্দটা অতটা গাঢ় রঙ ধারণ করে না। প্রবাসে অনেকেই আছেন যাদের জন্য ঈদের দিনটা অত্যন্ত কষ্টের। এই কষ্টকে বুকে নিয়েই যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি প্রবাসীরা ঈদ উদযাপন করে থাকেন।প্রবাসীদের ঈদ উদযাপনের খোঁজ-খবর নিতে গিয়ে তেমনটাই আঁচ করা গেলো।প্রবাসীরা বিভিন্ন মাধ্যমে জানিয়েছেন, বাংলাদেশসহ মুসলিম বিশ্বের মতো এখানেও ঈদকে নিয়ে আশা-আকাঙ্ক্ষা আর প্রস্তুতির কমতি থাকে না।কিন্তু প্রিয়জনদের হাজার মাইল দূরে রেখে ঈদ আনন্দ পাথর-চাপা কষ্টে পরিণত হয়।আত্মীয়-স্বজন রেখে দূর দেশে ঈদ করাটা সত্যিই বেদনার।                                     লেখক ও কলামিস্ট,যুক্তরাজ্য                                     raihan567@yahoo.com

ThemesBazar.Com

     More News Of This Category